কভিড-১৯ঃ জনসচেতনতা ও করুণ অভিজ্ঞতা

নিউজ নিউজ

এডিটর

প্রকাশিত: ১:০৩ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ২৯, ২০২০

————————-
আমি গত ৮.৭.২০ তারিখে করোনা সাসপেক্ট হিসেবে একটা পোস্ট দিয়েছিলাম যে কিভাবে ঘরে বসে ও করোনা আক্রান্ত কিন্তু আজ এর করুণ কষ্টের অভিজ্ঞতা আপনাদের সাথে শেয়ার করবো।

Advertisement

ঘটনা ১-

৪.৭.২০২০ তারিখে জ্বর, পাতলা পায়খানা ও-বুকের ব্যাথা শুরু হলো, ডক্টর এর পরামর্শে ঔষধ শুরু করলাম যদিও প্রেসকেরাইব কোন ট্রিটমেন্ট না বাংলাদেশে প্রচলিত চিকিৎসা ব্যবস্থা।এর সাথে গরম পানির ভাপ নেওয়া, গরম পানি খাওয়া, গরগর করা,গরম পানি দিয়ে গোসল, ওযু সব চলছিল সাথে মসলা চা,রসুন পানি,মধুপানি,ইসবগুলের ভুসি, লেবু ভিটামিন সি জাতীয় খাবার ফল,সব স্বাভাবিক নিয়মে চলছিলো কিন্তু ঘটনা ঘটলো ১০ তম দিন ১৪.৭.২০ তারিখে, রাত তখন ১২.৩০ টা

(ঘটনা ২):

রাত ১২.৩০ টা আমি স্বাভাবিক নিয়মে ঘুমাতে গেলাম কিন্তু জীবনের দুর্বিষহ রাতের মুখোমুখি হলাম হঠাৎ দেখি শরীর একদম নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে আমি আমার স্বামী কে বললাম আমার এতো খারাপ লাগছে কেন একটু অক্সিজেন লেভেল টা দেখতো। আমার অক্সিজেন লেভেল দেখে তো চোখ ছানাবড়া লেভেল ৯০ এর নীচে মানে ৮৫, যা ডক্টরের ভাষ্যমতে অসম্ভব। এরপর আমার এই কঠিন সময়ের সহযোদ্ধা আমার স্বামী যে আমার আইসোলেশনে সার্বক্ষণিক আমার সাথে ছিলো আমার দেখাশোনা করার জন্য। যদিও নিজের জন্য আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা ছিলো ১০০ ভাগ তবুও বিপদে আমাকে ছেড়ে যায়নি। আসল কথায় আসি এরপর প্রেশার মাপতে বললাম দেখি ৯০/৫২, তখন বললাম ডায়াবেটিস দেখো দেখি ৩.৫। আমিতো বুঝতে পারলাম করোনা আমাকে আর বাঁচতে দিলো না কিন্তু নিজের মনোবল কোন ভাবে ই নষ্ট না করে praun করলাম যা করোনা রুগীর জন্য অত্যাবশ্যক।আর স্বামীকে বললাম তুমি শুধু আমার কথা শোনো।গরম পানির হট ওয়াটার ব্যাগ দিয়ে গরম পানির থেরাপি শুরু করলাম। বুকে প্রচন্ড ব্যাথা আমার স্বামী তো এম্বুলেন্স ফোন, হাসপাতালে খবর নেওয়া শুরু করলো। আমি জেদ ধরলাম আমি হাসপাতালে যাবো না আমার কেন যেন মনে হচ্ছিল বাংলাদেশে এবং বিশ্বে করোনা রোগীদের চিকিৎসা না দিয়ে মেরে ফেলছে যার ঘটনা ও আপনাদের সাথে শেয়ার করবো। এরপর শুরু করলাম খেজুর খাওয়া দেখি গ্লুকোজ লেভেল একটুবাড়লো তখন আমার কনফিডেন্স লেভেল বাড়তে থাকলো ৮৮ হলো আমি তো praun অবসথায় আছি এরপর খেলাম চিনি লবন দিয়ে শরবত, এরপর স্যালাইন, এরপর ভাত দেখি আরও ইমপ্রুভমেন্ট। তখন ভোর ৫.৩০ টা পর্যন্ত মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করে গ্লুকোজ লেভেল ৯২ হলো।তখন একটু ক্লান্তিতে দুজনের চোখ বুজে এলো।

(ঘটনা ৩):

১৫.৭.২০ আগের দিনের রীতি মতো যুদ্ধ জয় করা দুজন শরীর প্রচন্ড দুর্বল সারাদিন স্বাভাবিক নিয়মে চলছিলো এরপর রাত ১০ টা হঠাৎ মাথা ঘুরানো ও বমি শুরু হলো আবার একই রকম হলো এবার প্রেশার বেশি ১৫৯/১১০, ডক্টরের সাথে হোয়াটস এপে সারবখনিক পরামর্শ চলছিলো। এভাবে আবার রাত পার করলাম তবে এবার অক্সিজেন লেভেল ৯৩ ছিলো। সেদিন ও নতুন জীবন পেলাম।

(ঘটনা ৪):

