দূষণ হচ্ছে চট্টগ্রামে, সিএসআর তহবিলের অর্থ যাচ্ছে বরিশালে!

নিউজ নিউজ

এডিটর

প্রকাশিত: ১২:৫৫ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৯, ২০২০

ডি এইচ মনসুর, আনোয়ারা ঃ
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড়ে আনোয়ারা উপজেলায় অবস্থিত কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানির (কাফকো)। কাফকোতে সার উৎপাদন করতে গিয়ে বিভিন্ন সময় পরিবেশ বিপর্যয়ের শিকার হয়েছে কারখানার আশপাশের মানুষ ও পরিবেশ।
সেই প্রেক্ষাপটে প্রতিষ্ঠানটির করপোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি বা করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিলের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে আনোয়ারা তথা চট্টগ্রাম অঞ্চল অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা। কিন্তু গত দুই অর্থবছরে এ খাতের একটি টাকাও ওই এলাকার মানুষের ভাগ্যে জোটেনি।

অথচ একই সময়ে প্রায় এক কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বরিশালের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন চট্টগ্রামের নানা পেশার মানুষ।
অভিযোগ উঠেছে, কাফকোর সদ্য অবসরপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আবদুল হালিমের বাড়ি বরিশালে হওয়ার কারনে সিএসআরের ওই টাকা সেখানে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কবরস্থানের উন্নয়ন থেকে শুরু করে কাফকো চেয়ারম্যানের উড়োজাহাজে বরিশালে যাওয়া-আসা কিংবা রেস্তোরাঁয় খাওয়ার বিলও পরিশোধ করা হয়েছে ওই খাত থেকে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী দেখা যায়, ২০১৮-১৯ ও ২০১৯-২০ অর্থবছরে কাফফোর সিএসআর তহবিল থেকে বরিশালের ফজলুল হক স্কুলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনে সাড়ে ১২ হাজার টাকা, কম্পিউটার ও সায়েন্স ল্যাবের জন্য ১৫ লাখ ৬৮ হাজার, ল্যাপটপ বাবদ ৩ লাখ ৯৪ হাজার, আইসিটি ল্যাবের জন্য ১ লাখ ১২ হাজার ১৬৬, কম্পিউটার সেটআপের জন্য ২ লাখ ২১ হাজার ৬৮৬ এবং সায়েন্স ল্যাবের জন্য ২ লাখ ১৩ হাজার ৬৬০, ছারগরিয়া মসজিদে অনুদান হিসেবে ২ লাখ, ঢাকা থেকে বরিশালে যাওয়া-আসার উড়োজাহাজ ভাড়া ৬৮ হাজার ৪০০, বরিশালের আরেকটি স্কুলের কম্পিউটার ল্যাবের জন্য ৫ লাখ, অপর একটি স্কুলের ল্যাপটপ কিনতে ৮ লাখ ১৪ হাজার ১১৩, শের-ই-বাংলা স্মৃতি বৃত্তির জন্য ৫ লাখ, হালতা হাজীবাড়ি কবরস্থান উন্নয়নে ৯ লাখ, ঢাকার সুরের ধারা স্কুলের জন্য ৭ লাখ, হালতা স্কুলের জন্য অনুদান ৫ লাখ, ওই স্কুলে ল্যাপটপ কেনার জন্য ৭ লাখ ৬৪ হাজার ৩১০, নামহীন একটি প্রতিষ্ঠানের ল্যাবের যন্ত্রপাতি কিনতে ১ লাখ ১২ হাজার ৭৫২, বরিশালে হোটেলে থাকার বিল ১ লাখ ৫৮ হাজার ২৫৪, বরিশাল আলতাফ স্কুলে ৫ লাখ এবং মুকুল স্মৃতি স্কুলে ৭ লাখ টাকা অনুদান দেওয়ার হিসাব দেখানো হয়েছে।

কাফকোর আইনে ১০০ ইউএস ডলার কিংবা সমপরিমাণ বাংলাদেশি মুদ্রার বেশি টাকার পণ্য নগদে কেনার সুযোগ নেই। এর বেশি কেনাকাটা করতে হলে তাতে প্রতিষ্ঠানটির ক্রয় কমিটির অনুমোদন লাগবে কিংবা ওই কমিটিই তা কিনবে। কিন্তু কাফকোর চিফ করপোরেট অফিসার (সিসিও) রবিউল হক চৌধুরী এই আইনের ধার ধারেননি। তিনি নিজেই সবকিছু কিনেছেন সিএসআর তহবিলের টাকায়।

আর বিলটি ধরিয়ে দিয়েছেন কাফকোকে। সিএসআরের ১ কোটি টাকার মধ্যে ৮৩ লাখ ৮৯ হাজার ৮৬১ টাকা তিনি এভাবেই ব্যয় করেছেন।
জানা গেছে, কাফকোর সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হালিমের বাড়ি বরিশালে। এই সাবেক শিল্প সচিব গত মে মাসে চাকরি থেকে অবসরে যান। নিয়ম অনুযায়ী শিল্প সচিব কাফকোর চেয়ারম্যান থাকেন। কাফকোর চিফ করপোরেট অফিসার (সিসিও) রবিউল হক চৌধুরীর হাত দিয়েই সিএসআরের পুরো টাকার বরাদ্দ বরিশালে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

কাফকোর সিএসআর খাতের অর্থ কারখানা এলাকায় ব্যয় না করে দূরের জেলা বরিশালে ব্যয় করাকে দুর্নীতি হিসেবে মনে করছেন অনেকেই। সচেতন মহল মনে করেন ‘কাফকো প্রতিষ্ঠার পর আশপাশের এলাকায় মারাত্মকভাবে পরিবেশ দূষণ হয়। কাফকোর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ সেখানে আছে। এ ছাড়া কাফকো এলাকায় অনেক গরিব মানুষের বাস। বহুজাতিক এই প্রতিষ্ঠানের সিএসআর খাতের বরাদ্দ অর্থের দাবিদার তারাই। কিন্তু তাদের পাশ কাটিয়ে পুরো টাকা বরিশালে বরাদ্দ দেওয়াটা শুধু অন্যায় নয়, দুর্নীতিও। ’

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে কাফকোর সিসিও রবিউল হক চৌধুরীর মোবাইল ফোনে বেশ কয়েক বার কল করা হলেও তিনি প্রতিবারই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

পরে কাফকোর মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) গাউছুল আজম ছিদ্দিকীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমার কিছু বলার নেই। এসব ঢাকা অফিস থেকে প্রসেসিং হয়। ’

কাফকোতে তিন বছর ধরে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নেই। প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও), প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) ও প্রধান করপোরেট কর্মকর্তা (সিসিও) মিলেই মূলত কাফকোর মূল সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে থাকেন। বহুজাতিক এই প্রতিষ্ঠানের ৪৯ শতাংশ শেয়ার বাংলাদেশ সরকারের, আর ৫১ শতাংশ শেয়ার বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের।