একটি নীল ডায়েরি এবং…

IMG_20181206_025119.jpg

: কাজী ই সাকিব
—————————————

ক্লাসে শেষে চোখে-মুখে বিরক্তির আভা নিয়ে ক্লাসরুম থেকে বের হল আরাফ ও অদ্রি। এতক্ষণ যেন খাঁচায় বন্দি ছিল। খাঁচা থেকে বের হয়ে অসীম আকাশে পাখি উড়ে যায় আর ওরা কথার জানালা খুলে দেয়। আরাফ বলেঃ-

উফফ! ক্লাস করতে আর ভাল্লাগেনা।

মুখ বেঁকিয়ে অদ্রি উত্তর দেয়ঃ- কার লাগে শুনি?

-নোট করে তো কর্ণফুলী মিল খালি করে দিচ্ছিস।

-আমি নোট না করলে পরিক্ষার আগে যে তোর চোখ প্রশান্ত মহাসাগর হয় তা মনে থাকে না?

আরাফ ব্যঙ্গ করে উত্তর দেয়

-অ্যাঁ! কে বলে তোকে নোট দিতে? আগামী সেমিস্টার ফাইনালে দেখিস নোটের নামই নিব না।

-পরিক্ষা শুরু হতে আর মাত্র একমাস বাকি। তখন যদি চাস না ঘুষি দিয়ে একদম নাক ভেঙ্গে দিব।

আরাফ তখন বলে আমি কি তখন চুড়ি পরে থাকব?

-তার মানে নোট চাইবি?

-তা জানিনা। এই বলে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার করুণ সুরে বলল,

অদ্রি শোন ভার্সিটি আমাদের এটেন্ডেন্সে আবদ্ধ করে রেখেছে। বুঝেছিস?

অদ্রি তাৎক্ষণিক বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নেড়ে হ্যা সূচক জবাব দেয় যেন শিক্ষক অনেকক্ষণ ধরে গুরুত্বপূর্ণ কিছু একটা বুঝানোর চেষ্টা করছেন এখন যদি না সূচক উত্তর দেয় তবে তিনি কটাক্ষ করবেন।

আরাফ হঠাৎ রোমান্টিক হয়ে পড়ে। মুখে একটু হাসি ফুটিয়ে বলে,

আচ্ছা যাই হোক শোন?

-হুম, বল

-তোকে না অনেক সুন্দর লাগতেছে। এটা বলেই ঘাড় ঘুরিয়ে আকাশের দিকে তাকায় যেন খুব লজ্জা পেয়েছে। কিন্তু অদ্রি এসব কানে নেয় না। এসব কত শুনেছে। মেয়ে হয়ে জন্মেছে কিন্তু কোন পুরুষ তার সৌন্দর্যের তারিফ করেনি এমন মেয়ে পাওয়া অধুনা খুবই মুশকিল।

অদ্রি চোখে একটু রাগান্বিত দৃষ্টি এনে গলা কড়া করে বলে

-আবার তৈল মর্দন শুরু করলি?

– মনে মনে ঠিকই খুশি হইছিস। উপরে এমন ভাব দেখাচ্ছিস যেন সাত দিনের অনাহারী থাকার পর কেউ এক থালা ভাত ভিক্ষা দিয়েছে সেটা আমি কেড়ে নিয়েছি।গোলাপের জন্ম যদি এই যুগে হতো তাহলে তাকে ফুলের রাণী উপাধি দেওয়ার পর সে নিজে বিশ্বাস করতে পারতো না। সে ভাবতো তাকে তৈল মর্দন করছে। আজকাল ন্যাকামোর আড়ালে সত্য মূল্য হারাচ্ছে।

অদ্রি হাসি আটকে রাখতে পারেনা। হেসে হেসে বলেঃ-

– সবসময়ই এমন যুক্তি দিয়ে বেড়াস কেন রে?

– না হলে যে তৈলময় সমাজে সুন্দরের পূজা থেমে যাবে।

-হ্যা তা বুঝলাম। তবে কি জানিস আমরা সৌন্দর্যের প্রশংসা শুনে যতটা খুশি হই তোরা তার চেয়ে বেশি হোস।

আরাফ একটা ডোন্ট কেয়ার ভাব এনে বলে-

হ্যা জানি জানি। তোরা এত প্রশংসা পেয়ে থাকিস খুশি কম হওয়ারই কথা। তবে এত প্রশংসা তো আমাদের জন্যই পেয়ে থাকিস। আমরা যদি এটা না করি তোরা কি নিয়ে বেচে থাকতি বল? কিন্তু কি জানিস তোরা আমাদের দয়ার প্রতি এতটুকু কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করিস না।

-হ্যা তোদের ব্যাপক দয়া। এত দয়াই দেখিয়ে থাকিস যে আমাদের জন্য না কাঁদলে তোদের জীবনের পূর্ণতাই আসে না।

– বাজে কথা রাখ তো। খাইছিস দুপুরে?

-না। খাওয়াবি?

-পুরুষ হয়ে জন্ম নেওয়াটাই পাপ হইছে!

অদ্রি ভ্রু উঁচু করে টেনে টেনে বলেঃ-পাপকে পুণ্যে রূপ দিতেই তো খাওয়াবি।

আইইআর ক্যান্টিনে খাবার গ্রহণের পূর্বেই বিল পরিশোধ করতে হয়। ক্যান্টিন ম্যানেজারের কাছে গিয়ে আরাফ ১০০টাকা দিয়ে দু’টো খাবারের অর্ডার দিল। আরাফ বিল পরিশোধ করার পূর্বেই অদ্রি ম্যানেজারের দিকে একটি একশো টাকার নোট বাড়িয়ে দিল। আরাফ অবাক হয়ে বলেঃ- একি! তুই বিল দিলি কি জন্য?

– মাঝেমাঝে আমারও পুণ্য করতে ইচ্ছে হয়। পাপ তো আমার, আমাদেরও আছে।

-দার্শনিক মার্কা কথা বাদ দে তো। এটা নিয়ে পরে কথা বলব।

আসলে অদ্রির বিল পরিশোধের কারণ পাপ-পুণ্য নয়। এর পিছনে যে গল্পটি আছে সেই গল্পের জন্যই আজ আরাফ ও অদ্রি এক সাথে খেতে আসছে।

আরাফ দরিদ্র পরিবারের ছেলে। তার পরিবারে তার মা,বাবা আর এক ছোট ভাই আছে। নাম সিফাত। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। আরাফ ও সিফাতের খরচ যোগানো তার বাবার জন্য অসম্ভব। তাই সে মালিবাগের ষষ্ঠ শ্রেণির এক ছাত্রকে পড়িয়ে পুরো মাস চলে। বেতন পাঁচ হাজার টাকা। এখানে থেকে পনেরশো টাকা আবার বাড়িতে পাঠাতে হয়।

অপরদিকে অদ্রির পরিবারের আর্থিক অবস্থাও যে খুব উচ্চমানের তা না। তবে বেশ চলে। অদ্রি আরাফের ব্যাপারের সব জানে। তবে সে স্বইচ্ছায় এসব বলতে আসেনি। একদিন ডিপার্টমেন্ট এর সেমিনার কক্ষে তাড়াহুড়ো করে যায়। তার পাশের চেয়ারে কেউ নেই কিন্তু চেয়ারের উপর একটি কালো ব্যাগ। ব্যাগের উপর একটি নীল ডায়েরি। অদ্রির চোখ আনন্দে ঝলমল করতে লাগলো। নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি মানুষ টান সবসময়ই। নিষিদ্ধ জিনিসের মধ্যে অন্যের ডায়েরি পড়ার মধ্যে সে বেশি টান অনুভব করে। যেহেতু ব্যাগ চেয়ারের উপর তার মানে ডায়েরি ও ব্যাগের মালিক জায়গা রেখে বাইরে কোন কাজে গিয়েছে এবং সে বসেছে এমন জায়গায় যে দরজা দিয়ে কেউ প্রবেশ করলেই দেখা যায়। তাই কেউ আসা মাত্রই ডায়েরিটা তাড়াতাড়ি রেখে দেয়া যাবে ধরা পড়ার সম্ভাবনা খুবই অল্প। নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি ব্যাপক টানের প্রতি সম্মান রেখে, ধরা পড়ার সম্ভাবনা আছে কিনা এটা বিবেচনা করে ডায়েরিটা হাতে নিলো। ডায়েরি উল্টে দেখলো আরাফের নাম। আরাফকে সে ক্লাসে দেখেছে। তেমন কথা হয়নি। খুব অমনোযোগী মনে হয়। চেহারার মধ্যে অসম্ভব মায়া।

