সোমবার ২৯শে নভেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ
আমাদের সম্পর্কে
যোগাযোগ

ধর্ম যার যার উৎসব তার তার।।

অক্টোবর ১৯, ২০২১
প্রিন্ট
নিউজ ভিশন

আমাদের এ দেশে সকল ধর্মের মানুষের বসবাস। এখানে সবাই তাদের সবকিছু স্বাধীনভাবে করার অধিকার রয়েছে। এই তো সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় এবং তাদের ভাষায় সর্বাধিক প্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ একটি মহোৎসব ‘দুর্গাপূজা’। যে পূজাকে কেন্দ্র করে ভারতসহ আমাদের দেশেও অত্যন্ত যাকজমক ও অনারম্বর এবং ব্যয়বহুল ভাবে আয়োজন করা হয় এই উৎসবটি! নিজেদের ধর্মীয় চেতনা থেকে তারা তাদের ধর্মীয় উৎসব পালন করবে এটাই স্বাভাবিক। এতে আমাদের সামান্যও মাথা ব্যথা নেই বরং উৎসব উদযাপনে তাঁদের রয়েছে পূর্ণ স্বাধিনতা।নিজস্ব সীমারেখায় থেকে নির্বিঘ্নে তারা তাদের ধর্মীয় উৎসব পালন করবে এতে আমাদের কোন সমস্যা নেই। আর সমস্যা থাকবেই বা কেন, তাদের ধর্ম তারা পালন করবে এতে তো আমাদের কোন যায় আসেনা। বরং ধর্মীয় উৎসব পালন করতে যেন তাদের কোন বাঁধা বিপত্তির সম্মুখীন না হতে হয় সেক্ষেত্রে আমরা সজাগ ও সদা প্রস্তুত। বর্তমানে শুধু আমাদের দেশের রাজধানী ঢাকাতেই নয় বরং পুরো বাংলাদেশ জুড়েই পূজার আয়োজন চলে মহাসমারোহে। শহরের অলিতে গলিতে, বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে প্রস্তুত হয় হাজার হাজার পূজা।প্রায় সপ্তাহজুড়ে চলে এই অনুষ্ঠান। যাদের উৎসব তারা তো পালন করেই। বরং সাম্প্রতিক এসকল মণ্ডপে শুধু হিন্দু ধর্মাবলম্বীরাই ভীড় করে না। বরং বহু মুসলমানও যায় পূজা দেখতে, কেউবা আনন্দ উপভোগ করতে এবং তাদের সাথে একাকার হয়ে অনুষ্ঠান উপভোগ ও উদযাপন করতে। যা খুবই দুঃখজনক! তবে এর চেয়েও কষ্ট ও পরিতাপের বিষয় হলো, এসকল পূজামণ্ডপে ছোট থেকে সর্বোচ্চ স্তরের নেতা-নেত্রীগণও অত্যন্ত আগ্রহ-উদ্দীপনার সাথে কেবল উপস্থিত হয়েই ক্ষান্ত থাকেন না বরং তাদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেন। যা একজন মুসলমানের পক্ষে চরম লজ্জা ও লাঞ্ছনার কারণ। অথচ কয়েক বছর আগেও দৃশ্যপট এমনটা ছিল না।

