ঢাকা১৬ই মে, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

টেকনাফে করোনার সংক্রমণ রোধে সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি মানছে না

প্রতিবেদক
নিউজ ভিশন

জানুয়ারি ৩১, ২০২১ ১:০৬ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

ফরহাদ আমিন:
কক্সবাজারের টেকনাফে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি মানছে না স্থানীয় ও রোহিঙ্গারা।টেকনাফ কয়েকটি শরনার্থী শিবির ঘুরে দেখা যায়,ক্যাম্পে রোহিঙ্গারা অবাধে চলাফেরা করছে।কেউ কেউ গ্রুপ বেঁধে আলাপ-আলোচনা করছে।আবার কেউ কেউ বাজার-সওদা করতে ব্যস্ত।কেউ কেউ দলবেঁধে পানি নিতে দেখা যায়।কারো মুখে নেই মাস্ক কিংবা হাতের গ্লাভস।লাইনে দাঁড়িয়ে একে অপরের সাথে ঘেঁষাঘেঁষি করে নিচ্ছে ত্রাণসামগ্রী।পুরো ক্যাম্প জুড়ে একই অবস্থা।বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী অধ্যুষিত জনপদ কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলা।এ দুই উপজেলার ৩৪টি শরণার্থী শিবিরে১১লাখের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছে।ব্যাপক জনঘনত্বের এই শিবিরে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটলে তার পরিণাম ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা করছেন জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয়রা।তারা বলছেন,রোহিঙ্গাদের বেশির ভাগই অসচেতন।তবে কর্তৃপক্ষ বলছে,করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে রোহিঙ্গাদের সচেতন করা হচ্ছে।
মুচনী নয়াপাড়া ক্যাম্পের বাসিন্দা রোহিঙ্গা শফিউল্লাহ (৫০)বলেন,করোনাভাইরাস নিয়ে ভয় তো করে,কিন্তু করার কিছুই নেই। আল্লাহর হকুম হবার থাকলে হবে, আর আল্লাহর হুকুম না থাকলে হবে না। সবই আল্লাহতায়ালার উপর- ছেড়ে দিলাম।শালবাগান ক্যাম্প থেকে ত্রাণ নিতে আসা ক্যাম্প-২৭এর রোহিঙ্গা বজলুল ইসলাম(৪৭)বলেন,ত্রাণ নিতে সকালে চাপ থাকে বেশি।সকালে ১০০থেকে১২০জনমত রোহিঙ্গা একসাথে ত্রাণ নেয় লাইনে দাঁড়িয়ে।বলতে গেলে ত্রাণ নিতে রোহিঙ্গারা আসতেও থাকে আর ত্রাণ দিতেও থাকে। ভাইরাসের নাম শুনেছি,ক্যাম্পে মাস্ক বিতরণ ও হাত ধোঁয়ার জন্য সাবান দিয়েছে। কেউ মুখে মাস্ক কিংবা সাবান দিয়ে হাত পরিস্কার করতে চাই না।টেকনাফ লেদা শরণার্থী শিবিরের ডেভেলপমেন্ট কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ আলম বলেন,করোনাভাইরাস থেকে রক্ষায় হাত ধোয়াসহ বিভিন্ন ধরণের সচেতনতামূলক কার্যক্রম করতে বলা হচ্ছে। পাশাপাশি শিবিরে যাতে কোনও লোকসমাগম না হয় সেদিকে নজর রাখা হচ্ছে।
টেকনাফ হ্নীলা ইউপি চেয়ারম্যান রাশেদ মোহাম্মদ আলী বলেন,এখানে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সাথে স্থানীয়দের মধ্যে বিচরন থাকায় ৮নং ও ৯নংওয়ার্ড এর আলীখালী,লেদা,জাদীমুড়া ও দমদমিয়া এলাকা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।ক্যাম্পগুলোতে কাঠাতারের বেড়া নির্মাণ কাজ শেষ হলে রোহিঙ্গারা ক্যাম্পের ভিতরে থাকবে। আশ্রিত রোহিঙ্গারা মাঝে-মধ্যে মিয়ানমার পারাপার করে থাকে।তাছাড়া মিয়ানমারের সঙ্গে চীনের সীমান্ত রয়েছে। আর রোহিঙ্গারা চোরাইপথে মিয়ানমারে আসা-যাওয়া করে।সেজন্য আমাদের ঝুঁকিটা একটু বেশি।
টেকনাফ স্বাস্থ্য ও প.প.কর্মকর্ত ডা. টিটু চন্দ্র শীল বলেন, টেকনাফ উপজেলায় এ পর্যন্ত করোনা (কোভিড-১৯)৭হাজার ৬০১জনকে টেষ্ট করা হয়েছে। এরমধ্যে স্থানীয় ২ হাজার ২৪জন,রোহিঙ্গা ৫হাজার ৫৭৭জন। তৎমধ্যে পজেটিভ রির্পোট এসেছে স্থানীয় ৪৪৮জন,রোহিঙ্গা ৮৪ জন,চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় ৯ জনের। নেগেটিভ এসেছে ৭ হাজার ৬৯জন। এরমধ্যে হোম আইসোলেশনে রয়েছে ২১জন,হাসপাতাল আইসোলেশনে ১জন।করোনা পরীক্ষা করতে লোকজনের মধ্যে এক অনীহা দেখা দিচ্ছে।কারো যদি জ্বর,হাশি-কাশি দেখা দিলে ভয়ে পরীক্ষা করতে হাসপাতালে আসে না।এ ধরণের লক্ষণ দেখা সাথে সাথে টেষ্ট করাবেন।প্রয়োজনে গরীব,অসাহায়দের ক্ষেত্রে ছাড় রয়েছে। সাধারণ মানুষকে মাস্ক পরিধান,লিফলেট বিতরণের মাধ্যমে জনসচেতনমূলক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে শালবাগান রোহিঙ্গা ২৬নং ক্যাম্প ইনচার্জ মোঃ খালিদ হোসেন বলেন,করোনা মোকাবেলায় ২৬নং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জনসমাগম এড়াতে রয়েছে বিশেষ পরিকল্পনা। বিশেষ করে,স্কুল-মাদ্রাসাসহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে। ক্যাম্পে কোন প্রকার জনসমাগম যাতে না হয় সে বিশেষ সংশ্লিষ্টদের বরাবরে নির্দেশনাও জারি করা হয়েছে।রোহিঙ্গাদের মাঝে স্বাস্থ্য ঝুঁকি এড়াতে মাস্ক পরিধান,সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রতিনিয়ত লিফলেট বিতরণ করা হচ্ছে।আবার রোহিঙ্গারা এগুলো করতে অনীহা প্রকাশ করে।তিনি আরও বলেন,যারা দৈনন্দিন রেশন বিতরণ করে সেক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে খাদ্যদ্রব্য ও এলপি গ্যাস বিতরণে সতর্কতা অবলম্বন করতে সংশ্লিষ্টদের জানিয়ে দেয়া হয়েছে।এছাড়াও জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা,বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দেশীয় এনজিওগুলো কাজ করছে।মিটিং করে সতর্কতা অবলম্বন করতে জানিয়ে দেয়া হয়েছে।
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে কক্সবাজারে একশনএইডের কার্যক্রমঃ-কোভিড-১৯সংক্রমণ প্রতিরোধের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এবং সংলগ্ন এলাকায় প্রায় ৩০হাজার মাস্ক বিতরণ করা হচ্ছে।রোহিঙ্গা ক্যাম্প-১১,১২,২৬ ও ২৭ এবং উখিয়ার পালংখালী ও টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নে সব মিলিয়ে অন্তত৬০টি হাতধোয়ার বেসিন বসানো হয়েছে।সেখানে জনসাধারণের হাত ধোয়ার জন্য পর্যাপ্ত সাবান ওপানি সরবরাহ নিশ্চিত করেছে একশনএইড।এছাড়া,কোভিড-১৯সংক্রমণ প্রতিরোধ ও জনসচেতনতা তৈরিতে বিভিন্ন আবাসিক মাদ্রাসা,মসজিদ এবং বাড়িতে গিয়ে মাস্ক বিতরণ করা হচ্ছে।মাস্ক ও সুরক্ষা সরঞ্জাম দেয়া হয়েছে জেলাপ্রশাসক,টেকনাফ ও উখিয়া উপজেলা প্রশাসন কার্যালয়েও।একই সাথে উখিয়া,টেকনাফ এবং বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জনসচেতনতামূলক পাপেট শো এবং বাইচকোপ দেখানো হচ্ছে। চলছে সাপলুডু খেলার মাধ্যমে সচেতনতা ক্যাম্পেইন।রোহিঙ্গা ক্যাম্প এবং স্থানীয়দের বাড়ি বাড়ি গিয়েও করোনাভাইরাসের সংক্রমণ সম্পর্ক সচেতনতা কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।করোনাভাইরাস সংক্রমিত হলে করণীয় এবং চিকিৎসা প্রাপ্তির বিষয়েও অবগত করা হচ্ছে স্থানীয় ও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে।এছাড়া,মহামারির এই সময়ে শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী,বয়োবৃদ্ধ এবং প্রসূতি মায়েদের বাড়তি যত্ন নেয়ার পরামর্শও নেয়া হচ্ছে একএশনইএইডের পক্ষ থেকে।এছাড়া করোনাভাইরাস সংক্রমণের শুরুর দিকে আক্রান্তদের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে কক্সবাজারের ৮উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে(আইসোলেশন সেন্টার),জেলাপ্রশাসন কার্যালয় ও সিভিলসার্জন কার্যালয়ে পিপিই,মাস্ক ও হ্যান্ড সেনিটাইজারসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম সহায়তা দেয়েছে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা একশনএইড বাংলাদেশ।একইসাথে করোনাভাইরাস সংক্রমণরোধে মিয়ানমার থেকে কক্সবাজারে আশ্রয় নেয়া বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকেও সচেতন করতে শুরু থেকেই কাজ করে যাচ্ছে সংস্থাটি।

সম্পর্কিত পোস্ট