আমরা নিজেদের তৈরী ফ্রাংকেনস্টাইনে নিজেরাই আক্রান্ত

নিউজ নিউজ

এডিটর

প্রকাশিত: ১:৫৯ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ২৬, ২০১৯

আতিক সুজন :
——————-

খুব সাদামাটাভাবে তাকালেও দেখি মানুষের প্রাণীত্ব স্বভাবের মধ্যে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট বলে বিবেচিত শুভবুদ্ধিগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে দ্রুত। যেটাকে অবক্ষয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, নৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় বা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তো অবক্ষয়টা চরম বিকৃত রূপ ধারণ করেছে। ব্যক্তি মানুষের হিসেব করতে গেলে প্রতিটা মানুষের ভেতর শুভ অশুভ চেতনার মিশ্রন আছে। পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে এই বোধগুলোর প্রভাব বিস্তারের মাত্রা ওঠানামা করে। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে বলা যায় অশুভ বোধ প্রবলভাবে আক্রান্ত আমাদের জনগোষ্ঠির বিশাল একটা অংশ।
গত শতকের শেষ দিকেও আমরা মাঝে মাঝে শুনতাম এই অবক্ষয়ের কথা, কিন্তু তখনো সেটা একটু দূরে ছিল, শোনা কথা, পত্রিকার পাতা ইত্যাদিতে সীমাবদ্ধ থাকতো। এই শতকের দ্বিতীয় দশকেই এসে তা এতই ভয়াবহ রূপে আক্রমণ করবে তা গত শতকে আমরা কল্পনাও করিনি। আমাদের প্রচুর দুর্বলতা আছে চরিত্রের, প্রচণ্ড সীমাবদ্ধতা আছে চিন্তা জগতের, আত্মকেন্দ্রিকতার অন্ধকার প্রচণ্ড। ভার্চুয়াল মননশীলতার বিচার করার জন্য বাঙালীর ফেসবুক ভুগোলে পরিভ্রমণ করেও অনেকটা অন্ততঃ আঁচ করা যায়। যদিও এই বাঙালী মধ্য এবং উচ্চবিত্ত বাঙালী। অনুমান করি শতকরা নব্বই ভাগ মানুষ এর অন্তর্ভুক্ত নয়। শ্রমজীবি কিংবা প্রান্তিক মানুষেরা এই জগতে নেই। কিন্তু একটা দেশে মধ্যবিত্ত শ্রেণীটাকে দিয়ে বিচার করা হয় সেই সমাজের মানবিক অবস্থান। এই অবস্থানটা অতিমাত্রায় সংকীর্ণ মানসিকতায় ভরপুর। এখানে শিক্ষা রুচি আর্থিক অবস্থা কোনটাই এই সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত করতে পারেনি মানুষকে। যে যেই মতবাদে বিশ্বাসী তার বাইরের কাউকে মানুষের মর্যাদা দিতেও রাজী না। ন্যুনতম শ্রদ্ধাবোধ দূরে থাকুক, তার জীবনেরই কোন দাম নেই প্রতিপক্ষের কাছে। সেটা ধর্মীয় হোক বা রাজনৈতিক হোক কিংবা সামাজিক মতবাদ হোক।
তবু একটা সময় ছিল যখন কেবল পক্ষ বিপক্ষে সীমাবদ্ধ ছিল এই বিরোধীতা। হিংসা হানাহানি যাই হতো তা নিজ নিজ প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধেই হতো। তার বাইরের কেউ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে এটা আমরা দশ বছর আগেও কল্পনা করিনি। এই বাংলাদেশে এখন তাই হচ্ছে। কে কখন কার লক্ষবস্তুতে পরিণত হবে কেউ জানে না। কে কখন কার হাতে খুন হবে কেউ জানে না। চোখের সামনে দেখতে দেখতেই একটি আত্মহত্যাপ্রবণ অপরিণামদর্শী সমাজে বিবর্তিত হয়ে গেছি আমরা। সমস্ত জাতির রক্তে অজানা কোন বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ শিরা উপশিরা বেয়ে শুভবুদ্ধির প্রধান আশ্রয়কেন্দ্র মগজকে আক্রান্ত করেছে। মগজে মগজে অমানুষ। কত হাজার কত লক্ষ কত কোটি, এখনো ঠিক জানি না। শুধু জানি আমরা ‘ভালো নেই’। আমরা ‘ভালো নই’।
কেন ভালো নই? কেননা এইসবের জন্য আমিও দায়ী, আপনিও দায়ী, আমরা সবাই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যে কোনভাবে অবশ্যই দায়ী। আমরা নিজ নিজ স্বার্থের বাছবিচার করে অশুভকে শুভ বলেছি, শুভকে অশুভ করেছি। আমাদের আশ্রয়ে প্রশ্রয়েই বেড়ে উঠেছে বিষবৃক্ষ। সময়ে সময়ে আমরা বপন করেছি বীজ, রোপন করেছি চারা, সার দিয়েছি, জলপানি দিয়েছি। সময়ে সময়ে আগাছাকে বাড়তে দিয়েছি অন্যের বাগান গ্রাস করবে বলে। অন্যের বাগান আক্রান্ত হলে আমরা পুলকিত হই। কিছু কিছু ধ্বংস আনন্দ দিয়েছে আমাদের কাউকে কাউকে। আর এখন সেই আগাছা, সেই বিষবৃক্ষ অন্যের বাগান খেয়ে আমার নিজের বাগানেও হানা দিয়েছে।
এখন আমরা নিজেদের তৈরী ফ্রাংকেনস্টাইনে নিজেরাই আক্রান্ত। তবু কি আমরা কিছু না করে বসে থাকবো? নিজের অবস্থানে ঠায় বসে থাকবো নাকি একটু সরে এসে দানবের শক্তিকে রুখে দেবার জন্য সমাজকে তৈরী করবো

—————————–
লেখক : আতিক সুজন,
সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার,
সভাপতি চট্টলা ইঞ্জিনিয়ারিং ক্লাব