ধর্ষণরোধে আমাদের দায়বদ্ধতা

নিউজ নিউজ

এডিটর

প্রকাশিত: ১:৫১ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২০

—————
বর্তমানে দেশ তথা পুরো বিশ্বকে গ্রাস করে ফেলেছে প্রত্যক্ষ এক মহামারি আর সেটা হচ্ছে ‘করোনা’। কিন্তু পরোক্ষভাবে আমাদের বিবেকবোধের আড়ালে এক মহামারি আমাদেরকে গ্রাস করে ফেলেছে আর সেটা হচ্ছে ‘ধর্ষণ’। আর এ ধর্ষণের ভয়ানক থাবা হতে রেহাই পাচ্ছে না ৬ বছরের শিশু কন্যা থেকে শুরু করে ২৫-৩০ ঊর্ধ নারী। আগেকার দিনে ধর্ষণ নামক শব্দটা শুনলেই যেখানে শরীর শিউরে উঠত বর্তমান সময়ের জন্য সে তো পত্রিকায় নিয়মিত প্রতিবেদন চাপানোর অন্যতম খোরাক। পত্রিকার পাতা উল্টালেই দেখা যায় এসব বিভৎস নিউজ। এসব অপরাধের জন্য ধর্ষকদের যতাযত বিচার কার্যকর না হাওয়ায় তারা দিন দিন সাহস পাচ্ছে এবং অপরাধের মাত্রাও ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এবং আমাদের সমাজ ও সভ্যতার ভাবধারাকে পাল্টে দিতে হায়েনারা নক মেলে বসেছে।সমাজে ধর্ষণের মত ঘটনা অনেক ধরনের হতে পারে।তবে আমাদেরকে দেখতে হবে সংবিধান কি বলে।

ধর্ষণ আইনে ধর্ষণকে সংজ্ঞায়িত করা হয় ঠিক এভাবে,যদিও নারী সংস্থাগুলো এই সংজ্ঞা নিয়ে আদৌ সন্তুষ্ট নয়। এই আইনে বলা হয়েছে,পুরুষাঙ্গ নারী-যৌনাঙ্গের ভেতরে প্রবেশ না করলে সেটি ধর্ষণ বলে গণ্য হবে না। অথচ পুরুষ বহুভাবেই নারীর উপর যৌন অত্যাচার (sexual assault) করতে পারে। দুর্ভাগ্যবশতঃ ধর্ষণ আইনের আওতায় এগুলো পড়বে না। ধর্ষণ (Rape) আইন (Penal Code) একজন পুরুষ তখনই ধর্ষণ করেছে বলে গণ্য হবে,যখন দুজনেরই যৌন-সংসর্গ ঘটেছে; (১) সেই নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে,(২) সেই নারীর সম্মতি ছাড়া,(৩) সেই নারীর সম্মতি নিয়ে, কিন্তু সেই সম্মতি আদায় করা হয়েছে তাকে বা তার কেন প্রিয়জনকে হত্যা বা আঘাত করা হবে বলে ভয় দেখিয়ে,(৪) নারীটি সম্মতি দিয়েছে এই বিশ্বাসেে যে পুরুষটি তার স্বামী,যদিও পুরুষটি জানে সে মহিলাটির স্বামী নয়,(৫) নারীটি যখন সম্মতি দিয়েছে তখন সে প্রকৃতিস্থ ছিলো না অথবা পুরুষটি বা অন্য কারো দেয়া হতবুদ্ধিকর বা বাজে কোন বস্ত খেয়ে নেশাগ্রস্থ অবস্থায় ছিল-যার ফলে এই সম্মতি দানের পরিমাপ বোঝার ক্ষমতা তার ছিল না,(৬) নারীটির সম্মতি থাকুক বা না থাকুক তার বয়স ১৬ বছরের কম।এ ব্যাপারে ব্যতিক্রম আছে,(ক) স্বামী-স্ত্রীর যৌন মিলনকে কোন ক্ষেত্রেই ধর্ষণ বলে ধরা হবে না,যদি না স্ত্রীর বয়স ১৫ বছরের কম হই অথবা আদালতের নির্দেশে স্বামী-স্ত্রী আলাদাভাবে না থাকে।

