আত্মহত্যা: এ যেনো এক মডার্ন ফ্যাশন!

নিউজ নিউজ

এডিটর

প্রকাশিত: ৬:২৬ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২০

———
আত্মহত্যা বর্তমান তরুণসমাজে অত্যন্ত জটিল একটি দৃশ্যমান বিষয়। বেঁচে থাকার আনন্দকে অস্বীকার করে সামাজিক বিচ্ছিন্নতাবোধ,পারিবারিক ও ব্যক্তিগত হতাশা,দারিদ্রতা,বেকারত্ব এবং মানসিক পীড়ন থেকে উত্তরণের মাধ্যম হিসেবে আত্মহত্যা নামক এই আত্মবিধ্বংসী মডার্ন ফ্যাশনকেই বেছে নিয়েছে বাংলাদেশের তরুণসমাজ।

বর্তমানে এই আত্মঘাতী সামাজিক ব্যাধিটি তরুণসমাজে দ্রুত হারেই ছড়িয়ে পড়ছে।আবার অনেকে এমনও আছে যারা একে অপরের অনুসরণ এবং অনুপ্রাণিত হয়ে এই চিরায়ত অভিশপ্ত পথে যাত্রা করে।

বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতেও আত্মহত্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে আশঙ্কাজনকহারে।সাম্প্রতিক এঈ সমীক্ষায় দেখা গেছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৬.৮ ভাগ ছাত্র-ছাত্রী কমবেশি মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত,যার কারণে ঠুনকো আবেগ ও জীবনযুদ্ধে হার মেনে নিয়ে আত্মহত্যার কোলে ঢলে পড়ে দেশের শ্রেষ্ঠ সম্পদ হাজারো মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী। ফলশ্রুতিতে পরিবার ও রাষ্ট্রে সৃষ্টি হয় বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি এবং মোকাবেলা করতে হয় চরম ক্ষতির।

পৃথিবীর যত মানুষ আত্মহত্যা করে তার মধ্যে ২.০৬% বাংলাদেশি।বাংলাদেশে প্রতিবছর লাখে ১২৮.০৮ জন মানুষ আত্মহত্যা করে।প্রতিবছর এই সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে ২৮ জন মানুষ আত্মহত্যা করে।আর এই আত্মহত্যার হার শহরের চেয়ে গ্রামে ১৭ গুণ বেশি।
বাংলাদেশে ১৫-২৪ বছর তরুণ-তরুণীদের আত্মহত্যার অন্যতম প্রধান কারণ ডিপ্রেশন। বাংলাদেশের শতকরা ১৮-২০ ভাগ মানুষ কোনো না কোনো প্রকারের ডিপ্রেশন বা এনজাইটিতে ভুগছেন।মনোবিজ্ঞানীদের মতে,যথাযথ চিকিৎসার মাধ্যমে এই ডিপ্রেশন থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।অথচ আমরা এমন এক সুশীল সমাজে পৌঁছে গেছি ডিপ্রেশন যে একটা রোগ সেটাই অনেকে জানেনা,চিকিৎসা তো অনেক বহুদূর।

আত্মঘাতী সামাজিক ব্যাধির করাল গ্রাসে ভেসে যাচ্ছে তরুমসমাজ।আত্মহত্যার এই বিষ দ্রুতহারে ছড়িয়ে পড়ার পেছনে অসচেতন অভিভাবকের দায়ভার একেবারেই এড়িয়ে যাওয়া যায়না।অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের সুশিক্ষা ও নৈতিক মূল্যবোধ শিক্ষা,বন্ধুসুলভ আচরণ,সৃজনশীল কাজে পরামর্শ ও সহযোগিতা করা।উপরন্তু বিনোদনের সকল প্রকার ব্যবস্থা করা,যাতে বিচ্ছিন্নতাবোধের কালো ছায়া না পড়ে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে,প্রতিবছর সারা পৃথিবীতে আট লাখের বেশি মানুষ আত্মহত্যা করে।অর্থাৎ প্রতি সেকেন্ডে পৃথিবীর কোথাও না কোথাও একজন মানুষ আত্মহত্যা করে থাকে।সংস্থাটির আশঙ্কামতে,২০২০ সাল নাগাদ প্রতিবছর সাড়ে পনেরো লাখ মানুষ আত্মঘাতী হবেন এবং চেষ্টা চালাবেন এর ১০ থেকে ২০ গুণ মানুষ।

বাংলাদেশে পরিচালিত এক গবেষণায় পারিবারিক সমস্যা (৪১.২%),পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া (১১.৮%),বৈবাহিক সমস্যা (১১.৮%), বিবাহবহির্ভূত গর্ভধারণ ও যৌন সম্পর্ক (১১.৮%),স্বামীর নির্যাতন (৫.৯%) এবং অর্থকষ্ট (৫.৯%) থেকে রেহাই পেতে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন।
বিভিন্ন নিউজ পোর্টাল,পত্রিকার সূত্রে জানা যায়, সারাবিশ্বে যত আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে থাকে তার ৭৫ শতাংশ বা তিন-চতুর্থাংশই নিম্ন ও মধ্যম আয়ভুক্ত দেশগুলোতে।এই তালিকাতে বাংলাদেশের স্থান দশম।

বাংলাদেশ চৌত্রিশতম স্থান থেকে মাত্র কয়েকবছরের ব্যবধানে দশম স্থানে উপনীত হয়েছে।
আর এটাই আগামীতে সুখী-সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গড়তে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে।

প্রতিষেধকের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম।আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতিতে আত্মহত্যাকে মানসিক অসুস্থতা সংক্রান্ত বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।উপযুক্ত চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রহণের মাধ্যমে এই ব্যাধি থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভবপর। উন্নতবিশ্বে চরম মুহুর্তজনিত হটলাইন রয়েছে,যাতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি তাদের চিন্তা-ভাবনা এবং আত্মহত্যার পরিকল্পনার কথা জানায়। হটলাইন ব্যবহারের মাধ্যমে ভুক্তভোগী তার সমস্যার সমাধান সম্পর্কে অবহিত হয়ে আত্মহত্যা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে,নিজেকে ভালোবাসাই আত্মহত্যা থেকে পরিত্রাণের অন্যতম উপায়।

লেখক :
শিক্ষার্থী, ইমরান উদ্দিন
বিজয় একাত্তর হল
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়