প্রত্যাশা( ছোটগল্প) — ওসমান গনি শুভ

IMG_20181126_003731.jpg

( পর্ব-৩)
—————————————-
প্রত্যাশার চেহারা অবাক সুন্দর এবং ইকরামের চেহারাও খুবই স্মার্ট।
একদিন বৃষ্টিতে কোচিং এ কেউ আসিনি শুধু প্রত্যাশা আর ইকরাম ছাড়া । স্যার ও তার শ্বশুর মারা গেছেন বলে চলে গেছেন শ্বশুর বাড়িতে সবার ছুটি জানা ছিল শুধু তারা দুইজন ছাড়া কারণ তারা পড়া এবং কোচিং নিয়ে ব্যস্ত ছিল।

তারা সেদিন একে অপরের সাথে গল্প করল জীবনের কিছু টপিক নিয়ে। কিভাবে ইকরামের মা মারা গিয়েছিল সে কথা বলতেই ইকরামের
নেত্রজল গড়িয়ে পড়ল অঝোরে। প্রত্যাশা উড়না দিয়ে চোখ মুছে দিল মনের অজান্তেই। সেই থেকে তারা আরো ক্লোজ হল। নিজেদের কলেজ সম্পর্কে তারা অনেক গল্প করল।

কোচিং এর প্রত্যাশা কিন্তু উপজেলার ধনী বাবার একমাত্র মেয়ে। সোমবার , কলেজ ছুটি কিন্তু কোচিং খোলা। তারা উভয়ই কোচিং এ আসল। আগেকার চেয়ে প্রত্যাশা এবং ইকরাম একটু বেশিই মেলামেশা করছে দেখে স্যার তাদের দুজনকে সাবধান করে দিলেন।

প্রত্যাশা ও ইকরামের স্মার্টফোন ছিল। তারা মোবাইলে কথা বলা শুরু করল। তাদের মধ্যে প্রেম নামক বস্তুটির শুভ উদয় হল।

যেনো দুইটি গোলাপফুল তারা দুইজন। ইকরাম বাশারের বাড়িতে কৌশলে গিয়েছিল প্রত্যাশা। যেমন চেহারা তেমন চালাক সে। চেহারা এবং বুদ্ধির এ যেন এক অপূর্ব সংমিশ্রণ । কোন এক জরিপের নামে সে ইকরামের বাড়িতে গেল । বাড়িটা
এবং বাড়ির মানুষগুলো তার বড় ভালই লাগল, এখানে অর্থ্যৎ এমন পরিবারে সংসার বাঁধলে কোনক্ষতি হবে না ।

প্রত্যাশার জীবনের আশা ছিল সে ইকরামকে নিয়ে সুখের ঘর বাঁধবে। জীবন আবেগ দিয়ে চলে না জীবন চলে টাকা দিয়ে। চাকা না হলে যেমন গাড়ি চলে না, টাকা না হলে তেমনি জীবন চলে না। ইকরামের পরিবার খুব বেশি স্বচ্ছল না, এদিকে ইকরাও কিছু করে না। যাইহোক ইকরাম ও প্রত্যাশা ছিল একই গাছের দুইটি সদ্য প্রস্ফূটিত গোলাপ। তাদের প্রেমে অনেক কাহিনী ঘটেছিল যেটি লাইলী- মজনু, শিরি-ফরহাদ, ইউসুফ- জুলেখা, শাহজান- মমতাজ থেকে কম নয়।

একদিন তারা দুইজন উপজেলার নিভৃত পল্লী পার্কে বেড়াতে এল। সেদিন তারা সারাদিন গল্প করল। ঝালমুড়ি খেল, আইচক্রিম, পপকর্ণ, ফুসকা, রসমালাই খেল। নিজেদের জীবনের সমস্ত গল্পই তারা সেদিন করেছিল। সেদিন তাদের প্রেম নদী থেকে বেড়ে সাগরের মতো হয়ে গেল। এভাবে তারা লুকিয়ে বিভিন্ন স্পটে গিয়ে দেখা করত।

( পর্ব-৪)

–গ্রাম্য প্রবাদে আছে লুকিয়ে খেলে শুকিয়ে যায়। ঠিক সেরূপ ঘটল, তাদের গার্ডিয়ানদের কাছে খবর পৌঁছে গেল বাতাসের আগে। কথায় বলে মন্দ খবর বাতাসের আগে ধাই,ঠিক যেনো তাই।

তবে সাক্ষাতকার তাদের বন্দ হয়নি মোটেও। হবেইবা কিভাবে তাদের যোগাযোগ তো সৃষ্টিকর্তার কর্তৃক নির্ধারিত। তাদের প্রেম যেন সদ্যজাত অর্থাত সদ্যভূমিষ্ট সন্তানের ন্যায় পূত-পবিত্র।

ইকরাম বাশার ও প্রত্যাশা এই আল্ট্রা- মডার্ণ এবং ডিজিটাল যুগে একে অপরের নিকট চিঠি লিখত। চিঠির বক্তব্য ছিল ঠিক কাব্যের মত। মধু আর রস- রসিকতাপূর্ণ। ইকরাম যেন ঠিক প্রেমিক পুরুষ আর প্রত্যাশা এ্যানজেল প্রেমিকা।

চিঠিগুলোর কিছু অংশ নিচে উদ্ধৃত হলঃ–
ভালবাসার প্রত্যাশা,
তুমি আমার হৃদয় নিংড়ানো ভালবাসা নিও। তুমি ভাল আছ এটা আমি জানি কারণ তোমার জীবনে ভালবাসার বাশার আছে।

তুমি আমার সকালবেলার হেয়ালি করা বেখেয়ালি খামখেয়ালি। তুমি আমার প্রভাতের টুনটুনি যে মিষ্টি কিচিরমিচির শব্দে আমার ঘুম ভাঙে
। তুমি আমার হার্টবিট যা না থাকলে বা না কাজ করলে মানুষ বাঁচে না। তুমি আমার জানু, জানপাখি, সোনার ময়না। তুমি আমার কাজলবরণ কন্যা। তোমারে না দেখলে আমি অনিদ্রায় ভুগি। তোমার সৌন্দর্যের তুলনা হয়না গো। পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্য তোমার কাছে অর্থহীন, নির্বিকার। তোমার চোখদুটি মায়াবিনী হরিণীর মতো যা দেখলে আমি মুহূর্ত ক্রাশিত হয়। তোমার ভ্রুকুটি আমার বেঁচে থাকার প্রত্যাশা জাগায়। তোমার প্রত্যাশায় আমি সর্বদায় নিমগ্ন থাকি। তোমার লাল সরু চঞ্চুতে লাল লিপস্টিকই বেশি শোভা বর্ধন করে । তোমার কানের দুল আমার বেঁচে থাকার মূল। তোমার কপালের লালটিপ আমার আকাশের লালসূর্য।
তোমার হাতের কাচের চুরি আমার হৃদয়ে দেয় সুখানুভূতির সুড়সুড়ি। তোমার হাতের ঐ ব্রেসলেট আমার আকাশে রিমিক- ঝিমিক আভা দেয়
। তোমার হাতের মেহেদি যেন আমার বন্য পৃথিবীতে আদিম বন্য মানুষের শিকারের দাগ কেটে যায়। তোমার পরণের আসমানি শাড়ি যেন আমার আসমানকে আচ্ছাদিত করে নিগূঢ় পবিত্রতায়। হে মানবী, তোমাতে বিভোর হতে চায়।

ইতি
তোমার লাবিং ডেয়ার
ভালবাসার বাশার

( পর্ব-৫)

—-> চিঠি পড়ে প্রত্যাশা আর আনন্দে উদ্বেলিত হয় তার সকল আশা।সেও চিঠির জবাব দিত নিয়মিতই।

ভালবাসার বাশার,
তোমার জন্ম হয়েছে শুধু আমার জন্য। তুমি ভাল আছ এটা আমি মনেপ্রাণে জানি। আমি তোমার মত মনের মাধুরী মিশিয়ে লিখতে পারি না শুধু একটি কথা জানি আমার জীবনে শুধু একটি ময়নাপাখির আর্বিভাব সেটা হল তুমি। তোমার ঘোলাটে চোখে আমি টাইটানিকের কিচম্যান লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিয়কে দেখতে পায়। তোমার আঁখিতলে লেখা আমার বাকিজীবন। আমি তোমার হলুদ শার্টের বোতাম হতে চায়, থাকতে চায় তোমার হৃদয়ের ঠিক মাঝখানে। ইসলামে আছে স্বামীর পদতলে স্ত্রীর বেহেশত তাই তোমার চরণের জুতাযুগল হতে চাই। তোমার দুই চরণে লেখা আছে আমার আশু – মরণ। তোমার কোমরের ধূসর বেল্ট হতে চাই, লেপ্টে থাকতে চায় কেয়ামত পর্যন্ত। তোমার গলার টাই/ বন্ধন হতে চাই। তুমি আমার তমসা নিশির আশার প্রদীপ। তোমাকে এভাবে এভাবে দেখতে চাই আমরণ

ইতি তোমার
ভালবাসার প্রত্যাশা।

পরেরদিন তারা চিঠির মতো করে সেজে – গুঁজে আসল । এইদিন তাদের প্রেমের শেষ পরিণয় ছিল সম্ভবত।

উপজেলার বিনোদিনী পার্কে আসল তারা। সারাদিন মজারগল্প, সুখ- দুঃখের গল্প করল। এক পর্যায়ে ইকরাম তীক্ষ্ণ চঞ্চুর আঘাত করল। এ আঘাত যেন সুখের আঘাত। প্রত্যাশার এমন সুখের আঘাত পাওয়ার ইচ্ছা অনেক দিনের। ঠিক সেই পর্যায়ে রিমঝিম বৃষ্টি ঠিক যেন বাংলা ছায়াছবির সাথে মিলে গেল বোধহয়, মিলে গেলেও এটি বাংলা ছায়াছবির কোন দৃশ্য নয় এটি তাদের অনাঙ্খিত বাস্তব। প্রত্যাশার আশা এমনদিনে এমনিভাবে সে গুঁড়গুঁড়ি বৃষ্টিতে ভিজবে তার স্বপ্নের নায়কের সাথে সে সু্যোগ এখনই সৃষ্টি হল। সেদিনের ঘটনা সেখানেই শেষ।
তারা বাড়ি ফিরে গেল।

বাসায় এসে ভীষণ জ্বর ধরলো প্রত্যাশার সে জ্বর সহজে সারল না এ যেন কালাজ্বর। যে জ্বর হলে জীবন সংকট পূর্ণ।

(পর্ব -৬ + অন্তিম পর্ব)
———————————————————–
–>> প্রত্যাশা তার ধনীবাবার সাথে হাসপাতালে গেল। তারপর জ্বর ধরা পড়ল বটে সেই সাথে ধরা পড়ল যমের বাড়ি যাওয়ার টিকিট,যার নাম ব্লাড ক্যানসার। যাইহোক প্রত্যাশার সাথে সরাসরিভাবে কিছুই বলেননি ডাক্তার
।বলেছিল তার বাবার সাথে। পিতা- মাতার কথোপকথনের এক পর্যায়ে গোপনে শুনে ফেলে ব্যাপারটি। তার সুখের আকাশ পাংশুবর্ণ ধারন করল।

পৃথিবীতে নিজের আশু মৃত্যুর কথা শুনে কার বা ভাল লাগে। সে কেমন যেন চুপচাপ হয়ে গেল। ঠিকমতো আহার- নিদ্রা নেই এ যেন একটি স্বপ্নের অপমৃত্যু। এদিকে বাশার নিয়মিতই তাকে ফোন দেয় তবে প্রত্যাশা তা রিসিভ করে না। তার মন নেই নিজের ঘরে তো ফোন ধরবে কি করে। যাইহোক রোগ ধরা পড়ার পঞ্চম দিনের মাথায় সে ইকরাম বাশারকে অবগত করল। ঘটনাটি শুনে বাশার মর্মাহত, পীড়িত। সে তৎক্ষনাত হন্তদন্ত হয়ে ছুটতে লাগল প্রত্যাশার বাসার দিকে। পথিমধ্যে একটি হলুদ রড এবং সিমেন্টবাহী ট্রাক বাশারকে সোঁ করে ধাক্কা দিল।
বাশারের ভালবাসার প্রত্যাশার খবর নেওয়া হলো না । রাস্তার আমজনতা ব্যাপারটি দেখতে লাগল এবং তানিয়ে গবেষণা, ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করতে লাগল। এক দাড়িওয়ালা ভদ্রলোক ইকরাম বাশারকে হাসপাতালে নিয়ে গেল। মনে হয় মাথায় বেশি আঘাত পেয়েছে। রক্ত পড়েছিল টকটকে লাক রক্ত। রক্ত পরীক্ষার পর জানা গেল রক্তের গ্রুপ AB+। অলৌকিকভাবে দাড়িওয়ালা ভদ্রলোকটির রক্তের গ্রুপ ছিল AB+। রক্তদিয়ে সেবার তার যমের বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হলো। কিন্তু ব্রেন হ্যাফ ড্যামেজড। স্মৃতশক্তি সব জায়নি।

যাকে সে ভালবাসে তাকে সে স্মৃতিশক্তি না থাকলেও ভুলবে কি করে?

এ যেন সদ্য প্রস্ফুটিত দুটি লাল গোলাপ অকালে ঝরে যাওয়ার মিনতি – প্রার্থনা করছে।

প্রত্যাশার রোগ ধরা পড়ার ৬১ দিন পর বাশার একটু সুস্থ্য হয়ে গ্রামের যাওয়ার সময় রাস্তার পাশে প্রত্যাশার ধনী বাবার কবরস্থানের উত্তর- পশ্চিম কোণের ডানপাশে একটি কবরের বেড়ায় ঘূণ ধরতে দেখল।

—————-★★★——————–
(যবনিকা/ শেষ)।

Top