রাজনীতিঃ যেমন নেতৃত্ব প্রত্যাশা করে তরুণ প্রজন্ম

IMG_20181203_012920.jpg

মুহাম্মদ হাসান মাহমুদ :

আমি গাই তারি গান
দৃপ্ত হস্তে যে যৌবন আজ ধরে আসি খরসান।
গুঞ্জরি ফেরে ক্রন্দন মোর তাদের নিখিল ব্যেপে
ফাঁসির রজ্জু ক্লান্ত আজিকে তাহাদের টুঁটি চেপে।
(কাজী নজরুল ইসলাম)

তরুণ বলতে আমি বুঝি যারা ১৮ কিংবা ১৯ থেকে শুরু করে ৩০ বছরের গন্ডির ভিতরে।যাদের স্পর্ধায় নেয় মাথা তুলবার ঝুঁকি।যারা আবেগ কে বিসর্জন দিয়ে বাস্তবতা বুঝতে শিখেছে।আর এ গন্ডির মধ্যে যারা আবদ্ধ তারাই মূলত তরুণ প্রজন্ম।

প্রথমে প্রশ্ন চলে আসে যাদের রাজনীতিতে কোনো আগ্রহ নেই ,তাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বে আবার প্রত্যাশা কি থাকতে পারে? আমরা কলরেডির একটি জরিপে দেখেছি যে, বাংলাদেশের ৮০% তরুণ রাজনীতি বিমুখ।তবে তাদের এ ক্ষেত্রে আর কি প্রত্যাশা থাকতে পারে! আবার আর একটি প্রশ্ন চলে আসে কেন তবে তরুণরা রাজনীতি বিমুখ?এর একটি সুন্দর জবাব প্রেসক্লাবের তরুণদের নিয়ে আয়োজিত একটি প্রোগ্রামে ২৯ নভেম্বর অধ্যাপক ড. শামসুল আলম দিয়েছেন,“ আসলে তরুণরা রাজনীতি বিমুখ নয় তারা হল অপরাজনীতি বিমুখ।” যেটা বাংলাদেশে বর্তমানে চর্চা হচ্ছে ফলে তরুণরা খুন খারাবি মারামারি ,প্রতিহিংসা অপছন্দ করার কারণে রাজনীতি বিমুখ হিসেবে নিজের স্থান নিশ্চিত করছেন ।

বাংলাদেশের মোট ভোট ব্যাংকের আড়াই কোটি তরুণরা ।যার ফলে শুধু তরুণদের নয় তরুণদের কাছেও রয়েছে প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলের প্রত্যাশা।গত ২৯ নভেম্বরে এ প্রত্যাশার প্রতিফলন আমরা নায়ক ফেরদাউসের মুখেও শুনেছি।তিনি বলেছেন,“আপনারা তরুণরা ভোট দেয়ার পরে ছবি তুলে আপনাদের ফেইসবুকে শেয়ার করবেন।”তার মানে স্পষ্ট যে তরুণদের এ ভোটের মূল্য অনেক।এছাড়া বর্তমানে আউটসোর্সিং এ তরুণ রা অনেকাংশে যুক্ত হতে শুরু করেছে ।১৬ % এর মতো বাংলাদেশি আউটসোর্সিং করে ।যার বেশির ভাগই তরুণরা।যা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে।

এবার আমরা তরুণদের কিছু সমস্যার দিকে নজর দিব।আর এ সমস্যা গুলোর সমাধান করাই হল রাজনীতিতে তরুণদের প্রত্যাশা, যে নেতা বা যার নেতৃত্ব যত দৃঢ় পদক্ষেপ নিয়ে সমস্যাগুলোর সমাধান দিবে তাঁর নেতৃত্বকেই তরুণরা মেনে নিবে।বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের জরিপ থেকে জানা যায় ,ভালো জীবন যাপন এবং পেশার উন্নতির জন্য ৮২ শতাংশ তরুণ দেশ ছাড়তে চান।গত পাঁচ বছরে ১ হাজার ৫৩ জন বাংলাদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন।২৬ লাখ এর উপর তরুণ বেকার রয়েছেন ।যাদের প্রয়োজন একটি চাকরি । এছাড়া ১৯৯১-২০১৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ৭ লাখ ২৪ হাজার ৬৩৬ জন নারী বিদেশে পাড়ি জমান ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকার একটি চাকরির জন্য।কিন্তু তারা সেখানে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হন ।যা আমাদের জন্য লজ্জার বিষয়।কেন আমাদের দেশে এমন সুযোগ তৈরি হচ্ছে না?আবার বেতন বাড়লে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস পত্রের দাম বেড়ে যায় কেন?।গত পহেলা ডিসেম্বরেও আমরা একটি জাতীয় দৈনিকে দেখেছি “মালয়েশিয়ায় কষ্টের জীবন” শিরোনামে একটি খবর ছাপা হয়েছে।কি করুণ পরিস্থিতিতে আছেন বাংলাদেশী মিনারুল,তারিক,মামুন,শাকিলরা! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কেও আমরা প্রায়ই দেখছি চাকরি না পাওয়ার হতাশায় আত্মহত্যা করছে।গত অক্টোবর মাস এবং নভেম্বর মাস তার জ্বলন্ত প্রমাণ।

প্রথমে তরুণদের যেটা প্রত্যাশা সেটি হল প্রত্যেকের একটির চাকরিরর ব্যবস্থা করা।আপনি চাকরিজীবীদের সুযোগ সুবিধা বাড়াবেন সমস্যা নেই ।কিন্তু সবার যদি চাকরি না থাকে পেটে ভাত না থাকে তবে এক শ্রেণি অনেক উপরে থাকবে আর এক শ্রেণি না খেয়ে মারা যাবে যা তরুণরা প্রত্যাশা করেনা।

কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা ।আমরা অনার্সে ৪ বছর যা পড়ি অনার্স শেষে দেখি এ পড়াশুনা কোনো কাজে আসে না ।তার মানে চাকরির পড়াশুনা আবার নতুন করে শুরু করতে হয়। তাহলে এ পড়াশুনার লাভ কি?যদি পড়াশুনার সাথে কর্মসংস্থানের কোনো সম্পর্ক না থাকে।তরুণরা চায় এপ্লাইড পড়াশুনার পদ্ধতি।

উদ্যোগতা সৃষ্টি না হওয়া একটি বড় সমস্যা।মালদ্বীপের জনসংখ্যার চেয়ে বাংলাদেশের বিসিএস এ আবেদন কারী সংখ্যা বেশি।কিন্তু কারন কি ?কারন হল সরকারী চাকরী সোনার হরিণ।সুযোগ সুবিধা দিন দিন বৃদ্ধি,দুর্নীতির সুযোগ ইত্যাদি ইত্যাদি।যার ফলে কেউ আর ঝুঁকি নেয় না।আর পড়াশুনাও একজন শিক্ষার্থীকে সেভাবে উৎসাহ দেয় না।তারপর রাজনৈতিক বিভিন্ন বাঁধা,পাশাপাশি সরকারি সাপোর্ট এর অভাব তো রয়েছেই।

রাজনীতি মানেই মাদক- –মারামারি ইত্যাদি।কারণ এমন একটি ট্রেন্ড চালু হয়েছে যে বিড়ি,সিগারেট,গাঁজা মদ না খেলে নেতা হওয়া যায় না।মারামারি বাধাতে হয়,ঝামেলা পাকিয়ে নিজের ক্ষমতার প্রমাণ দিতে হয় ।তাই তরুণদের রাজনীতি অপছন্দের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পরিশেষে বলব,তরুণদের আছে এক উজ্জ্বল ইতিহাস।তারা ১৯৫২,১৯৫৪,১৯৬৯,১৯৭১,১৯৯০ সকল রাজনৈতিক আন্দোলনে অবদান রেখেছেন।তাদের সে ইতিহাস কেউ ভুলে নি।ভুলেনি বাংলার তরুণরা।ভুলেনি সালাম,বরকত,রফিক,নূর হোসেন,আসাদ,রউফুন বসুনিয়া, আ.স.ম আব্দুর রব,মতিয়া চৌধুরী,তোফায়েল আহমেদ দের কেউ তরুণরা। তরুণরা যে তাদের উত্তরসুরী।তরুণরা ন্যায়ের পক্ষে থাকতে চায়। তরুণরা ক্ষুধা দারিদ্রমুক্ত একটি সুখী সুন্দর বাংলাদেশ চায় সকল অপরাজনীতির উর্ধ্বে থেকে ।আর এ নিশ্চয়তা যে দিবে তরুণদের, এক্ষেত্রে তরুণরা যাকে যোগ্য মনে করবে তরুণরা সে নেতৃত্ব কেই প্রাধান্য দিয়ে এমন রাজনৈতিক নেতাকে বিপুল ভোটে জয়যুক্ত করবেন পূর্বাপর কাজের বিবেচনায়।

শিক্ষার্থী,দর্শন বিভাগ,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Top