টুকিটাকি সহযোগিতা দিয়েও অমর হওয়া যায় কোটি জনতার হৃদয়ে!!

নিউজ নিউজ

এডিটর

প্রকাশিত: ৪:০৩ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৪, ২০১৯

–মুনিরুল আলম মুনির।

কিছু বিষয় আছে এমন যা নিজের কাছে খুবই ক্ষুদ্র মনে হলেও জীবনে অনেকের কাছে যথার্থ মূল্যায়ন আছে তার।হোকনা তা টুকিটাকি সহযোগিতাও।এই ক্ষুদ্র সহযোগিতাও প্রার্থীর হৃদয়ে দাগ টেনে দেয় সারাজীবনের জন্য।এই দাগ হতে পারে ভালবাসার কিংবা ঘৃণার।দু’দিকেই যথেষ্ট কারণ নিহিত রয়েছে।

রাস্তায় কিংবা শহরের কোথাও কোন কাজে কিংবা ঘুরতে বের হতে হলে যেকেউ সাধারণত পকেটে টাকাকড়ি নিয়েই বের হয়।নিজের হয়তোবা নেই।কিন্তু কারো কাছ থেকে ধার করে হলেও পকেট গরম রাখে।এটা খুবই স্বাভাবিক।বিশেষ করে ব্যাচেলরদের জন্য!সাথে তাদের প্রায়ই ভাংতি টাকা বা কয়েন থাকবেই।

তবে সাথে প্রয়োজনীয় ভাংতি টাকা নিতে ভুলে গেলে কিংবা ভাংতি কোথাও পাওয়া না গেলে যে উভয় সংকটে পড়তে হয় তাতো আর খুলে বলার অপেক্ষা রাখেনা।মাঝপথে এসে তখন অনেক লাঞ্চনা-হয়রানির শিকার হতে হয়।বিশেষ করে ঢাকা কিংবা চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন পরিবহন যান যেমন- সিএনজি,টমটম,মাহিন্দ্রা,ছোটখাটো বাস ইত্যাদিতে চড়েই বেশি বিপাকে পড়তে হয়।

কারণ,এগুলোর অধিকাংশ ভাড়া-ই ভাংতি টাইপের।ছয় টাকা,তেরো টাকা এ টাইপের ভাড়াগুলো।ছয় বা তেরো টাকার গাড়ি ভাড়ায় কারো হয়ত পাঁচ টাকা আছে, আর বাকি নোটগুলো হয়ত বড়।গাড়ির এসিস্ট্যান্টের কাছেও হয়ত ভাংতি নেই অথবা থাকলেও সে দিতে চাবেনা,এমতাবস্থায় এই এক টাকার জন্য যত মনোমালিন্য তা যেন সীমা ছাড়িয়ে যায়।সহজে কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজি নয়।

আর এ ঘটনা টুপি-দাঁড়ি-পান্জাবীওয়ালার সাথে ঘটলেতো ড্রাইভার বা এসিস্ট্যান্টের মুখ থেকে অনায়াসেই বেরিয়ে আসবে সব হুজুরই এরকম।তখন তার মুখখানা যেন বাংলার আটের মত,চোখগুলো আঙ্গুরের মত বড় হয়ে যাবে।যত্তসব অসহিষ্ণুভাব!

অথচ এ সময় চাইলে আপনার একটু সুন্দর মনোভাবই অনেক বড় সহায়তা হতে পারে।যেমন-আপনি যদি এসিস্ট্যান্ট হোন তাহলে যাত্রীকে বলতে পারেন-‘আচ্ছা,যেহেতু নেই তাহলে থাক।’আপনি যদি যাত্রী হোন তাহলে তার সাথে ঝগড়া না করে চেষ্টা করা উচিত যেকোনভাবে তাকে ‘একটা’ টাকা পেইড করার।কারণ,এ এক টাকার জন্যই তাকে অনেক ঘাম ঝরাতে হচ্ছে,সারাদিন বকবক করতে হচ্ছে,কতজনের গালি শুনতে হচ্ছে,থাপ্পরও হয়ত কপালে জুটে যায় মাঝেমাঝে।

যদি একান্তই নিরূপায় হোন তাহলে তাকে সুন্দরভাবে বুঝিয়ে বলুন।থাপ্পর কিংবা গালি দিয়ে নয়।এটা চিন্তা রাখুন যে,আপনি যেমন কারো স্বামী বা বাবা তেমনি সেওতো কারো স্বামী বা বাবা হতে পারে।সো,তাকেও সম্মান দিতে শিখুন।শ্রমিক বলে তাকে অবজ্ঞা করা খুবই নিকৃষ্ট মানসের পরিচায়ক।

তবুও তারা যদি কেউই তাদের দাবি ছাড়তে রাজি না হয় কিংবা তারা অক্ষম হয়,তাহলে আপনি এটা দেখে যদি কোন পক্ষকে একটা টাকা দিয়ে দিতে পারেন,এটা সেসময়ের জন্য তার কাছে সবচে’ বড় সাহায্য হিসেবে বিবেচিত হবে।সুতরাং আপনার দয়ালু মনটা তার হৃদয়ে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে।ত্রিপাক্ষিক এমন মানসিকতা যদিও অনেক ছোট সত্যি সে সময়ের জন্য তা অনেক বড় সহযোগিতা বলে বিবেচিত হতে পারে।

আপনি সিএনজি স্টেশন কিংবা অন্যকোন স্পটে দোকানদারি করেন বা ব্যবসা করেন।একজন সিএনজি থেকে নামল।ভাড়া দশ টাকা। কিন্তু তার কাছে আছে একশ কিংবা পাঁচ শ’ টাকার নোট।ড্রাইভারের কাছেও ভাংতি নেই।এখন সে নিরূপায় হয়ে আপনার কাছেই হয়ত ভাংতি চেয়ে বসলো।এটিকেই আপনি টুকিটাকি সাহায্যের একটি মোক্ষম সুযোগ ধরে নিতে পারেন।ভাংতি থাকলে দিয়ে দিন।আর সত্যিকারার্থে ভাংতি না থাকলে পাশের জনকে অনুরোধ করতে পারেন।কিন্তু ভাংতি থাকা সত্ত্বেও নেই বলাটা খুবই গর্হিত ও নিকৃষ্ট মানসিকতা!দুঃখের বিষয় হলো এটিই দেখা যায় সচরাচর!

এভাবে বাজারে কেউ আপনার কাছে ভাংতি চাইলে যথাসাধ্য থাকলে দেয়ার চেষ্টা করুন।পথ জিজ্ঞেস করলে যথাসম্ভব তাকে সঠিক পথের নির্দেশনা দিতে চেষ্টা করুন।কোন মুরব্বী বা অন্যকেউ মোবাইলের নাম্বারটি তুলে দিতে বললে দেয়ার চেষ্টা করুন।অথবা আপনার ফোন থেকে জরুরি একটু কথা বলতে চাইলে অপরিচিত হলেও দেয়ার চেষ্টা করুন।তবে সতর্ক থাকুন।

সাধারণত বৃদ্ধরা পকেটের কোন কাগজ দেখিয়ে জানতে চান যে,ওটা কিসের কাগজ।বিরক্তি না দেখিয়ে সম্ভব হলে তাও বলার চেষ্টা করুন।কোন ভিক্ষুক কিছু চাইলে যথাসাধ্য দেয়ার চেষ্টা করুন।অন্যথায় ভাল কথা বলুন,দরদ দেখান।হাসিমাখা মুখে কথা বলুন।কিন্তু ধমক দেবেন না।এটা খুবই নিকৃষ্ট মানস!আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,
وَاَمَّا السَّآٮِٕلَ فَلَا تَنْهَرْؕ
অর্থ:প্রার্থী-ভিক্ষুককে ধমক দিওনা।(সূরা দূহা-১০)

এভাবে নিজের অধীনস্থ শ্রমিক,কর্মচারী, কাজের মেয়ে ইত্যাদির প্রতিও সুন্দর আচরণ করার চেষ্টা করুন।তাদের প্রাপ্য বেতন যথাসময়ে আদায় করে দিন।এটাও তাদের প্রতি আপনার অনেক বড় সহায়তা বিবেচিত হবে।রাসূল(স) বলেছেন-
«أَعْطُوا الْأَجِيرَ أَجْرَهُ قَبْلَ أَنْ يَجِفَّ عَرَقُهُ»
অর্থ: শ্রমিককে তাঁর ঘাম শুকানোর পূর্বেই মজুরী দিয়ে দাও।
(বুলুগুল মারাম-৯১৩,সহীহ)

কোন বন্ধু একাডেমিক বা ক্লাস সংশ্লিষ্ট কিছু জানতে চাইলে যথাসাধ্য জানা থাকলে বলার চেষ্টা করুন।কেউ কোন বিষয়ে জানতে চাইলে সে ব্যাপারে আপনার স্পষ্ট ধারণা থাকলে বলার চেষ্টা করুন।অন্যথায় পরে বলার জন্য সময় নিন।কেউ আপনার কাছে কুরআন বা অন্য কোন বিষয়ে জ্ঞান পেতে চাইলে যথাসাধ্য চেষ্টা করুন।কারণ,আপনি না শেখালে সে অন্যকোনভাবে শিখে নেবে।কিন্তু সে আপনার প্রতি কোন শ্রদ্ধা অনুভব করবেনা।আপনার কাছে কোন প্রতিবেশী বা রোমম্যাট প্লেট,বাটি,পাটি,চামচ,লবণ,মরিচ ইত্যাদি ধার চাইতে পারে।এতেও আপনি যথাসাধ্য দেয়ার চেষ্টা করুন।

এভাবে কেউ হঠাৎ কোন বিপদে পড়ে গেলে তাকে যথাসাধ্য সাহায্য করার চেষ্টা করুন।কথা,পরামর্শ কিংবা অর্থ দিয়ে।অথবা পড়ে গেলে তুলে নিয়ে।কোর্টকাছারিতে আপনার মক্কেলকে হয়রানি না করে যথাসাধ্য সহজতা ও আন্তরিকতা দিয়ে কাজগুলো করে দেয়ার চেষ্টা করুন।এভাবে কোন পশুপাখি,কুকুর, বিড়াল,গরু ইত্যাদির বিপদেও আপনি এগিয়ে এসে সাহায্যের মহান পরশটি নিতে পারেন।
Plz,be humble to them.

