তরুণ প্রজন্ম আজ হুমকির মুখে!!

নিউজ নিউজ

এডিটর

প্রকাশিত: ১০:৩০ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২০

হাজেরা চৌধুরী তাহেরা:

আজকের শিশু আগামীদিনের ভবিষ্যত। সাধারণত ১৮ বছরের নিচে সবাইকে শিশু বলা হয়। তবে নির্দিষ্ট বয়সসীমানূযায়ী নির্দিষ্ট নাম নির্ধারিত হয়। ১-৫ বছরের হলে শিশু, ৬-১০ বছরের হলে বালক/ বালিকা এবং ১১-১৯ বছরের হলে কিশোর/কিশোরী। আর এই কিশোরেরাই আজকের ধ্বংসায়মান তরুণ প্রজন্ম ।

একটি দেশের সঠিক পথে পরিচালিত তরুণ সমাজ যেমন সে দেশের উন্নতির প্রধান শক্তি তেমনি পথভ্রষ্ট তরুণ সমাজ উন্নয়নের পথে প্রধান অন্তরায়। তরুণ ছাত্রসমাজ তাদের উদ্বেল তারুণ্য আর দুর্জয় সাহস দিয়ে অসাধ্যকে সাধন এবং অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে। একটি দেশের তরুণ ছাত্রসমাজ চিন্তাচেতনা ও শিক্ষায় এক অগ্রগামী বাহিনী। অন্যায়ের প্রতিবাদে এক অপরাজেয় শক্তি, সত্যের পথে জাগ্রত সৈনিক এবং আগামীদিনের উজ্জল আলোকবর্তিকা।

প্রকৃতপক্ষে আমরা গোড়ায় গলদ করেছি। তাই আজকের তরুণ প্রজন্ম গোল্লায় যাচ্ছে। কবির ভাষায়,
“শৈশবে সদোপদেশ যাহার না রোচে
জীবনে কভু তাহার অজ্ঞতা না ঘোচে ”
কবিতার চরণগুলির চিরন্তন সত্যতার দৃষ্টান্ত আজকের তরুণ প্রজন্মের কার্যকলাপ। তরুণ প্রজন্মের অধিকাংশ শৈশবে সঠিক শিক্ষা পায়নি। আর বাকি অংশ সঙ্গেদোষে, পরিবেশ, পারিপার্শিকতার কারণে ধ্বংসের পথে ধাবিত হচ্ছে। আর বাবা মার খেয়ালের অভাবে অনেক তরুণ চুরি, পকেটমারি, স্কুল পালানো, অশোভন ছবি অবলোকন, নাশকতামূলক কাজ এবং রাস্তাঘাটে বিশৃংখল অবস্থা সৃষ্টিসহ নানারকম অনিয়মে জড়িয়ে পড়ছে।

আমাদের দেশে উচ্চবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েরা তাদের চাহিদামতো সবকিছু হাতের নাগালে পেয়ে যাচ্ছে। টিভি, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ট্যাবলেট, মোবাইল ফোন সন্তানের আবদারে অভিভাবকেরা প্রত্যেকটা জিনিস তাদের হাতে তুলে দেন। তাছাড়া যন্ত্রগুলোর নেতিবাচক দিক ও মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের ব্যাপারেও অভিভাবকেরা সচেতন নন। আর সন্তানের প্রতি পিতামাতার এই আদরের মোহাচ্ছন্নতার ফলে তারা পড়ালেখার প্রতি আকর্ষণ হারিয়ে ফেলার পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়া : ফেইসবুক, টুইটার, ইউটিউব, এবং কম্পিউটার গেমে আসক্ত হয়ে পড়ছে। অনেক সময় বাবা মা কর্মের তাড়নায় অফিস চলে গেলে ছেলে একাকিত্ব ও নিঃসঙ্গতা হতে মুক্তি পেতে পাড়ার অকর্মণ্য কিছু তরুণদের সাহচর্য বেছে নেয় এবং তাদের কাছ থেকে আনন্দে সময় কাটানোর পন্থা হিসেবে মাদকতাও শিখে নেয়।

