অন্তত আপনার চোখের সামনে হওয়া বাল্যবিবাহটি বন্ধ করুন।

নিউজ নিউজ

ভিশন ৭১

প্রকাশিত: ৮:৪৯ অপরাহ্ণ, জুন ১১, ২০২০

তানজীল ইসলাম শুভ :

Advertisement

প্রতিদিনের মতো রাত ২টায় লাইট, মোবাইল, টিভি বন্ধ করে ঘুমিয়ে পরলাম। সকাল বেলা আম্মু ফজরের নামাজের জন্য ডেকে দিলো। ওজু করে নামাজ আদায় করে একটু মোবাইল নিয়ে বসলাম তারপর আবার ঘুমিয়ে পরলাম। সকাল বেলা বাড়িওয়ালা ভাই ডাক দিলেন আপনার গাড়িটি সরাতে হবে। তারাহুরো করে নিচে নেমে গাড়ী বের করে আবার উপরে উঠলাম। তারপর ফোন দিলো আমাদের ওয়ার্ডের কাজী সাহেব। তার সাথে আবার এক ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আমার।

ফ্রেশ হয়ে গেলাম তার অফিসে। অফিসে কিছুক্ষণ বসে থাকার পরেই ২ ভদ্রলোক আসলো এবং কাজী সাহবকে বলতে লাগলো, কাজী সাহেব একটু গোপন কথা ছিলো। বুঝতে আর বাকি রইলো না কি বলতে চাচ্ছে ওনারা। হ্যাঁ তারা একটি বাল্যবিবাহ পরানোর জন্য কাজী সাহেবকে জোর করতে লাগলো। তারপর আমি আমার মোবাইলের রেকর্ডিং চালু করে দিলাম। তারপরে যা যা কথা হলো তা হুবহু তুলে ধরলাম….

ভদ্রলোক : কাজী সাহেব একটা কাজ করা লাগে যে।

কাজী : কি কাজ বলেন।

ভদ্রলোক : ফিসফিস করে বলতে লাগলো…. একটা বিয়া পরান লাগে। কিন্তু মেয়ের জন্মসনদ, আইডি কার্ড নাই।

কাজী : না থাকলে কিভাবে বিয়ে পরাবেন?

ভদ্রলোক : দেখেন না ঐজন্যইতো আপনার কাছে আসা। দেখেন একটা ব্যবস্থা করা যায় কিনা.

ভদ্রলোক ২ : কাজী সাহেব মেয়ের বাবা নাই, মা অনেক কষ্ট করে এই পর্যন্ত বড় করছে। দেখেন যদি কিছু একটা করা যায়।

কাজী : আরে ভাই কিছু না থাকলে কেমনে করাবেন। অন্তত জন্মসনদ তো লাগবে।

ভদ্রলোক : আপনি কিছু করতে পারবেন না…? চেষ্টা কইরা দেখেন।

কাজী : কিভাবে? তবে আমি আমার কাজ করার জন্য একটা ব্যবস্থা করতে পারি। কিন্তু এই জন্মসনদ দিয়ে অন্য কোন কাজ করতে পারবেন না। আর মেয়ের জন্মসনদ বানান নাই কেন?

ভদ্রলোক : আসলে বানাতে গেছিলো। কিন্তু মেয়ের মায়ের আইডি কার্ড হারাই গেছে। আর তারা এখানকার ভোটার না। আপনি একটা ব্যবস্থা করেন।

ভদ্রলোক -২ : তাইলে এতে পরে প্রশাসন ঝামেলা করবে না? এহন না হয় হইলো।

ভদ্রলোক : সেটাই তো। আর কেউ যদি প্রশ্ন তোলে তখন কি আপনি বলতে পারবেন এটা বাল্যবিবাহ না।

কাজী : কেনো মেয়ের বয়স হয়নি? জন্মসনদ করেন।

ভদ্রলোক -২ : হইছে। ছেলের মা বিদেশে থাকে।ছেলের মা বিদেশে চলে যাবে। বাসায় বউ রেখে যেতে চায়। তবে ছেলে ভালো। ওনাদের ( প্রথম ভদ্রলোকের) বাসার ভাড়াটিয়া। যদি তাড়াতাড়ি পারেন। ছেলেও ওনাদের হাতে বড় হইছে মেয়েও ওনাদের হাতে বড় হইছে।আর জন্মসনদ এখন করতে সময় লাগবে।

ভদ্রলোক : কাজী সাহেব ছেলেকে আপনি চিনেন। হইছে কি কাপড় চোপড় সব দেয়া হয়ে গেছে। এখন বিয়াটা হইলেই হয়। এখন আপনি কি কোন কিছু করতে পারবেন? পরে নাইলে জন্মসনদ দিয়া গেলো

কাজী : আরে ভাই আমি তো বলছি আমরা আমাদের অফিসের জন্য করতে পারি। এটা অন্য জায়গায় কাজে লাগাতে পারবেন না। আবার আইসা বলবেন যে কাগজটা একটু দেন ফটোকপি করে আনি তা হবেনা কিন্তু। মেয়ে কি পড়াশোনা করে? কতটুকু পড়ছে?

ভদ্রলোক ২ : না মেয়ে পড়শোনা করেনা। ক্লাস ৫ পর্যন্ত পড়ছিলো। তারপর থেকে বাবা মারা যাওয়ার পর মেয়ের মা সেই ছোটবেলা থেকে মেয়েকে এই পর্যন্ত বড় করছে। আর পারতেছেনা। তাই বিয়ে দিবে।

কাজী : কোন ঝামেলা আছে নাকি? কেউ কি বাঁধা দিছে? বিয়া কবে দিতে চান?

