এক টুকরো ভালোবাসা-’শিশির কনা’ – নাজমে নওরোজ

IMG-20180206-WA0000.jpg

—————-
‘এই রিক্সা,যাবেন?’
‘কই আপা?’
‘চিটাগাং কলেজ?’
‘উঠেন’
হুটটা নিজেই তুলতে চাইলাম কিন্তু ততক্ষনে রিক্সা ওয়ালা নিজেই এগিয়ে এলো । একটু দেরী হয়ে গেল ।
টেনশন হচ্ছে । ফাস্ট পিরিয়ড টা মিস্ না হয় । রিক্সা ভাই একটু তাড়াতাড়ি চলেন ভাই । দেরী হয়ে গেছে
তো তাই বলছি । ‘এইতো আপা আর একটু’ । ইকোনমিকস ক্লাস,বারী স্যারের লজ্জা দেবার পদ্ধতি টা একটু
ভিন্ন । না পারলে হেসে হেসে বারোটা বাজিয়ে ছাড়বেন । এখন মনে থাকলেই হয় । কলেজ গেটে নেমে
পড়লাম ।অনেকটা দৌড়ে ঢুকে গেলাম ক্লাসে । ক্লাস হচ্ছে তিন তলায় । ফাস্ট পিরিয়ড, মোটামুটি সব
স্টুডেন্ট হাজির । কিন্তু সে কই ? তাকে তো দেখা যাচ্ছে না ? মনটা মুহুর্তেই দুর্বল হয়ে পড়লো । মন আর
চোখ যখন এক সাথে কোনো কিছুর সন্ধান করে বেড়ায় তখন অস্থিরতার মাত্রা আকাশ ছোঁয় । ছোট্ট করে
পাশে বসা দীপিকা কে ডেকে বললাম
“শোন্ তুই কি শিশির কে দেখতে পারছিস?”
দীপিকা মিষ্টি হেসে বললো “তোর পিছনে বসে আছে।” আমি আমার বোকামীতে এতো লজ্জা বোধহয় আর
কোনদিন পাইনি । ঘাড় ঘুরাতেই শিশিরকে দেখতে পেলাম,ঠোঁটের কোনে একটা মুচকি হাসি দিয়ে আমাকে
শুভ সকাল এর শুভেচ্ছা জানিয়ে দিল । ক্লাস শুরু করলাম । স্যার আমাদেরকে ম্যালথাসের জনসংখ্যা তত্ব
নিয়ে লিখতে বললেন । মোটামুটি সম্মানের সাথেই ক্লাস শেষ হল । স্যার বের হতেই একটা কাগজ ছোট্ট করে
ভাঁজ করে আমার হাতে দিয়ে শিশির বের হয়ে গেল । আমি আলতো করে কাগজটা চোখের সামনে খুলে
ধরলাম । তাতে লেখা-
“তুমি এতো সুন্দরী কেন হলে কনা?
হাল্কা হলুদ রং এর কাপড় আর তোমার হলুদ বর্ণ
এই দুয়ের মিলনে তুমি মিশে একাকার কনা ।
এতো সুন্দর তুমি?
বিধাতার সুন্দর সৃষ্টি তুমি কনা
এই সৌন্দর্য শুধুই আমার
তুমি,আমি শিশিরের শিশির কনা।”
দীপিকা যাবার সময় আমাকে ডেকেছিলো মনে হয় । কিন্তু আমার বসেই থাকতে মন চাইছিলো । সবাই
বেরিয়ে গেছে । আমি আস্তে উঠে কাগজ টা হাতের মুঠোতে নিয়ে বেরিয়ে এলাম । ভালোবাসার
ভালোলাগাগুলো একটু পাগলামীর হয় । লেখাটা পড়ে আমি এতোটাই আবেগ প্রবণ হয়ে পড়েছি,আমার জন্য যে
শিশির অপেক্ষা করছে সেটাই আমার মাথা থেকে ছুটে গেছে।একটু তাড়াতাড়ি হেটে যেতেই দেখলাম,সিঁড়ির
সামনে ও দাড়িয়ে আমার অপেক্ষা করছে । আমাকে দেখে পা বাড়ালো,আমি ওর পিছু নিলাম। নীচে নেমে
পাশাপাশি হাঁটছি,ক্যান্টিনের দিকে যাচ্ছি।”সকালের নাস্তা কেন করোনি বলোতো ? ঘুম ভাঙাতে দেরী করেছ
তাইনা ? নিশ্চয় খুব ক্ষুধা লেগেছে,তোমার ?” আমি কথা বলছি আর হাঁটছি । কথা বলছি কিন্ত ওর চোখের
দিকে তাকাতেই পারছিনা । আমি শিশিরের কনা । বারবার এই কথাটি মনে পড়ছে আর আমি লজ্জাবতী
গাছের পাতার মতো ভিতরে ভিতরে নুঁয়ে যাচ্ছি । লিখতে তার জুড়ি নেই, মুখে বলতেই সব বাঁধা । ক্যান্টিনে

ঢুকে কোণার দিকে একটা টেবিলের চেয়ার দুটোতে বসলাম ।পরোটা আর ডিম ভাজার অর্ডার হল । আমার
জন্য শুধু এক কাপ চা ।
“আজকে তো মাত্র আর দুটো ক্লাস, চলোনা, আজ আর ক্লাস না করি ? চলোনা সারাদিন রিক্সা নিয়ে ঘুরে
বেড়াই?”
চা খেতে খেতে বললাম,কিন্তু ও মজা করে খেয়েই যাচ্ছে । মনে হলোনা আমার কথা তার কানে গেছে । তৃপ্তি
সহকারে চা খেয়ে উঠলাম দুজনে । বের হতেই ও আমার হাত ধরে কলেজ থেকে বের হওয়ার পথের দিকে পা
বাড়ালো । আমি কিছু বুঝে উঠার আগেই দুজনে রিক্সায় চড়ে বসলাম । আমি ওর দিকে তাকালাম,সেই চেনা
তার ঠোঁটের কোণের মিষ্টি হাসি । রিক্সার হুট টা দিয়েই দিলাম।
“কই যাবেন ভাই? “
“তুমি চলতেই থাকো ভাই । থামতে হলে আমি বলবো তোমাকে ।”
“তুমি যে আমার কথা শুনেছিলে তা কিন্ত তোমাকে দেখে মনে হয়নি শিশির । গুন গুন করে কেন গাইছো ?
একটু জোরে গাও যাতে আমিও তোমার সুরে সুর মিলাতে পারি ।”
সত্যি সত্যি ও একটু জোরেই গেয়ে উঠলো, সেই সাথে আমিও গেয়ে উঠলাম…………
“আজ মন চেয়েছে আমি হারিয়ে যাবো হারিয়ে যাবো
আমি তোমার সাথে…………….কিছু সময় রেখ তোমার হাতে”।
রিক্সা টেনে চলছে আর সেই সাথে আমরা শিশির কনা গানে গানে মন ভরে ভালোবাসার স্বাদ নিচ্ছি।
মনের আনন্দে মন পেখম তুলে নাচে,জীবনের মানে কি যদি প্রেম দুয়ারে প্রবেশই না করি । কিছুই না শুধু
মনের মানুষ কে খুব কাছে নিয়ে এই রিক্সা ভ্রমন যদি এতো আনন্দের হয়,না জানি বাকী জীবন এক সাথে এক
আত্মা এক প্রাণ হয়ে বেঁচে থাকার আনন্দ কেমন হবে ! শিশির বলল “রিক্সা ভাই একটু দাড়াতে পারলে ভালো
হয় । একটু হাঁটতে ইচ্ছা হচ্ছে।” “আইচ্ছা।” আমার কোনো কিছুতেই মানা নেই । আমি এখন ভালোবাসার
স্বাদ নিচ্ছি,প্রানে প্রানে গানে গানে যৌবনের টানে ভালোবাসার স্বাদ নিচ্ছি । মানা কিসের ? রিক্সা দাড়ালো ।
আমার হাতটা ধরেই শিশির আমাকে নামতে সাহায্য করলো । আমরা পতেঙ্গা বীচের কাছেই নেমেছি ।
সামনে এগিয়ে গেলাম । গুন গুন করে গান ধরলাম……..
“সাগরের তীর থেকে মিষ্টি কিছু হাওয়া এনে……
…..ভাবি মনে মনে……..”।
সাগর পাড়ে দুজন দুজনার হাত ধরে হাটছি।অনন্ত প্রেমের ভাবনাহীন দুটি প্রেমিক প্রেমিকা হাতে হাত রেখে না
বলা শত ওয়াদা নিঃশর্তে মেনে নিয়ে হেঁটে চলেছি।

“কনা আমি তোমাকে কতোটা ভালোবাসি,তার সবটুকু যদি তোমাকে বোঝাতে পারতাম,এই সাগর তার সামনে
হার মেনে নিত । তোমার চোখে চোখ রেখে যদি আমার স্বপ্ন গুলোকে আঁকতে পারতাম তাহলে রং ধনুর সাত
রং লজ্জা পেত । তোমাকে ভালোবেসে তোমাকে পাওয়ার আনন্দ যদি জীবন দিয়ে দেখাতে পারতাম তাহলে
তুমি বুঝতে আমি শিশির ছাড়া তুমি কনা কতোটা একা কতোটা অপূর্ণ ।” আমি আর পারছিনা,আমি সব লজ্জা
ভুলে শিশির কে বুকে জরিয়ে নিলাম । আনন্দের অশ্রুজল দুজনের চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে,হৃদয়ের স্পন্দন
এক হয়ে মিশে আছে,সাগরের জলরাশি ভালোবাসার নীরব সাক্ষী হয়ে আমাদের পা ছুঁয়ে যাচ্ছে, সূর্য্য অস্ত যাবার
সামান্য আগের লাল আভা আমাদের দুজনের মুখ দুখানা রক্তিম আলোয় ভরিয়ে রাখছে।এতো ভালোবাসা এতো
প্রেম এতো ভরসা শুধু জড়িয়ে থাকার মাঝেই এতো বেশী ?
“শিশির তুমি কথা দাও আমাকে এভাবেই তোমার শক্ত বাহুতে সারাজীবন জড়িয়ে রাখবে? আমাকে ছেড়ে
যাবেনা কক্ষনো ? আমি তোমার মাঝেই চিরদিনের জন্য নিজেকে সঁপে দিয়েছি শিশির,দয়া করে আমার তীব্র

ভালোবাসা তোমার ভালোবাসা দিয়ে গ্রহণ করো, আমি শুধু তোমারই,শুধু তোমামারই শুধু তোমারই শিশির
কনা।”
লেখক পরিচিতিঃ- গল্পকার, সমাজ উন্নয়ন কর্মী ও নারী উদ্যোক্তা ।

Top