স্মরণে দৈনিক পূর্বকোণ সম্পাদক আমাদের প্রিয় তসলিম বর্দ্দা -জিয়া হাবীব আহ্‌সান

02_Surendra-Kumar-Sinha_300515_000148-620x330.jpg

——————–
সম্প্রতি পরলোকগমনকারী দৈনিক পূর্বকোণ সম্পাদক শ্রদ্ধেয় তসলিম উদ্দিন চৌধুরী সম্পর্কে কিছু লিখতে বার বার বিবেকের তাগেদা পেয়ে আসছিলাম । এতো কাছের মানুষটি সম্পর্কে কিছু না লিখে পারলাম না । এ-লিখাটি তাঁর সম্পর্কে আমার একান্ত ভাবনা ও স্মৃতি থেকে উৎসারিত । তিনি আমার মায়ের জেঠাতো বোনের ছেলে । নানার বাড়ির সমস্ত মামাতো–খালাতো ভাই বোনদের মধ্যে তসলিম ভাই সকলের বড় এবং তিনি সকলের প্রিয়জন ছিলেন । তসলিম বর্দ্দা নামে তিনি আমাদের হৃদয়ে এক বিশেষ শ্রদ্ধার আসন দখল করে আছেন । আমার আম্মার জেঠাতো বোন মরহুমা জোহরা বেগমের ৩ পুত্র তসলিম, জসিম, বাচ্চু (ডাঃ রমিজ) ভাই এর মধ্যে তিনি সকলের বড় । রাউজান সুলতানপুর গ্রামের ঐতিহ্যবাহী আমিনুল্লাহ কেরানীর বাড়ী আমাদের নানার বাড়ি । তসলিম ভাইয়ের নানা মুন্সী আমিন উল্লাহ্‌ কেরানীর ৪র্থ পুত্র মরহুম বজলুল করিমের জ্যৈষ্ঠ কন্যা জোহরা খালাম্মার ঘর আর আমার নানা মরহুম এডভোকেট এজাহার হোসেন বি.এল এর ঘর একেবারে লাগোয়া পাশাপাশি ঘর । আমার নানা ছিলেন মুন্সী শরীয়ত উল্লাহ্‌র একমাত্র পুত্র । তিনি আমার মায়ের জেঠাতো বোনের ছেলে । তাঁর এবং আমার উভয় নানা পরস্পর আপন চাচাতো জেঠাতো ভাই ছিলেন । উভয় পরিবার একই বংশ একই গোষ্ঠি । আমার পিতা মরহুম আলহাজ্ব এডভোকেট আবু মোহাম্মদ য়্যাহ্‌য়্যা ও তসলিম বর্দ্দার পিতা মরহুম আলহাজ্ব ইউসুফ চৌধুরী পরস্পর ভায়েরা ভাই ছিলেন । বিশিষ্ট ‘বংশ শেজরা’ গবেষক আলহাজ্ব মোহাম্মদ দিদারুল আলম রচিত ‘আমার বংশ শেজরা’ গ্রন্থে তাঁদের জীবনী পাশাপাশি লিপি আছে । আমার ছোট খালাম্মা মালেকা পারভীনকে মরহুম ইউসুফ চৌধুরীর ভাতিজা বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহমুদুল হক বাবুল বিয়ে করলে তসলিম ভাইদের সাথে আমাদের নতুন আত্মীয়তার বন্ধন সৃষ্টি হয় এবং তাদের দাদার বাড়িতে বহুবার যাওয়ার সুযোগ হয় । তসলিম বর্দ্দাদের দাদার বাড়ি একই গ্রামের (সুলতানপুর) হাজী পাড়ায় অবস্থিত । এই সুন্দর গ্রামটি বিদ্রোহী কবি ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামে স্মৃতি বিজড়িত বিধায় দেশে বিদেশে সুপরিচিত । নানার বাড়ির যে কোন পারিবারিক