করোনাকালে ঈদুল আযহা ও কুরবানি

নিউজ নিউজ

এডিটর

প্রকাশিত: ২:৩৮ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ৩১, ২০২০


।। ইমদাদুল হক যুবায়ের।।

প্রতিবারই বছর ঘুরে আসে পবিত্র ঈদুল আযহা। কিন্তু এবারের ঈদ অন্যবারের তুলনায় নি:সন্দেহে ব্যতিক্রম। এবারে ঈদের রঙ অনেকটাই ফ্যাকাসে। কারণ, বিশ্বজুড়ে চলছে বৈশ্বিক মহামারি করোনা সংকট। একাধিকবার বন্যার আগমন। এর সাথে যুক্ত হয়েছে দেশে কয়েকধাপে চলে আসা বন্যার্ত মানুষের কষ্টের আকুতি আর আর্তনাদ। বাংলার মানুষের জীবন কার্যত তছনছ করে দিয়েরছ আর অসংখ্য মানুষের ঘর ভেঙ্গে নিয়েছে আগত বন্যা। কেমন যাবে আমাদের এ ঈদ!!
যুলহাজ্জ মাসে ১০ তারিখে আমরা ঈদুল আযহার সালাত ও কুরবানি আদায় করি। ঈদ শব্দের অর্থ পুনরাগমণ। যে উৎসব বা পর্ব নির্ধারিত দিনে বা সময়ে প্রতি বৎসর ঘুরে ঘুরে আসে তাকে ঈদ বলা হয়। প্রতি সপ্তাহে জুমুআর দিনকে সপ্তাহিক ঈদ বলা হয়। হাদীস শরীফে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে, মহান আল্লাহ আমাদেরকে বাৎসরিক ঈদ হিসেবে দুটি দিন দিয়েছেন: ঈদুল ফিতরের দিন এবং ঈদুল আযহা দিন। (আবূ দাউদ, আস-সুনান ১/২৯৫; হাকিম, আল-মুসতাদরাক ১/৪৩৪)
ইসলাম সামাজিক আনন্দ ও উৎসবকে ইবাদত ও জনকল্যাণের সাথে সংযুক্ত করেছে। ঈদুল আযহায় প্রথমে সালাত আদায়, এরপর কুরবানি করা ও গোশত বিতরণ করা এবং এরপর আনন্দ, খেলাধুলা বা বৈধ বিনোদনের নিয়ম করা হয়েছে। যেন আমাদের আনন্দ পাশবিকতায় বা স্বার্থপরতায় পরিণত না হয়।
ঈদুল আযহার দিনে গোসল করা, যথাসাধ্য পরিস্কার ও সুন্দর পোশাক পরিধান করা, এক পথে যাওয়া ও অন্য পথে ফিরে আসা ইত্যাদি বিষয়ে আমরা জানি। ঈদুল আযহার দিনে কিছু না খেয়ে খালিপেটে সালাতুল ঈদ আদায় করতে যাওয়া সুন্নাত। সম্ভব হলে ঈদের সালাতের পরে দ্রুত কুরবানি করে কুরবানির গোশত দিয়ে “ইফতার” করা বা ঈদের দিনের পানাহার শুরু করা ভাল।
রাসূলুল্লাহ (সা.) সাধারণভাবে সূর্যোদয়ের ঘন্টাখানেকের মধ্যেই ঈদের সালাত আদায় করতেন। বিভিন্ন হাদীসের আলোকে জানা যায় যে, ঈদুল আযহার সালাত একটু তাড়াতাড়ি সূর্যোদয়ের আধাঘন্টা থেকে একঘন্টার মধ্যে আদায় করতেন। আমাদেরও সুন্নাত সময়ে সালাতুল ঈদ আদায়ের চেষ্টা করতে হবে। তবে প্রয়োজনে কিছু দেরী করা নিষিদ্ধ নয়। তবে সর্বাবস্থায় ঈদুল আযহার সালাত একটু আগে আদায়ের চেষ্টা করতে হবে, যেন কুরবানির দায়িত্ব পালন করে যথাসময়ে কুরবানির গোশত খাওয়া ও বণ্টন করা সম্ভব হয়। ঈদুল আযহার অন্যতম ইবাদত “আযহা” বা কুরবানি আদায় করা। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:
حَدَّثَنَا أَبُو عَبْدِ الرَّحْمَنِ حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ عَيَّاشٍ عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ هُرْمُزَ الْأَعْرَجِ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ وَجَدَ سَعَةً فَلَمْ يُضَحِّ فَلَا يَقْرَبَنَّ مُصَلَّانَا
“যার সাধ্য ছিল কুরবানি দেওয়ার, কিন্তু কুরবানি দিল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহে উপস্থিত না হয়।” (হাকিম, আল-মুসতাদরাক ৪/২৫৮; আলবানী, সহীহুত তারগীব ১/২৬৪)
উট, গরু বা মহিষ, ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা কুরবানি দিতে হবে। রাসূলুল্লাহ সাধারণত কাটান দেওয়া বা খাসী করা পুরুষ মেষ, ভেড়া বা দুম্বা কুরবানি দিতেন:
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ يَحْيَى حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّزَّاقِ أَنْبَأَنَا سُفْيَانُ الثَّوْرِيُّ عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مُحَمَّدِ بْنِ عَقِيلٍ عَنْ أَبِي سَلَمَةَ عَنْ عَائِشَةَ وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ إِذَا أَرَادَ أَنْ يُضَحِّيَ اشْتَرَى كَبْشَيْنِ عَظِيمَيْنِ سَمِينَيْنِ أَقْرَنَيْنِ أَمْلَحَيْنِ مَوْجُوءَيْنِ فَذَبَحَ أَحَدَهُمَا عَنْ أُمَّتِهِ لِمَنْ شَهِدَ لِلَّهِ بِالتَّوْحِيدِ وَشَهِدَ لَهُ بِالْبَلَاغِ وَذَبَحَ الْآخَرَ عَنْ مُحَمَّدٍ وَعَنْ آلِ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন কুরবানি দেওয়ার ইচ্ছা করতেন তখন দুটি বিশাল বড় আকারের যা দেখতে সুন্দর, খাসী করা বা কাটান দেওয়া পুরুষ মেষ বা ভেড়া ক্রয় করতেন। তাঁর উম্মাতের যারা তাওহীদের ও তাঁর রিসালাতের সাক্ষ্য দিয়েছে তাদের পক্ষ থেকে একটি কুরবানি করতেন এবং অন্যটি মুহাম্মাদ  ও মুহাম্মাদের পরিবারের পক্ষ থেকে কুরবানি করতেন।” (আবূ দাউদ ৩/৯৫; ইবনু মাজাহ ২/১০৪৩; আহমদ, আল-মুসনাদ ৬/২২০; হাইসামী, মাজমাউয যাওয়াইদ ৪/২১)
এছাড়া তিনি গরু ও উট কুরবানি দিয়েছেন। গরু ও উটের ক্ষেত্রে একটি পশুর মধ্যে সাত জন শরীক হওয়ার অনুমতি তিনি দিয়েছেন। তিনি স্বাস্থ্যবান ভাল পশু কুরবানি দিতে উৎসাহ দিয়েছেন। পক্ষান্তরে রোগা, অসুস্থ, খোড়া, কানা ইত্যাদি ত্রুটিযুক্ত পশু কুরবানি দিতে নিষেধ করেছেন।
কুরবানিকারী হজ্জে না যেয়েও হজ্জের কর্ম পালনের অর্জনের সুযোগ পান। এজন্যই হাজীর অনুকরণে তাকে কুরবানির আগে নখ-চুল কাটতে নিষেধ করে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:
و حَدَّثَنِي حَجَّاجُ بْنُ الشَّاعِرِ حَدَّثَنِي يَحْيَى بْنُ كَثِيرٍ الْعَنْبَرِيُّ أَبُو غَسَّانَ حَدَّثَنَا شُعْبَةُ عَنْ مَالِكِ بْنِ أَنَسٍ عَنْ عُمَرَ بْنِ مُسْلِمٍ عَنْ سَعِيدِ بْنِ الْمُسَيَّبِ عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ إِذَا رَأَيْتُمْ هِلَالَ ذِي الْحِجَّةِ وَأَرَادَ أَحَدُكُمْ أَنْ يُضَحِّيَ فَلْيُمْسِكْ عَنْ شَعْرِهِ وَأَظْفَارِهِ
“যদি তোমাদের কেউ কুরবানির নিয়্যাত করে তবে যুলহাজ্জ মাসের নতুন চাঁদ দেখার পরে সে যেন কুরবানি না দেওয়া পর্যন্ত তার চুল ও নখ স্পর্শ না করে।” (মুসলিম, আস-সহীহ ৩/১৫৬৫-১৫৬৬)
হজ্জ ও ঈদুল আযহার কুরবানি ইবরাহীম (আ.)-এর কুরবানির অনুসরণ। আজ থেকে প্রায় ৪ হাজার বৎসর পূর্বে, খ্রীস্টপূর্ব ২০০০ সালের দিকে ইরাকের “ঊর” নামক স্থানে ইবরাহীম (আ.) জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা, পরিবার, রাষ্ট্র ও সমাজের সকলের বিরোধিতা ও প্রতিরোধের মুখে তিনি তাওহীদের প্রচারে অনড় থাকেন। একপর্যায়ে তিনি ইরাক থেকে ফিলিস্তিনে হিজরত করেন। বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত তিনি নিঃসন্তান ছিলেন। ৮৬ বৎসর বয়সে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী হাজেরার গর্ভে তাঁর প্রথম পুত্র ইসমাঈল (আ.) জন্মগ্রহণ করেন। বৃদ্ধ বয়সের এ প্রিয় সন্তানকে কুরবানি করতে আল্লাহ তাঁকে নির্দেশ দেন। আল্লাহ বলেন:
فَلَمَّا بَلَغَ مَعَهُ السَّعْيَ قَالَ يَا بُنَيَّ إِنِّي أَرَى فِي الْمَنَامِ أَنِّي أَذْبَحُكَ فَانْظُرْ مَاذَا تَرَى قَالَ يَا أَبَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ سَتَجِدُنِي إِنْ شَاءَ اللَّهُ مِنَ الصَّابِرِينَ فَلَمَّا أَسْلَمَا وَتَلَّهُ لِلْجَبِينِ وَنَادَيْنَاهُ أَنْ يَا إِبْرَاهِيمُ قَدْ صَدَّقْتَ الرُّؤْيَا إِنَّا كَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ إِنَّ هَذَا لَهُوَ الْبَلَاءُ الْمُبِينُ وَفَدَيْنَاهُ بِذِبْحٍ عَظِيمٍ
“অতঃপর যখন তার ছেলে তার সাথে চলাফেরা করার মত বয়সে উপনীত হলো তখন ইবরাহীম বলল, হে প্রিয় বৎস, আমি স্বপ্নে দেখি যে, তোমাকে আমি যবেহ করছি, অতএব দেখ তোমার কি অভিমত? পুত্রটি বলল: হে আমার পিতা, আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে তা করুন। ইনশাআল্লাহ, আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন। অতঃপর যখন তারা উভয়েই আত্মসমর্পন করল এবং ইবরাহীম তার পুত্রকে কাত করে শুইয়ে দিল তখন আমি তাকে আহবান করে বললাম, হে ইবরাহীম, তুমি তো স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করেছ- স্বপ্নাদেশ পালন করেছ- এভাবেই আমি সৎকর্মশীলদের পুরস্কৃত করে থাকি। নিশ্চয় এটি সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আর আমি তাকে মুক্ত করলাম এক মহান যবেহের বিনিময়ে।” (আল কুরআন, সূরা সাফ্ফাত, আয়াত: ১০২-১০৭)
