কমলগঞ্জে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী পলো বাওয়া উৎসব

BAWA-UTHSAB-.jpg

নির্মল এস পলাশ,কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) প্র্রতিনিধি:
কালের বিবর্তনে পাল্টে গেছে সবকিছু। কমে আসছে এক সময়কার চিরচেনা নদ-নদী, খাল-বিল। হাওর-বাঁওড়ও। হারিয়ে যাচ্ছে একের পর এক বাঙালীর গ্রামীন উৎসব-ঐতিহ্য। এরপরও একটি প্রবাদ আছে “নদী, হাওর আর ধান এই তিনে মৌলভীবাজারের প্রাণ”। আর সেই মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার একটি নদীকে কেন্দ্র করে শত বছরেরও বেশি সময় ধরে পালিত হয়ে আসছে গ্রাম বাংলায় প্রায় হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী মাছ ধরা উৎসব। আর এই মাছ ধরা উৎসব জানিয়ে দিচ্ছে মাছে-ভাতে বাঙালির দেশে মাছেরা হারায়নি। হারায়নি এক সময়ের বহুল প্রচলিত মাছ ধরার উৎসবও।
বাপদাদার সময় থেকে চলে আসা এই উৎসব কত বছর ধরে চলছে তা নিশ্চিতভাবে না বলতে পারলেও, ধারনা করা হচ্ছে এই উৎসব শত বছরেরও বেশি সময় ধরে কমলগঞ্জ উপজেলার ধলাই নদীতে চলে আসছে। কার্ত্তিকী পূর্ণিমার পরপরই ওই নদীর আশ-পাশের এলাকার প্রতিটি গ্রামে শুরু হয় প্রস্তুতি । আগে থেকে ঘোষণা করে নির্দিষ্ট সময়ে মাছ ধরার জন্য নেমে পড়ে স্থানীয় গ্রামবাসী। মেতে উঠে মাছ ধরা উৎসবে। স্থানীয়রা একে ‘পলোবাওয়া’ উৎসব বলে। প্রধানত পলো (খাঁচা) দিয়ে মাছ ধরার কারনে এই উৎসবকে ‘পলোবাওয়া’ বলা হয়ে থাকে। আর সেই উৎসবে মাছ ধরতে নেমে পড়ে শত শত ছেলে, বুড়ো, যুবক। সঙ্গে থাকে খালুই হাতে শিশুরাও। অনেকে আবার নেমে পড়ে খালি হাতে। আর নদীর দুই পাড়ে থাকে দর্শকের ভিড়।
সরেজমিনে দেখা যায়, সোমবার কমলগঞ্জের ধলাই নদীতে মাছ ধরার খাঁচা (স্থানীয় ভাষায় পলো ) ও জাই জাল দিয়ে হৈ হুলোর করে বেশ আনন্দের সঙ্গে পাল¬া দিয়ে তারা যেন মাছ ধরার উৎসবে মেতে উঠেছেন। ইতিমধ্যেই অনেকে বোয়াল মাছ, শোল মাছ, আইর মাছসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ধরেছেন। আর নদীর দুই পাড়ে দাড়িয়ে উৎসুক হয়ে মাছ শিকারিদের সেই মাছ ধরার দৃশ্য দেখে হাততালি দিচ্ছে শিশু, বৃদ্ধ, আবাল-বনিতাসহ বিভিন্ন শ্রেনীর শতাধিক মানুষ। মনে হচ্ছে সেখানে মাছ ধরার উৎসব চলছে। উপজেলা সদরের ধলাই নদীতে অনুষ্টিত এ বাওয়া উৎসবে বিভিন্ন এলাকার সহস্রাধিক সৌখিন মাছ শিকারীর অংশগ্রহণে ভোর থেকে দুপুর নাগাদ পর্যন্ত মুখরিত ছিল গোটা এলাকা।
এলাকাবাসী জানান, প্রতি বছরের এই সময়ে অর্থাৎ কার্তিকী পূর্ণিমার পর ধলাই নদীর ভেতর একপ্রান্ত থেকে শুরু করে অপর প্রান্ত পর্যন্ত খাড়া জাল দিয়ে বের দিয়ে এলাকার লোকজন দলবদ্ধ হয়ে এভাবেই মাছ ধরার উৎসবে মেতে ওঠে। একে স্থানীয় ভাষায় ‘পলোবাওয়া’ উৎসব বলা হয়। আর এই উৎসবে যারা অংশগ্রহণ করেন তাদের অধিকাংশই কোন পেশাদার জেলে নয়। শুধু মাত্র গ্রামীন ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে বাপদাদার সময় থেকে এই ‘পলোবাওয়াা’ উৎসব পালন করে আসছে ।
এ ব্যাপারে আলাপকালে কমলগঞ্জের প্রবীন মাছ শিকারী মোঃ ইসহাক মিয়া জানান, দিন দিনই পরিবেশ ও আবহাওয়ার প্রতিকূলতার কারনে নদীনালা, খালবিল, হাওরের তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ার কারনে পানি হ্রাস এবং অধিকাংশ জলাশয় ইজারা দেওয়ায় বাওয়া উৎসব এখন অনেকটাই ভাটা পড়েছে। মাছ ধরা নিয়ে তখনকার দিনে মারামারি এমনকি খুন খারাবীর ঘটনাও ঘটতো । এখন আর তেমনটি শুনা যায়না । আভাব অনাটন ক্রমশ গ্রাস করে ফেলছে চিরাচরিত এই গ্রামীন উৎসবের অতীত ঐতিহ্যকে। তার মতে প্রাচীন এই উৎসবকে টিকিয়ে রাখতে সর্বমহলের উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। বাঙালীর হাজার বছরের এই ঐতিহ্যটি টিকে থাকুক হাজার বছর ধরে এটাই আজকের দিনের প্রত্যাশা।

Top