আত্মহত্যাকরীর প্রতি সমবেদনা নয়, একরাশ ঘৃণা।

নিউজ নিউজ

এডিটর

প্রকাশিত: ২:৩০ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২, ২০২০


এস বি আব্দুল কাদের

————————————-
‘স্মৃতি হত্যা করতে পারলেই এই শহরে আর কেহ আত্মহত্যা করতো না’! বিশ্বে চলমান ঘটনাগুলোর মধ্যে আত্মহত্যা নামক ব্যাধিটা যেন বর্তমানে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে।যার প্রধান কারণ হিসাবে ধরা যায় হতাশা আর বিষণ্ণতা। ল্যাটিন ভাষার সুই সেইডেয়ার থেকে আত্মহত্যা শব্দটি গৃহীত। যার অর্থ নিজেকে হত্যা করা বা কষ্ট দেওয়া।আত্মহত্যা বলতে আমরা ধরি কোন ব্যক্তি কতৃক নিজ জীবন বিসর্জন দেওয়া বা স্বেচ্ছায় নিজ প্রাণনাশের বিশেষ প্রক্রিয়া। বর্তমানে বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও আত্মহত্যার প্রকোপ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। যার প্রধান প্রধান কারণ হিসাবে লক্ষ্য করা যায় স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে মনোমালিন্য, যৌতুকের কারণে ঝগড়া,পরীক্ষায় ব্যর্থতা, দীর্ঘস্থায়ী রোগ যন্ত্রনা থেকে মুক্তি পাওয়া, ব্যবসায় ব্যর্থতা, শত্রুর ভয়, প্রেম-বিরহ এবং নারী সমাজে ধর্ষণের অপবাদ থেকে মুক্তি পাওয়া। বিশ্বে মানুষ মারা যাওয়ার বিভিন্ন কারণের পিছনে আত্মহত্যার স্থান ১৩তম।আমরা প্রতিনিয়ত যেসকল ভয়াবহ মৃত্যুর খবর পাই তার অধিকাংশ মৃত্যুই ঘটে আত্মহত্যার বদৌলতে। আর এমন ভয়াবহ মৃত্যু লক্ষ্য করা যাচ্ছে বেশির ভাগ পনের থেকে চব্বিশ বছরের তরুণ তরুণীদের মধ্যে।যার প্রধান কারণ হলো ডিপ্রেশন।
বিশ্বব্যাপী আত্মহত্যা পরিসংখান আত্মহত্যার উপর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক গবেষণায় দেখা গেছে স্কান্ডিনেভিয়া অঞ্চল,সুইজারল্যান্ড,, জার্মান,অস্ট্রিয়া, পূর্ব ইউরোপ দেশগুলো এবং জাপানে আত্মহত্যার হার সবথেকে বেশি।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে প্রতি বছর পৃথিবীতে আট লাখেরও বেশি মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে।অর্থাৎ প্রতি ৪০ সেকেন্ডে পৃথিবীর কোথাও না কোথাও একজন মানুষ আত্মহত্যা করে। পৃথিবীতে যত মানুষ আত্মহত্যা করছে তার মধ্যো ২.০৬ শতাংশই বাংলাদেশি। যার প্রতি লাখে ১২৮.০৮ জন।বাংলাদেশের সরকারি তথ্য অনুযায়ী দেশের সবথেকে বেশি আত্মহত্যার প্রকোপ দেখা গেছে দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলীয় জেলা ঝিনাইদহে। বাংলাদেশের শতকরা ১৮ থেকে ২০ ভাগ মানুষ কোন না কোন ডিপ্রেশনে ভুগছে।যার কারণ হিসাবে বাংলাদেশে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে পারিবারিক সমস্যা(৪১.২%),পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া(১১.৮%),বৈবাহিক সমস্যা(১১.৮%),ভালোবাসায় কষ্ট পাওয়া (১১.৮%),স্বামী কতৃক নির্যাতন (৫.৯%), এবং অর্থকষ্ট (৫.৯%)।