আর মধ্যবিত্ত পরিবারে জোগান কম তাই চাহিদাও কম। এ পরিবারে বাবা মার একটাই আশা, ছেলে বড় হয়ে চাকরি করে তাদের অভাব মোচন করবে।জ্ঞানার্জন করে সুশিক্ষিত সূনাগরিক হওয়ার স্বপ্ন তাই সে পরিবারের তরুণরাও দেখে না।তাই তারা নকল করে, অন্যের কাঁধে ভর করে, বছরের পর বছর ব্রেঞ্চি পাশ করে। সার্টিফিকেটের পর সার্টিফিকেট অর্জন করে। কিন্তু সঠিক মানসিকতার অধিকারী হয় না। আর তারাই হচ্ছে তথাকথিত ব্রিলিয়ান্ট ছেলে যারা বৃদ্ধ বয়সে পিতামাতার যত্নআত্তি না করে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠায়।

এদেশে নিরক্ষর হতদরিদ্র পরিবারের বাবা মার মানসিকতা হচ্ছে এইরকম, ‘সন্তান ছেলে হলে তাকে প্রাথমিক শিক্ষার স্তর পার করিয়ে ইটভাটায় , কলকারখানায় অথবা চেনা দোকানদারের অধীনে কাজে লাগাবো আর মেয়ে হলে তো পড়ালেখার প্রয়োজন নেই, কষ্ট করে পড়ালেখা শেখাব, আর অন্যের ঘরে ঘরকন্যার কাজ করবে তার চেয়ে বরং কয়েকবছর বোঝা বয়ে ১৪-১৫ বছর বয়সে বিয়ে দিয়ে দিব’। আর এর ফলে ছেলেমেয়ে উভয়ের জীবন ধ্বংসের দিকে নিপতিত হচ্ছে। অভিভাবকেরাই ওদের অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে ।
জসিম উদ্দিনের ভাষায়,
“অজ্ঞ পিতা সন্তানেরে অজ্ঞানতার টানছে কারায়,
মূর্খ মাতা ছেলের মুখে আপন হাতে বিষ তুলে দেয়।”

আবার বিশ্রী সমাজ হতে উঠে আসা সাধারণ হলেও শিক্ষিত পরিবারের তরুণদের বিনষ্ট হওয়ার প্রধান কারণ সমাজের কুপ্রভাব। তুমি যাই করনা কেন একটি সমাজের প্রভাব হতে তুমি মুক্ত হতে পারবেনা। তাই যে সমাজে ব্যাক্তিত্বহীন আমড়া কাঠের ঢেকিরা বসবাস করে সে সমাজের ছাত্ররা মেধাবী হলেও সামনে এগিয়ে যেতে পারছে না। সারাক্ষণ মারামারি, কাটাকাটি, ঝগড়াঝাটি, খুন, রাহাজানি, কটু ভাষায় গালাগালি, মেয়েদের অশালীন মন্তব্য ইত্যাদি শুনে পড়ালেখা করে মাথায় একটি নৈতিক কথা ঢুকলেও সমাজ থেকে তিনটি অনৈতিক কথা ঢুকছে।

আসলে আমাদের শেখার দুটি ধাপ আছে। প্রথম ধাপে আমরা সচেতনভাবে (consciously) শিখি।দ্বিতীয় ধাপে আমরা অবচেতনভাবে (unconsciously) শিখি। আর এই সম্ভাবনাময় তরুণ ছাত্রসমাজ অবচেতনভাবে অনৈতিকতা শিখে কুকর্মে লিপ্ত হয়। তারা স্কুল ফাঁকি দিয়ে হাটে হাটে মাঠে মাঠে ঘুরে বেড়ায় দোকানে বসে সিগারেট খায়। টিফিনের টাকা দিয়ে নেশাজাত দ্রব্য কিনে নেশা করে বাজারে বাজারে ঘুরে ব্যবসায়ীদের বিরক্ত করে, এটা ওটা নেয় টাকা দেয় না, বিপরীতে জোরপূর্বক চাঁদা আদায় করে ব্যবসায়ীদের ব্যবসার লোকসান ঘটায়। তাদের অনধিকার চর্চায় বিরক্ত হয়ে ব্যবসায়ীরা বাবা মাকে বলে দেব বললে দোকান ভেঙ্গে ফেলব বলে তারা হুমকি দেয়।

তাছাড়া তারা নানাভাবে মেয়েদের ইভটিজিং করে। রাস্তাঘাটে দোকানপাটে মেয়েদের উদ্দেশ্য করে ছুঁড়ে দেয় অশ্লীল মন্তব্য , শিস বাজায়, চোখ টিপ্পনী দেয়, ওড়নার আচল ধরে টান দেয় অথবা ভিড়ের মধ্যে ধাক্কা দেয়, অশোভন অঙ্গভঙ্গি করে, যানবাহন কিংবা মার্কেটে নারীদের দেখে খোঁচা দেয়, মোবাইলে ছবি তুলে অথবা মিসকল বা আজেবাজে এসএমএস পাঠিয়ে ইমেইল বা ফেইসবুকের মাধ্যমেও মেয়েদের বিরক্তি করে। যার ফলে মেয়েরা দৈনন্দিন কাজকর্ম নিয়মিত করতে পারছে না । এমনকি প্রয়োজনে বাইরে যেতেও তারা দ্বিধা দ্বন্দ্বে ভুগছে।

অনেক সময় স্কুলছাত্রীর পথ রুদ্ধ করে তারা অন্যায় প্রস্তাব দেয়, সে প্রস্তাবে মেয়েরা রাজি না হলে তাদের শারীরিকভাবে নির্যাতন করে এবং অনেক মেয়েকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। আর এর ফলে স্কুলছাত্রীরা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে স্কুল যাওয়া বাদ দিয়ে দেয় । বাবা মা এ ব্যাপারে প্রশ্ন তুললে তারা নানা অজুহাত দেখিয়ে স্কুলের মূল্যবান শিক্ষা হতে বঞ্চিত হয়। বাবা মা মেয়ের পড়ালেখাতে মন নেই ভেবে সংসারী করার লক্ষ্যে বিয়ে দিয়ে দেয় । যার ফলে অনেক নবমুকুলিত ফুল অকালে ঝরে পড়ে।

এই তরুণরা আবার পড়ন্ত বিকেলে কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে স্কুলশিক্ষার্থীদের সাথে বাড়ি ফিরে আসে।মা তো ভাবে ছেলে তার শিক্ষিত হচ্ছে, আর চোখের অন্তরালে ছেলে যে ঘোড়ার ঘাস কাটছে সেটা মা জানবে কী করে?

এই নষ্ট তরুণ ছাত্ররা সন্ধ্যেবেলা পাড়ার কিছু অভদ্র তরুণদের সাথে রাস্তার ধারের দোকানে আড্ডার আসর বসায়। সেখানে তারা দাবা, ক্যারাম, লুডু ও বাজি ধরে জুয়া খেলে। বাজিতে হেরে গেলে ফিস মাইনের অজুহাতে বাবা মাকে দিয়ে ধার করিয়ে টাকা এনে বাজির ঋণ পরিশোধ করে। আর দোকানে দোকানদারের বিভিন্ন মালামাল আত্মাসাৎ করে দরিদ্র দোকানীদের বিপদে ফেলে পৈশাচিক আনন্দে মেতে উঠে। তাছাড়া মদ গাঁজা ও নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবন করে মাতলামি করে পথে পথে পথিকদের হাঁটাচলায় ব্যাঘাত সৃষ্টি করে, গাড়ি ভাঙচুর করে, ছিনতাই করে এবং বোমিবাজির মতোও কান্ড ঘটায়।

অনেক সময় এই তরুণদের কুমতলবে অনেক মেধাবী ছাত্র তাদের অমূল্য সময় নষ্ট করে। তারাও অনেক সময় রাত্রে পড়ালেখা না করে বাজারে বাজারে ঘুরে বেড়ায়, দোকানে বসে আড্ডা দেয় এবং অসময়ে ব্যাডমিন্টন, টেবিল টেনিস, বাস্কেটবল বল ইত্যাদি খেলে সময় কাটায়। তখন শেরে বাংলার ‘পড়ার সময় পড়া, খেলার সময় খেলা ‘কথাটি তাদের মনে পড়ে না।

আবার দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেলে সেই নষ্ট তরুণরা বন্ধুদের সাথে পার্টি করে গভীর রাতে বাড়ি ফিরে। না খেয়ে বসে থাকা মা কোথায় ছিলে জিজ্ঞেস করলে মাতাল ছেলে ধমকের স্বরে মাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে। মার বুঝতে বাকি রয় না ছেলে তার কোনপথে গেছে। দুঃখে দুশ্চিন্তায় না খেয়ে মা ছেলের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে নির্ঘুম রাত কাটায়।