ভদ্রলোক -২ : আরে না কেউ বাঁধা দেয়নি। আর কেউ দিবে বলে মনে হয়না. অতঃপর প্রথম জনকে জিজ্ঞেস করতে লাগলো তোমাদের আসেপাশে কেউ কি বাঁধা দিবে?

ভদ্রলোক : আরে না এই এলাকায় বাঁধা দেয়ার মতো লোক নাই। এখন ডর প্রশাসন নিয়া। আজকালের ভিতর।

কাজী : এত তাড়াহুড়ো করে বিয়া দিবেন। ২দিন পর দেখবেন ছেলের অন্য জায়গায় বিয়া আছে। আরো কত কাহিনী।

ভদ্রলোক ২ : আরে না তেমন কিছু হবেনা

কাজী : কাগজপত্র কি কিছু নাই?

ভদ্রলোক -২ : কিছু আছে আমি আনতেছি।

অতঃপর মেয়ের মায়ের আগমন একটা কাগজ হাতে নিয়ে

খুলতেই দেখা গেলো জন্মসনদ বানানোর আবেদন ফরম।

মেয়ের মা : এখানে আমার জন্মসনদ আছে।

ভদ্রলোক : আপনার যে আইডি কার্ড হারাইছে সেটার জিডি কপি নাই। থানায় যে জিডি করছেন

মেয়ের মা : না সেটা দিয়া কাজ হবেনা।

এদিকে কাজী সাহেব দেখতে লাগলো সেই আবদেন ফরমে মেয়ের বয়স দেয়া ১৮। তখন তিনি মেয়ের মাকে জিজ্ঞেস করলো

কাজী : মেয়ের আসল বয়স কত?

মেয়ের মা : ১৬

আমি এতক্ষণ চুপ করে ছিলাম। এখন আর চুপ করে থাকা যাবেনা। জিজ্ঞেস করলাম

আমি : ১৬ বছরে কিভাবে আপনি মেয়ে দিবেন? এতে আপনারা নিজেরা ঝামেলায় পরবেন পরে কাজী সাহেবকেও ঝামেলায় ফেলবেন।(আসলে কাজী সাহেব যখন প্রথমে মেয়ের বয়স জিজ্ঞেস করেছিলো তখন তারা বয়স হইছে বললে এখন পুরো উল্টো)

মেয়ের মা : ১৬ বছর হতে এখনও ২ মাস বাকি? (কি আশ্চর্য তাইনা)

আমি : বাহ আপনি আপনার মেয়েকে মেরে ফেলতে চান? আমি একজন মিডিয়া কর্মী।

অতঃপর সবাই থমকে গেলো।

কথার মোড় ঘুরিয়ে ফেললো। এমন ভাব করতে লাগলো তারা আসলে জানেই না কত বছর বয়সে মেয়েকে বিয়ে দিতে হয়। আমাকে জিজ্ঞেস করতে লাগলো। মিনিমাম তো ১৮ বছর লাগে তাইনা? আমি বললাম অবশ্যই

ভদ্রলোক ২: আসলে এইরকম তো অনেক হচ্ছে ।গতকাল একটা হইছে গোপনে সেখানে আমি ছিলাম।

আমি : দেখেন অহরহ হচ্ছে ঠিক আছে। কিন্তু আমার চোখের সামনে তো আমি একটা বাল্যবিবাহ হতে দিতে পারিনা। হ্যাঁ বাংলাদেশে এমন অনেক হচ্ছে গোপনে।

ভদ্রলোক ২ : মেয়ের মাকে বলতে লাগলো। তাহলে মেয়ের তো ১৬ বছরই হয়নি ( কথা ঘুরাচ্ছে) তাহলে এখন ওকে বিয়ে দিলে আমরা যারা আসেপাশের লোকজন আছি তারাতো বিপদে পরবো কাজীকে বিপদে ফেলবো আর উনি মিডিয়ার লোক। উনিও তো বলবে যে আপনারা জেনেশুনে এটা কিভাবে করলেন।

(আমি বোঝালাম যে এটা অন্যায়)

তারপর সবাই দ্রুত স্থান ত্যাগ করে। হয়তো আমি আসার পরে আবার এসেছিলো।

মূলবিষয় : আমরা বিভিন্ন জায়গায় এইরকম ঘটনা প্রায় দেখি। কিন্তু সাহস করে কিছু বলতে পারিনা। আবার পরিচিত জনকে তো লজ্জায় বলতে পারিনা। কিন্তু আমরা চাইলেই একটি মেয়ের জীবন বাঁচিয়ে দিতে পারি। বাল্যবিবাহ যে শুধু দেশের জন্য ক্ষতি এমন কিন্তু নয়। মেয়েটির জন্যও ক্ষতি। তাই অন্তত আপনার চোখের সামনে হওয়া বাল্যবিবাহটি বন্ধে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করুন। কেননা আপনি হয়তো সবগুলো বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে পারবেন না কিন্তু একটি তো পারবেন। আর নিজে না পারলে প্রশাসনের সহায়তা নিন।

সর্বোপরি বাল্যবিবাহ বন্ধে ঐক্য গড়ে তুলি।