ঈদুল ফিতরের দিনে করণীয় ও বর্জনীয় — মুজাহিদুল ইসলাম স্বাধীন

14.jpg

_______
ঈদ অর্থ আনন্দ। ঈদের আরো একটি অর্থ হলো বারবার ফিরে আসা। অর্থাৎ ঈদ এমন একটি আনন্দের দিন যা বারবার (প্রতিবছর) ফিরে আসে। আল্লাহর নির্দেশে মহানবী (সা.) এর মাধ্যমে প্রথম হিজরিতে ঈদের প্রচলন শুরু হয়। এ ব্যাপারে হাদীসে এসেছেঃ
আনাস ইবনু মালিক (রা.) বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) মাদীনায় এসে দেখেন মাদীনাবাসীরা নির্দিষ্ট দুটি দিনে খেলাধূলা ও আনন্দ করে থাকে। রাসূলুল্লাহ (সা.) জিজ্ঞেস করলেনঃ এ দুটি দিন কীসের? সকলেই বলল, জাহিলী যুগে আমরা এ দুদিন খেলাধূলা করতাম। রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, মহান আল্লাহ তোমাদের এ দুদিনের পরিবর্তে উত্তম দুটি দিন দান করেছেন। তা হলো, ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিতরের দিন। (সুনানে আবু দাউদ, হা/১১৩৪)
এ হাদীস থেকে স্পষ্ট হয় যে, জাহেলী যুগের উৎসব থেকে আমরা যাতে বিরত থাকি, সেই লক্ষ্যেই ঈদের প্রচলন হয়। তাই আমাদের উচিৎ হবে জাহেলী যুগের মত নয়, বরং ইসলামি নিয়মে ঈদ উৎসব পালন করা।

ঈদুল ফিতরে করণীয়ঃ

০১/ তাকবীর পাঠঃ
ঈদের চাঁদ উঠার পর থেকে শুরু করে ঈদের সালাত আদায় পর্যন্ত মহানবী (সা.) এবং তাঁর সাহাবীগণ নিম্নলিখিত তাকবীরটি পাঠ করতেনঃ
“আল্লাহু আকবর আল্লাহু আকবর লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবর আল্লাহু আকবর ওয়া লিল্লাহিল হামদ।”
মহানবী (সা.) এর অনুসরণে আমাদেরও এই আমলটি করা উচিৎ।