যৌন হয়রানি শুধু নারীর বিরুদ্ধে নয়,মানবতার বিরুদ্ধে চরম অপরাধ।বিশ্বের যেসব দেশে ধর্ষণের মত জঘন্য অপরাধ বেড়েয় চলেছে সেখানে এশিয়ায় ভারত ও বাংলাদেশর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে থাকে। খুন,ধর্ষণ আজকাল এই আধুনিক পৃথিবীর নিত্যনৈমাত্রিক ঘটনা হলেও আমাদের দেশে এর মাত্রা যেন সব বিচিত্রিতার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে,ধর্ষণের ব্যাপকতার পেছনে অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে, ইসলামী মূল্যবোধ মেনে না চলা এবং অপরাধীর যতাযত শাস্তি নিশ্চিত না হাওয়া। আবার অনেকাংশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্লিপ্ততা ও তাদের তৎপরতা ও দায়ী। নারী নির্যাতন প্রতিরোধে যথেষ্ট শক্তিশালী আইন থাকার সত্ত্বেও নির্যাতনকারী বিভিন্ন উপায়ে পার পেয়ে যায়।এমনকি ধর্ষণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আইন ভারতের চেয়েও শক্তিশালী। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩) এর ৯(১)ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোন পুরুষ কোন নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে তবে সে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দন্ডিত হবে।একই আইনের ৯(২) ধারায় বলা আছে,ধর্ষণ বা ধর্ষণ পরবর্তী কার্যকলাপের ফলে ধর্ষিত নারী বা শিশুর মৃত্যু হলে ধর্ষকের মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দন্ডিত হবে। একই সঙ্গে জরিমানার কথাও বলা হয়েছে।সর্বনিম্ন ১ লক্ষ টাকা। ৯(৩) ধারায় আছে, যদি একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে কোন নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে এবং ঐ ধর্ষণের ফলে নারী বা শিশু মারা যায় তাহলে প্রত্যেকের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা মৃত্যুদন,কমপক্ষে ১ লক্ষ টাকা জরিমানা করা হবে।ধর্ষণের ক্ষেত্রে ভারতের চেয়েও বাংলাদেশের আইন শক্তিশালী বলার কারণ হচ্ছে, সে ক্ষেত্রে ভারতের আইন হলো যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। মহিলা আইনজীবী সমিতির এক জরিপে জানা যায়, নানা কারণে ধর্ষণ মামলার ৯০ শতাংশ আসামী খালাস পেয়ে থাকে। অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মত,প্রশাসনে দলীয় লোক থাকার কারণে এসব ঘটনার অপরাধীরা প্রায় ধরা- ছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় পার পেয়ে যাওয়ার আরেক কারণ। সেই কারণে আমাদেরকে শুনতে হচ্ছে তনুদের আর্তচিৎকার,এই তো গত ২৫ তারিখের ঘটনা খাগড়াছড়িতে এক উপজাতি মেয়ে ধর্ষণ, এবং তাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে তার মা-বাবা,তার কাপড়ের পেছনটাই লেগে আছে রক্তের দাগ। এই আপমান শুধু তার এবং তার পরিবারের না, ১৬ কোটি মানুষের জন্যেও অপমান ও লজ্জাজনক। সুতরাং এ বিষয়ে জনগণের প্রতিরোধ গড়ে তোলতে হবে এবং ধর্ষকদের সামাজিকভাবে বর্জন করতে হবে। তাহলেই ধর্ষকদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করা যাবে।

আইনে যাই থাকুক না কেন আমাদের সমাজের আতি রক্ষণশীলতা এবং পারিবারিক সমস্যাকে গোপন রাখায় ধর্ষণকারীদের শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে বিরাট অন্তরায়। যৌন নির্যাতন তথা ব্যভিচার সর্বযুগে সর্বধর্মমতে নিকৃষ্টতম পাপাচার। তন্মধ্যে আমাদের ধর্মগ্রন্থ আল কুরআনের বিভিন্ন সূরার বিভিন্ন আয়াতে মহান আল্লাহ তায়ালা ব্যভিচার সম্পর্কিত পাপের ভয়াবহতা ও এর কঠিন পরিণতি সম্পর্কে সুষ্ঠভাবে মানবজাতিকে সাবধান হতে বলেছেন।মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন,”তোমরা ব্যভিচারের ধারে কাছেও যেও না কারণ এটা একটা অশ্লীল এবং জঘন্য পন্থা”। কোন অপরাধ কখনো নিঃশেষ করা যায় না কিন্তু নিয়ন্ত্রণ করা যায়।এবং সেটাই আমাদের করতে হবে যে কেন মূল্যে ধর্ষণের মত অপরাধ নিয়ন্ত্রন করতে হবে।আমরা পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীদেরকে বানিয়েছি,ভোগের বস্তু।এ মন মানসিকতা দূর করতে হবে। আর আমরা প্রায়ই বলে থাকি পোশাকই ধর্ষণের জন্য দায়ী কিন্তু এ কথাটা পুরোপুরিভাবে সমর্থনযোগ্য নয়।কারণ অনেক শিশুও তো ধর্ষণের শিকার হচ্ছে,এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে তো নারীরা বোরকা পরিধান করার পরও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে, আমাদের দেশে অনেক নারী কর্মী আছে যারা এখানে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এসব ঘটনাকে কিভাবে বলবেন পোশাকের কারণে ঘটেছে। তাই কথ হচ্ছে পুরুষদের মন মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। ইসলামে নারীদের পর্দা বিধানের পাশাপাশি পুরুষদের চোখ অবনত রাখার বিধানও দিয়েছে। মোদ্দা কথা নারীদের শালিনতার পাশাপাশি আমাদের চোখকে অবনত করতে হবে। ধর্ষণরোধে আমাদের সমাজকে সচেতন হতে হবে।আামদের মানবিক গুণাবলী জাগ্রত করতে হবে। অবাধ মেলামেশা,পর্নো সাংস্কৃতি নামে অশ্লীল নাটক-সিনেমা,নাচ-গান যৌন সুডসুডিমূলক বই-ম্যাগাজিন ইত্যাদি মানুষকে প্রবলভাবে ব্যভিচারে প্ররোচিত করে এবং তা বর্জন করতে হবে। ধর্মীয় ও যৌন শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে । পরিবারকে একটা বিষয় খেয়াল রাখতে হবে যে, প্রাপ্তবয়স্ক হলে ছেলে-মেয়েদের জন্য বিয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। সর্বোপরি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে ,যদি সমাজ থেকে খুন,ধর্ষণ,নির্যাতন রোধ করতে চাই।
——————-
মিরাজ উদ্দীন সিফাত
শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।