জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে পাবলিক-প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্থক্য

নিউজ নিউজ

এডিটর

প্রকাশিত: ২:৫৯ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ২৯, ২০১৯

মো: সুলতান খান :

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্থক্য………

# ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে CGPA 4 পাওয়া একজন ছাত্রের সংজ্ঞা হল, ‘একজন মেধাবী ছাত্র। দেশের গর্ব। দেশের প্রতি তার অনেক দায়িত্ব’।

# একটা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের CGPA 4 পাওয়া একজন ছাত্রের সংজ্ঞা হল, ‘একজন মেধাবী ছাত্র। তার পরিবারের প্রতি তার অনেক দায়িত্ব’।

# আর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের CGPA 3.75 পাওয়া একজন ছাত্রের সংজ্ঞা হল, ‘জীবন যুদ্ধে হার না মানা এক আগুন পাখি’।
.
আমার এ কথা বলার কারণ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র আর অন্য পাঁচটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রের জীবনের মধ্যে হাজার গুণ তফাৎ।

# আপনাদের কাছে জীবন মানে একটি সবুজ ক্যাম্পাস অথবা একটি এয়ার কন্ডিশন ক্লাস রুম, কিছু চেনা মুখ, এসাইনমেন্ট,
প্রেজেন্টেশন। আর আমাদের কাছে জীবন মানে পাবলিক বাস, একটি কলেজের ক্লাশ রুম আর প্রাইভেট টিচার!. আপনাদের কাছে একটা ব্যস্ততাময় সকাল শুরু হয় শিশির ভেজা সবুজ ক্যাম্পাসের ক্যান্টিনে চায়ের কাপে চামচ নাড়ার টং টং শব্দে।

# একটা প্রাইভেট ভার্সিটির ছাত্রের সকাল শুরু হয় ব্রেকফাস্ট সাজানো ডাইনিং টেবিলে। আর আমাদের কাছে সকাল শুরু হয়, রাস্তার পাশের ওই টং এর সিটে বসে চায়ের কাপ হাতে পাবলিক বাসের দিকে তাকিয়ে থেকে। কোন বাসটাতে বসার জন্য একটা সিট খালি পাওয়া যায়। আমরা কখনোই ভার্সিটির বাসের জন্য অপেক্ষা করার সুযোগ পাই না।
.
# হ্যাঁ, আমরা পাবলিকে চান্স না পেয়ে এই খানে আসি।প্রাইভেটের খরচ সামলানোর ক্ষমতা আমাদের বাবাদের নেই। তাই পরিবারের প্রতি আমাদের দায়িত্বটা শতগুণ বেশি। আপনাদের উভয় পক্ষের জীবন সুনিশ্চিত। আমাদের কাছে জীবন অনিশ্চিত। আমাদের কেউ টিউশন দেয় না। তাই আমরা কখনো টিউশনের টাকা জমিয়ে নতুন মডেলের ফোন না পকেটে নেওয়ার স্বপ্ন দেখতে পারি না। আমরা কখনো ছোট বোনের পড়ার খরচ চালানোর টাকাটা নিজের পকেট থেকে দিতে পারি না।
.
# আমরাই সেই হতভাগা ছাত্র, যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি অথচ কখনো প্রেজেন্টেশন ক্লাসের স্বাদ পাই না। হ্যা, আমরা আপনাদের মত কথায় কথায় ইংরেজি বলতে পারি না। আমরা শিখতে চাই। অধিকার আমাদেরও আছে। কিন্তু জীবন আমাদের থামিয়ে দেয়। আমরা
আপনাদের মত ক্লাসের মজাটা পাই না। আপনাদের মতো আড্ডা ও হয় না একসাথে।
# আমাদের একটু বেশি জানার জন্য দৌড়াতে হয় প্রাইভেটে। আমরাই তারা, যারা কখনোই জানতেই পারি না আমার পরীক্ষার খাতাটা কে কাটে, কে আমাদের প্রশ্ন করে। তাই আমদের সিজিপিএ আপনাদের মত এতো সহজ নয়। আমরা কখনোই রেসাল্ট ভুল আসলে তার সমাধান খুঁজতে পারি না। কারণ আমরা কখনোই আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে চোখেই দেখি না। গতানুগতিক নিয়মের মধ্যে হারিয়ে যায় আমাদের জীবনের অনেক না বলা কথা।
.
# আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েও কখনোই একটা সুন্দর ক্যাম্পাসের স্বপ্ন দেখতে পরি না। এসি রুম তো দূরের কথা। পাবলিকের স্টুডেন্টরা সহপাঠীর জন্মদিন পালন করে সবুজ ঘাসের উপর বিসে কেক কেটে। প্রাইভেটের ছাত্ররা তা করে দামী রেস্টুরেন্টের লাল আলোয় বসে। আর আমাদের কাছে সহপাঠীর জন্মদিনটা ফেইসবুকের একটি মেসেজেই সীমাবদ্ধ।
.
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটা স্টুডেন্ট জীবন যুদ্ধের এক একটা যোদ্ধা। জীবন এখানে প্রতিনিয়ত আমাদের যুদ্ধে দাড় করায়। আমরা জীবনটকে প্রতিটা দিন, প্রতিটা মুহূর্ত খুব কাছ থেকে দেখি। আর আপনারা আমাদের দেখেন নীল চোখে! হেরে যাওয়ার সাথে যুদ্ধ করতে করতে যখন কোনোভাবে আমরা একটা অবস্থানে গিয়ে দাঁড়াই তখন আপনারা আমাদের গায়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় নামের একটা লেবেল লাগিয়ে দেন। আমাদের প্রতি পদে পদে অবহেলা করেন। মানুষ বলেই গণ্য করেননা অনেক সময়! আগেই বলেছি, আমাদের সিজিপিএ অর্জন আপনাদের চেয়ে শতগুণ বেশি কষ্টের। তারপর যখন আমরা চাকরির ময়দানে যায় তখন আমাদের অনেকেই নিজের যোগ্যতাটা প্রমাণ করার সুযোগটাই পায় না। পদে পদে আমরা অবহেলিত। কখনোই বুঝে পাই না নিজেদের অধিকার টা। তারপরও আপনারা আমাদের সাথে নিজেদের তুলনা করেন।
.
# তবে হ্যাঁ, এখন আমরা সব হারানোর গল্প পিছনে ফেলে সামনে চলার পথে । যখন সেশনজট নামের কলঙ্কে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় নামক নামটাই মুছে যেতে যাচ্ছিল, তখন প্রফেসর ড. হারুন আর রসিদ স্যার ভাইস চ্যালেন্সার দায়িত্ব নিয়ে টেনে ধরেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের হাল, সেশনজটকে তিনি নামিয়ে এনেছেন শুন্যের কোঠায়। হয়তো আমাদের জীবনটাও হারিয়ে যাবে কালের
অতল গর্ভে। তবে আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম এমন এক জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় পাবে, যা হবে আমাদের সোনার স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়।