চুনতীর ঐতিহাসিক ১৯ দিন ব্যাপী সীরাতুন্নবী ; ইসলাম প্রতিষ্ঠায় এক অনন্য অবদান

25488918_1548688268511992_1464600035_n.jpg

মরহুম হযরত শাহ ছাহেব কেবলা (রহ.)

শহীদুল ইসলাম বাবর :
মুসলমানদের ইমানী শক্তিকে বলিয়ান ও রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর জীবন কর্ম প্রচারের মাধ্যমে মানুষকে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে ধাবিত করার মহান উদ্যেশে ১৯৭২ সালে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতীর মহান আধ্যাত্মিক সাধক আশেকে রাসূল (সঃ) হিসেবে খ্যাত হযরত আলহাজ শাহ মাওলানা হাফেজ আহমদ প্রকাশ (শাহ ছাহেব কেবলা) (রাঃ) বিশ্বের একমাত্র ১৯ দিনব্যাপী সীরতুন্নবী (সঃ) প্রতিষ্টা করে মুসলমানদের এক প্রেরনার ঝর্ণা ধারা তৈরী করে গেছেন। তারই ধারাবাহিকতায় আহকামুল হাক্বেমিন শফিউল মুজনবীইয়ীন রাসুলের (সঃ) সীরত বর্ননার এ ঐতিহাসিক মাহফিলটি এখনো জারী রেখেছেন। এ বছর গত ১ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া ১৯ দিন ব্যাপী মাহফিলটি ৪৭ বছরে পর্দাপন করল। ১৯ ডিসেম্বর মঙ্গলবার এ মাহফিলের সমাপনী দিবস। আর বুধবার ভোরে ফজরের নামাজের আগে অনুষ্ঠিত হবে সমাপনী মোনাজাত। এ আখেরী মোনাজাতে অংশ নেওয়ার জন্য দুর-দুরান্ত থেকে ছুটে আসেন লাখো ধর্মপ্রান মানুষ।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত সীরত স্মরণীকায় হযরত শাহ ছাহেব কেবলার প্রধান সহযোগী চুনতী মাদ্রাসার তৎকালীন নাজেমে আলা আল্লামা ফজলুল্লাহ (রাঃ) এ মাহফিল সর্ম্পকে লিখেছেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পূর্বাপর সময়ে দেশের মানুষের নৈতিক অবক্ষয় চরম পর্যায়ে পৌছে। মসুলমান-মুসলমানদের প্রতি ছিল বিরাগবাজন । ইসলাম হয়েছিল মানুষের কাছে একটি অপ্রিয় বস্তু। সত্য ও ন্যায়ের কথাটি ছিল মানুষের কাছে অত্যান্ত তিক্ত। ইসলামের পক্ষে কথা বলার সাহস কারো ছিলনা। কালের পরিক্রমায় চলে আসা ওয়াজ মাহফিলও বন্ধ হয়ে পড়ে। ইসলামের এমন বিপর্যয় মুহুর্তে জাতীকে ধর্মীয় ও নৈতিক অবনতির অতল গহব্বর থেকে উত্তোলন করার জন্য দুঃসাহসিক ভুমিকায় অবর্তীণ হয়েছিলেন চুনতীর শাহ ছাহেব কেবলা (রাঃ)।প্রথম পর্যায়ে ১৯৭২ সালে তিনি একদিনের সীরত মাহফিল আয়োজন করলেন। সেই মাহফিলে প্রধান বক্তা ছিলেন বড় হুজুর হিসেবে পরিচিত মরহুম মাওলানা আমীনুল্লাহ (রহঃ)। গত ২০১৪ সালে মাহফিলের সমাপনী দিবসে মাহফিলের মেহমান প্রফেসর ড. আবু রেজা মোহাম্মদ নেজাম উদ্দিন নদভী এমপিকে কুচক্রি মহল কর্তৃক লাঞ্চিত করার ঘটনায় জের ধরে পরবর্তি বছর সমূহে প্রশাসনের দেওয়া একাধিক শর্ত মেনে মাহফিল চালিয়ে নিচ্ছেন