ডায়েরি উল্টিয়ে প্রথম পৃষ্টার লেখা দেখে বিস্ময়ে মনের অজান্তেই অদ্রি বলে উঠলো, ওয়াও! হাতের লেখা নয় যেন তুলির আঁচর। স্পষ্ট লেখা আছে, “লক্ষ্য যদি হয় মঙ্গলে যাওয়ার তবে মহাশূন্যে আমি এমনিতেই উঠব। তাই মহাশূন্য নিয়ে আমি ভাবিনা।” অদ্রির কথাটি পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা অনুভব করলো। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ছেলেটাকে সবচেয়ে বেশি অন্যমনস্ক মনে হয়, কথিত আনস্মার্ট বলা হয় সেই ছেলেটির চিন্তাভাবনাও যে কত পরিপক্ব, কত সূক্ষ্ম হতে পারে তা সে বারবার প্রমাণ পাচ্ছে। এই কারণে দৈহিক সৌন্দর্য বা পোশাকের আভিজাত্য দেখে সে কাউকে স্মার্ট বলে না।পরের পৃষ্ঠা উল্টিয়ে দেখলো কবিতার লাইনঃ-

“কিছু বাবার ভান্ডার শূন্য

খোদার আসন শূন্য বলে নয়,

পৃথিবী শূন্যতায় ভুগবে বলেই

এমনটি হয়!”

অদ্রি কবিতা বুঝেনা। এর মানে কী সে বুঝলো না। এটা চিন্তা করে সময় নষ্ট করা ঠিক নয়। আরাফ কখন চলে আসবে বলা যায়না। সে কবিতার লাইনগুলোর নিচে দেখলো

“বাবার পায়ের জুতা জোড়ার মূল্য কত? খুব বেশি কি? এজন্যই বুঝি বাবার পায়ের জুতা কেঁদে কেঁদে অভিশাপ দেয়! সেই অভিশাপ আমাকে শুনতে হয়। আমি এমনই যে তার অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে তাকে মুক্ত করতে পারিনা।”

অদ্রির চোখের কোণায় পানি জমতে থাকে, সে এটাকে তোয়াক্কা না করে পরের পৃষ্টায় গেল। লেখা আছে,

“হলে থাকা কোন ছেলেই কখনো অসুস্থ হয়না। বাবা, আমি তো ভালো আছি। চিন্তা করোনা।”

“মা আমাকে বলে ,”আমার জন্য কাফনের কাপড় কেনার সামর্থ তোদের যতদিন না হয় ততদিন পর্যন্ত আল্লাহ যেন আমাকে না নেন।” আমি এখনো সেই সামর্থ অর্জন করতে পারিনি।”

চোখের কোণা থেকে নোনা জল গাল বেয়ে ডায়েরির পাতা ভিজিয়ে দেয়। অদ্রি পরের পৃষ্টা উল্টায়,

“মা-বাবার নামে একদিন একটা ফান্ড তৈরি করব যেখান থেকে আমার মতো যারা মায়েদের কাফনের কাপড় কিনতে ব্যর্থ তাদের আমি এমনভাবে তৈরি করব যেন তারাও আমার মতোই একটি ফান্ড তৈরি করতে পারে।”

আরাফ সেমিনার কক্ষে প্রবেশ করেছে। অদ্রি তাড়াতাড়ি ব্যাগের উপর ডায়েরি রেখে চোখ মুছতে মুছতে সেখান থেকে বের হয়ে গেল। এরপরেরদিন থেকে অদ্রি আরাফকে খুব লক্ষ্য রাখে। এমনভাবেই লক্ষ্য রাখে যে আরাফের কয়টি শার্ট, কয়টি প্যান্ট আছে সব বলে দিতে পারবে। সেগুলোর রং কেমন এটাও জানে। এমনকি আরাফের ডান পায়ের জুতায় লাল সুতা দিয়ে একটি সেলাই আছে এটাও সে লক্ষ্য করেছে।আগে তেমন কথা না হলেও এখন সে আরাফের সাথে অনেক ব্যাপারে কথা বলে। ধীরে ধীরে কথা বলার মাত্রা বাড়তে থাকে। এক সময় তারা আবিষ্কার করলো তার খুব ভালো বন্ধু। অদ্রি তাই চেয়েছিল। সে মনে করে দুজন মেয়ের মধ্যে যে বন্ধুত্ব হয় তার মধ্যে তেমন টান থাকেনা। অনেক হিংসা কাজ করে।সহ্য ক্ষমতাও কম থাকে। দুজন ছেলের মধ্যে খুব ভালো বন্ধুত্ব হয়। প্রাণের টান থাকে। আর একটি ছেলে আর একটি মেয়ের মধ্যে সুপার বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। যেখানে হিংসাও থাকেনা, অনেক সহ্য ক্ষমতা থাকে।প্রাণের, মনের উভয় টানই থাকে। তবে সমস্যাও আছে। ছেলে-মেয়ে বন্ধুত্ব গড়ে উঠলে একজন আরেকজনের প্রেমে পড়ে যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ছেলের জন্যই হয়। ছেলেরা যার সাথে প্রতিনিয়ত চলে তা একসময় অভ্যাসে পরিণত হয়। এই অভ্যাস যে কখন ভালোবাসায় রূপ নেয় তা ছেলেরাও বুঝেনা। তবে আরাফকে দেখে তেমন মনে হয়না। আর তার ডায়েরি পড়ে, কথা বলে মনে হয়েছে সে একজন ভালো মানুষ। যখন খুব গভীর বন্ধুত্ব গড়ে উঠে তখন আরাফ তার সম্পর্কে, তার পরিবারের সম্পর্কে অদ্রির কাছে বলে।এই কারণে সে কখনোই আরাফকে বিল পরিশোধ করতে দেয়না। তবে মাঝেমাঝে সে নিজেই আরাফের কাছে আবদার করে বলে, “ঐ আমাকে পানিপুরী খাওয়াবি? ঐ আমাকে ঝাল মুড়ি খাওয়াবি?”এসব স্বল্পমূল্যের খাবার খেতে আবদার করে কারণ কোনদিন যেন আরাফ প্রশ্ন করতে না পারে কেন সে সবসময় বিল পরিশোধ করে,করুণা করছে এমন ভেবে না বসে। আজ তিন বছর ধরে এই ক্যাম্পাসে আরাফের বন্ধু শুধু এই একজনই।

আরাফ খেতে খেতে বলেঃ- বান্ধবীদের টাকায় কিছু খাওয়া মানে অমৃত খাওয়া। কী যে একটা আরাম লাগে বুঝেছিস?

অদ্রিঃ- কয়টা বান্ধবী আছে তোর? কয়জনের থেকে খেয়েছিস শুনি-

– ও মা একি! তোর চোখে ঈর্ষা কেন?

অদ্রি যেন একটু লজ্জা পেল। নিজেকে সামলে নিয়ে বললঃ- ঢং! ঈর্ষান্বিত কেন হব?

আরাফ টেনে টেনে অহমের সাথে বলল

-হতেও তো পারিস। কত মেয়ের স্বপ্নের পুরুষ আমি।

-তবে রে… এই বলে অদ্রি বাঁ হাত দিয়ে ঘুষি দিবে এমন ভাবে হাত তুলল। আরাফ অবাক হয়ে অদ্রির দিকে তাকাল। দুজন দুজনের চোখে চোখ পড়তেই কেউ হাসি আটকে রাখতে পারলো না।

আরাফের কোন স্মার্টফোন নেই। তাই ফেইসবুকসহ ভার্চুয়াল দুনিয়ার সাথে তার কোন সম্পর্ক নেই। তাই ক্লাস বাতিল, মেইক আপ ক্লাসসহ ডিপার্টমেন্ট এর কোন কিছুর খবরই সে তাদের ক্লাসের ফেইসবুক গ্রুপ থেকে নিতে পারেনা। এসব খবর জানতে সে কখনোই শ্রেণি প্রতিনিধিকে ফোন দেয়না। প্রথম বর্ষে থাকাকালীন শ্রেণি প্রতিনিধিকে ফোন দেওয়া পর মনে হয়েছিল সে খুব বিরক্ত হয়েছে। এর কিছুদিন পরেই অদ্রির সাথে তার ভালো বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। এরপর থেকে প্রতিদিন রাত নয়টায় সে অদ্রিকে ফোন দেয় ক্লাসের আপডেট কোন খবর আছে কিনা জানতে। আজকেও দিয়েছে।

অদ্রি ফোন ধরে খুব নিচুস্বরে বলে,”হ্যালো, আজ কোন আপডেট নিউজ নাই।” অদ্রির কথা ফোনে শুনলে মনে হয় কাঁথার নিচে শুয়ে প্রেমিকের সাথে খুব নিচুস্বরে কথা বলছে যেন মা-বাবা কেউ না শুনে।

-মনে হচ্ছে খুব বিরক্ত করলাম

-তুই কী ঝগড়া করতে ফোন দিছিস?

-ঝগড়া কে শুরু করছে, আমি না তুই?

-আমি কই শুরু করলাম?তুই তো কোন দিন ক্লাসের ব্যাপারে জানতে না চেয়ে ফোন দেস না তাই আগেই বলে দিলাম।

-আমি তো ক্লাসের ব্যাপারে জানতে হলেও দেই। তুই তো তাও দিস না।

-কেন দিব? আমার তো কিছু জানার প্রয়োজন হয়না।

-হ্যাঁ সবই তো জেনে বসে আছিস।

-কেন বিশ্বাস হয়না?

আরাফের কণ্ঠস্বর হঠাৎ খুব ধরে আসে।

– হ্যাঁ, হবেনা কেন! এটা বলেই ফোন রেখে দেয়।

আরাফের মনে হল তার হৃদয়কে কোন পর্বত চাপা দিয়েছে। চারিদিকে ছড়িয়ে থাকা হাওয়াকে তার খুব ভারী লাগছে।

সে বুঝতে পারছে খুব আবেগ ভর করেছে তার উপর। এটা এখন বাড়তে দিলে আরো কষ্ট লাগবে। সে দৌড়ে হলের ছাদে গেল। মন খারাপ থাকলেই আরাফ ছাদে যায়। আকাশে প্রকাণ্ড চাঁদ। এই চাঁদের সৌন্দর্য সবার জন্য না। চাঁদের হাসিও সবাই দেখতে পারেনা। আরাফও! তবুও সে চাঁদকে খুব ভালোবাসে। চাঁদের প্রতি এত ভালোবাসা থাকার একটি ব্যতিক্রমী কারণ আছে। সে যদি কাউকে খুব দূরে মনে করে তখনই সে চাঁদের দিকে তাকায় তখন তাকে খুব কাছে মনে হয়। কারণ সেই মানুষটিও একই চাঁদ দেখছে। এসব যে শুধু মনকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্যই ভাবে এটা সে জানে তবুও সে এই ভাবনাকে দূরে সরিয়ে দেয়না। কী দরকার? মনে তো সুখ পাওয়া যায়। চাঁদের দিকে তাকিয়ে সে মুচকি হাসি দিল।

ছাদে আসার পর বাতাস খুব হালকা লাগছে। মনের রং পরিবর্তন হতে শুরু করেছে। কী অদ্ভুত এই মন! মোবাইলে মেসেজ আসার শব্দ হল। অদ্রি মেসেজ করেছে, “সব কিছু জেনে কী হবে? জানার মধ্যেও ভুল হয়। কিন্তু অজানার মধ্যে অনন্ত সুখ।”

আরাফের মন ভালো হয়ে গেল। কিন্তু মেসেজের কোন উত্তর দিল না। এই মেয়েটি যদি তার পাশে না থাকতো তবে ক্যাম্পাস জীবন যে কিভাবে চলতো সে ভেবে পায়না। এই ক্যাম্পাসে তার আপন বলতে এই একজন মানুষই আছে। এমন আপন যে তার উপর অদ্রির ব্যাপক প্রভাব। এই প্রভাব কে আরাফ কখনোই বাজে চোখে দেখেনি। কিছু প্রভাব যদি ভালোবাসা থেকে হয়, ভালোবাসা বৃদ্ধি করে তবে তাতে ক্ষতি কী! ঠিক মতো খেয়েছে কিনা, গোসল করেছে কিনা, কাপড় নোংরা কেন, পড়াশোনা করছে কিনা, বাড়িতে কথা হয়েছে কিনা অদ্রি এসব জানতে চেয়ে আরাফকে সবসময় প্রশ্নের কামানের সামনে দাঁড় করিয়ে রাখবে। উপহার দিলে সম্পর্ক আরো উষ্ণ হয়। আরাফ ও অদ্রির মধ্যে এমনিতে সম্পর্ক খুব উষ্ণ তবুও একজন আরেক জনকে উপহার দিয়ে সেই সম্পর্ককে আরো উষ্ণ করে।তবে আরাফ উপহার দেওয়ার চেয়ে বেশি পায়।প্রতি ঈদেই অদ্রি আরাফের জন্য স্পেশাল উপহার কিনবে। অপরদিকে আরাফের লাল রেশমি চুড়ি, একটা ফুল কিংবা ফুটপাতে পছন্দ হয়েছে এমন স্বল্প মূল্যের ছোট কোন উপহার কেনা ছাড়া অন্য কিছু কেনার সামর্থ্য নাই। এগুলো পেয়েই অদ্রি আনন্দে নাচতে থাকে। উপহারের অনেক গুণগান করার পর আবার বলবে, “এসব আবার কেন কিনতে গেলি? শুধু শুধু টাকা খরচ।”

