একজন শ্রেণি প্রতিনিধি ও বৃষ্টি—কাজী ই সাকিব

image.png

——————–
কোন জলপরীর প্রশস্ত কপাল থেকে একটি সবুজ টিপ যেন খসে পড়েছে একটি রূপালী সমুদ্রে। চারিদিকে জল আয়তনে, গভীরতায় সমুদ্র নয় আসলে কিন্তু দেখতে তাই লাগে। তবে এই দেখাটা শুধু বর্ষাকালের জন্য। হেমন্তে এই অঞ্চল দেখে বুঝার উপায় নেই যে এই অঞ্চল বর্ষাকালে রূপালী সমুদ্রে রূপ নেয়। তবে হেমন্তকালেও এই অঞ্চলকে সমুদ্র বলা যায়। সবুজের সমুদ্র!রঙের ভিন্নতা নিয়ে সবসময় সমুদ্রের রূপ নিয়ে থাকে বলে এই অঁজপাড়া গাঁ থেকে যে কয়েকজন মানব সন্তান যান্ত্রিকতার টানে শহরের অবস্থান নেয় তারা স্বীকৃত কোন সমুদ্র দেখতে তেমন আগ্রহ প্রকাশ করেনা। তবে এই সমতল ভূমির মানুষগুলোর পাহাড়ের প্রতি রয়েছে তীব্র টান।
গোবরে পদ্মফুল ফুটে। কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন, “পথে ফুটে তাজা ফুল।” প্রকৃতির এই আশ্চর্য নিয়মে এই অজপাড়া গাঁয়েও মেধাবী জন্ম নেয়। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া সুমন ইসলাম এমনই একজন।বৃক্ষ খুব চেষ্টা করে যেন জ্যোৎস্না মাটি স্পর্শ করতে না পারে। কিন্তু গাছের পাতার ফাঁক ভেদ করে জ্যোৎস্না ঠিকই মাটিকে স্পর্শ করে। সুমনের গ্রাম যেন বৃক্ষের নিচে থাকা সেই মাটি। আর সেই মাটির ছেড়া জ্যোৎস্না হল সুমন। সুমন স্বভাবে নম্র-ভদ্র,চঞ্চল, সবসময় মুখে হাসি লেগে থাকে। একজন আদর্শ ছাত্রের যতগুলো গুণ দরকার সবই সুমনের মধ্যে বিদ্যমান। সে প্রাইমারী স্কুল থেকেই তার মেধার পরিচয় দিয়ে আসছে। সেখানকার শিক্ষক, আত্মীয় স্বজন তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। ঈর্ষা করার মতো মানুষের সংখ্যাও নগণ্য ছিলনা বরং বেশিই ছিল। কারণ গোবরে কীটের জন্মকেই মানুষ স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করে।
প্রাইমারী, মাধ্যমিক পেরিয়ে সেই ছেলেটি জেলা শহরের একটি কলেজে ভর্তি হয়। গ্রামে থাকা ছেলেটি শহরে এসে ব্যাপক উন্নতি করে। মানুষের সাথে কথা বলা, সহজে অন্যের সাথে মিলতে পারা, বন্ধুদের সাথে সময় কাটানো, আনন্দ-দুঃখ ভাগাভাগি করে নেওয়া এসব খুব সহজেই নিজের মধ্যে আয়ত্ত করে নেয়। পড়াশোনা বেশ চলতে থাকে।কলেজ পেরিয়ে সে দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়, প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পায়।
একসময় সুমনের কাছে শুধু তার মা-বাবা, পরিবারের প্রত্যাশা ছিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়াতে এলাকার মানুষও প্রত্যাশার বীজ বপন করে। চোখে হাজার স্বপ্ন আর সবার প্রত্যাশা পূরণের অঙ্গীকার নিয়ে সুমন তার গ্রাম ছাড়ে।
সে খুব বন্ধুত্বসুলভ হওয়ায় তার ক্লাসের প্রায় সবার সাথে স্বল্প সময়ে তার পরিচয় ঘটে। এরই সুবাদে ক্লাসের শ্রেণি প্রতিনিধি নির্বাচনে সর্বোচ্চ সংখ্যক ভোট পেয়ে ছেলেদের মধ্য থেকে সে নির্বাচিত হয়। সাথে একজন মেয়ে প্রতিনিধিও নির্বাচিত হয়। নাম আয়মান।
সুমন দায়িত্ব নিতে ভালোবাসে। দায়িত্বগ্রহণের পর এক প্রকারের মানসিক চাপ অনুভূত হয়। কেন জানি এটা অনুভব করতে সুমন ভালোবাসে।
শ্রেণি প্রতিনিধি হওয়াটা যে আনন্দের, সম্মানের, সেটা বড় ভাইয়েরা তাকে খুব করে বুঝিয়েছিল। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠও যে আছে এটাও বলেছিল তবে তা ছিল চন্দ্রের রূপ বর্ণনার পর তার গায়ে কিছু কালো দাগ আছে, তবে ও কিছুনা। এরকম।
দ্বিতীয় বর্ষের দু’জন শ্রেণি প্রতিনিধি সুমন ও আয়মানকে তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে জ্ঞান প্রদান করে। এখানে যে দায়িত্ব পালনের নামে সিনিয়ররা জুনিয়রের উপর আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করে সেদিন সুমন তা খুব ভালো করেই বুঝতে পেরিছিল।
শ্রেণি প্রতিনিধি হিসেবে সুমনের প্রথম ক্লাসটি ছিল ফ্রেমে বাঁধাই করে রাখার মতো। শ্রেণি প্রতিনিধি যেন সবার চোখের মণি। সবাই সুমন, আয়মানের সাথে কথা বলতে চাচ্ছে। যেন বহুকাল পর বন্ধু বাড়িতে এসেছে।
ক্লাস শুরুর পূর্বে তার বিভাগের অন্যান্য বর্ষের শ্রেণি প্রতিনিধিসহ, বিভাগের রাজনৈতিক বড় ভাই, বিভাগের সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধি হিসেবে বড় ভাই-আপুদের সমাগম হয়। তারা এসেছিল সবার সাথে পরিচিত হওয়ার জন্য। সবাইকে তারা তাদের নাম, পরিচয় বললেও সুমনের ক্লাসের সুমন আর, আয়মান ছাড়া কাউকে তারা চিনে যেতে পারেননি।
শিক্ষকগণ সাধারণত শ্রেণি প্রতিনিধি ছাড়া কারো সাথে কথা বলেন না। তাদের কাছে ক্লাসে নাম ধরে ডাকার মতো শিক্ষার্থী শুধু শ্রেণি প্রতিনিধিই থাকে। পরে যারা বিভিন্ন কিছুতে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দেয় শিক্ষকগণ তাদের চেহারা, নামসহ সবই স্মৃতি কোঠরে আবদ্ধ করেন। এমনকি টিউটোরিয়াল ক্লাসে একজন শিক্ষকের নিকট যখন ৮/১০ জন শিক্ষার্থী কয়েকটি ক্লাস করে তখনও শিক্ষকের সাথে ঐ ৮/১০ জনের তেমন কোন সম্পর্ক গড়ে উঠেনা। শিক্ষক নামও বলতে পারবেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র- শিক্ষক সম্পর্ক এখন এই পর্যায়ে পৌঁছেছে।
তবে শ্রেণি প্রতিনিধি হওয়ায় সুমন যেন প্যাকেট করা বিরিয়ানি পেয়েছে।সে শুধু খাবে।সেদিন দু’জন শিক্ষকের ক্লাস ছিল। দুজনের সাথেই সুমন ও আয়মান পরিচিত হয়। দু’জন শিক্ষকই তাদের অভিনন্দন জানান। যোগাযোগের জন্য শিক্ষক ফোন নাম্বার চাইলে সুমন ও আয়মান নিজেদের ফোন নাম্বার প্রদান করে। সেদিনটিতে যে সুমন নিজেকে খুব সম্মানিত বোধ করেছিল তাতে সন্দেহ করার অবকাশ নেই।
বন্ধুহীন জীবন মরুভূমিতে থাকা দরজা জানালাহীন একটি ঘরের মতো। খুব তাড়াতাড়ি সুমন একটি সার্কেল গড়ে তুললো। তবে সবার সাথেই সে খুব ভালো সম্পর্ক রাখার চেষ্টা করলো। হাসি-ছাড়া যেন কথা বললে প্রকৃতির কোন নিয়মে বিঘ্ন ঘটবে তাই সে যেন হাসি ছাড়া কথা বলা ভুলতে বসেছিল। তবে একদিন সে এই পথ থেকে ফিরে এলো।
ফার্স্ট ইয়ারে পড়াশুনা নাই বললেই চলে। ক্লাস আর হলের পলিটিকাল প্রোগ্রাম ছাড়া সবটুকু সময়ই ফ্রি থাকা হয়। তার সার্কেল নিয়ে সারাক্ষণ আড্ডা, ঘুরাঘুরি।দিনে ডাকসু ক্যান্টিন, বটতলা, টিএসসি,সামাজিক বিজ্ঞান চত্বর, চারুকলা আর রাতে ভিসি চত্বর, নীলক্ষেত মোড় কিংবা ঢাকা মেডিকেল কলেজের ইমার্জেন্সি গেইট অগণিত কথার নীরব শ্রোতা। অভিমান, খুনসুটির, মিষ্টি ঝগড়ারও সাক্ষী।
শ্রেণি প্রতিনিধির কাজগুলো সুমন খুব উপভোগ করছিল। মাইক ঠিক করা, রুমের এসিগুলো ঠিকমতো চলছে কিনা, বোর্ড পরিষ্কার আছে কিনা ইত্যাদি ছোট ছোট কাজ। এগুলোকে সুমন কখনোই বোঝা হিসেবে নেয়নি।
কিন্তু মুদ্রার উলটো পিঠের কথা বড় ভাইয়েরা বলেছিল। তা দেখতে সুমনের বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি। যে রুটিন অনুযায়ী ক্লাস চলছিল তার ব্যতিক্রম হল যেদিন থেকে সেদিন থেকে উল্টো পিঠের গল্প শুরু হয়।
দিনটি ছিল রবিবার। বিকালে অধ্যাপক সাদিক রহমান সুমনকে ফোন দিয়ে জানায় আগামীকাল সোমবারের সকাল আটটার ক্লাসটি অসুস্থতার কারণে নিতে পারছেন না। সুমন রাত দশটায় তাদের ক্লাসের ফেইসবুক গ্রুপে পোস্ট করে দেয় যে,আগামীকাল সকাল আটটার ক্লাস হবেনা।সোমবার দুপুর দুইটায় একটা ক্লাস ছিল সেই ক্লাসে উপস্থিত হওয়ার সাথে সাথে একজন সুমনের শার্টের কলারে ধরে বলে, “আজ সকালে এসে দেখি কেউ ক্লাসে আসেনি। ক্লাস যে হবেনা জানাইছিস?”
কোন প্রভু যেন তার দাসকে তলব করছে। সুমন হাসি-খুশি ছেলে। মাথা ঠান্ডা রেখে বলে, “আচ্ছা, তুই এসে দেখেছিস ক্লাসে কেউ নাই। তার মানে তারা জানে যে আজ সকালে ক্লাস নাই। তার মানে সবাইকে কেউ জানিয়েছে নইলে তো জানার কথা ছিল না। তাই না? তুই তো ঘুমে ছিলি, হুশ ছিল না তাই এখন তাদের কাছ থেকে জেনে নে তারা কিভাবে জেনেছে। আর হ্যা, আমি শ্রেণি প্রতিনিধি কারো দাস নই।”

আমাদের দেশের মানুষ অন্যের উপর দোষ চাপিয়ে পৈশাচিক আনন্দ লাভ করে। আমরা সবসময় নিজেকে ফেরেশতা মনে করি। আমাদের মর্যাদা,মহত্ত্ব শুধু বক্তৃতায়। একটু ভারী বৃষ্টিপাত হলেই ঢাকার রাজপথ মাওয়া ফেরীঘাট হয়ে যায়। তখন সব দোষ সরকারের। পান চিবাতে চিবাতে সরকারের চৌদ্দগোষ্ঠীকে উদ্ধার করেও আমাদের স্বাদ মিটে না। কিন্তু এই আমিই আবার ড্রেনে আবর্জনা ফেলতে বিরত হইনা।

মুদ্রার উল্টো পিঠ ক্রমশ তীব্রভাবে দৃশ্যমান হতে লাগলো। পরিবারের বড় ছেলের দায়িত্ব একটু বেশি থাকে। অপরদিকে ছোট ছেলে হয় কিছু দায়িত্ব না করলেই নয় এমন মনোভাব নিয়ে পালন করে নয়ত পুরো উড়নচণ্ডী।

সুমনের ক্ষেত্রেও এমন ঘটতে লাগলো। আয়মান প্রথমদিকে ঠিকঠাক দায়িত্ব পালন করলেও কিছুদিন যাওয়ার পর সে সব দায়ভার সুমনের উপর ছেড়ে দিল। সুমনও বড় ভাইয়ের মতো সব পালন করতে লাগলো। আয়মান কে দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগ দিয়ে একটি শব্দও উচ্চারণ করলো না।ক্লাসে দিনদিন যেন তার দায়িত্ব বেড়ে যেতে লাগলো। কেউ কেউ সুমনকে তাদের দাস মনে করলো, কেউ কেউ ভাবলো সে তাদের জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত কোন কর্মচারী। যে কর্মের বিনিময়ে অর্থ লাভ করে সে। এর ফলে শ্রেণি প্রতিনিধির সব কাজই শুধু ‘দায়িত্ব’ হিসেবে ভাবা হয়। তার জন্য কোন কৃতজ্ঞতা নেই, ভালোবাসা নেই।
যেসব কাজ সুমনের নয় কিছু শিক্ষার্থী তাও সুমনকে দিয়ে করাতে চায়। ক্লাসে প্রবেশ করার সাথে সাথেই কেউ না কেউ বলে উঠবে, “এই সুমন ফ্যানটা ছাড় তো, পিছনের লাইটের সুইচটা দে তো।” এই কাজগুলো যেন সুমন না আসলে হয়না। সুমন মাঝে মাঝে হাসি মুখে করে দেয়, মাঝে মাঝে কোন উত্তর না দিয়ে এক জায়গায় বসে পড়ে।

‘পহেলা ফাল্গুনে’ বসন্তকে বরণ করে নিতে সুমন ক্লাসে ঘোষণা দেয় তারা ছোটখাটো একটি অনুষ্ঠান করবে। এই ব্যাপারের সবার মতামত চাইলে তিন-ভাগের একভাগ সম্মতি দেয়। সুমনের হাসিমাখা মুখটি ম্লান হয়ে যায়। চাঁদকে যেন মেঘ ঢেকে দিয়েছে। তবুও সে সিদ্ধান্ত নেয় যে কজনই হোক তাদের নিয়েই সে অনুষ্ঠান করবে। ক্লাস শেষে তার ক্লাসের রি-এড দুইজন ভাই ও একজন বড় বোন তাকে ডেকে নেয়। একজন ভাই বলে, “সুমন তুই যে অনুষ্ঠান করার প্ল্যান করলি আমাদের কাছ থেকে অনুমতি নিছস?” সুমন উত্তর দিল, ” ভাই আমরা তো একটা পরিবারের মতো। এখানে সবাই মিলে একটা কাজ করব এখানে অনুমতি নিতে হবে? আর অনুষ্ঠানের তো এখনো কিছুই হয়নি, আপনাদের বলার সময় তো আছেই।”বড় বোনটি তখন বলে, “ঘোষণা দেওয়া আগে কি বলার প্রয়োজন ছিল না?”
কেউ কেউ সম্মান প্রদর্শন করাকে দুর্বলতা ভেবে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চালায়। সুমন বুঝেছিল তাদের সাথে তর্কে যেয়ে লাভ নেই। তাই সে বড় বোনের প্রশ্নের উত্তরে বললো, “জ্বি আপু, ছিল।” সে ‘সরি’ বলে তাদের প্রশ্নের বাণ থেকে নিজেকে রক্ষা করে।সেদিন অনুষ্ঠানের পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন কাজ করে বিকালে আবার হলের প্রোগ্রামে যেতে হয়। হলের প্রোগ্রামে থাকাকালীন সময়ে সে জানতে পারে তার গ্রামের একজন নিকটাত্মীয় দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়েছেন। প্রোগ্রাম থেকেই সে ঢাকা মেডিকেলে যায়। রাত দশটায় সে হলে ফিরে। সারাদিন তার হালকা, রোগাটে শরীরটার উপর বেশ দকল গিয়েছে।
ফ্রেশ হয়ে খেয়েদেয়ে এগারোটা বেজে গেল। হলে এসে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে যাবে তারও কোন সুযোগ নেই। গণরুম বলে কথা! সে জানে চাইলেও ঘুমাতে পারবেনা তাই সে হুমায়ূন আহমেদের ‘জ্যোৎস্না ও জননীর গল্প’ বইটি পড়তে শুরু করলো। বই পড়তে পড়তে তার ক্লান্ত দেহ কখন যে ঘুমের দেবতার সঙ্গী হয়েছে সে বুঝতে পারেনি। হঠাৎ ফোনের রিংটোনের শব্দে সুমনের ঘুম ভাঙ্গলো। ঘুম জড়ানো চোখে সে ফোন রিসিভ করার সাথে সাথেই ওপাশ থেকে শব্দ ভেসে এলো, ” দোস্ত কি ঘুমাচ্ছিস? আমি আতিক” সুমনের খুব ইচ্ছা হচ্ছিল উত্তর দিবে, আমি এখন ফুটবল খেলছি। কিন্তু সে তা না বলে শান্ত স্বরে জবাব দিল, “না দোস্ত। বল, কী হইছে?”আতিক বললো, ” দোস্ত, কাল সকাল আটটার ক্লাস কি হবে?”সুমন এ কথা শুনে তার কানে, চোখে আগুনের উষ্ণতা অনুভব করলো। দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরলো। কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে শান্ত স্বরে সে জবাব দিল, “হ্যা, ক্লাস আছে।”ফোন রেখে সুমন মোবাইলে দেখলো ৩:১০ মিনিট বাজে।

বসন্ত বরণ অনুষ্ঠানের কিছুদিন আগে প্রফেসর জালাল উদ্দিন সুমনের ক্লাসে বললেন একটি “মেইক আপ” ক্লাস নিবেন। যেদিন বলেছেন এর পরেরদিনই লাগবে। কলাভবনে রুম সংকটের কথা সকলেই জানে। তবুও নতুন নতুন বিভাগ খোলা বন্ধ হচ্ছেনা। তাই সুমনের দায়িত্ব এখন রুম খোঁজা। আয়মান সুমনের উপর দায়িত্ব দিয়ে গা ঝাড়া দিয়েছে। সুমন রুটিন দেখে, অন্যান্য বর্ষের শ্রেণি প্রতিনিধিদের সাথে যোগাযোগ করে জানতে পারে তার স্যারের ধার্যকৃত দিনে কোন রুম ফাকা নাই যেখানে স্যার ‘মেইক আপ ক্লাসটি’ নিতে পারেন। কিন্তু সুমন সেদিন একটি মারাত্মক ভুল করে বসে। রুম ফাকা নাই এ সংবাদটি সে স্যারকে জানাতে ভুলে যায়। ফলাফল যা হবার তাই হল। এরপরের ক্লাসে স্যার সুমন ও আয়মানকে ক্লাস শেষে দেখা করতে বলেন। স্যার তাদের কতটুকু আপ্যায়ন করেছিলেন তা না বলাই থাক। তবে আমি এটা বলতে পারি আয়মানের শুষ্ক টিস্যুগুলো নোনাজলে তৃষ্ণা মিটিয়েছিল। আর সুমন? পুরুষ কিছু পারুক আর না পারুক সে পুরুষত্বের মনোভাব সবসময় বজায় রাখবে। পুরুষের চোখ চারটি। দু’টো বাহ্যিক আর দু’টো অভ্যন্তরীণ। পুরুষত্বের অহমকে টিকিয়ে রাখতে সে সেদিন বাহ্যিক নয়নে কাঁদতে পারেনি। কিন্তু তার অভ্যন্তরে যে বৃষ্টি নেমেছিল, সেই বৃষ্টির ফোটার আঘাতে তার হৃদয় ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল। পুরুষের কান্না শুধু বিধাতাই দেখেন। কিন্তু যখন একজন পুরুষের হৃদয়ে কষ্টের তীব্রতা সীমা ছাড়িয়ে যায় তখন সে বাহ্যিক নয়নেও কাঁদে। এই কান্না যার জন্য সে খুব ভাগ্যবান, যে দেখে সেও বটে।
বসন্ত বরণ অনুষ্ঠানে সবকিছু ঠিকঠাক করে সে যখন দর্শকের আসনে বসতে আসছে তখন দেখে একটি আসনও খালি নাই। পিছনে এসে দেখে অদ্রির পাশে একটা আসন খালি আছে। সে কোন কিছু না ভেবেই সেখানে বসে পড়ে। অদ্রি শহুরে মেয়ে। গায়ের রং শ্যামলা, পাতলা গড়নের মেয়ে, দেখতে মোটামুটি, গভীর কালো কেশ। তার চোখ দুটো সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ে। গভীর কালো টানাটানা মায়াবী চোখ। দূর্গা দেবীর চোখও বুঝি এত সুন্দর হয়না! সুমনের সাথে অদ্রির হাই/হ্যালো সম্পর্ক। কিন্তু আজ যেহেতু একসাথে বসেছে তাই তাদের মাঝে কথোপকথন বেশ চমৎকার হলো। বেশির ভাগ মেয়েই সবার সাথে মিশেনা কিন্তু যার সাথে মিশে তার সাথে মনের বাক্স খুলে দিয়ে মিশে। তবে তাদের প্রধান অস্ত্র ‘ছলনা’কে বিসর্জন দিতে পারেনা। ‘ঢেঁকি স্বর্গে গিয়ে ধান ভানে’ আমার দৃঢ় বিশ্বাস নারীর যদি সুযোগ থাকতো তবে তারাও স্বর্গে ছলনা করার চেষ্টা করতো। অদ্রি নারীকুলের অংশীদার সে বাদ যাবে কেন?সুমন অনেক বন্ধুত্বসুলভ, তার কথাবার্তাও বেশ। বন্ধু হিসেবে যেমন হওয়া উচিত তেমনই। বন্ধু হিসেবে সুমনকে তার ভালো লেগে যায়। তাদের মধ্যে কথার বৃষ্টি ঝরতে থাকে। কয়েক ঘণ্টার অনুষ্ঠান কথা বলে, খুনসুটি করেই তারা কাটিয়ে দিয়েছে। এগুলো পাশে বসে থাকা বন্ধুদের নজর এড়ায়নি। তারা বিবিসি বাংলার রিপোর্টারের দায়িত্ব পালন করে মুক্তি পায়।
