আজ আওয়ামীলীগের ৭১ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী

নিউজ নিউজ

এডিটর

প্রকাশিত: ২:৩৫ পূর্বাহ্ণ, জুন ২৩, ২০২০

মোঃ সাব্বির হোসেন শান্ত :

Advertisement

বর্তমান বাংলাদেশকে টানা ৩ মেয়াদে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছে আওয়ামীলীগ সরকার। রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামীলীগ সবার কাছে অতি পরিচিত। তবে এই রাজনৈতিক দল আওয়ামীলীগ সৃষ্টির পিছনে রয়েছে সুদীর্ঘ ইতিহাস।

স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে যে দলটির অবদান অনস্বীকার্য সেটা হলো আওয়ামী মুসলিম লীগ। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন বাঙালির অধিকার আদায়ের লক্ষ্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আওয়ামী মুসলিম লীগ। এ দলটির মাধ্যমে বাঙালি পেয়েছিল মুক্তির দিশা, পেয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তানিদের হাত থেকে বাঁচার উপায়। আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠনের প্রাথমিক কারন ছিল মুসলিম লীগের উদারপন্থি নেতৃত্ববৃন্দকে অবহেলা, মুসলীম লীগের অগনতান্ত্রিক কার্যক্রম, মুসলিম লীগের দলীয় কোন্দল, পূর্ব বাংলার প্রতি বৈষম্য, বাংলা ভাষার প্রতি অবহেলা, বাংলার মানুষকে অধিকার থেকে বঞ্চিতসহ বেশ কিছু কারন।

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার কে আম দাস লেনের রোজ গার্ডেনে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিমের নেতৃত্বাধীন বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের এক অংশের নেতা কর্মীদের এক কনভেনশনে আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে এ দলটির নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ। মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে সভাপতি, আতাউর রহমান খান, শওকত হোসেন ও অলি আহমদ খানকে সহ-সভাপতি, শামসুল হককে সাধারন সম্পাদক, শেখ মুজিবুর রহমান, খন্দকার মোশতাক আহমদ, এ.কে রফিকুল হোসেনকে যুগ্ন সাধারন সম্পাদক, ইয়ার মোহাম্মদ খানকে কোষাধ্যক্ষ করে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন হয়।

১৯৫৫ সালের ২১-২৩ অক্টোবর তৃতীয় কাউন্সিল সভায় ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী হিসেবে দলের নাম থেকে ” মুসলিম ” শব্দটি বাদ দিয়ে শুধু আওয়ামীলীগ করা হয়। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামীলীগই ছিল প্রধান বিরোধী দল। দলটি জন্মলগ্ন থেকেই প্রাদেশিক স্বায়ত্বশাসনের দাবির উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে ৪২ দফা কর্মসূচি গ্রহন করে। পাকিস্তানের সূচনালগ্নেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে স্বীকৃতি, এক মানুষ এক ভোট, গণতন্ত্র, শাসনতন্ত্র প্রণয়ন, সংসদীয় সরকার পদ্ধতি, আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসন এবং দুই প্রদেশের মধ্য বৈষম্য দূরীকরন ইত্যাদি ছিল আওয়ামীলীগের প্রধান দাবি।

১৯৪৮-৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে আওয়ামিলীগ এবং এর ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ ( ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্র হত্যার পূর্বে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠনে আওয়ামীলীগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

পূর্ব বাংলার মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট গঠন ও নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ন অধ্যায়। নির্বাচন ও গনতান্ত্রিক পন্থা অবল্ম্বন করার জন্য আওয়ামী মুসলিম লীগের নেতারা যুক্তফ্রন্ট গঠন করে। তাদের সাথে যুক্ত হয় শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের কৃষক-শ্রমিক পার্টি, নেজামে ইসলাম পার্টিসহ কয়েকটি দলের সমন্বয় যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়।
যুক্তফ্রন্টের প্রধান ৩ নেতা ছিলেন মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, শেরে বাংলা একে ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। মুসলিম লীগের সাথে নির্বাচনী পদ্ধতির মাধ্যমে তাদেরকে পরাজিত করার জন্য ও মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য আওয়ামী মুসলীম লীগ ও এর সাথে অনান্য দল যুক্ত হয় যুক্তফ্রন্ট গঠন ও যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের পন্থা অবলম্বন করে। যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে তাদের প্রতিক ছিল নৌকা। নির্বাচনের প্রাক্কালে যুক্তফ্রন্ট ২১ দফা কর্মসূচি গ্রহন করে। নির্বাচনে ৩০৯ টি আসনের মধ্য ২৩৭ টি আসনে জয়লাভ করে যুক্তফ্রন্ট। যেখানে আওয়ামী মুসলিম লীগ ১৪৩ টি আসনে জয়লাভ করে একক সংখ্যাঘরিষ্ঠতা অর্জন করে। যার ফলে যুক্তফ্রন্ট সর্বপ্রথম পূর্ব পাকিস্তানে সরকার গঠন করে।

১৯৬২ সালে ছাত্র আন্দোলন হয়। যেখানে ছাত্রদের দ্বারা আন্দোলন সংগঠিত হয়। যে আন্দোলনের বড় ভূমিকা পালন করে আওয়ামীলীগের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ। যে আন্দোলনের ফলে ছাত্ররা বিভিন্ন দাবি আদায়ে সক্ষম হয়েছিল।

পাকিস্তানের শাসন-শোষন থেকে মুক্তির জন্য ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৫-৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে ৬ দফা দাবি পেশ করে। যে ৬ দফা দাবি ছিল বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ।

১৯৬৮ সালে, ৬ দফা পেশ করায় বঙ্গবন্ধু সহ বেশ কয়েকজন আওয়ামীলীগ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে আগরতলা মামলা ও গ্রেফতার করা হয়। জনগনের তীব্র প্রতিবাদের মুখে পড়ে স্বৈরাচারী আইয়ুব খান তাদের ছেড়্ব দিতে বাধ্য হয়।

১৯৭০ সালের নির্বাচন ছিল অবিভক্ত পাকিস্তান রাষ্টের প্রথম ও শেষ সাধারন নির্বাচন। নির্বাচনে ৩০০ টি আসনের মধ্যে ২৮৮ আসনে বিপুল সংখ্যাঘরিষ্টতা অর্জন করে আওয়ামীলীগ।

নির্বাচনে পরাজিত হয়ে ইয়াহিয়া খান যখন বাঙালির বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র লিপ্ত হয় ঠিক তখন ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দান বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিশাল এক জনসভার আয়োজন করে। বঙ্গবন্ধু ডাকে সাড়া দিয়ে লাখো লাখো লোক জমায়েত হয় ময়দানে। বঙ্গবন্ধু উচ্চস্বরে সেদিন বাঙালিকে অধিকার আদায়ের জন্য শত্রুর মোকাবেলা করার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেছিল।

১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ পাকবাহিনী ঘুমন্ত বাঙালির হত্যাকান্ড শুরু করলে ২৬ শে মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষনা দেয়।
অতঃপর বঙ্গবন্ধু গ্রেপ্তার হলে বাঙালির মানুষ আওয়ামীলীগের বিভিন্ন নেতৃত্বে শত্রুর মোকাবেলা করে স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জন করতে সক্ষম হয়।

সুতারং, বাংলাদেশ সৃষ্টিতে ইতিহাসের সকল আন্দোলন,সংগ্রামে আওয়ামীলীগ ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

যার প্রেক্ষিতে উপমহাদেশের প্রাচীনতম এই রাজনৈতিক সংগঠনর বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের ৭১ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ।