ছাত্রলীগের কাছে যেমন ছাত্ররাজনীতি প্রত্যাশা করি

নিউজ নিউজ

এডিটর

প্রকাশিত: ৪:২০ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৩১, ২০১৯

মাহবুবুর রহমান সাজিদ :

ছাত্রলীগকে অস্বীকার করে বাংলাদেশের ইতিহাস কল্পনা করা যায়না। মুসলিম লীগের ছাত্রসংগঠন নিখিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ যখন সন্ত্রাসী সংগঠনে রূপ নিয়েছিল। ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল দেশজুড়ে। তৎক্ষালীন দূরদর্শী দেশপ্রেমী ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ববাংলার জনমানুষের অধিকার আদায়ের অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল বাংলার নিপীড়িত, নির্যাতিত অধিকারহারা জনসাধারণের স্বাধিকার আদায়ের সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা রাখবে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। প্রতিষ্ঠার পর থেকে অক্ষরে অক্ষরে সেই স্বপ্ন পূরণ করে আসছিল বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। ১৯৪৮-৫২ সাল পর্যন্ত মাতৃভাষা আন্দোলনে সোচ্চার ছিল বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। ৫৪ সালের যুক্তফ্রণ্টের ভূমিধ্বস বিজয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিল বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।
৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬ সালের ছয়দফা আন্দোলন, ৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সামনের সারি থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। সুতরাং বাংলাদেশ ছাত্রলীগের অবদান অস্বীকার করতে গেলে নিজেকে অস্বীকার করা হবে। অস্বীকার করা হবে বাংলাদেশকে।

স্বাধীনতা পরবর্তী ছাত্ররাজনীতিতে আদর্শিক দ্বন্দ্ব শুরু হয়। বিশেষ করে ৭৫ পরবর্তী ক্যাম্পাসগুলো জাতীয় রাজনীতির প্রভাবে কলুষিত হতে শুরু করে। স্বৈরাচারের শাসনামলেও ছাত্ররাজনীতির এক স্বনামধন্য অধ্যায় রয়েছে।
এরপর জাতীয় রাজনীতিতে গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়েছে। সাথেসাথে ছাত্ররাজনীতিতে কালো অধ্যায় শুরু হয়েছে।

এর একমাত্র কারণ হল স্বাতন্ত্র্যহীনতা। নেতার কোন নেতা থাকেনা। নেতার থাকে তার আদর্শ, তার বিবেক, তার বুদ্ধিমত্তা, তার দূরদর্শীতা। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক গুরু ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে রয়েছে, বঙ্গবন্ধুর মতাদর্শের সাথে অমিল হওয়ায় তিনি বের হয়ে এসেছিলেন। যখন সোহরাওয়ার্দী বলেছিলেন, Who are you? You are nothing. বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, If I am nothing why do you call me?

আজকের ছাত্ররাজনীতির কোন স্বাতন্ত্র্য নেই। বাংলাদেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের শিশুশ্রমিকে রূপান্তরিত হয়েছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ এবং জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। তারা নিজেরা নেতৃত্ব ঠিক করতে পারেনা। নেতা ঠিক করে দেন হেডকোয়ার্টার। আবার নেতৃত্ব কেড়েও নেন হেডকোয়ার্টার। অন্ধ আনুগত্য দিয়ে ভালো নেতা হওয়া যায়না। হ্যাঁ, অন্ধ আনুগত্য দিয়ে ভালো কর্মী হওয়া যায়।

নব্বইয়ের দশকের পর থেকে ছাত্ররাজনীতিকে সুকৌশলে দলীয় রাজনীতির আজ্ঞাবহ দাসে পরিণত করা হয়েছে। যারফলে ছাত্ররাজনীতির অতীত ঐতিহ্য হারিয়ে আজ শুধু কলঙ্ক আর আতঙ্ক হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। শুধু ছাত্রলীগ নয় বিএনপি আমলে ছাত্রদল এবং জামাত শিবির একই আসনে সমাসীন ছিল। আমাদের মুরব্বীরা একসময় বলতেন, কুকুর এবং জামাত শিবির থেকে দূরে থাকুন। কারণ, কুকুর মানুষের পায়ে কামড় দিত আর জামাতশিবির পায়ের রগ কেটে দিত।
আজ অত্যন্ত দুঃখের সহিত বলতে হচ্ছে, সারাদেশের মানুষের মনে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ এক আতঙ্কের নাম। আজ আমাদের অভিভাবকেরা ছাত্রলীগ থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেন।