অনুষ্ঠানে শ্রদ্ধেয় জোহ্‌রা খালাম্মার সাথে তৎ পুত্র তসলিম বর্দ্দাকে দেখতাম । তিনি ছোটদের খুব স্নেহ করতেন ও বড়দের শ্রদ্ধা করতেন । আম্মার মুখে ছোটবেলা থেকে তাঁদের তিন ভাইয়ের প্রশংসা শুনতাম । তসলিম বর্দ্দা সকল মামাতো খালাতো ভাইদের স্নেহ মাখা কন্ঠে নাম ধরে ডাকতেন । বয়সে অনেক বড় হলেও তিনি আমাদের বন্ধুর মতো ব্যবহার করতেন । তাঁর প্রেরণায় আমি দৈনিক পূর্বকোণ পত্রিকায় নিয়মিত লেখালিখি শুরু করি । বিভিন্ন আইনী বিষয়ে তিনি আমার মরহুম পিতার পরামর্শকে গুরুত্ব দিতেন । চট্টগ্রাম কলেজের ১৯৮১-৮২ ব্যাচের বন্ধু আনিস উদ দৌল্লা (বর্তমানে কর্ণফুলী গ্রুপ এ উচ্চপদে কর্মরত) – এর বড় বোন মিসেস শাহানা চৌধুরী (হেলু) তসলিম বর্দ্দার স্ত্রী তথা আমাদের ভাবী হন । জোহরা খালাম্মার মৃত্যুর পরও আত্মীয় স্বজনের যে কোন পারিবারিক অনুষ্ঠানে ভাবী ও তসলিম ভাই হাজিরা দিতেন । আমার আম্মার সাথে তসলিম বর্দ্দাদের পুরাতন বাসা চৈতন্যগলি পরবর্তীতে আসকার দিঘীর পাড় ও বর্তমান খুলশীর বাসায় বহুবার বেড়াতে গিয়েছি । তসলিম বর্দ্দা তখন একেবারে তরুণ সুদর্শন যুবক । ভাবতেই অবাক লাগে তিনি কিভাবে এত অসুস্থ হয়ে পড়লেন । মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত দীর্ঘ ৭/৮ বছর মুখে কিছু খেতে না পারলেও তিনি সামাজিকতা রক্ষা করতেন এবং আত্মীয়তার বন্ধনকে খুবই গুরুত্ব দিতেন । বছর ২/৩ আগে আমার মামাতো বোনের বিয়েতে তিনি আমাকে ডেকে পাশে বসান এবং পূর্বকোণের সহয়তায় নারী নির্যাতন মামলার বিভিন্ন ধারায় অপব্যবহার সম্পর্কে একটি আলোচনা ও গোলটেবিল বৈঠক করার পরামর্শ দেন । নানা ব্যস্ততার ও তাঁর অসুস্থতার কারণে আর এ বিষয়ে এগুতে পারিনি । প্রায়ই তার সাথে দেখা হতো জুম্মাবার সি.আর.বি জামে মসজিদে । সর্বশেষ দেখা হয় প্রখ্যাত ফটো আর্টিষ্ট শোয়েব ফারুকী ভাইয়ের সার্সন রোডস্থ ফটো আর্ট গ্যালারী (হাট খোলা) তে । তিনি একজন ফটো আর্টিষ্টও ছিলেন । ছবি তোলা ও নানা ধরণের ক্যামেরা ল্যান্স সংগ্রহ তার শখ ছিল । স্থাপত্য বিদ্যায় উচ্চতর ডিগ্রী অর্জন করলেও তাঁর ভেতরে একটি শৈল্পিক মন সর্বদা কাজ করতো । হাটখোলা ফটো গ্যালারীতে সেদিন তিনি আদর করে ডেকে আমাকে পাশে বসান এবং শোয়েব ফারুকী ভাই সহ বসে তার জীবনের অনেক গল্প শোনালেন । ছবি তোলা ও দেশ বিদেশ থেকে ক্যামেরা-ল্যান্স ইত্যাদি