এদেশের হিন্দুরা যুগযুগ ধরে তাদের এই ধর্মীয় উৎসব পালন করে আসছেন । তখন তা ঢাকেশ্বরী মন্দীর ও নির্দিষ্ট কিছু মন্দীর মণ্ডপ পর্যন্তই সীমিত ও সীমাবদ্ধ থাকত। হিন্দু সম্প্রদায়ের একান্ত ধর্মীয় বিষয় বলে মুসলমানরা সেখানে কখনোও এ্যাটেন বা অংশগ্রহণ করত না। সরকারী-বেসরকারী মুসলিম নেতাদের উপস্থিতিও ছিল একেবারে নগণ্য। কিন্তু বিগত কয়েক বছর থেকে যেভাবে পূজো উদযাপন হচ্ছে এবং সর্বপ্রকারের মিডিয়ায় যেভাবে এর প্রচার-প্রচারণা চালানো হচ্ছে তা সম্পূর্ণই ভিন্ন। এখন পূজার সময় মনে হয় না, এটি যে এদেশের ১০% বা ১২% নাগরিকের একটি উৎসব। বরং সবকিছু দেখে মনে হতে পারে এ যেন হিন্দু প্রধান একটি দেশ।সে যাই হোক। পূজা যাদের তারা সেটা নিরাপদে আর আনন্দেই পালন করুক। কিন্তু সম্প্রতি কিছু কিছু নেতা-নেত্রীদের মুখে একটা স্লোগান অনেক বেশিই শোনা যাচ্ছে যে, “ধর্ম যার যার উৎসব সবার” ঈমান বিধ্বংসী এই স্লোগান বলতে ও লিখতে তাদের অন্তর সামান্যও কেঁপে উঠে না। অথচ কী মর্মান্তিক স্লোগান এটা! একজন মুসলমানের পক্ষে এরকম কথা বলা কতটুকু যৌক্তিক ও শরিয়ত সম্মত সে বিষয়েই কিছু আরয করার চেষ্টা করবো।

শুরুতেই আমাদের নিবেদন হচ্ছে, যেহেতু এসব পূজা-উৎসব কিংবা অপর ধর্মীয় কোনো বিষয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রটিতে ঈমানের প্রশ্ন জড়িত। তাই এ বিষয়টির বিশ্লেষণ শরীয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে হওয়াই বাঞ্ছনীয়। অন্য কোনো রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক তত্ত কিংবা ভাবাবেগের সাহায্য এক্ষেত্রে গ্রহণ করা সমীচীন নয়। সে হিসেবে প্রথমেই আমরা যে কথাটি পেশ করতে চাই সেটি হচ্ছে, সাধারণ যুক্তিতে কিংবা শরীয়তের আলোকে এই বাক্য দুটিকে বাস্তবসম্মত বলে সাব্যস্ত করা যায় না। কারণ, বিগত কয়েক বছর যাবৎ আমরা যে কথাটা শুনছি, ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ এটি কেবল পূজার সময়ই এবং পূজাকে উপলক্ষ করেই বলা হচ্ছে। মুসলমানদের কোনো উৎসব নিয়ে এ জাতীয় বাক্য উচ্চারিত হতে শোনা যায়নি। আর পূজার বিষয়টি যেহেতু সম্পূর্ণই ধর্মীয় বিশ্বাসনির্ভর তাই তা সংশ্লিষ্ট ধর্মের লোকেরা তাদের নিজস্ব ধর্মীয় বিশ্বাস ও নীতির ভিত্তিতে করে থাকে। এ উপলক্ষে তাদের যে উৎসব-আনন্দ সেটি সম্পূর্ণই পূজাকে কেন্দ্র করে। আর পূজাকে কেন্দ্র করেই ‘প্রতিমা’ তৈরি করা হয়। প্রসাদ বিতরণ করা হয়। বহু রকম কেনাকাটা ও আয়োজনের সমারোহ চালানো হয়। এভাবেই পূজাকেন্দ্রিক মহা এক উৎসবের ব্যবস্থা হয়। সুতরাং এ উৎসব-আনন্দ আর ধর্মীয় বিশ্বাস প্রত্যেকটাই একটা অপরটার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তাই এখানে উৎসব-আনন্দের বিষয়টিকে পৃথক করে দেখা এবং পূজার বিষয়টিকে পৃথক করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। বিষয়গুলো আসলে পৃথক নয়। বরং একটা আরেকটার অনুষঙ্গ এবং এক ও অভিন্ন। তাই এক ধর্মাবলম্বীদের ধর্মভিত্তিক উৎসবকে অন্য ধর্মাবলম্বীদের উৎসব হিসেবে সাব্যস্ত করা আদৌও যুক্তিসঙ্গত হতে পারে না।
এ বিষয়ে মৌলিক ও দ্বিতীয় আরেকটি কথা হচ্ছে, ইসলামের দৃষ্টিতে এ ধরনের কথা বা আকীদায় বিশ্বাস করার কোনো সুযোগই নেই। কারণ, ঈমান ও ইসলাম হচ্ছে একক ও নিরঙ্কুশ বিষয়। এখানে কোনো প্রকারের মিশ্রণের ন্যূনতম সুযোগ নেই। আমরা যদি আমাদের দুই ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার পটভূমির দিকে তাকাই তাহলে বিষয়টি আমাদের সামনে আরো স্পষ্ট হয়ে যাবে। মদীনায় ইসলামপূর্বে নওরোয ও মেহেরজান নামে দু’টি উৎসব চালু ছিল। সাহাবীগণ ওই দুটি উৎসব পালন করতে চাইলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা পালনের অনুমতি দেননি। বরং এর উত্তম বিকল্প হিসেবে মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র দুটি ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা উপহার দিয়েছেন। এ থেকে এ সত্যটি অনুধাবন করা যায় যে ,যদি মুসলমানদের জন্য অন্যদের উৎসব পালন করার সুযোগ থাকতো তাহলে তিনি ওই উৎসব পালন করা থেকে সাহাবীদের বিরত করতেন না। তৃতীয়ত পূজার বিষয়টিকে ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে যে কোনো মুসলমানের কাছেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে, তার সঙ্গে কোনোরকম সংশ্লিষ্টতারই সুযোগ কোনো মুসলমানের নেই। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামের শুরুর যুগে এ জাতীয় ধর্মাচারের বিরোধিতা করেই ইসলামের তাওহীদ তথা একত্ববাদের দিকে মানুষকে আহ্বান করেছেন। এবং সকল প্রকারের মূর্তি ও পূজাকে শিরিক আখ্যা দিয়ে তা থেকে বেঁচে থাকার তাগিদ দিয়েছেন।সুতরাং আকীদাগত বা বিশ্বাসগত দিক থেকে একজন একত্ববাদী মুসলিম এর জন্য পূজা-জাতীয় ধর্মাচারের সঙ্গে যুক্ত হওয়া, সমর্থন করা এবং সেটিকে নিজের উৎসবের বিষয় মনে করার কোনো সুযোগ ইসলামে নেই।
তবে এক ধর্মের সাথে অপর ধর্মের অনুসারীদের সহাবস্থান এবং অন্য ধর্মের অনুসারীদের আপন আপন পূজা-আরাধনা নির্বিঘ্নে পালন করতে সহযোগিতার বিষয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত পরিষ্কার। ইসলাম এতে পূর্ণ সমর্থন দেয় ও দায়িত্ব গ্রহণ করে। ইসলামের স্পষ্ট নীতি হচ্ছে, যে কোনো ধর্মাবলম্বী নিজস্ব গণ্ডির মধ্যে তার ধর্ম পালন করুক। নিজস্ব পরিধির মধ্যে তার ধর্ম পালনের পূর্ণ স্বাধীনতা তার রয়েছে। ইসলাম এক্ষেত্রে কোনো প্রকার অসহযোগিতা ও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে না। বরং তাদের নিজস্ব গণ্ডির ভেতরে থেকে এগুলো পালন করার জন্য ইসলামী সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতাও দেয়া হয়েছে ইসলামী খেলাফতের সময়গুলোতে। হযরত উমর রা. তাঁর শাসনামলে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের (কানীসা) বানানোর সুযোগও দিয়েছেন। সুতরাং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকার এবং ধর্মীয় আচার-আচরণকে এক করে দেখার পেছনে যুক্তিসঙ্গত কোনো কারণ নেই। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, প্রত্যেক ধর্মের নিজস্ব। এ উপলক্ষে আয়োজিত উৎসব ও আনন্দও তাদের নিজস্ব। ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের অন্যদের ধর্মীয় কাজে যোগ দেওয়া, সেগুলোকে পছন্দ করা, সে উৎসবকে নিজের উৎসব মনে করার কোনো একটি বিষয়ই শরীয়ত কর্তৃক সমর্থিত নয়।
মূলত অন্য ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে সহাবস্থান, নিজস্ব পরিধির মধ্যে তাদের ধর্মপালন ও পালনের অধিকার একটি সমর্থিত ও স্বীকৃত বিষয়। এটি ইসলামেরই নীতি। কিন্তু অপর ধর্মের ধর্মীয় আচার এবং ধর্মভিত্তিক উৎসবকে নিজের উৎসব মনে করা কিংবা সে উৎসবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেয়া সম্পূর্ণ অসমর্থিত, অযৌক্তিক ও বাস্তবতাবহির্ভূত। মূর্তিপূজা সংশ্লিষ্ট অনুষ্ঠান-উৎসবে কোনো মুসলমানের পক্ষে এভাবে একাত্মবোধ করার কোনো অবকাশই নেই। এটা ইসলামের অন্যতম প্রধান শিক্ষা এবং ভিত্তিগত চেতনারও বিরোধী।
এ ব্যাপারে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্ট বক্তব্য হচ্ছে, যে ব্যক্তি অন্য জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করবে, সে তাদের দলভুক্ত বলে গণ্য হবে।(সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৪০৩১) অন্য একটি বর্ণনায় খলীফা হযরত উমর রা. বলেন, তোমরা আল্লাহর দুশমনদের উৎসবগুলোতে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থাক।(আসসুনানুল কুবরা, হাদীস ১৮৮৬২) অন্য বর্ণনায় তিনি এর ব্যাখ্যায় বলেছেন ‘কারণ এক্ষেত্রে আল্লাহর অসন্তুষ্টি নাযিল হয়ে থাকে।’ আরেকটি বর্ণনায় হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রা. বলেছেন অর্থাৎ যারা বিধর্মীদের মত উৎসব করবে, কিয়ামত দিবসে তাদের হাশর ঐ লোকদের সাথেই হবে। (আসসুনানুল কুবরা, হাদীস ১৫৫৬৩)
অতএব, ধর্ম যার যার, উৎসব তার তার। তাই এজাতীয় সকল উৎসব উদযাপনের উদ্ভট চিন্তা পরিহার করা প্রতিটি মুসলমানের জন্য একান্ত জরুরী। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সঠিক উপলব্ধি দান করে মিল্লাতে ইব্রাহীমীর ওপর অবিচল থাকার তাওফীক দান করুন। আমীন।

সাজ্জাদ মাহমুদ
শিক্ষার্থী, ইসলামী আইন ও গবেষণা বিভাগ, ২য় বর্ষ, দারুস-সুন্নাহ মাদরাসা টাংগাইল।

সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
logo

নিউজ ভিশন বাংলাদেশের একটি পাঠক প্রিয় অনলাইন সংবাদপত্র। আমরা নিরপেক্ষ, পেশাদারিত্ব তথ্যনির্ভর, নৈতিক সাংবাদিকতায় বিশ্বাসী।

সম্পাদক ও প্রকাশক : মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম

ঢাকা অফিস: ইকুরিয়া বাজার,হাসনাবাদ,দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জ,ঢাকা-১৩১০।

চট্টগ্রাম অফিস: একে টাওয়ার,শাহ আমানত সংযোগ সেতু রোড,বাকলিয়া,চট্টগ্রাম |

সিলেট অফিস: বরকতিয়া মার্কেট,আম্বরখানা,সিলেট | রংপুর অফিস : সাকিন ভিলা, শাপলা চত্ত্বর, রংপুর |

+8801789372328, +8801829934487 newsvision71@gmail.com, https://newsvisionbd.com
Copyright@ 2021 নিউজ ভিশন |
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ‌্য মন্ত্রণালয়ে আবেদিত ।