একজন ক্ষণজন্মা মনিষী

নিউজ নিউজ

এডিটর

প্রকাশিত: ৩:০৭ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২০

মুহাম্মদ শামসুল ইসলাম সাদিক
আধ্যাত্নিক রাজধানী সিলেটের মুকুটহীন সম্রাট শাহজালাল রহ: ও ৩৬০ আউলিয়ার স্মৃতিধন্য ভূমিতে এবং ইসলামিক চিন্তা-চেতনার প্রচার প্রসারে খ্যাতিমান প্রাণপুরুষ আল্লামা ফুলতলী রহ:-এর অন্যতম খলিফা, জালালপুর জালালিয়া কামিল মাদরাসার সাবেক অধ্যক্ষ, সিলেটের প্রখ্যাত আলেমেদ্বীন অধ্যক্ষ মাওলানা শুয়াইবুর রহমান বালাউটি রহ: এক জীবন্ত ইতিহাস, গেীরবের কিংবদন্তি। সত্য-ন্যায় এবং আহলে সুন্নাতওয়াল জামাতের জন্য তিনি আজীবন সংগ্রাম ও পাশাপাশি জ্ঞানের আলো বিতরণে নিরলস চেষ্টা করেছেন। দার্শনিক বাট্রান্ড রাসেল একটি ভালো জীবন বলতে জ্ঞানের দ্বারা পরিচালিত জীবনকেই বুঝিয়েছেন। অধ্যক্ষ বালাউটি রহ: তাঁর সমগ্র জীবন প্রবাহে জ্ঞানের প্রচার-প্রসার এবং সত্য সুন্দরের বহি:প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন। অধ্যক্ষ বালাউটি রহ: আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর চিন্তায় ও বিশ্বাসে অনিন্দ্য সুন্দর উপাসনা ্্আর বলিষ্ঠ ও প্রখর ব্যক্তিত্বের গুণাবলী সবার মাঝে ছড়িয়ে আছে তাঁর জীবনের বিভিন্ন গুণাবলি আমাদেরকে সঠিক পথ চলতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। তিনি একজন যুগ শ্রেষ্ঠ খ্যাতিমান আলেম। তাঁর আপাদমস্তক ছিল রাসুল সা:-এর আদর্শে উদ্ভাসিত বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী। তিনি ছিলেন জালিম ও রাসুল সা:-এর শক্রদের বিরুদ্ধে সোচ্চার। তাগুতের বিরুদ্ধে তাঁর সময়োপযোগী এবং সাহসী কন্ঠ ছিল ধারালো তরবারির চেয়েও কঠোর। রাসুল সা:-এর আদর্শে অনুপ্রাণিত এ মহান ব্যক্তির মাঝে ছিল প্রেম, প্রীতি, স্নেহের ও ভালোবাসার মধুর সুর, অনাচার নির্যাতনের এবং সকল বাতিলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের প্রতীক। অধ্যক্ষ বালাউটি রহ: ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক, সামাজিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও আধ্যাত্মিক জীবনসহ সকল পর্যায়েই ছিলেন এক আদর্শের প্রতিকৃতি। তাঁর আদর্শের কারণে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলের হৃদয়ে স্বতন্ত্র আসন করে নিয়েছিলেন।
অধ্যক্ষ বালাউটি রহ: ১৯৪৩ সালে ১৫ মে সিলেট জেলাধীন জকিগঞ্জ উপজেলাস্থ ৩নং কাজলসার ইউনিয়নে বালাউট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মো. রছমান আলী মাতা জয়নব বিবি। প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন পিতা-মাতার কাছে। প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করার পর তাঁর মুরশিদ আল্লামা ফুলতলী রহ: তাঁকে সড়কের বাজার জয়পুর গ্রামের কুতুব আলীর বাড়িতে লজিং করে দিয়ে বললেন, ‘এই ছেলেকে তোমার দায়িত্বে দিয়ে দিলাম। তুমি মাদরাসাতে ভর্তি করে দেবে’। ১৯৪৭ সালে অধ্যক্ষ বালাউটি রহ: সড়কের বাজার আলিয়া মাদরাসায় ভর্তি হন। ১৯৪৯ সালে বাড়ির নিকটস্থ হাড়িকান্দি মাদরাসায় ভর্তি হয়ে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন। অত:পর ইছামতি দারুল উলূম কামিল (এম.এ) মাদরাসা থেকে ১৯৫৬ সালে দাখিল, ১৯৫৮ সালে আলিম পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। উক্ত মাদরাসা থেকে ১৯৬০ সালে ফাজিল পাশ করে ভর্তি হন সিলেটের অন্যতম বিদ্যাপীঠ ‘সিলেট সরকারি আলিয়া মাদরাসায়’ এবং ১৯৬২ সালে কৃতিত্বের সাথে কামিলও উত্তীর্ণ হন। ১৯৬০ সালে ছাত্রাবস্থায়ই কর্মজীবন সূচনা করেন বাদেদেওরাইল ফুলতলী কামিল (এম.এ) মাদরাসায় খন্ডকালীন সহকারী শিক্ষক হিসেবে। ১৯৬২ সালে উক্ত প্রতিষ্ঠানেই প্রধান শিক্ষক হিসাবে যোগদান করে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৬ সাল থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত আটগ্রাম আমজদিয়া মাদরাসায় প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮২ সাল থেকে সিলেট দক্ষিণ সুরমা উপজেলাস্থ জালালপুর জালালিয়া কামিল মাদরাসায় অধ্যক্ষ পদে দায়িত্ব পালন করে ২০০৮ সালে অবসর গ্রহণ করেন। তিনি ১৯৯০ সালে সিলেট জেলা শিক্ষা সপ্তাহে শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান প্রধান এবং ১৯৯৩ সালে জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমী আয়োজিত প্রশিক্ষণে ‘শ্রেষ্ঠ অধ্যক্ষ’ সম্মানে ভূষিত হন।
অধ্যক্ষ বালাউটি রহ: উপমহাদেশের প্রখ্যাত বুজুর্গ, আল্লামা ফুলতলী রহ:-এর কাছ থেকে ১৯৬৭ সালে ইলমে কেরাতের সনদ ও ১৯৭১ সালে আধ্যাত্মিক সাধনার সনদ লাভ করেন। আল্লামা ফুলতলী রহ:-এর কাছে বায়আত হওয়া গঠনা নিজেই বর্ণনা করেণ- ‘আল্লামা ফুলতলী রহ:-এর কাছে বায়আতের পূর্বে আমি শাহ ইয়াকুব বদরপুরী রহ:- এর কাছে বায়আত ছিলাম। শাহ ইয়াকুব বদরপুরী রহ:-এর ইন্তেকালের পূর্বে একটি ঘটনা আমার অন্ত:চক্ষু খুলে যায়। ঘটনাটি আল্লামা ফুলতলী রহ:-এর অন্যতম কারামত ও তিনি যে কামিল ওলী এ বিষয়ে আমার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মায়। আমি মাধ্যমিক শিক্ষায় অধ্যয়নরত অবস্থায় বেশি সংখ্যক ফুলতলী মসলক ছাড়া উস্তাদের কাছে থেকে জ্ঞান অর্জন করার কারণে আল্লামা ফুলতলী রহ:-এর প্রতি বিরূপ মনোভাবের সৃষ্টি হয়েছিল। দেওয়ানচক গ্রামে লজিং থাকাকালে গ্রামের মসজিদের ইমাম মরহুম আবদুছ ছবুর সাহেব রমজানে একাকী ইতিকাফে বসতে সম্মত না হওয়ায় গ্রামবাসীর অনুরোধে আমিও তাঁর সাথে শামিল হই। ইতিকাফরত একদিন সকালে আমি ‘নূরুল আনওয়ার’ কিতাব পড়ছি এবং তিনি কুরআন শরীফ পড়ছেন, এমতাবস্থায় কথা প্রসঙ্গে তিনি আল্লামা ফুলতলী রহ:-এর কথা উল্লেখ করলে আমি বললাম, উনি একজন বেদাতী পীর, উনার কথা এখানে আলোচনা করা ঠিক নয়। তিনি অত্যন্ত আশ্চার্যান্বিত হয়ে আর্তনাদের সুরে বললেন, আরে উনার কথা এভাবে বলো না, তিনি একজন কামিল ওলী। উল্লেখ্য, ইমাম সাহেব শাহ ইয়াকুব বদরপুরী রহ:-এর মুরীদ ছিলেন। আমাদের আলোচনার এক পর্যায়ে সম্পূর্ণ অকল্পিতভাবে আমরা দু‘জন ঘুমিয়ে পড়ি। অথচ আমার কিতাব এবং উনার কুরআন তখনো খোলা অবস্থায় ছিল। এটা ঘুম না অজ্ঞান হওয়া আমরা দু‘জনের একজন বুঝতে পারিনি। আমি স্বপ্নে দেখলাম, একটি অনাবাদী বাড়ির পুকুরপাড়ে হাতলবিহীন নতুন চেয়ারে আল্লামা ফুলতলী রহ: উত্তরমুখী হয়ে বসে আছেন। তাঁর সামনে একটি মাটির স্তুপ। আমার ধারণা হচ্ছে স্তুপের নীচে একটি কূপ আছে এবং শাহ ইয়াকুব বদরপুরী রহ. সেই কূপের ভেতরে শয়তানকে বন্দী করে রেখেছেন, আল্লামা ফুলতলী রহ: কে প্রহরী হিসেবে বসিয়ে রেখেছেন। আমি দেখলাম, কিছুক্ষণ পর পর বন্দী শয়তানটি মাথা উঠাতে চেষ্টা করলে মাটির স্তুপটিও উপরের দিকে উঠে যায়। তখন আল্লামা ফুলতলী রহ: তাঁর চেয়ারের পাশে রক্ষিত কিছু ঢিলা নিয়ে কুরআনের একটি আয়াত পড়া অবস্থায় শয়তানের উপর ঢিলা নিক্ষেপের জন্য হাত উঁচু করার সাথে সাথে শয়তানের মাথা নিচু করে ভেতরে ঢুকে নেয়। মনে হলো কুরআনের আয়াতটি আল্লামা ফুলতলী রহ:-এর মুখে উচ্চারিত হচ্ছে কিন্তু আওয়াজটি যেন আসমান থেকে আসছে। উক্ত আসমানী আওয়াজ আমার হৃদয়ে এমনভাবে আঘাত করছে, যা আমার মন গলে চোখ দিয়ে পানি ঝরছে আমি শব্দ করে কাঁদছি। স্বপ্ন দেখা সেই মুহুর্তে ইমাম সাহেব আমার মাথায় হাত বুলিয়ে আমাকে জাগ্রত করে বললেন, এইতো ভালোভাবে কথা বললেন, হঠাৎ কী হলো শব্দ করে কাঁদছেন কেন? উঠে দেখি আমার চোখের পানিতে মসজিদের চাটাই ভিজে মাটির কিছু অংশও ভিজে গেছে। উক্ত ঘটনার কিছুদিন পর শাহ ইয়াকুব বদরপুরী রহ: ইন্তেকাল করলেন। তাঁকে দাফনের পরের দিন উপস্থিত কিছু মুজায ও মুতাআল্লিকীন শাহ ইয়াকুব বদরপুরী রহ:-এর খাস কামরায় বৈঠকে বসেন। আল্লামা ফুলতলী রহ:-এর প্রস্তাবে সকল একত্রিত থাকার জন্য শাহ ইয়াকুব বদরপুরী রহ:-এর বড় ছাহেবজাদা আল্লামা মাহমুদুর রহমান রহ:-এর হাতে উপস্থিত সকলেই বাইয়াত হই। উপস্থিত এই সময় স্বপ্নের ঘটনাটি আমার মনে বার বার উদিত হচ্ছিল। হঠাৎ আল্লামা ফুলতলী রহ:-এর নযর আমার উপড় পড়ল। আমাকে কাছে ডেকে বললেন, তুমি ‘আল্লাহ আল্লায়‘ লেগে যাও। আল্লামা ফুলতলী রহ:-এর ‘নেক নযর ও সংস্পর্শ লাভ আমার জীবনে আল্লাহর এক নিয়ামত’।
ইসলামি দার্শনিক হিসেবে সর্বমহলে পরিচিত অধ্যক্ষ শুয়াইবুর রহমান বালাউটি রহ:। তাঁর প্রতিষ্ঠিত খানকা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাঁকে করেছে জননন্দিত। তাঁর নিজ হাতেগড়া শিক্ষার্থীবৃন্দ দেশ-বিদেশে উচ্চ পর্যায়ের চাকুরীতে নিয়োজিত থেকে সুনাম কুড়াচ্ছেন। তাঁর রচিত কয়েকটি গ্রন্থ রয়েছে। তিনি সমাজ ও দেশ হিতৈষী কর্মকান্ডে সবার নিকট প্রশংসিত। সৃষ্টিকর্তা তাঁর সকল খিদমতকে কবুল করুন এবং তাঁকে জান্নাতের উচ্চ মাকাম দান করুন। আমিন।

লেখক: প্রাবন্ধিক।