এন্তেজামিয়া কমিটি। অনাখাঙ্খিত ঘটনার পর থেকে প্রতি বৎসরই প্রফেসর ড. আবু রেজা মোহাম্মদ নেজামুদ্দিন নদভী এমপি এ মাহফিলটি উদ্বোধন করেন। চলতি বছরও তিনি শতাধিত গাড়ির বহর নিয়ে এ মাহফিল উদ্বোধন করতে আসেন।
পবিত্র মাহফিলের নাম করণ ঃ পরবর্তী বছর ১৯৭৩ সালে মাহফিল শুরুর আগে নাম করনের জন্য তৎকালীন স্বনামধন্য আলেম ও গন্যমান্য ব্যাক্তিবর্গদের নিয়ে পরার্মশ সবার আয়োজন করেন মুজাদ্দেদে মাহফিল হযরত শাহ ছাহেব কেবলা। সেই সভায় মাহফিলের নাম মিলাদুন্নবী, ইয়াউম্মুন্নবী ও সীরতুন্নবী প্রস্তাব এলে তিনিই সীরতুন্নবী নাম রাখার ব্যাপারে একমত পোষন করেন। সেই থেকেই সীরতুন্নবী নামেই এ মাহফিলটি প্রতি বছরের রবিউল আউয়াল মাসে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
১দিন থেকে ১৯ দিনের মাহফিল ঃ
তথ্যনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৭২ সালে রবিউল আউয়াল মাসের ১১ তারিখে চুনতী শাহ মঞ্জিল চত্তরে ১দিন ব্যাপী সীরত মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তি ১৯৭৩ সালে ৩দিন ব্যাপী, ১৯৭৪ সালে ৫দিন, ১৯৭৬ সালে ১০ দিন, ১৯৭৭ সালে ১২ দিন,১৯৭৯ সালে ১৫দিন একই বছর ২ দিন বাড়িয়ে ১৭ দিন, আরো ২দিন বাড়িয়ে ১৯ দিনব্যাপী সীরতুন্নবী মাহফিল করা হয়। সেই ১৯৮০ সাল থেকেই ১৯দিন ব্যাপী সীরতুন্নবী (সঃ) মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।শুধু মাহফিলতো নয় প্রতিদিন মাহফিলে আগ¦ত শ্রোতাদের জন্য রয়েছে খাবারের আয়োজন। সীরত ময়দানের উত্তর পূর্ব কোণায় অবস্থিত রান্নার ঘরে বার্বুচি ও সেচ্ছাসেবকদের ব্যস্থতা দেখলে বাঝা যায় কত লোক প্রতিদিন এখানে অনেকটা আয়েশের সাথে খাবার গ্রহণ করছে। স্থানীয় বাসিন্দারা পালা করেই এ মাহফিলের যাবতীয় কাজ আঞ্জাম দিয়ে থাাকেন।
১৯দিন যেন একটি মাকবুল সংখ্যা ঃএলাকার জনসাধারণ ১৯ দিন ব্যাপী মাহফিল এন্তেজামের বিষয়ে সন্দিহান থাকলেও হযরত শাহ ছাহেব কেবলা ১৯দিন ব্যাপী সীরতুন্নবী করার জন্য অনড় ছিলেন। আল্লাহ তায়ালা ১৯ সংখ্যাটি এই ভাবে কবুল করে দেখালেন যে, ১৯৮৩ সালের মাহফিল শুরুর টিক ১৯দিন আগে ২৩ সফর লক্ষ লক্ষ ভক্ত অনুরক্তকে শোক সাগরে ভাসিয়ে মহান আল্লাহর মেহমান বনে গেলেন ইসলামের এই সাধক। সেই থেকে মাহফিল শুরুর ১৯দিন আগে হুজুরের ইছালে ছওয়াব মাহফিল আয়োজন করা হয়।
কোন বাজেট ছাড়াই এত বড় আয়োজন ঃ
কোন নগদ টাকা ছাড়াই এ মাহফিলের সূচনা। শাহ ছাহেব কেবলার কাছ থেকে এ মাহফিলের বাজেটের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি জবাব দিতেন রাসুল (সঃ) এর সীরত মাহফিল করতে বাজেট কিসের? আল­াহ পাক দুনিয়া তৈরী করতে বাজেট করেছেন মুহাম্মদ (সঃ) কে আর সেই নবীজির সীরত মাহফিলে কোন ঘাটতি হবেনা। তার জীবদ্দশায় ১২টি মাহফিল ও ইন্তেকালের পর ৩০টি মাহফিল পার হয়ে