করোনা বনাম বন্যা!!

নিউজ নিউজ

এডিটর

প্রকাশিত: ১০:৫৮ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ২৬, ২০২০

————–
মরার উপর খাড়ার ঘা।বিগত ৭ মাস থেকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে মহামারী করোনা ভাইরাস যার ভয়াবহ পরিণতির মোকাবেলা করে এখনও উঠে দাড়াতে পারেনি পৃথিবী।এর মধ্যে শুরু হয়েছে বণ‍্যা দেশের উত্তর এবং মধ্যাঞ্চল সহকারে সারাদেশে বিশাল এলাকা এখন বন্যা কবলিত। দেশের প্রায় ৩০ টি জেলার বিশাল এলাকাজুড়ে বন্যা চলছে। চারিদিকে কেবল পানি আর পানি। এ বন্যার কারণে অনেক অঞ্চলের অসহায়,গরিব মানুষদের জীবনে এখন সীমাহীন দুর্ভোগ নেমে এসেছে। বন্যার পানিতে ধ্বংস হয়েছে ঘরবাড়ি,তলিয়ে গেছে ফসলের মাঠ, ভেসে গেছে পুকুরের মাছগবাদিপশু। মাঠের ফসল, ধান ক্ষেত আর তরিতরকারি সবই পানিতে ডুবে ধ্বংস হয়েছে। গোলার ধান, গোয়ালের গরু আর ছাগল সবই ক্ষতিগ্রস্ত এবং ভেসে গেছে বণ‍্যায়। ধ্বংস হয়েছে কয়েক শত পোল্ট্রি খামার। পানিতে ভেসে
গেছে হাজারো হাঁস-মুরগি। বন্যার পানিতে হাজার হাজার মাটির ঘর ধসে পড়েছে। ধ্বংস হয়ে গেছে হাজার হাজার একর জমির ফসল। মাছের খামার সমুহ ডুবে যাবার কারণে ভেসে গেছে শত কোটি টাকার মাছ।একদিকে অসহায় মানুষের জীবন যাপন অতিষ্ট হয়ে গেছে করোনার জন্য যার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি এখন‌ও তার উপরে বণ‍্যায় দুরভিসন্ধি হয়ে পড়েছে মানুষের জনজীবন। পানিতে ভেসে গেছে হাজারো গবাধি পশু। রাস্তাঘাট, বসত বাড়ি, স্কুলের মাঠ সবই পানির নিচে। মসজিদ, মাদরাসা, মন্দির-গির্জা সবটার ভিতরেই পানি। বাড়ির বাইরেও পানি, ভেতরেও পানি। দাঁড়ানোর জন্য কোথাও একটু শুকনো জায়গা নেই। বসার এবং ঘুমানোর জন্যও কোথাও একটু জায়গা নেই। সব মিলিয়ে অনেক অঞ্চলের মানুষের জীবনে আজ বড়ই কষ্ট কাটছে এখনও অনেকেই কোনো ধরনের সাহায্য সহযোগিতা পায়নি না খেয়ে অনাহারে দিন অতিবাহিত করছে হাজার হাজার পরিবার। মহিলা, বৃদ্ধা এবং শিশুদের জীবনে কাটছে অনেক কষ্টে।হতদরিদ্র পরিবার আরো আরো বেশি অসহায় হয়ে পরছে তাদেরকে কেউ একটু সাহায্য করতে পারছেনা। বন্যার পানিতে লন্ডভন্ড হয়ে গেছে মানুষের জীবন। সবদিকেই কেবল মানবতার হাহাকার। একদিকে মহামারী করোনা ভাইরাস অন‍্য দিকে বণ‍্যার পানির কারণে অনেক অঞ্চলের কয়েক হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে বন্ধ।

ছেলেমেয়েদের পড়ালেখাওরয়েছে অনেক দিন থেকে বন্ধ।বণ‍্যার কারণে খাবার পানির বড়ই অভাব দেখা দিয়েছে। সব নলকূপই পানির নিচে এবং পুকুরসমূহ ময়লা পানিতে ভরাট। রান্না করে খাবার তৈরির সুযোগ কোথাও নেই। শুকনো রুটি, বিস্কুট, মুড়ি আর চিড়া খেয়েই জীবন চালাতে হচ্ছে হাজার হাজার পরিবারের। এক কথায় করোনা অন্য দিকে ত্রাণের সাহায্যের ওপর নির্ভর করেই বেঁচে আছে হতদরিদ্রদের জীবন। এ অবস্থায় সব ভেদাভেদ ভুলে আজ আমাদেরকে দুর্গত মানুষদের রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে। এখানে কোন ধরনের রাজনীতি নয়, সংকীর্ণতা এবং বিভেদ নয়। আসুন সব ভেদাভেদ ভুলে দুর্গতদের রক্ষায় এগিয়ে আসি।