সংগ্রহ করা ছিল তাঁর অন্যতম প্রিয় শখ । খুলশী আবাসিক এলাকায় তাঁদের বাসভবনে ছোটবেলা আম্মার সাথে বেড়াতে গিয়ে দেখেছিলাম তাঁর বেড রুমে এখানে সেখানে অনেক ক্যামেরা ও ল্যান্স পড়ে আছে । তিনি স্থাপত্য ইন্সিটিউট চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের চেয়ারম্যান হিলেন । তিনি প্রচুর পড়ালেখা করতেন এবং তাঁর সংগ্রহে বিপুল দেশী বিদেশী বইয়ের স্মভার ছিলো । তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহশালা থেকে অতি মূল্যবান বইগুলো চুয়েটের স্থাপত্য বিভাগকে দান করেন যাতে ছাত্রছাত্রীরা জ্ঞান চর্চা করতে পারেন । তার সম্পর্কে পিরোজপুর ল্যান্ড সার্ভে ট্র্যাইবুন্যালের বিজ্ঞ বিচারক, জনাব মোহাম্মদ মাহাবুবুর রহমান বলেন, “যুদ্ধ তাঁর কাছ থেকে শিখতে হবে । দীর্ঘদিন মুখ দিয়ে খাননি । এক বিশেষ পাউডার নলের মাধ্যমে সরাসরি পাকস্থলিতে নিজেই দিয়ে দিতেন । মরণব্যাধি শরীরকে গিলে ফেলতে চাইছে, তারপরও স্বাভাবিক । খেতে পারতেন না, তথাপি বিয়ে-শাদিতে যেতেন । সমাজ সংস্কার ও চট্টগ্রামের উন্নয়নের জন্য সুস্থ সবলদের চেয়েও সোচ্চার ছিলেন । ছিলেন অনেক বেশি একটিভ । মাস্ক পরে থাকতেন সব সময় । মুখ দিয়ে না খাওয়া, মাস্ক পরা মুখ-একেবারে আইকনিক হয়ে গিয়েছিলেন । উনাকে নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হবার কারণ ছিল । কিন্তু উনার বীরোচিত প্রতিটি পদক্ষেপের কারণে কেউ উনাকে নিয়ে চিন্তিত হতো না । আমি ভাবতাম-ভদ্রলোক অমর হোক । শেষ পর্যন্ত উনি অমর হয়ে গেলেন । যেভাবেই হোন । উনি অমর হয়ে থাকবেন ।” দৈনিক পূর্বকোণ এর স্বপ্ন দ্রষ্টা মরহুম পিতার অবর্তমানে তাঁর দুই অনুজ জসীম ভাই ও বাচ্চু ভাইকে নিয়ে তিনি তাকে সাফল্যের সাথে অগ্রসর করে বর্তমান অবস্থায় নিয়ে আসেন । তিনি আজ নেই তবে বহু স্মৃতি রেখে গেছেন যা আমাদের মনে বার বার নাড়া দেয় । মৃত্যুকালে তিনি শ্রদ্ধেয় হেলু ভাবী, দুই পুত্র যথাক্রমে তৌসিফ, তৌকির এবং এক কন্যা তানিতা চৌধুরী টুম্পা সহ অসংখ্য আত্মীয় স্বজন গুণগ্রাহী রেখে যান । তাঁর জানাযায় বিপুল সংখ্যক মানুষের উপস্থিতি এ কথারই প্রমাণ দেয় । আল্লাহ্‌ সুবহানু ওয়াতায়ালা আমাদের প্রিয় তসলিম বর্দ্দাকে মেহেরবানী করে জান্নাত নসিব করে দিন, আমীন ।

লেখক : আইনজীবী, কলামিস্ট, সু-শাসন ও মানবাধিকার কর্মী।

Top