স্কয়ার হাসপাতাল ১৯.৭.২০ তারিখে সারাদিন ভালো ছিলাম রাতে আনুমানিক ৮.৩০ মিনিটে হঠাৎ করে মাথা ঘুরে বমি করতে শুরু করলাম তখন প্রেশার ১৭০/১২০. আমি এই প্রথম ভয় পেলাম মনোবল হারিয়ে ফেললাম তবুও হাল ছারিনি তখন দ্রুত তেঁতুলের শরবত,মাথায় অনবরত পানি ঢালা শুরু করলাম এবং আইস মাথায় দিয়ে রাখলাম ১০.৩০ নাগাদ প্রেশার তখন ১৫৯/১১২. তখন আমার স্বামীকে বললাম আমি আর পারলাম না এম্বুলেন্স ডাকো কিছু খনের মধ্যে স্কয়ার হাসপাতালে গেলাম কিন্তু সেখানে আরেক বিপত্তি ঘটলো করোনা পজিটিভ পেশেন্ট শুনে আমাকে বিদায় করে দিচ্ছে, বলছে বেড ফাঁকা নেই আসলে ঘটনা কিন্তু তার উল্টো এটা পরে জানতে পারলাম। তখন এক ডক্টর এর রেফারেন্স নিয়ে কোনমতে ইমারজেন্সি তে নিয়ে গেল কিন্তু কোন চিকিৎসা শুরু করলোনা। এরপর আমাকে আইসোলেশন ইউনিটে নিয়ে গেলো সেখানে অক্সিজেন লেভেল ও প্রেশার দেখে ফেলে রাখলো। আমি আমার আমার স্বামীকে বললাম তুমি ডক্টর কে ডাকো আমি কথা বলবো ডক্টর উনি নিজে করোনা আক্রান্ত সে আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনে আমার ইসিজি আর কিছু রক্ত পরীক্ষা করলো তার রিপোর্ট আসলো রাত দুটোয় তখন রিপোর্ট দেখে ডক্টর আমাকে হাসপাতালে ভর্তির বিষয়ে ডিসকারেজ করলো আর বললো আপনার এখন ১৮ তম দিন আপনি করোনা থেকে প্রায় শংকা মুক্ত, এখানে থাকলে আপনার জন্য খারাপ হবে। রাত ২.৩০ মিনিটে আমাকে ইমারজেন্সি থেকে কোনরকম চিকিৎসা না দিয়ে ফেরত দিলো ফেরার পথে আমি আমার স্বামীকে বললাম আমি কেন হাসপাতালে আসতে চাই নি তার প্রমান কি পেয়েছো।এই হচ্ছে আমাদের চিকিৎসা ব্যাবস্থা পরে হাসপাতালের খবর নিয়ে জানা গেলো যদি কোন পেশেন্ট আসে তার টেস্ট হাসপাতালে করে যদি করোনা পজিটিভ হয় তবে তারা চিকিৎসা দিচ্ছে আইসিইউতে নিচ্ছে।কিন্তু আমার মতো মাঝপথে করোনা পেশেন্ট তাদের চিকিৎসার আওতাভুক্ত না।অথচ তারা বাংলাদেশ তার এক নাম্বার বেসরকারি হাসপাতালের দাবিদার।

(ঘটনা ৫) :

এবার চেষ্টা সম্পুর্ন নিজের আমার যা সামর্থ্য ছিলো সব জীবনীশক্তি দিয়ে আল্লাহ র উপর ভরসা করে অনলাইন ডক্টর সেবা নিয়ে গতকাল নেগেটিভ রেজাল্ট এসেছে। যদিও আমার শরীরের তেমন কোন উন্নতি হয়নি। আমার এতো বড় লেখার কারন একটাই আমি যেমন কষ্ট পেয়েছি আর কেউ যেন না পায়।সবাই যেন করোনা কে অবহেলা না করে আমার জানামতে যারা আমার মতো নানারোগে আক্রান্ত তাদের করোনা ভীষণ কষ্ট দিয়েছে। শুধু বলবো বাঁচা মরার লড়াই। আশাকরি আমার লেখাটি পড়ে সবাই সচেতন থাকবেন এবং নিজের জন্য ও পরিবারের মানুষ গুলোর জন্য বেঁচে থাকা খুব জরুরি। সবশেষে আল্লাহকে ধন্যবাদ দেই ও কোটি কোটি শুকরিয়া জানাই নতুন জীবন দান করার জন্য। হয়তো আমার কাচা হাতের লেখা পড়ে অনেকে কিছু মনে করতে পারেন কিন্তু আমার একটাই উদ্দেশ্য সচেতনতা তৈরি করা। হয়তো আমার চেয়ে আর ও কারো আরও কঠিন সময় পার করতে হয়েছে আমি আমার জায়গা থেকে আমার করুন অভিজ্ঞতা শেয়ার করলাম। আমাকে বেঁচে থাকার জন্য কিছু জিনিস সংগ্রহ করতে হয়েছে ইন্ডাক্সন চুলা,ইলেকট্রনিক কেতলি,অকসিমিটার,ব্লাড প্রেশার মেশিন আরও কতো কি। আমার একটা জিনিস লাগে নি সেটা নেবু লাই জার মেশিন। অনেক অনেক ধন্যবাদ আল্লাহ কে অবশেষে ২৬.৭.২০ তারিখে নেগেটিভ রিপোর্ট আসলো। যদিও শরীরের অবস্থার পরিবর্তন ঘটে নি তবুও মানসিক সস্তি। দোয়া করি সবাই সুস্থ থাকুক।

————-

রুনা লায়লা,
সহকারী অধ্যাপক,
প্রাণিবিদ্যা বিভাগ,
ঢাকা কলেজ, ঢাকা।