ইবরাহীম (আ.) নবী ছিলেন। এজন্য তাঁর স্বপ্ন ছিল ওহী। স্বপ্নে তিনি দেখেছেন যে, তিনি পুত্রকে কুরবানি করছেন এবং তিনি এবং তাঁর কিশোর পুত্র উভয়েই এ নির্দেশ মেনে নিয়েছেন। কিন্তু সাধারণ মানুষ কখনোই কোনোভাবে স্বপ্নের উপর নির্ভর করে শরীয়ত বিরোধী কিছু করতে পারে না।
অনেক সময় সাধারণ মানুষের অজ্ঞতার সুযোগ স্বপ্নের মাধ্যমে শয়তান মানুষকে শিরক-কুফরের মধ্যে নিপতিত করে। সে স্বপ্ন দেখায়, অমুক মাযারে বা দরগায় মানত কর, ছেলের নাক বা কান ফুড়িয়ে দাও, অমুক দেবতার নামে শিরণী দাও ইত্যাদি। এমনকি যদি কেউ রাসূলুল্লাহ (সা.) -কে স্বপ্ন দেখে এবং স্বপ্নের মধ্যে তিনি তাকে কোনো শরীয়ত বিরোধী কর্মের নির্দেশ দেন তবে সে তা করতে পারবে না। স্বপ্নে রাসূলুল্লাহ (সা.) -কে দেখলে তা সত্য; কারণ শয়তান তাঁর আকৃতি ধারণ করতে পারে না। তবে ঘুমন্ত অবস্থার শ্রবন ও দর্শন জাগ্রত অবস্থার কর্মের দলীল হবে না।
রাসূলুল্লাহ (সা.)  জাগ্রত অবস্থায় সাহাবীদের মাধ্যমে যে শরীয়ত দিয়েছেন ঘুমের মধ্যকার শ্রবণ দিয়ে তার বিরোধিতা করা যাবে না।
পিতা যখন পুত্রকে কাত করে শুইয়ে দিলেন তখনই আল্লাহ ইবরাহীম (আ.) কে বললেন, স্বপ্নাদেশ পালন করা হয়ে গিয়েছে। কারণ, এখানে মূলকথা হলো মনের কুরবানি। ইবরাহীম (আ.) ও ইসমাঈল (আ.) মন থেকে আল্লাহর আদেশ মেনে নিয়েছেন। পিতা তাঁর মন থেকে ছেলের মায়া পরিপূর্ণরূপে কুরবানি করে দিয়ে ছেলেকে জবাই করতে প্রস্তুত হয়েছেন। পুত্র তাঁর মন থেকে পিতা-মাতা ও দুনিয়ার সকল মায়া কুরবানি দিয়ে আখিরাতের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছেন। তাঁদের মনের এ কুরবানি ছিল নিখাদ। আর এজন্যই শায়িত করার সাথে সাথেই আল্লাহ জানিয়ে দিলেন যে, তার কুরবানি কবুল হয়ে গিয়েছে। আর এর বিনিময়ে আল্লাহ জান্নাতী দুম্বা দিয়ে কুরবানির ব্যবস্থা করলেন।
কুরবানির মূল বিষয় হলো উদ্দেশ্যের বিশুদ্ধতা। নিজের সম্পদের কিছু অংশ একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিলিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে কুরবানি করলেই তা প্রকৃত কুরবানি। আল্লাহ বলেন:
لَنْ يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلا دِمَاؤُهَا وَلَكِنْ يَنَالُهُ التَّقْوَى مِنْكُمْ كَذَلِكَ سَخَّرَهَا لَكُمْ لِتُكَبِّرُوا اللَّهَ عَلَى مَا هَدَاكُمْ وَبَشِّرِ الْمُحْسِنِينَ
“এগুলির অর্থাৎ কুবরানিকৃত পশুগুলির গোশত বা রক্ত আল্লাহর নিকট পৌঁছে না; বরং তোমাদের তাকওয়া তাঁর নিকট পৌঁছায়। এভাবেই তিনি এ সব পশুকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন, যাতে তোমরা আল্লাহর তাকবীর পাঠ করতে পার, এজন্য যে, তিনি তোমাদেরকে হেদায়াত করেছেন; সুতরাং তুমি সৎকর্মশীলদেরকে সুসংবাদ দাও।” (আল কুরআন, সূরা হাজ্জ, আয়াত: ৩৭)
তাহলে মূল বিষয় হলো অন্তরের তাকওয়া, আল্লাহ ভীতি, আল্লাহর কাছে সাওয়াব পাওয়ার আবেগ, আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও শাস্তি থেকে আত্মরক্ষার আগ্রহ। একমাত্র এরূপ সাওয়াবের আগ্রহ ও অসন্তুষ্টি থেকে রক্ষার আবেগ নিয়েই কুরবানি দিতে হবে। আর মনের এ আবেগ ও আগ্রহই আল্লাহ দেখেন এবং এর উপরেই পুরস্কার দেন। কুরবানি দেওয়ার পর গোশত কে কতটুকু খেল তা বড় কথা নয়।
এ কথা ঠিক যে আমরা নিজেরা ও পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়স্বজন সকলেই কুরবানির পশুর গোশত খাব। পশুটির গোশত সুন্দর হবে, মানুষ ভালোভাবে খেতে পারবে ইত্যাদি সবই চিন্তা করতে হবে। কিন্তু গোশত খাওয়ার উদ্দেশ্যে কুরবানি দিলে কুরবানিই হবে না। মূল উদ্দেশ্য হবে, আমি আল্লাহর রেযামন্দি ও নৈকট্য লাভের জন্য আমার কষ্টের সম্পদ থেকে যথাসম্ভব বেশি মূল্যের ভালো একটি পশু কুরবানি করব। কুরবানির পর এ থেকে আল্লাহর বান্দারা খাবেন। আল্লাহর বান্দা হিসেবে আমি ও আমার পরিজন কিছু খাব। আর যথাসাধ্য বেশি করে মানুষদের খাওয়াব। আল্লাহ বলেন:
لِيَشْهَدُوا مَنَافِعَ لَهُمْ وَيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ فِي أَيَّامٍ مَعْلُومَاتٍ عَلَى مَا رَزَقَهُمْ مِنْ بَهِيمَةِ الأَنْعَامِ فَكُلُوا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا الْبَائِسَ الْفَقِيرَ
“যেন তারা নিজেদের কল্যাণের স্থানসমূহে হাযির হতে পারে এবং তিনি তাদেরকে চতুষ্পদ জন্তু থেকে যে রিযক দান করেছেন তার উপর নির্দিষ্ট দিনগুলিতে আল্লাহর নাম স্মরণ করে। অতঃপর তোমরা তা থেকে খাও এবং দুস্থ-দরিদ্রদেরকে খেতে দাও।” (আল কুরআন, সূরা হাজ্জ, আয়াত:২৮)
তাহলে, দুস্থ-দরিদ্রদেরকে খাওয়ানো আগ্রহ ও উদ্দেশ্য কুরবানির অবিচ্ছেদ্য অংশ। কুরবানির গোশত তিনভাগ করে একভাগ পরিবারের, একভাগ আত্মীয়দের এবং একভাগ দরিদ্রদের প্রদানের রীতি আছে। এরূপ ভাগ করা একটি প্রাথমিক হিসাব মাত্র। যাদের সারা বৎসর গোশত কিনে খাওয়ার মত সচ্ছলতা আছে তারা চেষ্টা করবেন যথাসম্ভব বেশি পরিমান গোশত দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করতে। আর যারা কিছুটা অসচ্ছল এবং সাধারণভাবে পরিবার ও সন্তানদের গোশত কিনে খাওয়াতে পারেন না, তারা প্রয়োজনে পরিবারের জন্য বেশি পরিমান রাখতে পারেন। তবে কুরবানির আগে আমার পরিবার কি পরিমান গোশত পাবে, অথবা বাজার দর হিসেবে গোশত কিনতে হলে কত লাগত এবং কুরবানি দিয়ে আমার কি পরিমাণ সাশ্রয় হলো ইত্যাদি চিন্তা করে কুরবানি দিলে তা আর কুরবানি হবে না।
কুরবানির গোশত ঘরে রেখে দীর্ঘদিন ধরে খাওয়া বৈধ। তবে ত্যাগের অনুভূতি যেন নষ্ট না হয়। আজকাল ফ্রীজ হওয়ার কারণে অনেকেই কুরবানির গোশত রেখে দিয়ে বাজার খরচ বাচানোর চিন্তা করি। বস্তুত যথাসম্ভব বেশি পরিমাণ দান করতে এবং যথাসম্ভব বেশি দরিদ্রকে ঈদুল আযহার আনন্দে শরীক করতে চেষ্টা করতে হবে। এরপর কিছু রেখে দিলে অসুবিধা নেই।
কুরবানি দিতে হবে আল্লাহর নামে। আমরা বাংলায় বলি, অমুকের নামে কুরবানি। আমাদের উদ্দেশ্য ভাল হলেও কথাটি ভাল নয়। এক্ষেত্রে বলতে হবে, “অমুকের পক্ষ থেকে কুরবানি”। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে কুরবানি বা জবাই করা শিরক এবং এভাবে জবাইকৃত পশুর গোশত খাওয়া হারাম। উপরের আয়াতে আমরা দেখেছি যে, কুরবানির পশু জবাইয়ের সময় আল্লাহর নামের যিকর করতে নির্দেশ দিয়েছেন আল্লাহ। অন্যত্র আল্লাহ বলেন:
وَلِكُلِّ أُمَّةٍ جَعَلْنَا مَنْسَكًا لِيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ عَلَى مَا رَزَقَهُمْ مِنْ بَهِيمَةِ الأَنْعَامِ
“প্রত্যেক জাতির জন্য আমি কুরবানির নিয়ম করে দিয়েছি; এজন্য যে, আল্লাহ তাদেরকে যে সকল চতুষ্পদ জন্তু রিযক হিসেবে প্রদান করেছেন সেগুলির উপর তারা আল্লাহর নাম যিকর করতে পারে।” (আল কুরআন, সূরা হাজ্জ, আয়াত:৩৪)
কুরবানির ক্ষেত্রে মূল সুন্নাত হলো “বিসমিল্লাহ” বাক্যটি বলে আল্লাহর নাম যিকর করা। বিভিন্ন হাদীস থেকে আমরা দেখি যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) কখনো কখনো শুধু বিসমিল্লাহ বলেই কুরবানি করেছেন। এরপর তিনি কবুলিয়্যাতের দু‘আ করেছেন। সাধারণত তিনি “বিসমিল্লাহি ওয়া আল্লাহু আকবার” বলতেন। কখনো কখনো তিনি প্রথমে “ ইন্নি ওয়াজ্জাহতু ওয়াজহিয়া লিল্লাযি ফাতারাস সামাওয়াতি ওয়াল আরদা হানীফাও ওয়ামা আনা মিনাল মুশরিকীন। ইন্না সালাতী ওয়া নুসুকী ওয়া মাহইয়ায়াইয়া ওয়া মামাতী লিল্লাহি রাব্বীল আলামীন। লা শারীকা লাহু ওয়া বি যালিকা উমিরতু ওয়া আনা আউয়ালুল মুসলিমীন” বলতেন। এরপর বলতেন: বিসমিল্লাহি ওয়া আল্লাহু আকবার। এরপর তিনি কবুলের দু‘আ করে বলতেন “আল্লাহুম্মা লাকা ওয়া মিনকা”, “আল্লাহুম্মা ‘আন মুহাম্মাদিন ওয়া আলি মুহাম্মাদ”, অথবা “আল্লাহুম্মা তাকাব্বাল মিন মুহাম্মাদিন ওয়া আলি মুহাম্মাদিন ওয়া উম্মাতি মুহাম্মাদিন” “আল্লাহ আপনারই জন্য এবং আপনার পক্ষ থেকে।” “হে আল্লাহ, মুহাম্মাদ ও মুহাম্মাদের পরিবারের পক্ষ থেকে”, “হে আল্লাহ আপনি কবুল করুন এ কুবরানী মুহাম্মাদের পক্ষ থেকে, মুহাম্মাদের পরিবারের পক্ষ থেকে ও মুহাম্মাদের উম্মাতের পক্ষ থেকে।”
আমাদের ফকীহগণ উল্লেখ করেছেন যে, কবুলের দু‘আ গুলি জবাইয়ের আগে বা পরে বলতে হবে, যেন, জবাইয়ের সময় আল্লাহ ছাড়া কারো নাম মুখে উচ্চারণ করা না হয়।
আমাদের দেশের মুসলিমদের মধ্যে যত দলাদলি মারামারি তার মূল কারণ হলো, ইবাদত বন্দেগি পালনের ক্ষেত্রে সুন্নাতের বিষয়ে গুরুত্ব না দেওয়া। আমরা যদি প্রতিটি ইবাদত পালনের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (সা.)  ও সাহাবীগণের পদ্ধতি হুবহু অনুসরণ করতে চেষ্টা করতাম এবং সুন্নাতের অতিরিক্ত কর্ম বা পদ্ধতিকে ইবাদতের অংশ না মনে করতাম তাহলে আমাদের অধিকাংশ বিবাদ নিরসন হতো, আমরা সুন্নাত পালনের অফুরন্ত সাওয়াব পেতাম এবং পারস্পরিক ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্বের সাওয়াবও পেতাম।
আলোচনায় প্রান্তটিকায় এসে বলতে পারি যে, ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর পবিত্র ঈদুল আযহা মহান আল্লাহর প্রতি অপরিসীম আনুগত্যের অনুপম নিদর্শন। মহান আল্লাহর নির্দেশে হযরত ইবরাহীম (আ.) প্রাণপ্রিয় পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.) কে কুরবানি করতে উদ্যত হয়ে আল্লাহর প্রতি যে আনুগত্য ও ভক্তি প্রদর্শন করেছেন তা অতুলনীয়, সমগ্র বিশ্ববাসীর কাছে এ ত্যাগ চিরসমুজ্জ্বল ও অনুকরণীয় হয়ে থাকবে।
ঈদ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে গড়ে তোলে সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও ঐক্যের বন্ধন। এবার ঈদুল আযহা এমন একটি সময়ে সমাগত যখন বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত সমগ্র বিশ্বের মানবসমাজ। আমাদের পরিবার-পরিজন বন্ধু-বান্ধব পরিচিতজন অনেকেই আক্রান্ত। আমরা অনেকেই করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত আপনজনকে হারিয়েছি। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন ঘরবন্দি থেকে মানুষের জীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিসহ। এমনই সময় ঈদ এসেছে আনন্দের বার্তা নিয়ে। তাই জনসমাগম এড়িয়ে সচেতনতার সঙ্গে ঘরে থেকেই ঈদুল আযহা ও কুরবানি উদযাপন করতে হবে।
ত্যাগের মহিমায় মহিমান্বিত প্রতি বছর ঈদুল আযহা আমাদের মাঝে ফিরে আসে। স্বার্থপরতা পরিহার করে মানবতার কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করা কোরবানির প্রধান শিক্ষা। হিংসা-বিদ্বেষ, লোভ-ক্রোধকে পরিহার করে সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় আত্মনিবেদিত হওয়া আমাদের কর্তব্য। কোরবানির যে মূল শিক্ষা তা ব্যক্তি জীবনে প্রতিফলিত করে মানব কল্যাণে ব্রতী হওয়ার মাধ্যমে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভ সম্ভব।
কোরবানির মর্ম অনুধাবন করে সমাজে শান্তি, সৌহার্দ্য ও কল্যাণের পথ রচনা করতে আমাদের সংযম ও ত্যাগ স্বীকারের মানসিকতায় উজ্জীবিত হতে হবে। ত্যাগের মনোভাবকে প্রসারিত করতে হবে আমাদের কর্ম ও চিন্তায়। এই উৎসবের মধ্য দিয়ে সামর্থ্যবান মুসলমানগণ কুরবানিকৃত পশুর গোশত আত্মীয় ও প্রতিবেশীদের মধ্যে বিলিয়ে দিয়ে প্রকারান্তরে সকলের মধ্যে সমতা প্রতিবিধান এবং সহমর্মিতা অনুশীলন করতে হবে।
ঈদ বয়ে আনুক মুসলমানদের জীবনে অনাবিল আনন্দ। ঈদের উৎসবে মুসলিম উম্মাহ শোষণ ও বঞ্চনামুক্ত বিশ্ব গড়ার দৃঢ় প্রত্যয় গ্রহণ করুক। ঈদের আনন্দকে ভাগাভাগি করতে দেশের দুঃস্থ, দরিদ্র ও সঙ্গতিহীন মানুষের প্রতি ভ্রাতৃত্ব ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়ে সমাজের বিত্তবান মানুষরা ঈদের আনন্দকে সকলের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে।
ঈদ হাসতে শিখায়, ঈদ ভালোবাসতে শিখায়, ত্যাগের মহিমা শেখায়, ঈদুল আযহা আমাদের শুধু আনন্দই দেয়না, মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ও অনৈক্য ভুলে গিয়ে পরস্পরকে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ বন্ধনে আবদ্ধ করে এবং সামাজিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করে। পবিত্র ঈদুল আযহার মহান আদর্শ ও শিক্ষাকে আমাদের চিন্তা ও কর্মে প্রতিফলন করতে হবে।
ঈদুল আযহার মহিমান্বিত আহ্বানে শান্তি-সুধায় ভরে উঠুক বিশ্ব সমাজ। দেশপ্রেম আর মানবতাবোধের বহ্নিশিখায় জেগে উঠুক প্রতিটি মানব হৃদয়।
আসুন, আমরা সকলে পবিত্র ঈদুল আযহার মর্মবাণী অন্তরে ধারণ করে নিজ নিজ অবস্থান থেকে জনকল্যাণমুখী কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়ে বিভেদ-বৈষম্যহীন সুখী, সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ে তুলি। সমাজের ধনী-গরিব, ধর্ম-বর্ণ-গোত্র, জাতি-গোষ্ঠী-সম্প্রদায় নির্বিশেষে সবাই পারস্পারিক সহযোগিতা ও সহর্মিমতার মধ্য দিয়ে পবিত্র ঈদুল আযহার খুশি ভাগাভাগি করে নিই। পরম করুণাময় আল্লাহ তায়ালার কাছে প্রার্থনা করি- মানুষের জীবন থেকে তথা বিশ্ব থেকে দূরীভূত হোক সব মহামারি, দুঃখ-জরা, সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধির ধারায় প্রবাহিত হোক বিশ্বলোক।
আল্লাহ আমাদেরকে তাওফীক দিন। আমীন।

Advertisement

লেখক:
প্রাবন্ধিক ও গবেষক
শিক্ষক,
জালালাবাদ ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ, সিলেট।
মোবাইল: 01712374650
ইমেইল: zubairjcpsc@gmail.com
Website: www.bdzubair.info
twitter: https://twitter.com/ImdadulZ
facebook: Imdadul Haque Zubair
Facebook Page: ইমদাদুল হক যুবায়ের