আত্নহত্যা: পরিত্রানের পথ কি?

নিউজ নিউজ

এডিটর

প্রকাশিত: ৬:৩৫ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ২১, ২০২০

———————-

আত্মহত্যা বা আত্মহনন (ইংরেজি: Suicide) হচ্ছে কোনো ব্যক্তি কর্তৃক ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের জীবন বিসর্জন দেয়া বা স্বেচ্ছায় নিজের প্রাণনাশের প্রক্রিয়াবিশেষ। ল্যাটিন ভাষায় সুই সেইডেয়ার থেকে আত্মহত্যা শব্দটি এসেছে, যার অর্থ হচ্ছে নিজেকে হত্যা করা। যখন কেউ আত্মহত্যা করেন, তখন জনগণ এ প্রক্রিয়াকে আত্মহত্যা করেছে বলে প্রচার করে। ডাক্তার বা চিকিৎসকগণ আত্মহত্যার চেষ্টা করাকে মানসিক অবসাদজনিত গুরুতর উপসর্গ হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। ইতোমধ্যেই বিশ্বের অনেক দেশেই আত্মহত্যার প্রচেষ্টাকে এক ধরনের অপরাধরূপে ঘোষণা করা হয়েছে।

অনেক ধর্মেই আত্মহত্যাকে পাপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যিনি নিজেই নিজের জীবন প্রাণ বিনাশ করেন, তিনি – আত্মঘাতক, আত্মঘাতী বা আত্মঘাতিকা, আত্মঘাতিনীরূপে সমাজে পরিচিত হন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতি বছর সারা পৃথিবীতে আট লাখেরও বেশি মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। অর্থাৎ প্রতি ৪০ সেকেন্ডে পৃথিবীর কোথাও না কোথাও একজন মানুষ আত্মহত্যা করে থাকেন। এবং অগণিত মানুষ আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেন। সংস্থাটির আশঙ্কা মতে, ২০২০ সাল নাগাদ প্রতিবছর সাড়ে ১৫ লাখ মানুষ আত্মঘাতী হবেন। আত্মহত্যার চেষ্টা চালাবেন এর ১০ থেকে ২০ গুণ মানুষ।

পৃথিবীর যত মানুষ আত্মহত্যার মাধ্যমে মৃত্যুবরণ করে, তার মধ্যে ২.০৬ শতাংশ বাংলাদেশি। বাংলাদেশে প্রতিবছর লাখে ১২৮.০৮ জন মানুষ আত্মহত্যা করে। প্রতিবছর এই সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে ২৮ জন মানুষ আত্মহত্যা করে। আর এই আত্মহত্যার হার শহরের চেয়ে গ্রামে ১৭ গুণ বেশি।

গত বছর পাঁচ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ১৯ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই ৯ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। এ ছাড়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭ জন, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী আত্মঘাতী হয়েছেন।
আত্মহত্যার কারণ
আত্মহত্যার প্রধান কারণ হলো মানসিক বিকৃতি। ২৭% থেকে ৯০% এরও বেশি সময় আত্মহত্যার সাথে মানসিক সমস্যার সম্পর্ক থাকে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের দেয়া তথ্য মতে, বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ৩১ শতাংশ বা প্রায় ৫ কোটি মানুষ কোন না কোন মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত।

আত্মহত্যার ব্যবহারিক নানাবিধ কারণের মাঝে রয়েছে স্বামী-স্ত্রীর মনোমালিন্য, যৌতুকের কারণে ঝগড়া-বিবাদ, বাবা-মা ও ছেলে-মেয়ের মাঝে মনোমালিন্য, প্রেম-বিরহ, মিথ্যা অভিনয়ের ফাঁদে পড়া, কারও কাছে পরাজয় বরণ করা, ধনদৌলত আত্মসাৎ হয়ে ফতুর হওয়া, দীর্ঘস্থায়ী রোগ যন্ত্রণায় জীবনযাপন করা, পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়া, জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও আত্মবোধ সম্পর্কে অবহিত না হওয়া, ধর্মীয় রীতিনীতি, আদর্শ সম্পর্কে অবগত না হওয়া, জাতীয় পর্যায়ে ধর্মীয় ও নীতিনৈতিকতাপূর্ণ শিক্ষার বাস্তবায়ন না থাকা ইত্যাদি।

ইসলামের দৃষ্টিতে আত্মহত্যা
ইসলামের দৃষ্টিতে আত্মহত্যা কবিরা গুনাহ। শিরকের পর সবচে বড় গুনাহ। ফকিহ ইমামগণের সর্বসম্মত মতে আত্মহত্যা হারাম। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর তোমরা নিজেরা নিজেদের হত্যা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়ালু। আর যে কেউ যুলুম করে, অন্যায়ভাবে তা (আত্মহত্যা) করবে, অবশ্যই আমি তাকে অগ্নিদগ্ধ করবো, আল্লাহর পক্ষে তা সহজসাধ্য।’ [সুরা নিসা, ৪ : ২৯-৩০]

অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর তোমরা নিজ হাতে নিজদেরকে ধ্বংসে নিক্ষেপ করো না।’ [সুরা বাকারা, ২ : ১৯৫]

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি দুনিয়াতে যে বস্তু দিয়ে আত্মহত্যা করবে, কিয়ামতের দিন তাকে সে বস্তু দিয়েই শাস্তি প্রদান করা হবে।’ [বুখারি, আসসাহিহ : ৫৭০০; মুসলিম, আসসাহিহ : ১১০]

অপর এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি নিজেকে পাহাড়ের ওপর থেকে নিক্ষেপ করে আত্মহত্যা করবে, সে জাহান্নামে যাবে। সেখানে সর্বদা সে ওইভাবে নিজেকে নিক্ষেপ করতে থাকবে অনন্তকাল ধরে। যে ব্যক্তি বিষপান করে আত্মহত্যা করবে, জাহান্নামে সর্বদা সে ওইভাবে নিজেকে বিষ খাইয়ে মারতে থাকবে অনন্তকাল ধরে। যে কোনো ধারালো অস্ত্র দ্বারা আত্মহত্যা করেছে, তার কাছে জাহান্নামে সে ধারালো অস্ত্র থাকবে, যার দ্বারা সে সর্বদা নিজের পেটকে ফুঁড়তে থাকবে। [বুখারি, আসসাহিহ : ৫৪৪২; মুসলিম, আসসাহিহ : ১০৯]

আত্মহত্যা প্রতিরোধের ক্ষেত্রে পরিবার এবং সঠিক শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। ছোটবেলা থেকেই মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ (stress management), রাগ নিয়ন্ত্রণ (anger management) জাতীয় দক্ষতা বাচ্চাদের শেখাতে হবে। যে কোন Crisis বা stress এ অতি বিচলিত না হয়ে তাকে মোকাবেলা করার চেষ্টা করতে হবে, আবার একই সঙ্গে এটাও বুঝতে হবে পৃথিবীতে সব সমস্যারই আমি আমার মনের মতো করে সমাধান করতে পারব না, তখন তার সঙ্গে আমাকে cope করতে হবে। এসব শেখার ক্ষেত্রে পরিবার এবং সমাজের ভূমিকা অনেক।

* পারিবারিক, সামাজিক বন্ধনকে সুদূঢ় করতে হবে, একে অপরকে সময় দিতে হবে, কাছের মানুষের কষ্টের কথাগুলো শুনতে হবে।

* পর্যাপ্ত সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

* প্রতিটি সমস্যাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে তাকে মোকাবেলা করতে শিখতে হবে, মোকাবেলা করতে হবে।

* মিডিয়া বা গণমাধ্যম এ ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। আত্মহত্যার সংবাদ প্রচারের ক্ষেত্রেও মিডিয়াকে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।

আত্মহত্যার পথ থেকে ফেরানোর উপায় কী হতে পারে
আমাদের আলোচনায় অংশ নেওয়া বন্ধুদের অনেকেই সমাধানের নানা পথ বাতলেছেন। সবাই মনে করেন এই পরিস্থিতি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। দ্রুত এই অর্থহীন ফলাফলের দৌরাত্ম্য বন্ধ হওয়া আবশ্যক! বলেছেন, যা করার আমাদেরই করতে হবে। শিশুদের বাঁচানোর দায়িত্ব আমাদের। দীর্ঘ ও মধ্যমেয়াদি আর তাৎক্ষণিক সেসব পদক্ষেপের মধ্যে আছে
১। পরীক্ষাপদ্ধতি এবং রেজাল্ট-পদ্ধতির আশু পরিবর্তন।
২। পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের আগে থেকেই অভিভাবক ও মা-বাবাকে সতর্ক করে দেওয়ার জন্য প্রচারণা। পরিবারে পরীক্ষার্থী থাকলে তাকে সব সময় চাপমুক্ত রাখতে হবে। ফলাফল প্রকাশের পর বিপন্ন শিক্ষার্থীদের সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখা এবং তাদের প্রতি যত্নবান ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা।
৩। ফেসবুক ও নানা সামাজিক মাধ্যমে উদযাপনের মাত্রা উসকানিমূলক পর্যায়ে চলে যায়। উদযাপন বন্ধ করা।
৪। যেহেতু আত্মহত্যার তালিকায় মেয়েদের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেশি, তাই মেয়েদের বিষয়টি আলাদাভাবে ভাবতে হবে।
৫। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনাসহ একজন প্রশিক্ষিত মনোসামাজিক সহায়ক থাকবেন।
৬। অভিভাবক-শিক্ষক সংঘ, ছাত্র-শিক্ষক ক্লাব ইত্যাদির সভায় বিষয়টিকে আলোচনার তালিকায় রাখা। এবং আত্মহত্যানিরোধক পদক্ষেপ গ্রহণ।
৭। এ বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা তৈরির জন্য একটি স্বেচ্ছাসেবী দল বা কার্যকর কোনো সংগঠিত স্বেচ্ছাসেবী দল থাকলে তাদের সহযোগিতা নেওয়া।
৮। সব ধরনের প্রচারমাধ্যমে বিষয়টিকে সারা বছর আলোচনায় রাখা।
তবে সব আলোচনা ছাপিয়ে যে বিষয়গুলো বারবার আলোচনায় এসেছে সেগুলো হচ্ছে: ক. সমাজের সব স্তরে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন খ. শিক্ষার্থী-অভিভাবক-শিক্ষক সবারই মনোসামাজিক পরিচর্যা গ. আত্মহত্যার চেষ্টা থেকে বেঁচে যাওয়াদের সুরক্ষা।
এ বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই, এ দেশে মানসিক স্বাস্থ্য একটি অবহেলিত বিষয়। এ বিষয়ে আমাদের ধারণাগুলো খুবই সেকেলে আর ভ্রান্ত। অভিভাবকতা বা প্যারেন্টিং যে শেখার বিষয়, সেটা অনেক কথিত সচেতন ব্যক্তিও স্বীকার করেন না। কিশোর-কিশোরীদের মনের খবর আমরা রাখতে পারি না! দিন দিন মুখস্থ পড়াশোনা হয়ে উঠছে জীবনের বিকল্প। মানসিক অসুস্থতা থেকেই আত্মহত্যার মতো সংকটের সৃষ্টি হয়। এটা প্রতিহত করা সম্ভব। এই আলোচনা বা প্রস্তাবনা তখনই সম্পূর্ণ হবে যখন শিশু, কিশোর-কিশোরীদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা করে তাদের মতামতকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে।

সর্বোপরি জীবনকে আনন্দের সঙ্গে উপভোগ করতে শিখতে হবে। ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখবেন শত দুঃখ, শত কষ্টের পরও জীবন অনেক সুন্দর। নিজের জীবনের দিকে ভালো করে তাকালে দেখবেন জীবনে শুধু অপ্রাপ্তিই নয় প্রচুর প্রাপ্তিও আছে। সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, হাসি-কান্না সব মিলিয়েই হচ্ছে জীবন। জীবনের সব Content কে মেনে নিয়েই জীবনকে যাপন করতে হবে। জীবনের মুহূর্তগুলোকে সুন্দর করুন জীবন সুন্দর হয়ে উঠবে।

——————
শফিকুল ইসলাম, বাংলা বিভাগ।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যলয়।

সদস্য, বাংলাদেশ তরুন কলাম লেখক ফরাম।