জীবনানন্দ দাশ ও অজানা কিছু কথা

নিউজ নিউজ

এডিটর

প্রকাশিত: ২:১৬ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ১০, ২০২০

————————-
একবার যখন দেহ থেকে বার হয়ে যাব
আবার কি ফিরে আসব না পৃথিবীতে?
আবার যেন ফিরে আসি
কোন এক শীতের রাতে
একটা হিম কমলালেবুর মাংস নিয়ে
কোন এক পরিচিত মুমূর্ষের বিছানায়।
~কমলালেবু
….. জীবনানন্দ দাশ

মৃত্যুশয্যায় এই কমলালেবুই খেতে চেয়েছিলেন জীবনানন্দ দাশ।বাংলা সাহিত্যে জীবদ্দশায় মনে হয় সবচেয়ে বেশি অবহেলিত ছিলেন জীবনানন্দ।তার লেখা কবিতা বার বার সমালোচিত হলেও প্রশংসা কুড়াতে পারেন নি,মৃত্যুর আগে যখন চারদিকে প্রশংসা ছড়াতে লাগল তখন তিনিই প্রথম এবং শেষ ব্যাক্তি হিসেবে কলকাতায় ট্রাম দূর্ঘটনায় মৃত্যুবরন করেন,যদিও তিনি আত্মহত্যা করেছেন বলেও ধারনা করা হয়।

জীবনানন্দ দাশের জন্ম ১৮৯৯ সালে বরিশালে[১৮৯৯ সালের বাংলা সাহিত্যর আরও ৩ নক্ষত্রের জন্ম।কাজী নজরুল ইসলাম,বনফুল,শরবিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। ]
তার ডাকনাম মিলু।তার মা কুসুমকুমারী ও একজন কবি। জীবনানন্দ দাশের কবিতা লেখার অনুপ্রেরনা ছিল তার মা। ইংরেজি সাহিত্য দ্বিতীয় শ্রেনি পেয়ে এমএ পাশ করেন । অসুস্থতার কারনে তিনি ভালো ফল করতে পারেননি যা তাকে পরবর্তী চাকরি জীবনে ভুগায়।

চাকুরিজীবনে তিনি শিক্ষকতা করেছেন অনেক কলেজে কিন্তু কোথাও থিতু হতে পারেননি। দেশভাগের আগ পর্যন্ত ব্রজমোহন কলেজে কর্মরত ছিলেন আর মৃত্যুর সময় তিনি হাওড়া কলেজে কর্মরত ছিলেন। স্বরাজ পত্রিকায়ও সাংবাদিকতা করেছেন।

তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ঝড়া পালক’ উৎসর্গ ছিল রহস্যময়। উৎসর্গপত্র পৃষ্ঠায় শুধু লিখেছিলেন ‘কল্যাণীয়াসুকে’। তার অপ্রকাশিত পান্ডুলিপি থেকে জানা যায় কল্যাণীয়াসু হল তার কাকাতো বোন শোভনা দাশ ওরফে বেবী। তার বইয়ের একটি কপি পাঠিয়েছিলেন শোভনা দাশকেও।
এই শোভনা দাশের সাথে প্রণয়ে আবদ্ধ হয়েছিলেন জীবনানন্দ। ধর্মীয় শাস্ত্রমতে তাদের বিয়ে অসম্ভব ছিল।আর শোভনা ছিল বিত্তবান,কনভেন্টে পড়া চৌকস মেয়ে তাই শোভনাই নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলো। ঐ সময়কার তার লেখা কবিতাগুলো মূলত শোভনাকে নিয়েই লেখা। তখন তিনি লিখেছিলেন

তুমি জান না কিছু,না জানিলে,-
আমার সকল গান তবুও তোমায় লক্ষ্য করে!
যখন ঝড়িয়া যাবো হেমন্তের ঝড়ে,
পথের পাতার মতে তুমিও তখন
আমার বুকের ‘পরে শুয়ে রবে?
………………………………….
একদিন-একরাত করেছি প্রেমের খেলা!
একরাত-একদিন করেছি মৃত্যুর অবহেলা।
একদিন-একরাত; -তারপর প্রেম গেছে চ’লে,-
সবাই চলিয়া যায়, সকলেরই চলে যেতে হয় ব’লে

দিল্লির রামযশ কলেজে চাকরির সময় বিয়ে করেন ইডেন কলেজে পড়ুয়া লাবন্যকে। বিয়ের পরপরই চাকরি চলে যায় জীবনানন্দের জীবনে নেমে আসে দুর্বিসহ দুঃখ। চাকরির জন্য বরিশাল ত্যাগ করে কলকাতা গিয়ে মেসে উঠেন,একটা টিউশনি জোগাড় করে নিজের খরচ চালাতে লাগলেন। এরমধ্যে জন্ম নেয় তার কন্যা মঞ্জুশ্রী।
দাম্পত্য জীবনে অসুখী ছিলেন জীবনানন্দ। লাবণ্য চেয়েছিল স্বচ্ছল পরিবারের স্ত্রী হতে কিন্তু জীবনানন্দের জীবনে আর্থিক টানাপোড়ন লেগেই ছিল আর জীবনানন্দ সংসারমুখীও ছিলেন না। তার উপন্যাসগুলো বরাবরই তার জীবনের কাহিনীর প্রতিকী ছিলো।
‘জীবন প্রনালী’ উপন্যাসে অঞ্জলি তার স্বামীকে বলছে ‘বয়স তিরিস পেরিয়ে গেছে,এমএ পাশ করেছো এক যুগ আগে,তবু একটা পয়সা সম্বল। নেই তোমার-মেয়েমানুষকে জীবনে আকাঙ্ক্ষা করতে গিয়েছিলে কেন?’
‘বাসর রাত’ গল্পে প্রেমনীহারের স্ত্রী মনিকা তার স্বামীকে বলছে, ‘নিজেরা কায়ক্লেশে যে সংসার চালাতে পারে না সেখানে একজন পরের মেয়েকে এনে যারা কষ্ট দেয় তারা কি সৎ?’

বিয়ের পরই তাদের সম্পর্কে একধরনের ফাটল দেখা দেয়,দূরত্ব দেখা দেয়। যে দূরত্ব কখনই ঘুচে না। জীবনানন্দ হাতের কাছে সমব্যথী খুজেঁছিলেন কিন্তু লাবণ্য কখনও তা ছিলেন না।
জীবনানন্দ অন্তিমকালে যখন হাসপাতালে ভর্তি ছিলো তখন তার বোন রাত জেগেছে কিন্তু তার বৌ একটি রাতও জাগেনি।তার মৃত্যুর পর লাবণ্য ভুমেন্দ্রকে বলেছিলেন “তোমার দাদা তাহলে বাংলা সাহিত্যর জন্য অনেক কিছু রেখে গেলেন,আমার জন্য কি রেখে গেলেন বলো তো?

জীবনানন্দ দাশের মা কুসুমকুমারী ছিল কবি। কুসুমকুমারীও চেয়েছিল তার ছেলে কবি হোক। মায়ের নির্দেশেই জীবনানন্দ তার প্রথম কবিতা ‘বর্ষাআবহন’ লেখেন। ১৯১৯ সালে ‘ব্রহ্মবাদী’ পত্রিকায় ছাপা হয় তার কবিতা। এরপর টানা ৫ বছর কোন লেখালেখি করেননি।১৯২৫ সালে চিত্তরঞ্জন দাশের মৃত্যুতে তাকে স্মরণ করে লিখেন ‘দেশবন্ধু প্রয়াণে’।১৯২৬ সালে ‘কল্লোল’ পত্রিকায় তার ‘নীলিমা’ কবিতা প্রকাশ হয় কিন্তু তার নাম ভুল ছাপা হয়। লেখা হয় শ্রী জীবনান্দ দাশ।

১৯২৭ সালে নিজ খরচে প্রথম কবিতার বই ‘ঝরা পালক’ প্রকাশ করেন।
” আমি কবি,-সেই কবি-
আকাশের পানে আখিঁ তুলি হেরি ঝরা পালকের ছবি!”
‘ঝরা পালক’ বইটা জীবনানন্দ ডাকে পাঠিয়ে দেন রবীন্দনাথ এর কাছে, সবিনয়ে অনুরোধ জানান মন্তব্যর। রবীন্দ্রনাথ জবাবে চিঠি দেন

‘কল্যাণীয়েষু,
তোমার কবিতাশক্তি আছে তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই।কিন্তু ভাষা প্রভৃতি নিয়ে এত জবরদস্তি কেন বুঝতে পারি নে কাব্যর মুদ্রাদোষটা ওস্তদীকে পরিহাসিত করে।
বড়ো জাতের কবিতার মধ্যে একটা শান্তি আছে,যেখানে তার ব্যাঘাত দেখি সেখানে স্থায়িত্ব সম্বন্ধে সন্দেহ জন্মে।জোর দেখানো যে জোরের প্রমান তা নয় বরঞ্চ উল্টো
ইতি
শ্রী রবীন্দনাথ ঠাকুর।’

রবীন্দনাথ থেকে পজিটিভ জবাব পাবেন বলে প্রত্যাশা ছিল কিন্তু রবীন্দ্রনাথ একপ্রকার সমালোচনা করে বসলেন।
জীবনানন্দ দাশ তার দ্বিতীয় কবিতার বই ‘ধূসর পান্ডুলিপিও’ রবীন্দ্রনাথের কাছে পাঠান মন্তব্য জানানোর জন্য।
রবীন্দ্রনাথ চিঠিতে লিখেন:

‘কল্যাণীয়েষু,
তোমার কবিতা পড়ে খুশি হয়েছি।তোমার লেখার রস আছে,স্বকীয়তা আছে এবং তাকিয়ে দেখার আনন্দ আছে।
ইতি
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৩৪৩’