এখন ৪৪ তম মাহফিল চলছে। এ মাহফিলে বাজেট ঘাটতি তো দুরের কথা গত ২০১০ সালের হিসাব অনুযায়ী ৬২ লক্ষ ৮৭ হাজার, ৭শ ৫০ টাকা, ৫০ পয়শা খরচ করেও ১ লক্ষ ৯২ হাজার,৪শ ৫৮ টাকা, ৫০ পয়সা উদ্ধৃত থেকে গেছে। এলাকার প্রখ্যাত আলেমরা এ বিষয়ে বলেন, এ বিশাল এন্তেজামে আল্লাহর বিশেষ রহমত থাকে, না হয় এটা কিভাবে সম্ভব? এ বছরে মাহফিলের বাজেট নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ২ কোটি টাকা। এর আগের বছর এ মাহফিলের বাজেট ছিল এক কোটি ৮৫ লক্ষ টাকা প্রায়। এত বিশাল বাজেটের আয়োজন শুধু চট্টগ্রামে নয় সার াদেশ ব্যাপীই আর ২য় টি নেই।
চুনতীর সীরত মাহফিল এলাকাবাসীর প্রান ঃ
একটানা ১৯ দিন ব্যাপী মাহফিলে আগ¦ত ধর্মপ্রান মুসলমানবৃন্ধ, ওয়াজেীনে কেরাম, সেচ্ছাসেবকবৃন্ধ, এলাকার মহিলা ও শিশুদের জন্য টানা ১৯ দিন খানা পিনার ব্যবস্থা করা চাট্টিখানি কথা নয়। কিন্তু এই অসাধ্য সাধন করে চলেছেন, সীরত মাহফিল এন্তেজামিয়া কমিটি ও ধর্মপ্রান এলাকাবাসী। এলাকার শত শত মানুষ রাত-দিন সমানতালে হাজার হাজার মানুষের খানাপিনার এন্তেজাম করতে ব্যস্থ থাকেন। এলাকাবাসীর পাশাপাশি এ মাহফিল এন্তেজাম করতে প্রচুর পরিশ্রম করেন চুনতী হাকিমিয়া কামিল মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষক বৃন্ধরা। এ মাহফিলকে কেন্দ্র করে পুরো চুনতী এলাকায় যেন ঈদের আমেজ সৃষ্টি হয়। প্রতিটি বাড়িতে মেহমানে ভরপুর। এখানে অলৌকিক বিষয় হচ্ছে যে প্রতিদিন এক সাথে আড়াই হাজার নারী পুরুষ ও শিশুদের খাবার পরিবশেন করা হয় কিন্তু আড়াই হাজার মানুষকে এক সাথে খাবার পরিবেশনে অতি জোর সময় লাগে ১০/১৫ মিনিট এটা কি আল­াহর বিশেষ রহমত ছাড়া সম্ভব?
চুনতীর সীরত সবার জন্য নিয়ামত ঃ
হযরত শাহ ছাহেব কেবলা (রহঃ) বলতেন সীরতুন্নবী করেছি গুনাহগার উম্মতদের বাচাঁবার জন্য। যারা টাকা পয়সা, জানমাল নিয়ে শরীক হচ্ছে তারা এর বরকতে সওয়াবের পাশপাশি বিপদ-আপদ রোগমুক্তির মত অনেক ফায়দা দুনিয়াতে পেয়েছেন। যার কারনে অনেক অমুসলিম পর্যন্ত দুনিয়াবী কামিয়াবির জন্য মাহফিলে আসতেন এবং বাস্তবে ফায়দা পেয়েছেন। চুনতীর মাহফিল এন্তেজাম, নবী প্রেমিকদের সমাগম মুসলমানদের হৃদয়ের গভীরে নাড়াঁ দেয়। নতুন করে প্রেরনা যোগায়। এ মাহফিল থেকে উৎসাহিত হয়ে প্রতিটি পাড়ায় মহল­ায় সীরতুন্নবী, মিলাদুন্নবী মাহফিলের আয়োজন করে মানুষকে আল­াহর খাঁিট বান্দা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন রাসূল (সঃ) এর উম্মতরা। এ মাহফিল কেয়ামত পর্যন্ত কায়েম থাকবে এবং মানুষ অন্ধকার রাস্তা থেকে আলোর পথে (আল­াহর নির্দেশিত পথে) ধাবিত করার দৃঢ় পদক্ষেপ নয় কি?

লেখক সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী।

Top