পরেরদিন অদ্রির আগে আরাফ উপস্থিত হয়। তার পাশে অদ্রির জন্য ব্যাগ রেখে জায়গা রেখেছে। অদ্রি আসতেই ব্যাগটা টেনে নিয়ে মুখ ঘুরিয়ে বেঞ্চের উপর হাত রেখে সেখানে মাথা গুঁজেছে যেন অদ্রিকে সে চিনেই না, তাই কোন কথা নেই। নীরব থাকাই ভালো। অদ্রি হাসতে থাকে। সে জানে একটু পরই ওর কথার জন্য কানের পর্দা ফেটে যাবে। অদ্রি খোঁচা দিয়ে বললঃ- সাহেবের বিবি কি পরলোক গমন করেছে?

আরাফ কোন উত্তর দিল না। অদ্রি আবার প্রশ্ন করলোঃ- আহা! আজকাল মেয়েরা এত কষ্ট দেয়! পুরুষ জাতিকে কষ্টের সাগরে ভাসিয়ে কী যে মজা পায় বুঝিনা। এসব মহাপাপ গো মহাপাপ। আমি আবার কখনো এসব করব না।

আরাফ মুখ না তুলেই জবাব দিলঃ-

-তোদের আবার পাপ কিসে?

-আমি কী করলাম? আর ঠিকই তো বলেছি পুরুষদের কষ্ট দেওয়া পাপই তো।

আরাফ মাথা তুলে বললঃ- জন্মই তো তোদের পুণ্য।

-কিভাবে?

– এমন ভাব করছিস যেন কিছুই বুঝিস না। তোদের পুণ্যের ফলাফল কোথায় পাস না বল? রাজনীতি, সাহিত্য, কর্মক্ষেত্র, প্রেম সব জায়গাতেই তোদের জয়জয়কার! রাজনীতির জন্য রাজপথে হাঁটতে হাঁটতে আমরা স্যান্ডেল ক্ষয় করে ফেলি, কিন্তু তোদের রাজনীতিতে কত সুযোগ। এত ভালো সাহিত্য লিখেও আমাদের লেখা উইপোকা খায়। কিন্তু কোন অপরিপক্ব সুন্দর রমণীর লেখা ছাপা হয় চকচকে পত্রিকায়।কর্মক্ষেত্রেও তো কত সুবিধা তোদের!চাকরি, প্রমোশনে সব জায়গায় তোদের এত মূল্যায়ন! এমনকি প্রেম করতে গেলেও ছেলেকেই প্রথম মুখ ফুটে বলতে হবে।

-আমাদের শরীরের কোমলতা, শরীরের বাঁক, সৌন্দর্য যদি পুণ্য হয় তবে সেখানে যে কোন ‘মানুষ’ থাকেনা। আর আমরা যদি মেধায়,কর্মে পুরুষকে ছাড়িয়ে দিগ্বিদিক জয়ও করি তবুও আমরা মূল্যায়িত হব লালসার দৃষ্টিতেই। আর এত মূল্যায়ন কোথায়? তুই বাংলাদেশ নারী ক্রিকেটের কতজন খেলোয়াড়কে চিনিস? অথচ দেখ তারা এশিয়া কাপ জয় করেছে। পত্রিকায় দেখিস না হলিউডের নারী অভিনেত্রীদের চেয়ে অভিনেতাদের বেশি পারিশ্রমিক দেয়া হয়। এরকম আরো অনেক উদাহরণ দিতে পারব। দিনশেষে দেখা যায় আমরা কোমল মাংস পিণ্ড ছাড়া কিছুই নই। তোকে আজ প্রচণ্ড নারী বিদ্বেষী মনে হচ্ছে। আগে তো এমন কথা কখনো বলিসনি?

-নারী বিদ্বেষী কই? ভুল ধারণা ভেঙ্গে দিয়েছিস। ধন্যবাদ। আচ্ছা বন্ধুত্বেও কী লালসার দৃষ্টি থাকে?

– তোর মধ্যে দেখিনি। দেখব কেমন করে? লালসা থাকে তো পুরুষের।

শিক্ষক ক্লাসে প্রবেশ করেছে আরাফের উত্তর দিতে পারেনি। শুধু দাঁতে দাঁত চেপে বলেছে, “তোকে পরে দেখে নিব।”

অদ্রি হাত দিয়ে মুখ চেপে হাসতে থাকে।

সেমিস্টার ফাইনাল পরিক্ষার ১৮ দিন আগে আরাফ অসুস্থতা অনুভব করে। তবে এটাকে বড় ধরণের কোন অসুখ না ভেবে আগের মতোই চলতে থাকে। কিন্তু তিন- চারদিন পর অসুস্থতার মাত্রা বেড়ে যায়। অদ্রিকে নিয়েই সে ডাক্তারের কাছে যায়। ডাক্তারের কাছে গিয়ে যা শুনেছে তার জন্য তারা কেউই প্রস্তুত ছিল না। আরাফের মনে হল পৃথিবীর সবটুকু ওজন তার মাথার উপর। অদ্রি ডাক্তারের রুম থেকে কাঁদতে কাঁদতে বের হয়ে গিয়েছে। আরাফ অদ্রির কাছে এসে হেসে হেসে বলে, “আরে পাগল, এসব কিছুনা। শীঘ্রই ভালো হয়ে যাব। আল্লাহ রোগ দিয়েছেন আল্লাহ ভালো করবেন। অসুখ তো আল্লাহর বিশেষ নিয়ামত। তুই ভেঙ্গে পড়লে আমার কী হবে?”

অদ্রির এখন চিৎকার করে কাঁদছে। আরাফকে কী বলবে তার ভাষা তার জানা নেই।

আরাফের মা-বাবাকে খবর দেয়া হল। এর পরেরদিন তার মা-বাবা ঢাকায় উপস্থিত হয়। তার মা তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। আরাফ হেসে হেসে কথা বলার চেষ্টা করছে কিন্তু গলা জড়িয়ে আসছে। তবুও একটি কথাই বারবার বলছে,”আমার কিছুই হয়নি, মা। আমি ভালো হয়ে যাব।” আরাফের বাবা প্রাণহীন কোন জড় বস্তুর মতো দাঁড়িয়ে আছে।

আরাফকে জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালে ভর্তি করা হল।প্রচুর টাকা দরকার কিন্তু সময় অল্প।অদ্রি প্রতিটি ডিপার্টমেন্ট এ গিয়ে আরাফের জন্য সহায়তা চাচ্ছে, ফান্ড রাইজিং এর বক্স নিয়ে পুরো ক্যাম্পাস ঘুরছে। ডিপার্টমেন্ট এর কয়েকজনকে সে পাশে পেয়েছে। তাদের নিয়ে ঢাকা শহরের বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থানে বিরামহীনভাবে সাহায্যের জন্য হাত পাতছে।

অদ্রি সকালে বের হয়ে রাত আটটায় হলে ফিরে তবুও তার শরীরে কোন ক্লান্তির ছাপ নেই। প্রথম কয়েকদিন রাতে শুয়ে শুয়ে সে যখন আরাফের কথা ভাবতো তখন তার শিমুল তোলার বালিশ নোনাজলে পিপাসা মেটাত। কিন্তু এখন সেই বালিশের আর তৃষ্ণা পায়না। যে জল পান করে তাই যে শেষ হয়না।

পরিক্ষা শুরুর কয়েকদিন আগে অদ্রি আরাফের সাথে দেখা করতে গেছে। আরাফের রুমের সামনে তার মা শূন্য দৃষ্টিতে উপরে তাকিয়ে আছে। অদ্রি রুমে ঢুকে দেখলো আরাফ বসে আছে। শরীর শুকিয়ে গেছে। চোখের নিচে কালি পড়েছে। অদ্রিকে দেখে সে উঠে দাঁড়িয়ে চিরচেনা হাসি দিয়ে জিজ্ঞাস করলো, “কিরে কেমন আছিস?”

অদ্রি উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করলো, “আংকেল কোথায়? বাহিরে দেখলাম না”

– বাবা তো বাড়িতে গেছে। শুধু শুধু কষ্ট করছে। তুইও তো করছিস। কষ্ট হয় না রে? তোর শরীরের অবস্থা এমন হল কেন? ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করিস না নিশ্চয়। শোন, আমি বলেছিলাম এই পরিক্ষায় তোর নোট চাইব না। দেখছিস আমি কথা রেখেছি। ঠিক না রে?”

অদ্রি ফুফিয়ে ফুফিয়ে কাঁদছে। কোনো কথা তার মুখে আসছে না।

-ঐ কান্না করছিস কেন?সামনে বসন্তকাল। ফুল দিয়ে কি একটা বানায় না চাক না কী বলে? দেখতে গোল মেয়েরা যে মাথায় দেয়। আমি সামনের বসন্তে তোর মাথায় ঐটা পরিয়ে দিব।

আরাফ খুব দ্রুত কথা বলছে। যেন আজই তার জীবন প্রদীপ নিভে যাবে। সব কথা আজই বলতে হবে।

আরাফের প্রতিটি কথা অদ্রির হৃদয়কে কাঁচের মতো টুকরোটুকরো করছে। সে আর সহ্য করতে পারছিল না বলে কাঁদতে কাঁদতে বের হয়ে যেতে চাচ্ছিল তখন আরাফ কান্না মিশ্রিত স্বরে বললঃ- “আমিই তো চলে যাব, তুই কেন যাচ্ছিস? একটু থাক না আমার পাশে।”

অদ্রি নিজেকে আর সামলাতে পারলো না। দৌড়ে গিয়ে আরাফকে জড়িয়ে ধরলো। কেঁদে কেঁদে বলতো লাগলো, “কোথায় যাব আমি? তোকে ছেড়ে যাওয়া যায় রে? তুই বেঈমান তাই চলে যেতে চাচ্ছিস। আমি বেঈমান না। আমি যাব না।” অদ্রি চিৎকার করে বলছে, “আমি তোকে বেঈমান হতে দিব না রে, বেঈমান হতে দিব না।”

আরাফ অদ্রিকে স্পর্শও করেনি। অদ্রি যেন কোন মৃত গাছকে জড়িয়ে ধরেছে। যে মৃত গাছ কান্না করে। আরাফের চোখের জল অদ্রির ঘাড়কে ভিজিয়ে দিচ্ছে। এটা অনুভব করে অদ্রির কান্না আরো বৃদ্ধি পায়।

সন্ধ্যা সাতটা বাজে।বাসে করে অদ্রি হলে ফিরছে। তার কান্না এখনো থামেনি। পাশের সিটে বসা ভদ্র লোকটি অদ্ভুত চোখে তাকাচ্ছে। অদ্রির সে দিকে খেয়াল নেই। সে ভাবছে, কেন সে নীল ডায়েরিটা পড়তে গিয়েছিল। নীল ডায়েরির প্রতি প্রচণ্ড ক্ষোভ হচ্ছে। সে যদি সেদিন ঐ ডায়েরিতে চোখের জল না ফেলতো তাহলে হয়ত এত কাঁদতে হতো না। চোখের জল দিয়ে যা শুরু তা কি চোখের জল দিয়েই শেষ হয়? এটাই কি বিধাতার নিয়ম?

ঢাকা শহরে আলোর ছড়াছড়ি। আকাশে চাঁদ নেই তবুও সব দিক আলোকিত। কিন্তু অদ্রির কাছে মনে হচ্ছে সবদিক থেকে অন্ধকারের মিছিল এগিয়ে আসছে। পথ খুঁজে পাবে তো?
———————-
লেখকঃ কাজী ই সাকিব
শিক্ষার্থী,দর্শন বিভাগ,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Top