টেংরাটিলার আব্দুস সালাম প্রচার বিমুখ এক জীবন্ত কিংবদন্তী

FB_IMG_15141872809771127.jpg

ক্যাপশনঃ মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও লেখক আব্দুস সালামের সাথে তার স্বরচিত বই হাতে প্রতিবেদক আশিস রহমান

আশিস রহমান,দোয়ারাবাজার(সুনামগঞ্জ)থেকে
মুক্তিযুদ্ধের সময়কার প্রচার বিমুখ একজন জীবন্ত কিংবদন্তী সুনামগঞ্জের টেংরাটিলার আব্দুস সালাম।একাত্তরের সময় আব্দুস সালাম এক তরুনুদীপ্ত যুবক। পাকিস্তানী সেনাদের বর্বরতা তখন তরুণ আব্দুস সালামের হৃদয়ে দাগ কাটে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ডাকে সাড়া দিতে গিয়ে দেশের অন্যান্য যুবকদের মতো তিনিও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তার জন্ম ১৯৫৩ সালের ১৩ মার্চ নরসিংদীর বেলাবোতে। শৈশবে পরিবারের সাথে আব্দুস সালামও ভাগ্যের সন্ধানে দোয়ারাবাজার উপজেলার টেংরাটিলায় পাড়ি জমান। তখন থেকে টেংরাটিলাতে তার বেড়ে ওঠা এবং স্থায়ীভাবে বসবাস। ছাত্র জীবনে রাজনীতিতে হাতে খড়ি ছাত্র ইউনিয়নের মাধ্যমে। ১৯৬৯ সালে গোবিন্দগঞ্জ হাইস্কুলে দশম শ্রেণীতে পড়াশোনাকালী তিনি ওই প্রতিষ্ঠানের ছাত্র ইউনিয়নের আহবায়ক নির্বাচিত হন। আব্দুস সালাম সিলেট এমসি কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে পড়াশোনাকালীন এমসি কলেজের ভিপি ছিলেন তৎকালীন ছাত্র নেতা দিরাইয়ের সাবেক এমপি নাসির চৌধুরী। ওই সময়টাতে ছাত্র রাজনীতি বেশ উত্তাল ছিলো। আর তখনই আসে স্বাধীনতার ডাক। মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে তিনি এমসি কলেজ ছেড়ে সোজা চলে আসেন টেংরাটিলায়। ছাতকের কমরেড মানিকের হাত ধরে যোগ দেন কমরেড মনিসিংহের নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট পার্টিতে। এসময় তিনি ছাতক, দোয়ারাবাজার, গোবিন্দ গঞ্জ ও বৃহত্তর টেংরাটিলার বিভিন্ন মিটিং মিছিল ও সভায় পাকিস্তানী শোষণের বিরুদ্ধে জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিয়ে লোকজনদেরকে পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহনে উদ্বুদ্ধ করেন। এদিকে আব্দুস সালামের বড়ভাই ফজলুল হক তখন বৃহত্তর টেংরাটিলার স্বাধীন বাংলদেশ সংগ্রাম কমিটির সভাপতি। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে ফজলুল হকের নেতৃত্বে তখন এলাকার যুবকদেরকে সংগঠিত করার কাজ চলছে। সেই সুবাদে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের ইচ্ছা এমসি কলেজের মেধাবী ছাত্র আব্দুস সালামের মননে প্রবল ভাবে দানা বাধে। যেই ইচ্ছা, সেই কাজ। মে মাসের শেষের দিকে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে ছাতকের(বর্তমানে দোয়ারাবাজার উপজেলার অন্তর্ভুক্ত) বাশতলা ইয়ুথ ক্যাম্পে যোগ দেন। উল্লেখ্য, তৎকালীন এম.এন.এ আব্দুল হকের নেতৃত্বে বাশতলা ইয়ুথ ক্যাম্প গঠিত হয়। ভারতের চেলা ক্যাম্পের আর্মি সদস্য দেবদাস ও পাথরঘাটা ক্যাম্পের ইনচার্জ ক্যাপ্টেন চ্যাটার্জী বাশতলা ইয়ুথ ক্যাম্পের যুবকের তালিকা তৈরী করে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পাঠাতেন। শেষপর্যন্ত ইয়ুথ ক্যাম্পের দায়িত্ব এসে বর্তায় আব্দুস সালামের ওপর।তিনিও দীর্ঘদিন এই ক্যাম্পে একই কাজ করেন। বাশতলা ইয়ুথ ক্যাম্প পাকবাহিনীর দখলে চলে আসলে তিনি সহ কয়েক শতাধিক যুবককে স্থানান্তরিত করা হয় ভারতের ডিংরাই ইয়ুথ ক্যাম্পে। ডিংরাই ইয়ুথ ক্যাম্পেও তিনি দীর্ঘ দিন রিকোরিং এজেন্টের দায়িত্বে পালন করতে হয়। ফলে প্রত্যক্ষ ভাবে মু্ক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের সুযোগ হয়নি আব্দুস সালামের। ভাগ্যের ফেরে তিনি মুক্তিযোদ্ধার বদলে হয়ে উঠেন মুক্তিযুদ্ধের একজন সংগঠক কিংবা পরোক্ষ মুক্তিযোদ্ধা। উল্লেখ্য, ডিংরাই ইয়ুথ ক্যাম্পের মেডিকেলের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন ছাতকের বিশিষ্ট আওয়ামীলীগ নেতা মরহুম ডাঃ হারিছ আলী, দোয়ারাবাজারের ডাঃ আব্দুর রহিম প্রমুখ। এই ক্যাম্পে ভারতীয় ইনচার্জ ছিলেন ফ্লাইট লেফটেনেন্ট এন.সি বসাক এবং বাংলাদেশের পক্ষে ইনচার্জ ছিলেন ছাতকের কমরেড মানিক মিয়া, ডেপুটি ইনচার্জ সুনামগঞ্জের দিরাইয়ের কমরেড আব্দুল গনি, একই দায়িত্বে ছিলেন ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরির শ্রমিক ইউনিয়েনের নেতা আব্দুল খালেক, লঙ্গর কমান্ডার ছিলেন জগন্নাথ পুরের সৈয়দ সাহেব, যুবকদের প্রশিক্ষণ করাতেন আনসার কমান্ডার দোলন। বর্তমানে উনাদের কেউ আর পৃথিবীতে বেচেঁ নেই । নভেম্বরে আব্দুস সালাম টাইফয়েড জ্বরাক্রান্ত হয়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পরায় উনাকে ভারতের শিলংয়ে সিএইচএমে ভর্তি করা হয়। এখানে দীর্ঘদিন চিকিৎসা সুস্থ হয়ে উঠার পর হাসপাতালের ডাক্তারদের সাথে দুভাষী হিসেবে কাজ করেন। পরবর্তীতে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ২১ ডিসেম্বর বাড়িতে ফেরেন এবং স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের পুনর্গঠনের কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। আশির দশকে বৃহত্তর লক্ষীপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রোসমত আলী(চিনু চেয়ারম্যান) অসুস্থ থাকাকালীন সময়ে তৎকালীন নির্বাচিত মেম্বাবার আব্দুস সালাম ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দায়িত্বে থাকাবস্থায় তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী মেজর ইকবালের সহযোগিতায় আব্দুস সালামই সর্বপ্রথম দোয়ারাবাজার থেকে বোগলা সড়কের নির্মাণ কাজ সফলভাবে শুরু করেন। এছাড়াও তিনি খাসিয়ামারা নদীর দুপারের বন্যা প্রতিরোধক বাধ, কনছখাই হাওরের ফসল রক্ষা বাধ, কাঙলার হাওরের ফসল রক্ষা বাধ নির্মাণ করে ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করেন। বৃহত্তর লক্ষীপুর ইউনিয়নের সর্বস্তরের জনসাধারণের কাছে তিনি সালাম মেম্বার নামে সমধিক সুপরিচিত। জনপ্রতিনিধি হওয়ার আগ থেকে আজোবধি তিনি এলাকার সকল সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন কর্মকান্ডে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ ভাবে নিয়োজিত রয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার শরনার্থী ক্যাম্পে অবস্থানের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আব্দুস সালাম বলেন, “এখনো চোখের সামনে ভেসে ওঠে শরনার্থীদের মরা লাশের দৃশ্য। সেই দিনগুলিতে একদিকে তীব্র মৌল মানবিক সংকট অপরদিকে ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েড, আমাশয় সহ নানাবিধ রোগে প্রতিদিন অসংখ্য শরনার্থীদের লাশের মিছিল যেন এক নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাড়িয়ে ছিল। যখনই মনে হয় স্বজনহারাদের আর্ত চিৎকারের শব্দে এখনো আৎকে উঠি।” বার্ধক্যে এসেও আব্দুস সালামের মনোবল এখনো আগের মতোই। স্বপ্ন নিয়ে পরিবার পরিজনদের মাঝে এখনো বেচেঁ আছেন মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শী ও সংগঠক আব্দুস সালাম। পরিণত বয়সে এসেও তিনি থেমে নেই। নানাবিধ শারীরিক অসুস্থতার মধ্যেও তিনি লিখে যাচ্ছেন একের পর এক মুক্তিযুদ্ধ ধর্মী লেখা। ইতোমধ্যে সুনামগঞ্জের উড়াল প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত তার স্বরচিত মুক্তিযুদ্ধ ধর্মী বইগুলো হল আমার স্মৃতি বিজরিত ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ৭১-এর নীলার রক্তস্নান (উপন্যাস ধর্মী), ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের এপিঠ ওপিঠ, ঐতিহাসিক টেংরাটিলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য, গল্পমঞ্জুরী ইত্যাদি। এছাড়াও তার প্রকাশিতব্য আরেকটি বই হল রূপসী সুনামগঞ্জ। স্বাধীনতার রজতজয়ন্তীতে এদেশের নবীন প্রবীণদের একসাথে দাড়ানোর স্বপ্ন দেখেন তিনি। তার বিশ্বাস সাধারণ মানুষদের অর্থনৈতিক মুক্তি ও গনতন্ত্রের পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারলেই এদেশের মানুষ স্বাধীনতার প্রকৃত স্বাদ অনুভব করতে পারবে এবং সার্থক হবে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা।

Top