ঢাকা১৮ই মে, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

একজন শিশুর স্মৃতিতে মুক্তিযুদ্ধ।

প্রতিবেদক
নিউজ ভিশন

মার্চ ১০, ২০২১ ১:০৬ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

মোহাম্মদ মন্‌জুরুল আলম চৌধুরী।

( প্রথম )

১৯৭০ সাল আমি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির রোসাংগিরি আরবানিয়া প্রাইমারী স্কুলের চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র। ভোটের হাওয়ায় উত্তাল দেশ এবং দেশের মানুষ ভোটযুদ্ধে আন্দোলিত, উদ্বেলিত। সারা দেশ প্রচার প্রচারণায় সরগরম। আমার বাবা, চাচারা, ভাইয়েরা এবং বাড়ীর ছোটবড় সবাই ভোট নিয়ে ব্যস্ত। বড়দের পাশাপাশি আমার উৎসাহের যেন কোন কমতি নেই। অনেক মিছিল মিটিংয়ে আমিও সবার সঙ্গে যোগ দিয়েছিলাম। আমাদের এলাকার এম পি পদে লড়েছিলেন মীর্জা আবু মনসুর এবং ফটিকছড়ি এবং মিরেরশ্বরাই এলাকা থেকে এম এন এ পদে ফজলুল হক বিএসসি। ভোটের তারিখ, মাস আমার এখন আর মনে নেই। তবে ভোটের দিন আমার বাবারা আমাদের পরিবারের সকল ভোটার এবং এলাকার পর্দানশীন মা-বোনদের নিয়ে একটা বিরাট নৌকায় চড়ে রোসাংগিরি হাই স্কুলের ভোট কেন্দ্রে অনেক উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে ভোট দিতে গিয়েছিলেন। এবং সঙ্গে আমিও ছিলাম। আমার মেঝদাদা জনাব মোহাম্মদ শহীদুল আলম চৌধুরী (বেবি) শহর থেকে অনেকগুলি পোস্টার নিয়ে গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর, ভোটের এবং পূর্ব বাংলা শ্মশান কেন ইত্যাদি। পূর্ব বাংলা শ্মশান কেন ? ছোট বড় সকল মানুষের মনে সেই পোস্টারটা খুব দাগ কেটেছিল তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান আর পূর্ব বাংলা তথা বাংলাদেশের মধ্যে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিষপত্রের দামের বিশাল হেরফের দেখে। ১২ হাজার মাইলের তফাতের দুই পাকিস্তানের মধ্যে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে দ্রব্য মূল্য ছিল পশ্চিমের চেয়ে অনেক বেশী যা মানুষের মনে ক্ষোভ, ঘৃণা এবং দুঃখের সঞ্চার করে। একদিন বিকালে রোসাংগিরি হাইস্কুলের বিরাট মাঠে ছিল নির্বাচনী মিটিং। তবে কোন মঞ্চ ছিল না। সারিবদ্ধভাবে চেয়ারে উপবিষ্ট ছিলেন স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং আওয়ামী লীগের নৌকা মার্কা প্রতীকের প্রার্থী জনাব মীর্জা মনসুর। এবং আমার বাবারা তিন ভাই ( আমার মেঝবাবা মরহুম আব্দুল লতিফ চৌধুরী ছিলেন অবিভক্ত ১৩ নম্বর রোসাংগিরি ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান)ও বসেছিলেন অন্যান্য গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের সাথে। আর শ্রোতারা সবুজ ঘাসে সারিবদ্ধভাবে বসে খুব ধৈর্য সহকারে পাকিস্তানীদের অন্যায় জুলুমের কথা শুনছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আন্দোলন সংগ্রাম কারাবরণের বিভিন্ন ঘটনার কথা শুনছিলেন। বিরাট মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় আমিও সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের একজন ক্ষুদে দর্শক ছিলাম। বলা যায় ইতিহাসেরও সাক্ষী। আরেকদিন রাতে সমিতির হাট বাজারে মিটিং ছিল। বড়দের সঙ্গে আমিও গিয়েছিলাম। সেখানে মীর্জা মনসুরের পিতা শিল্পপতি মীর্জা আবু বক্তৃত্বা দিয়েছিলেন। ভোটের একদিন কি দুইদিন আগে এক বিরাট মিছিল বের হয় যা ছিল কয়েক মাইল লম্বা এটি পুরো রোসাংগিরি ইয়নিয়ন প্রদক্ষিণ করে। সেই মিছিলে কয়েকজন মানুষের কাঁধে ছিল মাইক। মাইকে জয় বাংলা, আমার নেতা তোমার নেতা শেখ মুজিব শেখ মুজিব সহ বিভিন্ন স্লোগানে স্লোগানে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হয়ে উঠেছিল। আমি নিজেও জানিনা আমি সেই ছোট্ট শিশুটি কত মাইল পায়ে হেটেছি।

১৯৭১ সাল আমি গ্রাম ছেড়ে লেখাপড়ার জন্য শহরে আসি আমার বড় ভাই মোহাম্মদ ফরিদুল আলম চৌধুরীর ভাড়া বাসায়। সেটি ছিল দেওয়ান বাজার সিএন্ডবি কলোনীর সামনে বশর বিল্ডিং। আমার চাচারা গুরা মিয়া চৌধুরী লেইনে অবস্থিত শহরে আমাদের পৈত্রিক বাসায় বসবাস করতেন। শহরে এসে আবারো আমাকে সেই চতুর্থ শ্রেণীতেই ভর্তি করিয়ে দেন আমার সেঝ ভাই মরহুম আকতারুল আলম চৌধুরী (বাবু)। তিনিও ঐ স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র ছিলেন। ১৯৭১ সালে তিনি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজের একাদশ/দাদ্বশ বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ছিলেন। ১৯৭১ সাল ছিল এদেশের ইতিহাসের জাতীয় রাজনীতির আন্দোলন আর সংগ্রামের সর্বপোরি বাংলাদেশের রক্তক্ষয়ী নয় মাসের মহান মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনসহ একটি ঘটনাবহুল ঐতিহাসিক বছর। বঙ্গবন্ধুর ৭মার্চের ভাষণের মাধ্যমে দেশে শুরু হয় পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলন সহ নানানমুখী মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি। অসহযোগ আন্দোলনের কারণে স্কুল বন্ধ হয়ে গেলে আমি বাবা মায়ের কাছে গ্রামে চলে যাই। আমাদের বাড়ির নাম হচ্ছে, আরবান আলী সওদাগর বাড়ী, পূর্ব ধলই, হালদার কুল, ১৩ নম্বর রোসাংগিরি ইউনিয়ন, থানা- ফটিকছড়ি চট্টগ্রাম। স্বাধীনতার পর সাবেক রোসাংগিরি ইউনিয়ন ২টি ইউনিয়নে বিভক্ত হয়। একটি আগের ১৩ নম্বর রোসাংগিরি আরেকটি ১৯ নম্বর সমিতির হাট ইউনিয়ন। বর্তমানে আমরা সমিতির হাট ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালো রাতে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী অপারেশন সার্চ লাইট নামক তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ঘুমন্ত, নিরীহ, নিরস্ত্র মানুষের ওপর পৃথিবীর সবচেয়ে জঘন্য, বর্বর, নিষ্ঠুর, পৈশাচিক এবং মানবতা বিরোধী হামলা ও হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। ২৬ মার্চ সকাল থেকেই চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট থেকে বিভিন্ন ধরণের অস্ত্রের গুলির আওয়াজ আমরা গ্রাম থেকে শুনতে পাই। তখন সারাদেশে কি হচ্ছে তার খবর পাওয়া ছিল অনেক কষ্টকর, দুরূহ, দুঃসাধ্য ব্যাপার। টেলিগ্রাম ছাড়া টেলিফোন বা ট্র্যাঙ্ককলের খুব একটা ব্যবস্থা বা ব্যবহার ছিলনা। ২৬ ও ২৭ মার্চ গ্রামের মুরুব্বী, যুবক কিশোরদের পাশাপাশি আমরা অনেক শিশু বিভিন্ন ঘরে ঘরে গিয়ে চাল ডাল তরি-তরকারি সংগ্রহ করতে থাকি ক্যান্টমেন্টে বাঙালি সেনা, পুলিশ, ইপির সহ বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যদের জন্য। ইতোমধ্যে শহর থেকে আমাদের ভাই চাচারা সহ অনেক আত্মীয় স্বজন ফুফুরা গ্রামের বাড়িতে আশ্রয় নিতে ছুটে আসে। হালদা নদী ছিল তখন খুব খরস্রোতা একটি নদী। শহর থেকে বিভিন্ন পণ্য সামগ্রী তখন হালদা নদী দিয়ে বিরাট বিরাট নৌকার মাধ্যমে আনা নেয়া হতো। এবং এই নদী দিয়ে বিভিন্ন ছোট বড় নৌকার মাধ্যমে হিন্দু মুসলিম পরিবারগুলো শহর থেকে নিজেদের গ্রামে বা ভারতে আশ্রয় নেয়ার জন্য ছুটে যেতে থাকে। আমাদের এলাকার এবং পরিবারের লোকজন অনেক নৌকা থামিয়ে তাঁদের অনেককেই মুড়ি, চিড়া, গুড়, আবার অনেকেই ভাত খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিচ্ছিলেন। এরই মধ্যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক, ছাত্র আমাদের বাড়িতে রাত যাপন এবং খাওয়া দাওয়া শেষ করে দিনে ফটিকছড়ির খিরাম সহ বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করতে থাকেন। তাঁদের মধ্য আমাদের আত্মীয় কবি ও লেখক শওকত হাফিজ খান রুশনী এবং তার ছোট ভাই ফেরদৌস হাফিজ খান রুমু (সি এন্ড সি, স্পেশাল / হাটহাজারী) ভাইয়ের ভার্সিটির বন্ধুরা সহ অনেকেই সীমান্ত পাড়ি দেয়ার সময় আমাদের বাড়িতে রাত্রি যাপন করেছেন।