রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সংক্রামক রোগে সাড়ে ৩ মাসে ৪৭ জনের মৃত্যু

download-2-4.jpg

কায়সার হামিদ মানিক,উখিয়া।
কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা কলেরা, হাম, কালাজ্বর, গুটিবসন্ত, চর্মরোগ, ডিপথেরিয়াসহ মারাত্মক সব সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছে। সাড়ে ৩ মাসে নতুন আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে ৭ লাখ ৮০ হাজার ৩৪১ জনকে চিকিৎসা দিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। এর মধ্যে ডিপথেরিয়ায় ছয়জন এবং এইডসে দুইজনসহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে ৪৭ জন রোহিঙ্গা মারা গেছে।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার মোঃ শাহীন আবদুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা গোষ্ঠীটি মিয়ানমারে মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত ছিল। আমাদের দেশে আমরা বিভিন্ন রোগের প্রতিষেধক হিসেবে টিকা নিয়ে থাকি। কিন্তু তারা এদেশে আসার আগে কখনো কোনো ধরনের টিকা নেননি। এজন্য রোহিঙ্গারা নানা সংক্রামক রোগে আক্রান্ত। পাশাপাশি তারা পানিবাহিত রোগও আক্রান্ত হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, গত সাড়ে তিনমাস যাবৎ সদর হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ২৫০ রোহিঙ্গা রোগীকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।
কক্সবাজার সিভিল সার্জন ডা. আবদুস সালাম বলেন, ২৫ আগস্টের পর থেকে ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে ৭ লাখ ৮০ হাজার ৩৪১ জন রোহিঙ্গাকে চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়েছে। এদের মধ্যে ডায়রিয়া রোগী এক লাখ ৪৫ হাজার ৫১৯ জন, সর্দি, জ্বর, কাশি ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত দুই লাখ ৪৮৪০ জন, হামের রোগী ৬৮ জন, জন্ডিসে আক্রান্ত এক হাজার ৩৬৫ জন, চর্মরোগী ৬৫ হাজার ২৩১ জন, অপুষ্টির শিকার ২০ হাজার ৯৩৬ জন, মানসিক সমস্যায় ভুগছে তিন হাজার ২৪২, টিবিতে আক্রান্ত ৭৪ জন। এছাড়া আরো অন্য রোগে আক্রান্ত এক লাখ ৩২ হাজার ৫৭৭ জন রোহিঙ্গাকে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে।
তাছাড়া ১০৭ জন এইডস রোগী এবং ১১০ জন ডিপথেরিয়া আক্রান্তকে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। একই সময়ে ৩ হাজার নারী এদেশে এসে সন্তান প্রসব করেছে। এছাড়া এই মুহুর্তে গর্ভবতী নারী রয়েছে আরো ২২ হাজার। নতুন আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৪৭ জন রোহিঙ্গা মারা গেছে।
উখিয়ার কুতুপালং, বালুখালি, মধুরছড়া, গুলশান পাহাড়, আমতলী ও জামতলী রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘুরে দেখা যায়, মেডিকেল ক্যাম্পগুলোর সামনে দীর্ঘ লাইন। চিকিৎসকরা জন্য আগতদের অধিকাংশ চর্মরোগ, ডায়রিয়া, আমাশয় ও সর্দি জ্বরে আক্রান্ত। আগতদের বেশিরভাগ শিশু, নারী ও বৃদ্ধ।
ওই সময় আমতলী রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল ক্যাম্পে চিকিৎসা নিতে আসা রোহিঙ্গা নারী সুফিয়া বলেন, মিয়ানমারের থাকা অবস্থা থেকেই তার মাঝে মাঝে কাপুনি দিয়ে জ্বর আসত। আবার ঘাম দিয়ে ছেড়ে যেত। তার হাঁটুতে, বাহুতে ব্যথা করে। এজন্যই মেডিকেল ক্যাম্পে এসেছেন। এখানে আসার পর তাকে রক্ত পরীক্ষা করা হয়। পরে তার শরীরের ম্যালেরিয়া ধরা পড়ে। এখন তিনি এসেছেন ম্যালেরিয়ার ওষুধ নিতে।
উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মেজবাহ উদ্দিন বলেন, কলেরা, টাইফয়েড, ডিপথেরিয়া, পোলিও ও হামের মত ছোঁয়াচে রোগে আক্রান্ত রোহিঙ্গারা। এদেরকে সেবা দিতে উখিয়ায় ৪৮টি ও টেকনাফে ১২টি মেডিকেল টিম কাজ করছে।
আবদুস সালাম বলেন, নতুন আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে তিন লাখ ৯১ হাজার ৩৯৭ জনকে কলেরার টিকা, এক লাখ ২৭ হাজার জনকে ভিটামিন এ ক্যাপসুল, এক লাখ ২৯ হাজার ৭৫০ জনকে রুবেলার টিকা, ও ৬৯ হাজার ৫৩৯ জন রোহিঙ্গাকে পোলিওর টিকা খাওয়ানো হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, শনিবার থেকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ডিপথেরিয়োর প্রতিষেধক টিকা দেয়া হচ্ছে। আমরা পাঁচ লাখ রোহিঙ্গাকে এই টিকা প্রদান করব। এছাড়া রোহিঙ্গাদের চিকিৎসায় ১০০ জন এমবিবিএস, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, ইন্টার্নি চিকিৎসক, মেডিকেল স্টুডেন্টসহ ২ হাজার জনবল কাজ করছে।
এদিকে বাংলাদেশ পার্সপোর্ট ও ইমিগ্রেশন অধিদফতরের উপ-পরিচালক আবু নোমান মোহাম্মদ জাকের হোসেন বলেন, ১২ অস্থায়ী শিবিরে আশ্রয় নেয়া ৮ লাখ ১১ হাজার রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ, শিশুর নিবন্ধন সোমবার পর্যন্ত সম্পন্ন করা হয়েছে।

Top