বঙ্গবন্ধুর হাতেগড়া সংগঠন কেন আজ চাঁদাবাজের সংগঠন হবে? উপমাহাদেশের সর্ববৃহৎ, সুপ্রাচীন এই সংগঠনের মিছিলে কেন শিক্ষার্থীদের জোর করে নিতে হবে?
কেন বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও গৌরবময় এই সংগঠনের গায়ে সন্ত্রাস, দখলদারিত্বের কালিমালেপন করা হবে?
তারমানে বুঝতে হবে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে বিচ্যুত। তাই এই বেহালদশা।

নব্বয়ের দশকের পর থেকে ছাত্রলীগের দীর্ঘ ত্রিশ বছরের ছাত্ররাজনীতিতে কী অর্জন সেটির কি কোন পরিসংখ্যান রয়েছে? ছাত্ররাজনীতি করে জাতীয় সংসদে গিয়েছেন কয়জন? হাতেগুনা দুচারজন দেখাতে পারবেননা। সংসদে রমরমা বাণিজ্য করছে ব্যবসায়ীরা। রাজনীতি চলে গেছে ব্যবসায়ীদের দখলে।

ছাত্রদের অধিকার আদায়ে ছাত্রলীগ কি অবদান রেখেছে? সিট সংকট বিশ্ববিদ্যালয়েরর হলগুলোতে প্রকট। বরং
এই সিট সংকটের কারণ হয়েছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। হলগুলোতে দখলদারিত্ব ছাত্রলীগের। সিট বন্টনের দায়িত্ব ছাত্রলীগের। হল প্রশাসনের সকল দায়িত্ব ছাত্রলীগ নিজহাতে নিয়ে হরিলুট করছে।

শিক্ষা, শান্তি, প্রগতির পতাকাবাহী সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।

গেস্টরুমের নামে হলে হলে টর্চারসেল তৈরী করে শিক্ষার্থীদের মানসিক এবং শারীরিক নির্যাতন করছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। গেস্টরুম, প্রোগ্রাম, প্রোটকলে ঘন্টার পর ঘন্টা সময় নষ্ট করছে ছাত্রলীগ।
ক্লাস থেকে ডেকে প্রোগ্রাম, প্রোটকলে নিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। এটাই কি ছাত্রলীগের মূলনীতি “শিক্ষা”?

গেস্টরুমে শারীরিক, মানসিক নির্যাতন করছে ছাত্রলীগ। ক্যাম্পাসে আবু বকর, হাফিজুর, আবরারদের লাশ উপহার দিচ্ছে ছাত্রলীগ। আহসানদের চক্ষু নষ্ট করছে ছাত্রলীগ। এটা কি ছাত্রলীগের “শান্তি” মূলনীতি?

সালাম না দেওয়ায় সিঙ্গেল গেস্টরুমে নির্যাতন, সমালোচনা করায় হত্যা, হল থেকে বের করে দেওয়া, সহনশীলতার অভাব এটা কি প্রগতিশীলতা?

ছাত্রলীগকে আমার পরামর্শ দেওয়ার কিছু নেই। ছাত্রলীগ একটি আদর্শিক সংগঠন।
ছাত্রলীগের আদর্শ মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ। ছাত্রলীগের বাইবেল হওয়া উচিত অসমাপ্ত আত্মজীবনী।

বঙ্গবন্ধুর আদর্শ নিয়ে ছাত্রসমাজের কাছে আসেন। এখনো ছাত্রলীগকে প্রত্যেকটা শিক্ষার্থী ধারণ করবে, লালন করবে।

বহান্ন, বাষট্টি, উনসত্তরের মতো অধিকারের আন্দোলনে সামনের সারি থেকে নেতৃত্ব দিক বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। আবারো ফিরে আসুক বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সেই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস সেই প্রত্যাশা করি।