কে বলেছে পুলিশের চোখে পানি আসেনা ?? একজন মানবিক পুলিশ পাল্টে দিয়েছে সেই ধারণা !!

নিউজ নিউজ

এডিটর

প্রকাশিত: ৯:২২ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২০

অনলাইন ডেস্ক :

কে বলেছে পুলিশের চোখে পানি আসেনা ?? পুলিশের হৃদয় কঠিন , সাধারণ মানুষের এ ধ‌্যান ধারণাকে পাল্টে দিয়েছি সুপার হিউম‌্যান খ‌্যাত মানবিক পুলিশ সদ‌স‌্য শওকত। সদ‌্য প্রচারিত ঢাকা এফ.এম ৯০.৪ লাইভে তার চোখের পানি লক্ষ মানুষকে কাঁদিয়েছে। একজন শওকত হোসেনই জাতিকে দেখিয়ে দিয়েছে মনুষ‌্যত্ব কাকে বলে। যিনি শুধু বাংলাদেশ পুলিেশের ভাবমুর্তিকে উজ্জল করেনাই। মানবতার একজন নি:স্বার্থ সেবক হিসেবে জাতির সামনে নিজেকে দীর্ঘ ১০ বছর পেশ করে এসেছেন।

বলছি সেই সুপারহিউম‌্যান খ‌্যাত মুহাম্মদ শওকত হোসেন এর কথা। যিনি বাংলাদেশ পুলিশের একজন গর্বিত সদস্য। কিন্তু তাঁর পরিচয় শুধু এতটুকু নয়, তিনি সবার কাছে সুপারহিউম্যান খ্যাত মানবিক পুলিশ সদস্য হিসেবেই পরিচিত।

তার মানবকিতার গল্প শুরু চট্টগ্রাম মেডিকেলের মর্গের পাশে ডাস্টবিনের পড়ে থাকা কোনো ভারসাম্যহীন অসুস্থ অজ্ঞাত ব‌্যক্তির পরিচর্যা করে সুস্থ করে তোলার মধ‌্য দিয়ে । তার লাইভ বর্ণনায় জানা যায়, অর্ধমৃত এই লোকটা চিকিৎসার অভাবে ময়লার ডাস্টবিনে জীবন মৃত‌্যুর সন্দিক্ষণে ছিল। যার এক পায়ের অর্ধেকজুড়ে পঁচে গেছে,পঁচা অংশ থেকে বের হচ্ছে মারাত্নক দুর্গন্ধ । যার শরীরের পঁচা অংশ পোকামাকড়ে খাওয়া শুরু করেছে। এমন রোগী থেকে সবাই দূরে থাকলেও পরম যত্নে তাদের চিকিৎসা দিয়ে ভালো করে তুলেন মানবিক পুলিশ শওকত হোসেন।

সে আলোচিত মানবতার ফেরিওয়ালা মানবিক পুলিশ মুহাম্মদ শওকত হোসেন বর্তমানে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের মানবিক পুলিশ শাখার টিম লিডার হিসেবে কর্মরত আছেন। ১০ বছর ধরে চট্টগ্রাম বিভাগীয় পুলিশ হাসপাতালে কাজ করছেন।

মুহাম্মদ শওকত হোসেনর বাড়ি নোয়াখালীর কবিরহাটে। তাঁর বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা।

প্রত্যেকদিনই শওকত হোসেন কোন না কোন ভারসাম্যহীন রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে এসে সুস্থ করে তুলছেন। অসহায় এসব রোগীর সেবায় তাঁর বেতনের অর্ধেকের বেশিই শেষ হয়ে যায়। অনেক সময় পুরো বেতনের সব টাকা দিয়েও পেরে ওঠতে না পেরে নিজের অর্থনৈতিক অবলস্বন দুটি ফার্মেসী ও বিক্রি করে মানবতার পাশে দাঁড়িয়েছেন। এসব রোগীকে দেখভাল করতে গিয়ে গত ১০ বছর ধরে নিজের জন্য একটি পোশাকও কিনতে পারেননি তিনি। সহকর্মীর পোশাক পরেই বিভিন্ন পারিবারিক ও অফিসের অনুষ্ঠানে যেতেন তিনি।

মুহাম্মদ শওকত হোসেনর মানবিক পুলিশ হয়ে ওঠার গল্প :

