অনিশ্চিত জীবনের পথে…(সত্য ঘটনা অবলম্বনে)

download.jpg

(প্রতিকী ছবি)
লেখকঃ এস. এম. রুবেল :
মেয়েটির নাম শান্তা। নামের মতই শান্ত স্বভাবের একটি মেয়ে। তার বয়স যখন দুই বছর তখন বাবাকে হারিয়েছে। আর পরপরই মায়ের অন্যত্র বিয়ে হয়ে যায়। একা হয়ে যায় মেয়েটি। তখন থেকেই দাদী ও অবিবাহিত চাচার কাছেই বড় হতে থাকে। আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের সার্বিক সহযোগীতায় মেয়েটি পড়াশোনা করে আসছে। সে প্রচন্ড আত্মবিশ্বাসীও বঠে। শিশু বয়সে মা-বাবাকে হারানোর পরেও শত প্রতিকূল পরিস্থিতি পাড়ি দিয়ে সে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে। মেয়েটি ধীরে ধীরে স্ব-গুণে সবার প্রিয় হয়ে উঠেছে। সবকিছু স্বাভাবিক নিয়মেই চলছিল। আর স্বজনহারা মেয়েটি লালিত স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে সামনে অগ্রসরের রাস্তা পাড়ি দিচ্ছিল।

শান্তা এখন সপ্তম শ্রেণীতে পড়ে। পড়াশোনায়ও ভাল। অভিভাবকের সঠিক পরামর্শ ও দিক নির্দেশনায় হয়তো আরো ভাল করত। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস শিশু কালেই সে অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছিল। কিছুদিন পূর্বে চাচার বিয়ে হলো, দাদীও বৃদ্ধ বয়সে পড়ল, আর শান্তার জীবনে নেমে আসল কুসংস্কারের কালো ছায়া। অনিচ্ছা সত্ত্বেও তুচ্ছ বিষয়ে চাচীর সাথে মনোমালিন্যের সূত্রপাত, সংসারে দাদীর দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ব হ্রাস, চাচার সিদ্ধান্তহীনতার অযুহাত সহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র বিষয়ে নেমে আসে শান্তার জীবনে পরোক্ষ অত্যাচার। ক’দিন পূর্বেই যে শান্তা ছিল পরিবার সহ আত্মীয়দের মধ্যমনি, আর এখন সেই শান্তাই সবার ঝামেলার প্রতিধ্বনি। যাদের ভরসা ও বিশ্বাসকে পুঁজি করে শান্তা জীবন জয়ের স্বপ্ন দেখেছিল, আজ তাদের ভূল সিদ্ধান্তেই শান্তার জীবন অনিশ্চয়তার মুখে চলে যাচ্ছে। শুধুমাত্র আত্মীয়তার দাবীতে লোভের সান্নিধ্যে কথিত সুখের সাগরে ভাসিয়ে দিচ্ছে শান্তার সহজ সরল জীবন। নিজেদের ঝামেলা দূর করতে শান্তার বিয়ে ঠিক করা হলো। ১৩ বছরের শান্তা বিয়ের কথা শুনে মুচকি মুচকি হাসে। তার এই হাসিই প্রমান করছে মেয়েটি কতটা অবুঝ ও সহজ সরল। যে বয়সটা হেসে খেলে কাটানোর বয়স সেই বয়সটা শান্তার বিয়ের বয়স। তার বয়সী অন্য সহপাঠীরা জীবন গড়ার যুদ্ধের লড়াইয়ে ব্যস্ত। আর শান্তা অল্প বয়সে বিয়ের মত কঠিনতম জীবনে প্রবেশের প্রতিক্ষায় অপেক্ষমাণ।

আর ক’দিন পরে শান্তার বিয়ে। আত্মীয়দের নিকট বাল্য বিয়ের কুফল বর্ণনা করে শান্তাকে সুনিশ্চিত জীবনে ফিরিয়ে আনার ব্যর্থ চেষ্টা করা হয়েছে অনেকবার। কিন্তু অসহায় ও এতিম শান্তার দায়-দায়িত্ব নিতে ইচ্ছুক নয় দাদী, চাচা-চাচী সহ কোন আত্মীয়-স্বজন। সবাই শান্তাকে স্ব-ঘোষিত ঝামেলার বস্তুতে পরিণত করেছে। ফলে থেমে যায় বাল্য বিবাহ বন্ধের ব্যর্থ চেষ্টা। সপ্তম শ্রেণীতেই বাঁধা পড়ে গেল শান্তার লালিত হাজারো স্বপ্নের বাস্তবনরূপ। ঝরে পড়ে যাচ্ছে একটি সম্ভাবনাময় মেধার সম্ভার। কেউ আত্মীয়তার বন্ধনের অযুহাতে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ ভূমিকায় ফুটন্ত ফুলকে কলিতেই নষ্ট করে দিচ্ছে।

এভাবে কত শান্তার জীবন বাল্যবিবাহ নামক ভয়ানক ব্যাধীতে পরিবার সহ আত্মীয় স্বজন দ্বারা আক্রান্ত হয়ে অনিশ্চিত জীবনের পথে পা বাড়াচ্ছে তা আমাদের অজানা। জীবনের লক্ষ্যে পৌঁছার সহযোগী মাধ্যম মই এর অভাবে অকালে ঝরে পড়ে যাচ্ছে শান্তার মত হাজারো সম্ভাবনাময়ী মেধা। সার্বিক সহযোগীতা পেলে আজ হয়তো অভিভাবকহীন অসহায় শান্তার অনিশ্চিত জীবন অলোর মুখ দেখবে। কারো ইতিবাচক হস্তক্ষেপে বদলে যেতে পারে তার জীবন। আর ভবিষ্যতে প্রদীপ শিখা হয়ে চারিদিকে আলো ছড়াতে পারে শান্তার মত কেউ। (

Top