একদিকে করোনার জন্য ঘরবন্দি রয়েছে অনেক পরিবার অন্য দিকে বন্যার কারণে যা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা বর্ণনাতীত। এসব ক্ষতি সহজে পূরণ হবার নয়। কিন্তু এখন প্রয়োজন করোনার জন্য যে সকল পরিবারের মধ্যে কোন ধরনের সাহায্য দেওয়া হয়নি সেই সকল পরিবার সহকারে বন্যাদুর্গত মানুষদেরকেও সর্বাত্মকভাবে সাহায্য করা অতি জরুরি হয়ে পরেছে। তারা যেন আবার সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে, সে জন্য তাদেরকে সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতা করতে হবে আমাদের সকলের।

বন্যার সময় সার্বিকভাবেই মানুষের জীবনে কষ্ট নেমে আসে। আবার বন্যার পানি নেমে যাবার পর ও অনেকদিন ধরে বন্যা কবলিত মানুষদেরকে সেই কষ্ট সহ্য করতে হয়। কারণ তখন মানুষ বিভিন্ন ধরনের রোগ ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়। বিশেষ করে পানি বাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ে। বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দেয় প্রবলভাবে। পুকুরসমূহ ময়লা পানিতে সয়লাব হয়ে যাওয়ায় ব্যবহারের পানিরও সংকট চলে। মানুষ বর্তমানে করোনা ভাইরাসের সঙ্গে প্রতিনিয়ত ভাবে যুদ্ধ করে যাচ্ছে কিন্তু যখনই বণ‍্যার পানি কমতে শুরু করবে তখনই ব্যাপক হারে ডায়রিয়ার আক্রান্ত হবে লক্ষ লক্ষ মানুষ। এ অবস্থায় বন্যার্ত মানুষদেরকে সাহায্য করাটা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। আসুন আমরা বন্যাদুর্গত মানুষদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিই।

সারা দেশের সার্মথ্যবান মানুষেরা যদি আজ এগিয়ে আসে তাহলে এই দুর্যোগকে মোকাবেলা করা কঠিন এবং অসম্ভব নয়। আমাদের সম্মিলিত প্রয়াসে এসব দুর্গত মানুষেরা অচিরেই তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারবে, একথা আমি দৃঢ়তার সাথে বিশ্বাস করি। আসুন আমরা দলবেঁধে করোনার বিরুদ্ধে এবং বণ‍্যায় দুর্গত মানুষদের কাছে যতটুকু সম্ভব সাহায্য পৌঁছে দেই যেমন:- শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ।

বন্যার কারণে যে মানুষটি আজ সর্বহারা তার প্রতি আসুন আমরা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিই। বন্যার কারণে যে মানুষটির ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে, তাকে একটি ঘরের ব্যবস্থা করে দিতে চেষ্টা করি। আসুন এক ভাই অন্য ভাইকে মাথা গোজার ঠাঁই করে দিই। যে কৃষকের ফসল ধ্বংস হয়েছে আসুন নতুন করে কৃষিকাজের জন্য সেই কৃষকের পাশে দাঁড়াই। যারা গবাদিপশুকে হারিয়েছে, তাদের হাতে আবারো গবাদি পশু তুলে দিই। ক্ষতিগ্রস্ত পোল্ট্রি এবং মৎস্য চাষিদেরকে আবারো নতুন করে ব্যবসা শুরুর জন্য সহযোগিতা করতে হবে। যে ছাত্রটির বই খাতা নষ্ট হয়েছে সেই ছাত্রটির হাতে আসুন আমরা আবারো বই খাতা কলম তুলে দিই।

ক্ষতিগ্রস্ত মানুষেরা যেন সহজে ব্যাংক থেকে বিনিয়োগ নিয়ে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য পুনরায় চালু করতে পারে, সে জন্য ব্যাংকগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করে দিতে হবে যেটা বর্তমান সরকার যতেষ্ট গুরুত্ব বহন করবে বলে আমরা আশা করছি। একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদেরকে বর্তমানে বিদ্যমান ব্যাংক ঋণ পরিশোধের জন্য সময় দিতে হবে। সেন্ট্রাল ব্যাংক হিসাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক্ষেত্রে বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদেরকে সাহাযের জন্য ব্যাংকগুলোকে সহজ নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। দেশের এক কোটি মানুষ যদি আজ প্রত্যেকেই মাত্র একশত টাকা করে দুর্গত মানুষদের জন্য দান করে তাহলে নিমিষেই জোগাড় হবে শত কোটি টাকা।
———-
লেখক সাংবাদিক
মোঃ ফিরোজ খান