একটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেটের পতন –রব নেওয়াজ খোকন

FB_IMG_1510586631677.jpg

————
মানবমনের দু’টি গুরুত্বপূর্ণ এবং বিপরীতধর্মী অনুভূতি হলো, আনন্দ ও বিরহ। দু’টি অনুভূতিই হৃদয় কাঁপিয়ে দিতে যথেষ্ট শক্তিশালী। আর সে-শক্তির উৎস যদি হয় সংগীত, তাহলে সে-সংগীত পায় অমরতার আসন। ফিরে মাঠে-ঘাটে, শহরে-বন্দরে মুখ থেকে মুখান্তরে।

বারী সিদ্দিকী ছিলেন দ্বিতীয় অনুভূতিটির শক্তিশালী উদ্দীপক ও বাহক। সুরের বিরহগাথা তাঁর শিল্পীসত্তার অনন্য বৈশিষ্ট্য। নেত্রকোনা তথা বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের বাউল ভাবধারার লোকজসুর, লোকজ ভাবের বহিঃপ্রকাশ ঘটে তাঁর সংগীতশিল্পে। সে-অঞ্চলের সাধারণ মেয়েদের কান্নার সুর প্রতিধ্বনিত হয়েছে তাঁর সংগীতে। কষ্টের কথাগুলোকে বিলাপের সুরে-সুরে প্রকাশ করার একটা অনন্যধারা সে-অঞলে আজও প্রচলিত রয়েছে। বারী সিদ্দিকী সে-ধারাটিকে সুরের মূর্ছনায় সংগীতরূপে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন। মূলত উক্ত অঞ্চলের লোকজ গানের সুরগুলো সে আদলেই নির্মিত হয়ে আসছে বহুকাল আগে থেকে। উকিল মুন্সী, জালাল উদ্দীন খাঁ, রশীদ উদ্দীন প্রমুখ মরমীকবিদের নির্মিত সংগীতগুলোর সুরের ধারা বিশ্লেষণ করলে সে বিলাপের ছায়াটিই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বারী সিদ্দিকী ছিলেন সে মূলধারার সুযোগ্য শিল্পী। তাঁর গানশুনে কান্নার জলে অবগাহন করেছেন এমন বহু ভক্তশ্রোতা রয়েছে এ-দেশে। হৃদয়ের সবচে’ গভীরতর অংশে ছুঁয়ে দেবার অপূূর্ব ক্ষমতা ছিলো তাঁর শিল্পীসত্তায়। লোকসংগীতের বিকৃতির মহোৎসবে আমরা তাঁকে দেখেছি, একশোভাগ মূলধারার বৈশিষ্ট্য নিয়ে হাজির হতে।

গত কয়েকদিন আগে তিনি রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর। তিনি স্ত্রী, দুই ছেলে, এক মেয়ে আর অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। বারী সিদ্দিকী বাংলাদেশ টেলিভিশনে সংগীত পরিচালক ও মুখ্য বাদ্যযন্ত্রশিল্পী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি দু’বছর ধরে কিডনি সমস্যায় ভুগছিলেন। তাঁর দুটি কিডনি অকার্যকর হয়ে পড়েছিলো। তিনি বহুমূত্র রোগেও ভুগছিলেন। গত ১৭ নভেম্বর রাতে তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হন। এরপর অচেতন অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয় এবং নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়।

একবছর ধরে সপ্তাহে তিনদিন কিডনির ডায়ালাইসিস করে আসছিলেন বারী সিদ্দিকী। এর আগে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরে যান। সেখান থেকে রাত ১০টায় বাসায় ফেরেন। তখনো তিনি স্বাভাবিক ছিলেন। কোনো অসুস্থতার কথা কাউকে বলেন নি। গভীর রাতে হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন এবং মুহূর্তেই অচেতন হয়ে যান। এ-থেকে বোঝা যায়, অসম্ভব মনের জোর ছিলো মানুষটির। অনেক দিন থেকে কিডনির জটিল সমস্যা নিয়েও স্বাভাবিক জীবনযাপন করে আসছিলেন তিনি।

দীর্ঘদিন সংগীতের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এ গুণীশিল্পী। হুমায়ূন আহমেদের ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ ছবিতে তিনি ছয়টি গান গেয়েছেন। তাঁর জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে রয়েছে
১.শুয়াচান পাখি
আমি ডাকিতাছি তুমি ঘুমাইছ নাকি….
২.পূবালি বাতাসে প্রাণ না-জুড়ায়
না-জুড়ায় রে…
৩.আমার গায়ে যতো দুঃখ সয়
বন্ধুয়ারে করো তোমার মনে যাহা লয়।
৪.ও..লো ভাবীজান নাউ বাওয়া…
৫.মানুষ ধরো মানুষ ভজো
শোন বলিরে পাগল মন।

তিনি চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক করেছেন। তাঁর বেশিকিছু জনপ্রিয় অডিও অ্যালবামও রয়েছে।

বারী সিদ্দিকীর সংগীতসংখ্যা মুখ্যবিষয় নয়। মুখ্য হলো তাঁর শিল্পের আবেদন কিংবা মান। তাঁর অবদান অনন্যসাধারণ। সংগীতভুবণে আরেকজন বারী সিদ্দিকী তৈরি হতে বেশিকিছুকাল সময় লাগবে নিঃসন্দেহে। স্বকীয় অবদানের সৌজন্যে দীর্ঘকাল অমর থাকবেন তিনি। তবে তাঁর আকষ্মিক প্রস্থান আমাদের সংগীতাঙ্গনে যে শূন্যতার সৃষ্টি করেছে, তা সহজে পূরণ হবার নয়। তাঁর চলে যাওয়াটা সংগীতের মাঠে একটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেটের পতন।

Top