কিছু হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নের গল্প

received_2323990057643210.jpeg

—————

কিছু মানুষ ছোটে সুখের আশায়,কিছু মানুষ টাকার নেশায়, আবার কেউ ছোটে আবেগের তাড়নায়, কেউবা আবার রক্তের মায়ায়,একেই বলে পৃথিবী গ্রহের বিচিত্র মানুষ।বিচিত্র তাহার স্বভাব। এই বিচিত্র মানুষের ভিড়েই কোনঠাসা হয়ে আমরা ছুটে চলি আমাদের গন্তব্যে।

১৫-ই জানুয়ারি ২০১৭, আমি ও এক দূরদর্শী স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি দিয়েছিলাম এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায়। এই স্বল্প সময়ে সাক্ষী হয়েছি নানা সাফল্য, হতাশা, সংগ্রামের। সাক্ষী হয়েছি এক দুঃসাহসিক অভিপ্রায়ের। “আত্মহত্যা” শব্দটির সাথে পরিচিত ছিলাম অনেক আগেই। ছোটবেলায় বাড়ির পাশে এক ভাবিকে দেখেছি রেললাইনে সন্তান দুইটিকে ঘুম পাড়িয়ে কীভাবে পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়েছিল।তার টুকরো টুকরো শরীরের অংশ গুলো দেখেছি, ছোট ছিলাম ভয় পেয়েছিলাম অনেক। দেখেছি জে.এস.সি ও এস.এস.সি রেজাল্ট দেওয়ার পরপরই কীভাবে আত্মহত্যার মাত্রা বাড়িয়ে তুলতো ফেল করা শিক্ষার্থীরা,দেখেছি স্বামীর অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে বিষ খেয়ে বাঁশবাগানে ঘাপটি মেরে বসে থাকা চাচীকে,কখনো কখনো বিরহের যন্ত্রণায় ও মরতে দেখেছি অনেককে।তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে যখন শুনতাম আগের কষ্টতাই নতুন করে পেতাম,অচেনা লাগত না।কিন্তু গত ১২ ই নভেম্বর শুনতে পাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের ২য় বর্ষের ছাত্রী ফাহমিদা রেজা সিলভীর আত্মহত্যার খবর, ১৫ ই নভেম্বর খাদ্য ও পুষ্টি বিভগের ইভার আত্মহত্যার খবর,১৬ ই নভেম্বর ইংরেজি বিভাগের দীনার আত্মহত্যার খবর , এই তিনজন এর মধ্যে দুইজন ঝিনাইদহ ও একজন যশোরের বাসিন্দা। এখন সত্যি নিজেকে আর সংযত করতে পারছি না , মেনে নিতে পারছি না এই অপ্রত্যাশিত মৃত্যু।
একটি সেচ্ছাসেবক প্রতিষ্ঠান শোভা(society for voluntary activities) প্রায় ১০ বছরের বেশি সময় আত্মহত্যা নিরসনে কাজ করছে ঝিনাইদহে,তাদের মতে গত ৬ বছরে প্রায় ২,৩৩২ জন মানুষ আত্মহত্যার বলি হয়েছে ঝিনাইদহে এবং এর মধ্যে ১,৪৫৭ জন ছিল মহিলা এবং ৮৭৫ জন ছিল পুরুষ। যখন মাধ্যমিক স্কুলে পড়তাম কয়েকবার” শোভা” সংস্থা থেকে ইলা চৌধুরী নামে এক আপাকে আসতে দেখতাম, আপার কথাগুলো অনেক ভাল লাগতো,অনেক শিক্ষা ও পেয়েছি তার কথায়।কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে যখন কেউ আত্মহত্যাকে সমাধান বলে বেছে নেয় এটা কষ্টের নয়, বরং অপমানের। আমরা জানি,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ ছেলে মেয়ে সবুজ-শ্যামল গ্রামের এক একটি ফুটন্ত মেধা।কিন্তু কেন এই সুপ্ত কলিগুলো পূর্নতা পাওয়ার আগেই শুকিয়ে যাচ্ছে?

আমরা জানি,প্রতিটি মানুষকেই প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করতে হয় এডজাস্টমেন্ট এর সাথে।একটা সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়া শিশুকে এডজাস্ট করতে হয় এই পৃথিবী নামক গ্রহটির সাথে,আর তার এই এডজাস্টমেন্ট চলতে থাকে মৃত্যু পর্যন্ত।যখন আমরা গ্রাম বা বিভাগীয় শহর থেকে আসি এই ইট পাথরের শহরে আমাদের সামনে প্রথম চ্যালেন্জ আসে এডজাস্টমেন্টর। শুরু হয় এই সুত্র থেকে বিভিন্ন সমস্যার জাল।চলে যায় আমরা আামাদের শহরে যেখানে থাকি আমরা আর একটা রশি!!!!!

আসুন না,আর ইনট্রোভার্ট না, নিজেকে নিজে না জেনে সবাইকে জানি,খুজে বের করি আমাদের সকলের নিজ নিজ টাইপএর বন্ধু/বান্ধবী, শেয়ার করি আমাদের কষ্ট,আবেগকে হারিয়ে ছুটে যায় আমাদের গন্তব্যে,তৈরি করি এক আত্মহত্যামুক্ত বাংলাদেশ।

লেখকঃ
রোশনী খাতুন,
সমাজকল্যান ও গবেষণা ইনস্টিটিউট,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Top