শওকত হোসেন পুলিশের কনস্টেবল হিসেবে ২৪তম ব্যাচে যোগ দেন ২০০৫ সালে। তখন তার মূল বেতন ছিলো ২ হাজার ৮৫০ টাকা। সবকিছু মিলিয়ে বেতন পেতেন ৫ হাজার টাকা। ওইসময় আর্থিক অনটনে দিন অতিবাহিত করতেন। চাকরি ছেড়ে দেওয়ার কথা বললে তার মুক্তিযোদ্ধা বাবা ধৈর্য রাখতে বলতেন। বাবার অভয়ে তার পুলিশে পথচলা শুরু। ২০০৫ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ঢাকায় কর্মরত ছিলেন। এরপর বদলি হয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশে আসেন। পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষার অধীনে মেডিক্যালের ওপর তিন বছরের ডিপ্লোমা ও দুই বছরের প্যারা মেডিক্যালের বিষয়ে লেখাপড়া করেন।

২০০৯ সালে কিছুদিন রাঙামাটিতে কর্মরত থাকার পর চট্টগ্রাম বিভাগীয় পুলিশ হাসপাতালে বদলি শওকত হোসেন। রাঙামাটি থেকে আসা আহত পুলিশ সদস্যের সেবা দেওয়ার দায়িত্ব নিয়ে একসময় তাকে ওটির ইনচার্জ হয়ে যান তিনি। তখন থেকে তার রোগীর সঙ্গে সখ্যতা গড়ে উঠে। ভারসাম্যহীন অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে এনে সুস্থ করে তোলার যাত্রা শুরু এখান থেকেই।

প্রথম দিকে নিজেই একা কাজ করলেও এখন তার সহযোগী আছেন ১০জন।

শওকত হোসেন জানান, ‘রাস্তার পাশে পড়ে থাকা রোগী, যাদের শরীর থেকে ছড়াতো উৎকট গন্ধ, এমন মানুষের পাশে কেউ যেতেন না। আমি মনে করতাম, এই মানুষটি-তো আমিও হতে পারতাম বা আমার ভাইও হতে পারতো। এইভেবে নিজে উদ্যোগী হয়ে অসুস্থ রোগীদের হাসপাতালে এনে সুস্থ করে তুলতাম।

আরও জানান, প্রায় সময় এমন রোগী পেতাম কারও হাত, কারও পা ও কারও মুখ পচে গেছে। এসব রোগীর শরীর থেকে পোকাও বের হচ্ছে। এমন রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যেতাম। নিজের টাকায় কয়েক সেট কাপড় কিনে তাদের পড়াতাম। সেই কাপড়ে প্রস্রাব, পায়খানা করলে কাপড়টি বদলিয়ে নতুন কাপড় পড়াতাম নিজ হাতে। এভাবে সুস্থ করে তুলতাম।

গত ১০ বছরে নিজের জন্য একটিও নতুন কাপড় কেনেননি উল্লেখ করে সুপারহিউম্যান খ্যাত এই পুলিশ সদস্য জানান, শত শত রোগীর চিকিৎসা করাতে গিয়ে অনেক টাকার প্রয়োজন হয়। তবে অনেকে এগিয়ে এলেও টাকার পরিমাণ অপ্রতুল। নিজেরে বেশিরভাগ টাকা এসব রোগীর পেছনে চলে যাওয়ায় ১০ বছরে নতুন কোনো পোশাকও কিনিনি। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যেতাম সহকর্মীর পোশাক পরে।

পরিচিতজনকে বলতাম, আমার কিছু গরীব মানুষের জন্য কাপড়-চোপড় দরকার। তখন তারা যে কাপড়গুলো দিতো, তা থেকে অসুস্থ রোগীকে দিতাম, নিজেও পরতাম।

‘নিজের স্ত্রীকে নিয়েও দূরে কোথাও ঘুরতে যেতে পারিনি। আমার স্ত্রীও বিষয়টি বুঝেন, তিনি বরং আমাকে এ কাজে সাহায্য করেন। আমার আশা, দেশের মানুষ এসব রোগীর জন্য এগিয়ে আসবেন। সবাই এগিয়ে এলে তখনই আমার পরিশ্রম সার্থক হবে’ বলে আশা ব্যক্ত করেন শওকত হোসেন।

সুপার হিউম‌্যান তথা মানবিক পুলিশ শওকত হোসেনের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা ও মানবিক ভালবাসা ।