এবারও জীবনানন্দকে হতাশ করলেন রবীন্দ্রনাথ। জীবনানন্দ প্রত্যাশা করেছিল বিষদভাবে কিছু লিখবেন। কিন্তু উত্তর দেখে মনে হল তেমন গুরুত্বের সাথে নেননি। রবীন্দ্রনাথ সবাইকেই এমন দু,চার লাইন লিখতেন।
রবীন্দ্রনাথও তার কাব্যপ্রতিভা ধরতে পারেনি।
রবীন্দ্রনাথ আচঁও করতে পারেননি ‘ধূসর পান্ডুলিপি’ এর মাধ্যমে ঘটে যাবে বাংলা কবিতার পালাবদল।
প্রমথ চৌধুরী,ধূর্জটিপ্রাসাদকেও তিনি ধূসর পান্ডুলিপি পাঠিয়ে মন্তব্য জানতে চেয়েছিলেন কিন্তু কারও কাছ থেকেই তেমন কোন জবাব পাননি। তিনি অর্ন্তমুখী মানুষ ছিলেন ফলে তেমন কোন কবি সাহিত্যিকের সাথে পরিচয় ছিল না, মানুষের সাথেও কম মিশতেন ফলে তার কবিতার প্রচার ঘটেনি তখন।

ত্রিশের দশকের ঠিক গোড়ার ঠিক সেই সময়টায় রবীন্দ্রনাথ বিশ্বভ্রমন করছেন।রাজকীয় অতিথি হয়ে ফ্রান্স,ইংল্যান্ড, জার্মানি,ডেনমার্ক যাচ্ছেন।সবজায়গায় লাল গালিচা সংবর্ধনা পাচ্ছেন সর্বত্র। ঠিক তখনই জীবনানন্দ মেসের বিছানায় ছাড়পোকা মারছেন আর না খেতে পেয়ে পাশের বাড়ির চড়ুইয়ের রেখে যাওয়া বিস্কুট খাওয়ার ইচ্ছা নিয়ে গল্প লিখছেন।

জীবনানন্দ তখন কবিতা লিখলে প্রশংসার থেকে সমালোচিত বেশি হত। সজনীকান্ত সহ আরও কয়েকজন রীতিমত জীবনানন্দের প্রত্যকটি কবিতা তুলোধুনো করে ছাড়তেন।এক বুদ্ধদেব বসু জীবনানন্দ পক্ষে শুধু কলম ধরতেন।

দেশভাগের আগে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারনে জীবনানন্দ কলকাতা চলে যান।পরে বরিশাল
পাকিস্থানে, কলকাতা ভারতে পড়ে যাওয়ায় বরিশাল আর ফিরতে পারেননি যদিও তার নিজ জন্মস্থানে ফিরে যাওয়ার আকুলতা সবসময় কাজ করেছে। ১৯৫৩ সালে কবি কায়সুল হকের কাছে পাঠানো একটা চিঠিতে লিখেছেন :’পূর্বপাকিস্তান আমার জন্মস্থান,সেখানে যেতে আমি অনেকদিন থেকেই ব্যাকুল,কিন্তু পার্সপোর্ট ইত্যাদি কবে জোগাড় করে উঠতে পারব বলে যেতে পারছি না…।”কবি শামসুর রহমান এবং কায়সুল হকের সাথে প্রায়ই দেখা করতেন।

জীবনানন্দ ২১ টি উপন্যাস,১২৬ টি ছোট গল্প লিখলেও তিনি কোথাও প্রকাশ করেননি। তার মৃত্যুর পর তার ট্রাংক থেকে তার অপ্রকাশিত লেখাগুলো উদ্ধার করা হয়।

জীবনানন্দ তার জীবদ্দশায় ‘বনলতা সেনের’ বইয়ের জন্য বঙ্গ রবীন্দ্র সাহিত্য পুরষ্কার পান।
১৯৫৪ সালের প্রথমদিকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট হলে আবৃত্তি করেন তার বিখ্যাত কবিতা ‘বনলতা সেন’।

১৯৫৪ সালের ১৪ অক্টোবর ট্রাম দূর্ঘটনায় আহত হন এবং ২২ অক্টোবর মৃত্যুবরন করেন।
তিনি আত্মহত্যা করেছেন বলে ধারনা করা হয় এর যথেষ্ট কারনও আছে।তার লেখায় অনেকবার আত্মহত্যার কথা তুলে ধরেছেন।’আট বছর একদিন’কবিতার মূল বিষয়ই আত্মহত্যা।তার ‘কারুবাসনা’ উপন্যাসে সরাসরি আত্মহত্যার ইচ্ছার কথা আছে।দূর্ঘটনার কয়েকদিন আগেও কেউ ট্রাম দূর্ঘটনায় মারা গিয়েছেন কিনা জানতে চেয়েছিলেন।

” মাটি-পৃথিবীর টানে মানবজন্মের ঘরে কখন এসেছি
না এলেই ভালে হত অনুভব করে;
এসে যে গভীরতর লাভ হল সে সব বুঝেছি
শিশির শরীর ছুঁয়ে সমুজ্জ্বল ভোরে…”

তথ্যসূত্র :একজন কমলালেবু-শাহাদুজ্জামান,
উইকিপিডিয়া

সাইফুল ইসলাম