বনী ইসরাইলের এক ব্যক্তির কুকুরকে পানি পান করিয়ে জান্নাতি হওয়া ও এক মহিলার বিড়ালকে বেঁধে অভূক্ত রেখে মেরে ফেলায় জাহান্নামী হওয়ার কথা নিশ্চয়ই আপনাদের মনে থাকার কথা!এভাবে মসজিদ, মাদ্রাসা, এতীমখানা,হেফজখানা, নূরাণী ইত্যাদিতে সাহায্য করতে পারেন বিভিন্নভাবে।গোপন কিংবা প্রকাশ্যে।গরীব ও অসহায়দের প্রতি একটু স্পেশাল কেয়ার নিন।Plz,be kind to poor.

উপর্যোক্ত প্রত্যেকটি ক্ষেত্রই হয়ত আপনার কাছে অনকে ক্ষুদ্র মনে হতে পারে।কিন্তু এর প্রত্যেকটি সাহায্যই সে মুহূর্তের জন্য ভূক্তভোগীর কাছে অনেক বড় সহায়তা হিসেবে বিবেচিত হয়।সুতরাং এ সুন্দর সুযোগগুলো কাজে লাগানো উচিত।

আল্লাহ তায়ালা এজন্য সবসময় ভাল কাজে সহযোগিতা ও মন্দ কাজে অসহযোগিতার প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন।আল্লাহ পাক বলেন-
আল-মা’ইদাহ 5:2
َتَعَاوَنُوْا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوٰى‌ وَلَا تَعَاوَنُوْا عَلَى الْاِثْمِ وَالْعُدْوَان
অর্থ:তোমরা কল্যাণ ও তাকওয়ামূলক কাজে সহযোগিতা করো আর পাপ ও সীমালঙ্ঘনমূলক কাজে সহযোগিতা করোনা।

সুতরাং আমরা সবচে’ ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ কাজেও সহায়তা করতে পারি যা কল্যাণকর।আর সবচে’ ছোট হলেও পাপ কাজ করা ও তাতে সহায়তা থেকে বিরত থাকা উচিত।

রাসূল(স) বলেছেন-
اللَّهُ فِي عَوْنِ الْعَبْدِ مَا كَانَ الْعَبْدُ فِي عَوْنِ أَخِيهِ»
অর্থ:আল্লাহ বান্দার সাহায্যে থাকেন যতক্ষণ বান্দা তার ভাইয়ের সাহায্যে রত থাকে।
(রিয়াদুস সলেহিন-১৪৬৫,সহীহ)
হাদীসেও মুসলিম ভাই উদ্দেশ্য।তদুপরি মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রে যেকোন মানুষকেই সহায়তা করতে হবে।

সুতরাং উপর্যোক্ত ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুূদ্রতর সুযোগকেও কাজে লাগিয়ে অনেক বেশি সাওয়াব অর্জন করার সুযোগ আল্লাহ তায়ালা করে দিয়েছেন।এখন প্রয়োজন শুধু একটু সদিচ্ছা ও আন্তরিকতার।সর্বোপরি একটি স্বচ্ছ মনের।

একজন যালিম ও মাযলূম(নির্যাতত) এর প্রতিও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়া যায়।রাসূল(স) বলেছেন-
انْصُرْ أَخَاكَ ظَالِمًا أَوْ مَظْلُومًا ‏
অর্থ:তোমার ভাইকে সাহায্য কর, সে নির্যাতনকারী(যালিম) হোক কিংবা নির্যাতিতই (মাযলূম)হোক না কেন।

মাযলূমকে তো সাহায্য করতেই হবে।কিন্তু যালিমকে কিভাবে?হুম,এমন প্রশ্নের কৌতুহল সাহাবা কিরাম(রা) এর মনেও জাগ্রত হয়েছিল।তারাও জিজ্ঞেস করেছিলেন, কিভাবে? রাসূল(স) জবাবে বলেন-
“‏ تَكُفُّهُ عَنِ الظُّلْمِ فَذَاكَ نَصْرُكَ إِيَّاهُ ‏”‏ ‏
অর্থ:তাকে অত্যাচার করা হতে বিরত রাখাই তার জন্য তোমার সাহায্য।(তিরমিজি-২২৫৫,সহীহ)

তবে সহযোগিতাটি একটু কঠিন ও কষ্টসাধ্য ব্যাপার।বিশেষ করে বর্তমান প্রেক্ষাপটে।কিন্তু উপর্যোক্ত অন্যান্য ক্ষুদ্র সহযোগিতাগুলোর প্রতি যত্নবান হলে অভূত কল্যাণ ও সাওয়াব লাভ করা সম্ভব।সাহায্য প্রার্থীর হৃদয়জগতে চিরভাস্বর হয়ে থাকবেন আপনি আজীবন।।