সাময়িক কষ্টটা ভুলে থাকতে না পেরে আবেগের মোহে পড়ে এভাবে জীবন বিসর্জন দিয়ে দিচ্ছে সমাজের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিশ্বের আলোচিত ব্যক্তিরাও।বিশ্ব আত্মহত্যা পরিক্রমা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় জীবনের সকল পূর্ণতা থাকার পরেও আবেগের মোহে পড়ে আত্মহত্যা করেছেন এমন হাজারো নজির।আত্মহত্যা নামক ব্যধি থেকে রেহায় পাননি অ্যাডলফ হিটলারের মত বিশ্ব কাপানো নেতাও।আত্মহত্যার পূর্বে তিনি তার সুইসাইড নোটে লিখে যান “নিজের কাজের জায়গা, যেখানটায় ১২বছর ধরে প্রতিদিন আমরা মানুষের জন্য কাজ করছি। সেখানটায় তাৎক্ষণিক পুড়ে মরতে চাওয়া পুরোপুরি আমার ইচ্ছা”। জর্জ ইস্টম্যান, যিনি আত্মহত্যার পূর্বে লিখে গেছেন”আমার বন্ধুদের প্রতি আমার কাজ শেষ।তাহলে অপেক্ষা কেন?”। ভিনসেন্ট ভ্যানগখ লিখেছেন”দুঃখ সব সময় টিকে থাকবে”।পৃথিবীর সবথেকে আলোচিত আত্মহত্যা সম্ভবত রাজনীতিবিদ রবার্ড বাড ডয়ারের।কেননা তার আত্মহত্যার দৃশ্য ক্যামেরা বন্দী করে রাখা হয় যা পরবর্তিতে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে প্রচার করা হয়।ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলি শহরে জন্মগ্রহণ করা এভিলিন ম্যাকহেল বিখ্যাত কোন ব্যক্তি না হলেও তার মৃত্যুকে বলা হয়ে থাকে “ইতিহাসের সুন্দরতম আত্মহত্যা”।যিনি কাজ করতেন একটি বইয়ের দোকানে। আত্মহত্যা কখনো কোন সমাধান দিতে পারে না বরং বাস্তবতার কাছে নিজেকে শেষ করে দেওয়া।যেটা প্রত্যেক সমাজে একটি নিন্দনীয় কাজ হিসাবে পরিচিত। প্রাচীন এথেন্সে যদি রাষ্ট্রের অনুমোদন ছাড়া কোন ব্যক্তি আত্মহত্যা করতো তবে তাকে সাধারণ কবরস্থানে সম্মান দেওয়াকে অস্বীকার করতো।খ্রিস্টান ইউরোপেও আত্মহত্যাকে একটি পাপ হিসাবে গণ্য করা হয়েছিলো।ইসলাম ধর্মেও আত্মহত্যাকে একটি মারাত্মক পাপের কাজ হিসাবে বলা হয়েছে।এমনকি আত্মহত্যাকারীর নামাজের জানাযায়ও উপস্থিত না হওয়ার জন্য বলা হয়েছে।আত্মহত্যাকারীর জন্য সমবেদনা নয় বরং একরাশ ঘৃণা।একটা ছেলে বা মেয়ে যখন বড় হয় কিংবা একজন মানুষ যখন প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে তখন তার দিকে চেয়ে থাকে তার পরিবার ও সমাজ।কিন্তু যখন সে কোন কারণে আত্মহত্যার পথে বেছে নেয় ঠিক তখনই তার পরিবার, সমাজ ও সন্তান সন্ততি চরম ধাক্কার মুখে পতিত হয়।আত্মহত্যাকারী নিজে মুক্তি পেলেও তার উপর নির্ভর করে থাকা মানুষগুলোর জীবনটা থমকে যায়।বিশেষ করে মধ্যবিত্ত কিংবা নিম্নবিত্ত পরিবারের উপর নেমে আসে চরম দুর্দশা আর কষ্টের ছাঁয়া।সুতরাং আত্মহত্যাকারী প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করার মাধ্যমে আত্মহত্যার প্রতি অনুপ্রাণিত না করে আত্মহত্যাকে সমাজে ঘৃণিত বিষয় হিসাবে প্রদর্শন করাই উচিৎ।আর এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বৈশ্বিক মানসিক স্বাস্থ্য ফেডারেশনের উদ্যোগে বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ ও সচেতনতার জন্য প্রতি বছর ১০ সেপ্টেম্বরকে বিশ্ব আত্মহত্যা দিবস হিসাবে পালন করে আসছে।

লেখক : এস বি আব্দুল কাদের
শিক্ষার্থী,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ।