ভোলায় নদীভাঁঙনে নি:স্ব চরের অন্তত ১২-১৩শ’ পরিবার অধিকার ফিরে পেতে চান,গড়তে চান বসতি

Bhola-pic-02-4.jpg

ফয়সল বিন ইসলাম নয়ন,ভোলা প্রতিনিধি :
ভোলার ঢালচর ইউনিয়ন পরিষদ সূত্র বলছে, চরের পশ্চিম, দক্ষিণ-পশ্চিম এবং দক্ষিণ দিকে বিপুল পরিমাণ খাসজমি পড়ে আছে। যার পরিমাণ হবে প্রায় দুই হাজার একর। সেখানে কোনো গাছপালা নেই। কিছু এলাকায় প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো ছড়ানো ছিটানো কিছু গাছ রয়েছে। ৪০ বছরেরও বেশি পুরনো এই চরের জমি বেশ উবর। এখানে চাষাবাদ হতে পারে। বসতি গড়তে পারে নদীভাঙনে নি:স্ব চরের অন্তত ১২-১৩শ’ পরিবার।
ঢালচরের পশ্চিমে আনন্দ বাজারের নিকটে দীর্ঘ চর থেকে শুরু করে পশ্চিম ও দক্ষিণ দিকে সরেজমিন ঘুরে এরই প্রমাণ মেলে। আনন্দ বাজার লাগোয়া বনে এখন আর গাছপালা নেই বললেই চলে। প্রকৃতি যেন সবুজ ঘাসের গালিচা বিছিয়ে রেখেছে এই চরে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে গরু-মহিষের বিচরণ চোখে পড়লো। কিন্তু এই চরে গাছপালার সংখ্যা একেবারেই কম। গাছ মরে যাচ্ছে, চুরি হয়ে যাচ্ছে। বনের পাশে চরের সরু খাল। খালের ওপারে আবারও বৃহৎ বনাঞ্চল। কিন্তু এই বনের গা ঘেঁষে আরও রয়েছে বিশাল খাস জমি: যেখানে কোন গাছপালা নেই।
ভাঙনের বিপরীতে বিপুল সম্ভাবনার হাতছানি। গত কয়েক বছর ধরে নদী ভাঙনে ভোলার চরফ্যাসনের সর্বদক্ষিণের জনপদ ঢালচর ছোট হয়ে এলেও এর পশ্চিম ও দক্ষিণে পড়ে আছে প্রায় দুই হাজার একর পতিত খাসজমি। দ্বীপের মানুষ এই জমিতে অধিকার চান।গড়তে চান বসতি, আবার গড়ে তুলতে চান সাজানো গোছানো বাড়ি। কিন্তু আইনগত জটিলতা তাদের সে দাবি পূরণে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরেজমিন ঘুরে ঢালচরের পশ্চিম ও দক্ষিণে বিশাল ফাঁকা চর চোখে পড়ে। চরের বালু দেখে বোঝা যায়, এখানে সমুদ্র বা নদী থেকে পানি ওঠে না। বালু শুকিয়ে গেছে। ওপরে জন্মেছে সবুজ ঘাস। ছড়ানো ছিটানো কিছু কুল গাছ দেখা যায় এই চরে। হয়তো সমুদ্রের পানিতে ভেসে আসা বীজ থেকে এই গাছের জন্ম হয়েছে। আর কাঁটাওয়ালা গাছ বলে এগুলো বেঁচে আছে। দক্ষিণ-পশ্চিমের এই চরের পাশে বন বিভাগের একটি বড় এলাকা রয়েছে। সেখানে অনেক কেওড়া গাছ মরে যাচ্ছে। বনের ভেতরের খালে এখন আর জোয়ারের পানি প্রবেশ না করায় কেওড়া গাছের শ্বাসমূল মরে যাচ্ছে। ফলে গাছগুলোও মারা যাচ্ছে। সংকটের মুখে থাকা গাছগুলো মরে গেলে আরও বিপুল এলাকা বৃক্ষশূণ্য হয়ে যাবে। বন এলাকাও ছোট হয়ে যাবে।
পতিত খাসজমিতে নিঃস্ব মানুষের পুনর্বাসন বিষয়ে আলাপ হচ্ছিল ঢালচর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আবদুস সালাম হাওলাদারের সঙ্গে। তিনি বলেন, চরে যে পরিমাণ পতিত খাসজমি রয়েছে, তাতে নদীভাঙনে নি:স্ব পরিবারগুলোকে পুনর্বাসন করা সম্ভব। ক্ষতিগ্রস্ত সকল পরিবার পুনর্বাসনের পরও জমি থেকে যাবে। সরকারকে এ বিষয়ে আমরা বিভিন্নভাবে জানালেও কোনো ইতিবাচক ফল মেলেনি। ঢালচরের সম্ভাবনা বিকাশের স্বার্থে এবং মানুষের পুনর্বাসনের প্রয়োজনে আমরা পতিত খাসজমি বন্দোবস্ত চাই।
সূত্রগুলো বলছে, বন এলাকায় বসতবাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে আইনগত জটিলতা থাকার কারণে বনের ধারে বিপুল পরিমাণ খাসজমি পড়ে থাকলেও তাতে ভূমিহীনের অধিকার প্রতিষ্ঠা হচ্ছে না। উপকূল অঞ্চলে জেগে ওঠা চরে গাছ রোপণের দায়িত্ব বন বিভাগের। গাছ বড় হয়ে গেলে এবং চর বসবাসের উপযোগী হলে চরের জমি প্রকৃত ভূমিহীনদের মাঝে বন্দোবস্ত দেওয়ার বিধান রয়েছে। এতে ২৫ থেকে ৩০ বছর লাগে। কিন্তু বন বিভাগের আওতাধীন ঢালচরের এই পতিত খাসজমির বয়স ৪০ বছর অতিক্রম করলেও এ বিষয়ে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
ভূমিহীন পরিবারের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে খাসজমি বন্দোবস্তের দাবির এ বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। সর্বশেষ মামলাটি ঝুলছে ভোলা জজকোর্টে। এছাড়াও সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে এ খাসজমি পাওয়ার লক্ষ্যে আবেদন নিবেদন করা হয়েছে। কিন্তু খাসজমি বন্দোবন্তের প্রক্রিয়া এগোয়নি। ঢালচরের সচেতন নাগরিক ও ঢালচর ভূমিহীন কৃষক সমবায় সমিতির সদস্য মাস্টার আনিসুর রহমান বলেন, ১৯৮৩ সালের জরিপ অনুযায়ী আমরা খাসজমিতে দখল চেয়েছি। আমরা বলছি, এই জমিতে বন উৎপাদনের কোনো উপযোগিতা নেই। এখানে ফসল আবাদ, বৃক্ষ জাতীয় উদ্ভিদ এবং বসতি গড়ার যথেষ্ট উপযোগিতা রয়েছে। বন্দোবস্ত দেওয়া হলে দ্বীপের সকল ভূমিহীন পরিবার মাথা গোঁজার ঠাঁই পাবে।
তিনি বলেন, এরশাদ সরকারের শাসনামলে চরে ভূমিহীন কৃষক সমবায় সমিতি গঠন করা হয়েছিল। ওই সময় নীতিমালা চালু হয়েছিল, ২০ একরের উর্ধ্বে কোথাও খাসজমি থাকলে তা ভূমিহীনদের মাঝে বন্টন করা হবে। ঢালচরবাসী এর কোনো বাস্তব প্রতিফলন দেখেনি। ঢালচর ভূমিহীন কৃষক সমবায় সমিতি আজও ভূমিহীনদের ভূমির অধিকারের জন্য লড়াই করছে। সমিতিতে সদস্য সংখ্যা প্রায় ১২শ’ পরিবার। ঢালচরের পুরানো বাসিন্দাদের মধ্যে অনেকেই বাড়িঘর হারিয়ে নি:স্ব হয়ে এখানে সেখানে কোনমতে বসতি গড়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। অনেকে অন্যের জমিতে বসবাস করছেন। কেউ কেউ আবার কিছু অর্থকড়ি যোগাড় করে মূল ভূ-খন্ডে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। এ অবস্থায় চরের খাসজমিতে ভূমিহীনদের পুনর্বাসন সবারই দাবি।
প্রায় ৪০ বছর ধরে ঢালচরে বসবাসকারী জেবল হক (৭৫) জানালেন, নদীর ভাঙন আমাদের জীবন এলোমেলো করে দিয়েছে। এক সময় দ্বীপের মানুষের অবস্থা বেশ ভালো ছিল। কিন্তু ক্রমে অবস্থা খারাপ হতে থাকে। সহায় সম্পদ নদীতে হারানোর পাশাপাশি অধিকাংশ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ছে। চর ছেড়ে আমরা যেতে চাই না। চরে যে খাসজমি পড়ে আছে, তাতে সকল নি:স্ব ভূমিহীন পরিবারকে বাঁচার ঠিকানা করে দেয়া সম্ভব।
বন বিভাগের ঢালচর রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা কারার মাহবুব হোসেন বলেন, নতুন চর জাগিয়ে তোলা বা শক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে চরে বন বিভাগের তত্ত্বাবধানে গাছ লাগানো হয়। ঢালচরের বন এলাকার কিছু খাসজমির বয়স ৩০-৪০ বছর হয়েছে। কিছু এলাকায় গাছপালা নেই। তবে এ জমি ভূমিহীনের জন্য বরাদ্দের ক্ষেত্রে আন্তমন্ত্রণালয়ের বৈঠকের প্রয়োজন রয়েছে। ওই বৈঠকের মধ্য দিয়ে খাসজমি বন বিভাগের কাছ থেকে স্থানীয় সরকার বিভাগ পাবে। সেখান থেকে জমি বন্দোবস্তের নিয়ম।

Top