০২/ সাদাকাতুল ফিতর আদায়ঃ
সাদাকাতুল ফিতরের ব্যাপারে হাদীসে এসেছেঃ
ইবনু ‘উমর (রা.) বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, প্রত্যক গোলাম, আযাদ, পুরুষ, নারী, প্রাপ্ত বয়স্ক, অপ্রাপ্ত বয়স্ক মুসলিমের উপর আল্লাহর রাসূল (সা.) সাদাকাতুল ফিতর হিসেবে খেজুর হোক অথবা যব হোক এক সা’ পরিমাণ আদায় করা ফরয করেছেন এবং লোকজনকে ঈদের সালাতের জন্য বের হবার পূর্বেই তা আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন।
(সহিহ বুখারী, হা/১৫০৩, ১৫০৪-১৫১২; সহিহ মুসলিম, হা/২১৬৮-২১৭৯)
এসব হাদীস থেকে স্পষ্টত প্রমাণ হয়ঃ
=> প্রত্যেকের উপরে সাদাকাতুল ফিতর ফরয। কেউ কেউ অনুবাদে ওয়াজিবও লিখেছেন। [অবশ্য ইমাম আবু হানিফার মতে যাকাতের নিসাব পরিমাণ অর্থ থাকতে হবে যার পক্ষে সহিহ হাদীস নেই]।
=> ফিতরা দিতে হবে ১ সা’ পরিমাণ যা ২ কেজি ৪০ গ্রামের সমান। [অবশ্য ইমাম আবু হানিফার মতে আধা সা’ বা ১ কেজি ২০ গ্রাম যার পক্ষের হাদীস খুবই দুর্বল]।
=> যেহেতু সাদাকাতুল ফিতর সম্পর্কিত হাদীসগুলোতে কেবল খাদ্যদ্রব্যের কথাই উল্লেখ আছে, সে কারণে তিন মাযহাব (মালেকী, শাফেয়ী, হাম্বলী), মক্কা-মদিনার ঈমামগণের মত হলো খাদ্যদ্রব্য দিয়েই ফিতরা আদায় করতে হবে, টাকা পয়সা দিয়ে আদায় করলে হবে না। [অবশ্য ইমাম আবু হানিফার মতে টাকা পয়সা দিয়েও ফিতরা দেওয়া জায়েজ যার পক্ষে সরাসরি কোনো হাদীসই নেই]।
=>ফিতরা দিতে হবে ঈদের সালাতের পূর্বেই যেমনটা উল্লেখিত হাদীসে এসেছে। ঈদের সালাতের পরে আদায় করলে ফিতরা আদায় হবে না, সাধারণ দানের সওয়াব পাওয়া যাবে মাত্র। এ ব্যাপারে হাদীসে এসেছেঃ
ইবনু ‘আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) সাদাকাতুল ফিতর ফরয করেছেন- অশ্লীল কথা ও বেহুদা কাজ হতে (রমযানের) সাওমকে পবিত্র করতে এবং মিসকীনদের খাদ্যের ব্যবস্থার জন্য। যে ব্যক্তি (ঈদের) সালাতের পূর্বে তা আদায় করে সেটা কবুল সাদাকা গণ্য হবে। আর যে ব্যক্তি সলাতের পরে আদায় করে, তা সাধারণ দান হিসেবে গৃহীত হবে। (সুনানে আবু দাউদ, হা/১৬০৯)

০৩/ উত্তম পোশাক পরিধান করাঃ
আল্লামা ইবনুল কাইয়ুম তাঁর রচিত “যাদুল মা’আদ” গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, মহানবী (সা.) ঈদে উত্তম পোশাক পরিধান করতেন। তাঁর একজোড়া পোশাক ছিল যা উনি কেবল দুই ঈদ এবং জুম’আর দিনেই পরিধান করতেন।
তাই আমরাও ঈদে উত্তম পোশাক পরিধানের চেষ্টা করব।

০৪/ বেজোড় সংখ্যক খেজুরগ্রহণঃ
হাদীসে এসেছেঃ
আনাস ইবনু মালিক (রা.) বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আল্লাহর রসূল (সা.) ঈদুল ফিতরের দিন কিছু খেজুর না খেয়ে বের হতেন না। অপর এক বর্ণনায় আনাস (রা.) নবী (সা.) হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি তা বিজোড় সংখ্যায় খেতেন। (সহিহ বুখারী, হা/৯৫৩)
তাই আমরাও মহানবী (সা.) এর অনুসরণে ঈদের সালাতে যাওয়ার পূর্বে বেজোড় সংখ্যক খেজুর খাব।

০৫/ ঈদগাহে গিয়ে ঈদের সালাত আদায়ঃ
ঈদের দিন ঈদগাহে গিয়ে দুই রাকআত ঈদের সালাত আদায় করা আমাদের উপর ফরয বা ওয়াজিব।
আমাদের দেশে ৬ ও ১২ তাকবীরে ঈদের সালাত আদায়ের প্রচলন আছে। হানাফী মাযহাব অনুযায়ী ৬ তাকবীরে ঈদের সালাত আদায় করা হলেও এর পক্ষে সহিহ বা যঈফ কোনো হাদীস নেই। অন্যদিকে বাকি তিন মাযহাব এবং মক্কা মদিনার আলেমগণের মতে ১২ তাকবীরে ঈদের সালাত আদায় করতে হবে যার স্বপক্ষে অসংখ্য সহিহ হাদীস রয়েছে। যেমনঃ
‘আয়িশাহ (রা.) বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার সালাতে প্রথম রাকআতে সাতবার এবং দ্বিতীয় রাক‘আতে পাঁচবার তাকবীর বলতেন। (সুনানে আবু দাউদ, হা/১১৪৯)
আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস (রা.) বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, নবী (সা.) বলেছেনঃ ঈদুল ফিতরের সালাতের তাকবীর হচ্ছে প্রথম রাকআতে সাতটি এবং দ্বিতীয় রাকআতে পাঁচটি এবং উভয় রাকআতেই তাকবীরের পর ক্বিরাআত পড়তে হবে। (সুনানে আবু দাউদ, হা/১১৫১)

০৬/ ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়ঃ
ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়ের ইসলামি পদ্ধতি হলো একে অপরকে “তাকাববালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম” বলা।
অনেক আলেমই প্রচলিত “ঈদ মোবারক” বলার বিরোধিতা করে থাকেন।

★ঈদুল ফিতরে বর্জনীয়ঃ

০১/ অমুসলিমদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ পোশাকঃ
হাদীসে এসেছেঃ
ইবনু ‘উমার (রা.) বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি বিজাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদের দলভুক্ত গণ্য হবে। (সুনানে আবু দাউদ, হা/৪০৩১)
তাই, অমুসলিম তথা বিজাতীয় পোশাক পরিধান থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে।

০২/ বিপরীত লিঙ্গের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ পোশাকঃ
হাদীসে এসেছেঃ
ইবনু আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, নবী (সা.) ঐ সব পুরুষকে লা’নত করেছেন যারা নারীর বেশ ধরে এবং ঐসব নারীকে যারা পুরুষের বেশ ধরে।
‘আমরও এরকমই বর্ণনা করেছেন। আমাদের কাছে শু‘য়বা এ সংবাদ দিয়েছেন। (সহিহ বুখারী, হা/৫৮৮৫)
তাই আমাদের এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।

০৩/ বেপর্দা হয়ে ঘুরে বেড়ানোঃ
হাদীসে এসেছেঃ
আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বলেছেনঃ জাহান্নামবাসী দু’প্রকার মানুষ, আমি যাদের (এ পর্যন্ত) দেখিনি। একদল মানুষ, যাদের সঙ্গে গরুর লেজের মতো চাবুক থাকবে, তা দ্বারা তারা লোকজনকে মারবে এবং একদল স্ত্রী লোক, যারা কাপড় পরিহিত উলঙ্গ, যারা অন্যদের আকর্ষণকারিণী ও আকৃষ্টা, তাদের মাথার চুলের অবস্থা উটের হেলে পড়া কুঁজের মতো। ওরা জান্নাতে যেতে পারবে না, এমনকি তার সুগন্ধিও পাবে না অথচ এত এত দূর হতে তার সুঘ্রাণ পাওয়া যায়। (সহিহ মুসলিম, হা/৫৪৭৫)
তাই বিশেষত মহিলাদের এ ব্যপারে সাবধান হওয়া আবশ্যক।

০৪/ গান-বাজনা করা, সিনেমা-নাটক দেখাঃ
ঈদ উপলক্ষে বিভিন্ন টিভি চ্যানেল বিশেষ বিশেষ সিনেমা-নাটক এবং অন্যান্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে। অনেকেই এসব দেখায় মনযোগী হয় ঈদের দিনে। এছাড়া নানাধরণের গান-বাজনা নিয়ে ব্যস্ত হয় অনেকেই। আবার সিনেমাহলগুলোতে নতুন নতুন সিনেমা আসে ঈদ উপলক্ষে।
এসব কিছু থেকে সর্বাত্মকভাবে বিরত থাকতে।

আল্লাহ যেন আমাদেরকে ইসলামি পদ্ধতিতে ঈদ উদযাপন করার তাওফিক দেন।

Top