ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনঃ বাংলাদেশের রাজনীতি

নিউজ নিউজ

ভিশন ৭১

প্রকাশিত: ৮:১৮ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২০

কাউকে যদি জিজ্ঞেস করেন, ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন এর ফলাফল কী? অনেকেই বিনা বাক্যে উত্তর দিবে, ‘আওয়ামী লীগ জিতছে।’ কিন্তু নির্বাচনের সার্বিক ব্যাপার নিয়ে যদি জিজ্ঞেস করেন, তবে অধিকাংশ মানুষের উত্তর হবে, ‘কিছুই জানিনা।’ ভোটারদের না জানা নিয়ে মাথা ব্যথা নেই প্রার্থীদের। তবে নির্বাচন নিয়ে জনগণের এই অনাগ্রহ দেখে বিশ্লেষকরা কিছুটা অবাকই হয়েছেন। গত দুই দশকে বাংলাদেশের কোন নির্বাচনে ভোটারদের এত খরা দেখা যায়নি। অবশ্য অনেকের মতে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এর থেকেও কম ভোট পড়েছে। ভোট কারচুপি এবং সব কেন্দ্রে ইভিএম পদ্ধতির অভাবে সঠিক তথ্য বলাও মুশকিল। যদিও নির্বাচন কমিশন থেকে বলা হয়েছে ৮০ শতাংশ ভোট কাস্টিং হয়েছে। কিন্তু দেশের সার্বিক পরিস্থিতি ইসির তথ্যকে সন্দেহের তীরে ঠেলে দিছে।

ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের দুই অঞ্চল মিলিয়ে মোট ভোটার ৫৪ লাখ ৬৩ হাজার ৪৬৭ জন। অথচ দুই অঞ্চল দুইজন বিজেতা প্রার্থী ভোট পেয়েছেন মাত্র ৪ লাখ থেকে একটু বেশি। নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করতে এসে সিইসি খুব হাসিমাখা মুখেই বলেছিলেন, এবারের ভোটারের উপস্থিতি মোট ভোটারের ৩০ শতাংশ এর কম। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা উত্তরে ২৫.৩ এবং ঢাকা দক্ষিণে ২৯ শতাংশ ভোটার ভোট দিতে এসেছেন। এত স্বল্প ভোটারের উপস্থিতি থাকার পরও এই নির্বাচন নিয়ে বেজায় সন্তুষ্ট নির্বাচন কমিশন। অথচ চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যখন দেশের অধিকাংশ দল ভোট বর্জন করেছিলো, তখনও কেন্দ্রে ৫২ শতাংশ ভোটারের উপস্থিতি ছিলো।

দীর্ঘ অঙ্কের ভোটারদের মধ্যে দুই বিজয়ী মেয়রের ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন মাত্র ৮ লাখ ৪০ হাজার ৩৯৭ জন ভোটার। বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীগণ তাদের আহবানে ভোট কেন্দ্রে ভিড়িয়েছেন মাত্র ৪ লাখ ৭৭ হাজার ৩৫৯ জন। পরিসংখ্যান হিসাব করলে ক্ষমতাসীন দল তাদের ডাকে মাত্র ১৫-১৭ শতাংশ ভোটার কেন্দ্রে আনতে পারছিলেন। নব্বই এর পরবর্তীতে কোন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এত কম ভোট পায়নি। ২০০১ সালে ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসন হারের বিশাল ব্যবধানের সময়ও আওয়ামী লীগ ভোট পেয়েছে ৪০.০২ শতাংশ। অথচ নিজেরা ক্ষমতায় থাকার পরও কেন্দ্রে আসছে না পর্যাপ্ত ভোটার। তাহলে প্রার্থীদের হয়ে মিছিল মিটিং করা এত কর্মী-সমর্থক কোথায় গেলো? তারা প্রত্যেকে ভোট দিলেও মনে হয় এর থেকে বেশি ভোট জমা হতো।

ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগে একটা দৈনিক পত্রিকা জরিপ করেছিলো। তাদের জরিপের পরিমাপ অনুযায়ী ৬৮ শতাংশ ভোটার ভোট দিতে আসবে বলে ধারণা করা হয়েছিলো। অথচ বাস্তবে তার অর্ধেকই বা হলো কই! প্রার্থীরা যখন নিজদের প্রচারণা চালাতে মসজিদ মহল্লায় গেছেন, দেখা গেছে তার পিছনে বিপুল কর্মী সমর্থকদের লাইন। কিন্তু নির্বাচনে তার প্রতিফলন বা হলো কোথায়? ভাত ছিটালেই বাড়ির ছাদে অসংখ্য কাকের দেখা মিলে। আজকাল অর্থ ছিটালেই কাকের মতো কর্মীও মিলে। দল ভারী করে নেতারা চলে। বাস্তবে যেন মাকাল ফলের প্রতিচ্ছবি। নির্বাচনের দিন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের একটি কেন্দ্রে রিপোর্ট করছিলো নাগরিক টেলিভিশন। দেখা গেলো মহিলা ভোটারদের লম্বা লাইন। কিন্তু তারা দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলেও কেউ যাচ্ছেন না ভোট দিতে। রিপোর্টার তাদের জাতীয় পরিচয় পত্র দেখতে চাইলে দেখাতে পারেননি অনেকেই। অর্থাৎ আজকাল প্রার্থীরা কেন্দ্রে প্রচুর ভোটারদের সমাগম হয়েছে দেখাতে মানুষও ভাড়া করেন।

নির্বাচনে ভোটারদের এত অনুপস্থিতির কারণ কী? আওয়ামী লীগ নেতারা বলেছেন, বিএনপির নেতিবাচক প্রভাবের কারণেই কেন্দ্রে এত কম ভোটার। তার মানে আওয়ামী লীগ নেতাবৃন্দ ক্ষমতাসীন দল থেকে দেশের অন্যান্য দলকে প্রভাবশালী মানছেন? বাকি দলগুলো চাইলে ভোটার কেন্দ্রে আসবে, অন্যথায় না! কেউ কেউ বলছেন, নির্বাচনের আগে ছুটি পেয়ে অনেকে গ্রামে চলে গেছেন। গ্রামে কারা গেছেন? যারা গ্রামের ভোটার। ঢাকার ভোটাররা একদিনের ছুটিতে গ্রামে ঘুরতে গেছেন, এ কথাটা কিছুটা অসত্য ই মনে হবে। যদি ভোটাররা ভোট না দিয়ে গ্রামে গিয়েই থাকেন, তবে এর ব্যর্থতা কার? মাসখানেক ধরে এই প্রচার প্রচারণার ফলপ্রসূ ফলাফল কোথায়? প্রার্থীদের সাথে চলা এত কর্মী-সমর্থক কি আসলেই কর্মী? নাকি তারা দুধের মাছি? প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

বিএনপি অবশ্য এই নির্বাচনকে মন্দের ভালো হিসেবে দেখছেন। অনেক দৈনিক পত্রিকা ‘নির্বাচনে বিএনপির লাভবান’ শিরোনামে রিপোর্ট করেছেন। নির্বাচনের পরের দিন হরতালও ডেকেছিলেন বিএনপি। মামলা খেয়ে একেবারে দমে যাওয়া বিএনপি নেতারা কিছুটা হলেও নির্বাচনের জন্য উদ্যমী হয়েছেন। কর্মীরা আবার রাজপথে নেমে মিছিল করেছেন। পথে ঘাটে আবার ধানের শীষের পোস্টার আলো ফেলেছে। পাশাপাশি একটা গুঞ্জন ছিল, প্র‍য়াত সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার সাথে মির্জা আব্বাসের মনমালিন্য ছিলো। কিন্তু এবার সেই মির্জা আব্বাস খোকার ছেলে ইশরাকের জন্য জনগণের কাছে ভোট চেয়েছেন। যদিও নির্বাচনে বিএনপি উভয় আসনে পরাজিত হয়েছেন। তবুও নেতাকর্মীদের প্রায় মাসখানেকের মিলন মেলা অনেকেই ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নির্বাচনে ৫০ শতাংশের কম ভোটারের উপস্থিতি হলে পুনরায় ভোট নেওয়া হয়। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ৫০ এর অর্ধেকও ভোট পড়েনি। তাতেই নির্বাচিত প্রার্থী ঘোষিত হয়েছে। মাত্র ২৩ শতাংশ ভোট নয়, বরং ১০ শতাংশ ভোট পড়লেও সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া প্রার্থী নির্বাচিত হতেন। এটাই আমাদের দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা। গড়ে ২৭ শতাংশ ভোটারদের উপস্থিতির এই নির্বাচনকে আওয়ামী লীগের একজন শত বছরের সেরা নির্বাচন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এটা নিয়ে অনেকে টিভি চ্যানেলে হাস্যরসের টকশো করছেন। দলগুলোর নেতাকর্মীরা নিজ স্বার্থ হাসিলের পরে কেটে পড়ছেন। কিন্তু দেশীয় রাজনীতিতে ক্রমাগত জনগণের আস্থা-ভরসা, ভালোবাসার অবনতি নিয়ে কয়জন বা মুখ খুলেছেন? দেশের রাজনীতির উন্নতিতে কয়জন বা আওয়াজ তুলেছেন?

মুহা. ইকবাল আজাদ
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।