অন্যদিকে এই মধ্যবিত্ত পরিবারের তরুণদের এক অংশ স্কুলে যায় বটে। তবে উদ্দেশ্য পড়ালেখা নয় মেয়ে দেখা । ক্লাস ফাঁকি দিয়ে তারা মেয়েদের রুমে উঁকি দেয়। কলে, ক্যান্টিনে যাবার নামে প্রেমিকা জুটায়। আর প্রেমিকার আবদার পূরণ করতে সর্বস্ব বিলিয়ে দেয়। রাত্রে পড়ালেখা বসে প্রেমপত্র লিখে প্রেমিকার কল্পনায় অঘোর ঘুমে ঢলে পড়ে।
আর সেই ছেলেদের জন্য বাবা মা ভূতের বেগার খাটেন । আর ছেলে যে তাদের চোখের আড়ালে দেবদাস হচ্ছে সেদিকে খেয়াল রাখে কে? বাবা মা কর্মস্থলে ব্যস্ততার কারণে ছেলের দিকে তেমন মনোযোগ দিতে পারেন না। শুধু ৩-৪ জন প্রাইভেট টিউটর রেখে নিখুঁত একটি পড়ার রুটিন বানিয়ে দেন। আর সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য এগুলোই তারা যথেষ্ট মনে করেন।

অনেক পরিবারে বাবা মা ছেলেমেয়ের কার্যকলাপ তেমন আমলে আনেন না। ছেলে অসৎদের সঙ্গী বানাচ্ছে, মেয়ে পশ্চিমা সংস্কৃতি অনুকরণে উগ্র পোশাক পড়ছে এবং অপসংস্কৃতি চর্চা করছে অথচ বাবা মা সেদিকে খেয়ালই করেন না। আধুনিক যুগের ছেলেমেয়ে তো এরকমই হবে ভেবে বাবা মা তাদের কাজে তেমন বাধা দেন না। যার ফলে ছেলে সন্ত্রাসী কাজকর্মে লিপ্ত হয়ে পড়ছে আর মেয়ে ইভটিজিংয়ের স্বীকার হচ্ছে।

আবার অনেক হতদরিদ্র পরিবারের তরুণরা আকাশকুসুম সপ্ন দেখে পূরণ করার পন্থা খুঁজে না পেয়ে হতাশায় হীনমন্যতায় ভোগে। সেই হতাশা থেকে মুক্তি ও সাময়িক উত্তেজনার জন্য তারা মাদকদ্রব্য সেবন করে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। নিজেদের এই ক্ষতি করার পাশাপাশি ভয়, উৎকণ্ঠা ও উত্তেজনার শিকার হয়ে সমাজে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে।

যে সমাজে মাদকদ্রব্য সহজলভ্য সে সমাজের তরুণরাও অযাচিতভাবে বন্ধুদের প্ররোচনায় বা কৌতূহলের বশে মাদকদ্রব্য গ্রহণ করে। তাছাড়া প্রিয়জনের মৃত্য, প্রেমে ব্যর্থতা, পারিবারিক অশান্তি বা পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার ফলেও অনেক তরুণ মদ ,গাজা, হেরোইন , ইয়াবা, আফিম, ফেনসিডিল ইত্যাদি নেশাদ্রব্যে আসক্ত হয়ে পড়ে।

অনেক পরিবারে বাবা মার অতিরিক্ত শাসন ও নজরদারির কারণে বাবা মার প্রতি ছেলে মেয়ের মনে বিদ্বেষের সৃষ্টি হয়। আর তার পরিণতি অনেক সময় ছেলেমেয়ের বাড়ি থেকে পালিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া ও আত্মাহননের মাধ্যমে প্রকাশ পায়।আর এভাবেই জাতির সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্ম আজ হুমকির সম্মুখীন । এই সম্ভাবনাময় তরুণদের যথাযথ বিকাশে আমাদের আরো বেশি সচেতন ও যত্নবান হওয়া উচিত।

লেখক :শিক্ষার্থী, কালীপ্রসাদ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়।