চসিক নির্বাচনে পলিথিন ব্যবহার চট্টগ্রামে পরিবেশ দূষণ এবং জলাবদ্ধতার দুঃসহ কারণ হতে পারে

নিউজ নিউজ

এডিটর

প্রকাশিত: ১২:০৩ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২০
মোহাম্মদ মন্‌জুরুল আলম চৌধুরী।

ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের রেশ শেষ হতে না হতেই শুরু হয়ে গেছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের ঢামাঢোল। নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণা না করার পূর্বেই সরকারী দল আওয়ামী লীগ ইতোমধ্যেই মেয়র এবং কাউন্সিলরদের দলীয় মনোনয়ন ফরম বিক্রি শুরু করেছে। আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট অনেক প্রার্থী বিশেষ করে মেয়ের পদের ফরম কিনেছেন। পাশাপাশি বিএনপি’র মহাসচিব চট্টগ্রামে এক দিনের সফর শেষ করে গেছেন এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণের গ্রীণ সিগন্যাল দিয়েছেন নেতা কর্মীদের। অতীতের কিছু নির্বাচনে অংশ গ্রহণ না করা ভুল হয়েছে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি। তবে চট্টগ্রামবাসীর শঙ্কা এবং উদ্বেগের কারণ হচ্ছে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ব্যবহৃত পলিথিন। পলিথিন পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর এবং জলাবদ্ধতার কারণ হওয়ায় আইন করে পলিথিন উৎপাদনবিপণন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে ২০০২ সালে। আইন অনুযায়ী পলিথিন শপিং ব্যাগের উৎপাদনআমদানিবাজারজাতকরণবিক্রি কিংবা বিক্রির জন্য প্রদর্শনমজুতবাণিজ্যিক উদ্দেশে পরিবহন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ। অথচ সেই পরিবেশ বিধ্বংসী নিষিদ্ধ পালিথিনের পোষ্টারে ছেয়ে গিয়েছিল রাজধানী ঢাকা শহর বিগত ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে। জানা যায়, ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে প্রচারণার জন্য প্রথম বারো দিনে প্রায় ২৫০০ টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হয়েছে। রাজধানী জুড়ে পলিথিনে মোড়ানো এসব পোস্টার পরবর্তী সময়ে ড্রেনে-নালা-নর্দমায় ঢুকে নগরীর পানিবদ্ধতা বাড়িয়ে তুলবে বলে সতর্কতা এবং শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন সিটি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা। তাঁদের আশঙ্কা হচ্ছে এসব লেমিনেটেড পোস্টার পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। পাশাপাশি বর্ষা মৌসুমে এসব পলিথিন ড্রেনেজ ব্যবস্থা অচল করে দেবে। এমনকি শুষ্ক মৌসুমেও এগুলো ড্রেনেজ ব্যবস্থায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে বলে তাঁরা উদ্বেগ এবং শঙ্কা প্রকাশ করেন। যার ফলে শুষ্ক মৌসুমেও ড্রেনের পানি রাস্তায় উপচে পড়বে। এদিকে “বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল বলেননগরের পরিবেশ দূষণ ও পানিবদ্ধতার জন্য প্রধানত দায়ী পলিথিন। পলিথিন পঁচতে ৫শ বছর লাগে। এটা পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর”। ( সূত্রঃ ইনকিলাব, ২২ জানুয়ারি’২০)। পাশাপাশি পরিবেশবিদরা জানিয়েছেনবিপুল পরিমাণ এই পলিথিন বর্জ্য কখনোই মাটির সঙ্গে পুরোপুরি মিশে যাবে না। এগুলো একসময় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র হয়ে পানির সঙ্গে মিশে যাবে। যা মাছের মতো জলজ প্রাণীর মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে মারাত্মক রোগের সৃষ্টি করবে। যদিও দুই ঢাকা সিটির নির্বাচনে পলিথিনের এরকম ব্যবহারের বিষয়ে দৃষ্টি আকৃষ্ট হয় উচ্চ আদালতের। গত ২২ জানুয়ারি হাইকোর্ট ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে প্রার্থীদের নতুন করে লেমিনেটেড পোস্টার লাগানোর উপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। নতুন করে লেমিনেটেড পোস্টার উৎপাদনছাপানো ও প্রদর্শনের বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে সিটি কর্পোরেশন ও নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ দেন আদালত।

ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে পলিথিন ব্যাগ, লেমিনেটেড পোস্টারের অত্যধিক অপব্যবহারে চট্টগ্রামবাসী আসন্ন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনেও পলিথিনের অপব্যবহারের জন্য শঙ্কিত,আতঙ্কিত এবং উদ্বিগ্ন হয়ে আছে। কেননা প্রতিবছর বর্ষায় চট্টগ্রাম শহর কয়েকবার পানিতে তলিয়ে যায়। সামান্য বৃষ্টিতে নগরীতে জলাবদ্ধতা, জলজটের সৃষ্টি হয়। ফলশ্রুতিতে নগরের মানুষ অমানবিক দুঃখ দুর্দশা ভোগান্তি দুর্ভোগে পড়ে। চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য সিডিএ’র মেগা প্রকল্প চলমান যা নির্দিষ্ট সময়ে শেষ হচ্ছে না এবং এ বছরও নগরবাসীর ধারণা এবং শঙ্কা তাঁদেরকে আবারো পানিতে ডুবতে হবে। এই কার্যক্রম চলাকালে দেখা গেছে নালা, নর্দমা, খালগুলো বিপুল অপচনশীল প্ল্যাস্টিক বর্জ্যে ভরপুর। এবং তা এ প্রকল্পের গতিকে বাধাগ্রস্থ করছে। পাশাপাশি আরেকটি দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে চট্টগ্রামের প্রধান এবং ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য খ্যাত কর্ণফুলী নদীর ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের কাজেও নদীর তলদেশে পলিথিনের বিরাট এবং পুরো স্তরের কারণে বার বার ব্যাঘাত ঘটছে এবং প্রকল্প কাজ সম্পন্ন হতে বিল্বিত হচ্ছে। শুধু বাংলাদেশেও নয় সারা পৃথিবীর জন্য পরিবেশ বিপর্যয়ের জন্য প্ল্যাস্টিক বর্জ্য ও প্ল্যাস্টিক দূষণ অনেকাংশে দায়ী।  অনুমেয় কারণে পরিবেশ দূষণসহ স্বাস্থ্যহানিকর নানাবিধ কারণে আসন্ন চসিক নির্বাচনের পূর্বে অবশ্যই পলিথিন মোড়ানো এবং লেমিনেটেড পোষ্টার ব্যবহার নিষিদ্ধকরণের ওপর নির্বাচন কমিশনের সুস্পষ্ট নির্বাচনী বিধি বিধান প্রদান করা জরুরি। অন্যথায় প্রতি বছরের ন্যায় অল্প বৃষ্টিতে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা এবং জলজট আরও বৃদ্ধি পাবে।  প্রাসঙ্গিক কারণে নির্বাচনের সময় কানের পর্দা ফাটানো নির্বাচনী প্রচারণার মাইকসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের উচ্চ ও বিক্ট শব্দ মানুষকে ভয়াবহ শব্দ দূষণে আক্রান্ত করে ছাড়ে। বলা যায় এটা শব্দ দূষণ নয় বরং শব্দ সন্ত্রাস। নাগরিক সমাজ এমনিতেই কল কারখানা, গাড়ীর হরণ বাজানো, গায়ে হলুদ অনুষ্ঠান সহ বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে উচ্চ স্বরের গান বাজানার শব্দ দূষণে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ভয়াবহ শব্দ দূষণে আক্রান্ত হয়ে আছে। পরিবেশবিদ , সমাজবিশ্লেষকদের অভিমত নির্বাচনী প্রচারণা আধুনিক যুগোপযোগী, প্রযুক্তি নির্ভর করা জরুরি। প্ল্যাস্টিক যদি ব্যবহার করতেই হয় তবে তা রিসাইক্লিং করে পুনঃব্যবহারের ব্যবস্থা করাটা জরুরি।

জন সাধারণ মনে করে নির্বাচনে পোস্টারিং, মাইকিং বন্ধ হলে খুব ভালো হয়।  আশার কথা, “নির্বাচনী প্রচারণায় পোস্টার ও মাইকের ব্যবহার চায় না নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এসবের বাইরে প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারণার জন্য কী ধরনের সুযোগ দেয়া যায় সে বিষয়ে চিন্তা ভাবনা করছে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি। আগারগাঁওস্থ নির্বাচন ভবনে মঙ্গলবার ( ১১ ফেব্রুয়ারি’২০) বিকালে ঢাকার দুই সিটি নির্বাচন পর্যালোচনা করতে জরুরি বৈঠকে বসে ইসি। সেখানে এ বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয় বলে জানা গেছে। বৈঠকে একটি লিখিত প্রস্তাব করেন নির্বাচন কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম। তার মতে নির্বাচনে বর্তমানে যে প্লাস্টিকের লেমিনেটিং করা পোস্টার ব্যবহার করা হচ্ছে এতে পরিবেশের মারাত্মক বিপর্যয় হচ্ছে। এছাড়া কেবল কাগজের তৈরি পোস্টারও যদি ড্রেনে যায়, তাহলে জলাবদ্ধতা ব্যাপক আকার ধারণ করবে। ঢাকা সিটি নির্বাচনে প্লাস্টিকে মোড়ানোর পোস্টারগুলো সরিয়ে নেওয়া হলেও পরিবেশ বিপর্যয় ঠেকানো যাবে না। কেননা, এগুলো পোড়ালে পরিবেশ দূষণ হবে। মাটিতে ফেললেও পরিবেশ দূষণ হবে। তাই পোস্টার ছাড়া নির্বাচনী প্রচারণা নিয়ে ভাবা প্রয়োজন। এছাড়া নির্বাচনে মাইক ব্যবহারের আইনি অনুমতি থাকলেও বাস্তবে যেভাবে লাউড স্পিকার ব্যবহার করা হয়, তাতে দুপুর ২টা থেকে ৮টার সময়সীমা কেউ মানে না। এছাড়া একাধিক স্পিকার ব্যবহার করা হয় উচ্চমাত্রায়। ফলে ব্যাপক শব্দ দূষণের সৃষ্টি হয়। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, আমরা তিনটি বিষয়কে মাথায় রেখেছি। আর তা হলো- পরিবেশ দূষণ, শব্দ দূষণ ও যানজটমুক্ত নির্বাচনী প্রচার। এটার জন্য যা যা করা দরকার আমরা সবাই করবো। রাজনৈতিক দলের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলা হবে বলেও জানান তিনি। ( ঢাকা টাইমস, ১৪ ফেব্রুয়ারি’ ২০)।

আমরা প্রত্যাশা করি দেশের নির্বাচনের সঙ্গে জড়িত সংশ্লিষ্ট মহল নির্বাচনী প্রচারণায় কিভাবে জন দুর্ভোগ, দুর্দশা, ভোগান্তি লাগব করা যায় সে ব্যাপারে যথাযথ চিন্তা ভাবনা করে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ দেশের জন সাধারণের বৃহত্তর স্বার্থে খুবই জরুরি।