জাতি গঠনে পাঠাভ্যাস বাড়ানো প্রয়োজন

নিউজ নিউজ

ভিশন ৭১

প্রকাশিত: ১:০৮ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ৭, ২০২০

দেলোয়ার সাইদি সাদ্দাম :

গত ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০ নানা কর্মসূচিতে সারা দেশে পালিত হলো জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস (আমি দু’ টিতে অংশগ্রহণ করতে পেরেছিলাম)। বক্তারা এলেন। সিরিয়ালি মঞ্চে উঠলেন এবং কথায় নানা রঙ-রস মিশিয়ে বক্তব্য রাখলেন তাঁদের কথায় যেমন ম্যাক্সিম গোর্কি তার মা উপন্যাসকে নিয়ে সামনে এলো,তেমনি বাচ্চাদের কার্টুন গোপাল ভাঁড়ও মঞ্চে অভিনয় দেখালো।অথচ খুব সূক্ষ্মভাবে গ্রন্থাগার কী বক্তারা তা বেমালুম ভুলে গেলেন। গ্রন্থগারের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব উপেক্ষা করে তাঁর আসনে বসলো সহপাঠের গুরুত্ব,নন্দনতত্ত্বের অতীত বায়োপত্ত।

মূলত গ্রন্থাগার (ইংরেজি:Library) একটি সন্ধিজাত শব্দ।গ্রন্থ+আগার=গ্রন্থগার।যেখানে গ্রন্থ হলো পুস্তক বা বই এবং আগার শব্দের অর্থ আলয়,বাড়ি,আধার।এককথায় বইয়ের আধার গ্রন্থাগার।

প্রকৃত অর্থে গ্রন্থাগার বা পাঠাগার হলো বই,পুস্তিকা ও অন্যান্য তথ্য সামগ্রির একটি সংগ্রহশালা,যেখানে পাঠকের প্রবেশাধিকার থাকে এবং পাঠক সেখানে পাঠ,গবেষণা কিংবা তথ্যানুসন্ধান করতে পারেন।(সংজ্ঞা:উইকিপিডিয়া)

সংজ্ঞা এবং গ্রন্থাগার শব্দটির অর্থ থেকে দেখা যায় গ্রন্থাগার শুধুমাত্র সহপাঠমূলক বই কিংবা আনন্দ আস্বাদনের জন্য ব্যবহৃত হয় না।বরং একেকটি গ্রন্থাগার হচ্ছে গবেষণা কর্মীদের তীর্থস্থান।এখানে একজন সাধারণ পাঠক আনন্দ লাভের জন্য নির্বিঘ্নে ‘মেমসাহেব’ পড়তে পারেন। তেমনি একজন লেখক বা গবেষকও সাবলীলভাবে ‘সাহিত্য সন্দর্শন’ কিংবা মার্কস-ফ্রয়েডকে ছুঁয়ে যেতে পারেন। কিংবা Kermack and Mckendrik এর “Contribution to the mathematical theory of epidemic” পড়ে একজন বিশেষজ্ঞ SIR মডেল পড়ে দেশের জনসংখ্যার নির্ধারক হতে পারেন। তার উপর হাইপোথিসিস দিয়ে নতুন তত্ত্ব দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন।

কিন্তু বক্তারা শুরু থেকেই শুধু আত্মতুষ্টিতে সাহিত্য,আনন্দলাভে বই,অবসরে বই বই করে বইয়ের তালিকা দিয়ে গেলেন। যার কোনটাই গবেষণাধর্মী নয়,কিংবা ভবিষ্যতে ইতিহাস জানা ছাড়া আর কোনো কাজে আসবে না। অথচ গ্রন্থাগার শুধু এটাকে বুঝায় না।

আমরা যুগ যুগ ধরে একটা ভ্রান্তি নিয়ে বাস করছি।বই পড়া মানে শুধু আনন্দ অথবা বিনোদন মনে করি।সেটি তো আমরা অন্য কোনো মাধ্যম থেকে নেওয়া যায়(যেমন-ইউটুবে ভিডিও দেখে,সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো কাজে লাগিয়ে।) এই ভুল ধারণার কারণে মানুষ বই পড়ার অভ্যেস থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।

এখন আমাদের এমন কিছু সামনে নিয়ে আসতে হবে যেটি বইপড়ার আনন্দের সাথে আমাদের প্রয়োজনকে সম্পৃক্ত করতে পারে। তৃপ্তির পাশাপাশি আমাদের চাহিদাও যেন পূরণ হয়। বক্তাদের একটি অজ্ঞতা আমাকে খুব অবাক করেছে। আমরা বই পড়াকে কেন শুধু আনন্দ দানের উৎস বলবো?

এমনও অনেক শিক্ষার্থী কিংবা কর্মজীবী মানুষ আছেন,যাদের অবসরের জন্য অতিরিক্ত সময় নেই। তাদের কাছে যেকোনো আনন্দ মূল্যহীন।

মানুষ ঈশ্বরকে পুজো করে কিংবা মসজিদের ফ্লোরে মাথা ঠুকে স্বর্গ পাওয়ার লোভে। কোনো দায়বদ্ধতা থেকে নয়। যদিও ইবাদতের মধ্যে আত্মতৃপ্তি আছে। শান্তি আছে। তাহলে বই পড়ার উপকারের সাথে কেন আমরা লোভনীয় কিছু মেশাচ্ছি না?!

বই পড়লে আনন্দ লাভের পাশাপাশি যা একান্তই নিজের জন্য পেতে পারি –

উন্নত বাচনভঙ্গি, একজন ভালো বক্তা হওয়ার সম্ভাবনা, মানুষের সামনে গঠনমূলক মন্তব্য করার ক্ষমতা। সর্বোপরি নিজের জ্ঞানের পরিধি এবং নৈমিত্তিক জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় গুণাবলি অর্জন। যারা বলেন,চাকরির ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব কতটুকু-তাদের বলি,লিখিত পরীক্ষায় আপনার জ্ঞানও যাচাই করা হয়।

আর লোভ জাগানোর সবচাইতে বড় টোপটি হতে পারে, অন্য মাধ্যমগুলতে অবসর কাটালে হতাশা বাড়ে, পরশ্রীকাতরতা জন্মায়, আত্মহননের প্রবণতা বেড়ে যায়। কিন্তু বই সর্বদা প্রশান্তি দেয়, কষ্ট লাঘবে বন্ধুর মতো কাজ করে।

হ্যাঁ,সাহিত্যকে শুধুমাত্র খেলাচ্ছলে নেওয়া উচিত। তার অর্জিত জ্ঞানকে নয়। জোর করে নয়, বরং শিক্ষা ব্যবস্থা সংস্কার করে পাঠ্য বহির্ভূত জ্ঞানও মূল্যায়ন করা উচিত। আনন্দ আস্বাদনে বই পড়া না বলে প্রয়োজন নামক দায়বদ্ধতা সৃষ্টির দরকার। নতুবা ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শুধু গ্রন্থাগার শব্দটি জানবে, ভেতরটা থাকবে জনশূন্য।

লেখক :
শিক্ষার্থী,ঢাকা কলেজ ঢাকা।

তামিম/ঢাকা/০১