পরের দিন ক্লাসে গিয়ে সুমনকে সেই রিপোর্টাদের তৈরিকৃত সংবাদ বিভিন্নজনের কাছ থেকে শুনতে হয়। অদ্রিকেও যে শুনতে হয়নি তা কিন্তু না। এসব সংবাদ ভবিষ্যৎকালে যে আরো শুনতে হবে তা দু’জনেই বুঝেছিল। তাই সেদিনের পর থেকে তাদের মধ্যে বিশেষ কোন কারণ ছাড়া আর কোন কথা হয়নি। তাদের বন্ধুত্বের সবেমাত্র অঙ্কুরোদগম হয়েছিল তখনই কীট এসে এটাকে খেয়ে ফেললো।

শ্রেণি প্রতিনিধি সবার নজরে থাকে। তাই তার সবকিছুই চোখে পড়ে। চাঁদ সবসময় দেখা যায়। এর গায়ে কালো কালো দাগ রয়েছে। এগুলো আমরা সবাই দেখি, তা নিয়ে কথা বলি। বলে বেড়াই এগুলো হল চাঁদের কলঙ্ক। বাড়িয়ে বাড়িয়ে রূপকথা বানানো আমাদের সহজাত অভ্যাস। কিন্তু সেই গল্প বানানোর পূর্বে আমরা একবারও ভাবিনা এই গল্পের প্রভাব কেমন হবে।শ্রেণি প্রতিনিধির কলঙ্ক লাগা শুরু হয় ক্যানসারের মতো। ক্যানসার যেমন প্রথম দিকে শরীরের নির্দিষ্ট একটি অংশে শুরু হয়ে পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে, শ্রেণি প্রতিনিধির কলঙ্ক লাগাও তেমন ভাবেই শুরু হয়। পরে একসময় দেখা যায়, শ্রেণি প্রতিনিধির পুঁজি শুধু এক বাক্য তা হল ‘যত দোষ, নন্দ ঘোষ’।ক্যানসারের মতো শ্রেণি প্রতিনিধির দোষ একজনের চোখ থেকে আরেকজনের চোখে, এমন ভাবে ক্লাসের সবার চোখেই পড়তে থাকে। কেউ আসলেই দোষ দেখেছে, কেউ ভুল বুঝে, কেউ শুনে, কেউ হিংসা করে শ্রেণি প্রতিনিধির প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করতে থাকে। তার দোষ গানের সুরে সবাইকে জানিয়ে আনন্দ পায়।সেই ক্যানসার একদিন সুমনের সার্কেলও দেখতে শুরু করলো।সুমন শ্রেণি প্রতিনিধি তাই সবার সাথেই তার ভালো আচরণ করতে হয়। সে যার সাথেই কথা বলে সে-ই যেন তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু, আত্মার বন্ধু। সে এটা জানতো সবার সাথে ভালো আচরণ করা ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখা উচিত।কিন্তু এটা জানতো না যে যার সবাই বন্ধু তার আসলে কোন বন্ধু নাই। তার কাছের বন্ধুদের প্রতি সে আলাদাভাবে কোন ভালোবাসা প্রদর্শন করতে ব্যর্থ হয়।

ক্লাসের পর মাইক তালা দিয়ে রেখে চাবি ডিপার্টমেন্ট এর অফিসে দিয়ে আসা, প্রতিদিন নোটিশ বোর্ড দেখতে অফিসের সামনে যাওয়াসহ ক্লাসের বিভিন্ন কাজ শেষ করে দেখা যায় তার অন্যান্য বন্ধুরা ক্লাস রুম থেকে বের হয়ে আড্ডা দিতে কোন স্থানে বসে গেছে। সে তখন ফোন দিয়ে আড্ডার মাঝখানে সিনেমার অতিথি চরিত্রের মতো উপস্থিত হতো। এভাবে আর কয়দিন। আস্তে আস্তে দূরত্ব বাড়তে থাকে। আবার কেউ হয়ত সুমনকে ঈর্ষাও করতো।
একসময় সুমন অনুভব করলো তার চারিপাশে এত মানুষ, এত বন্ধু কিন্তু দিন শেষে সে মধুহীন ম্লান পুষ্প। কাজী নজরুল ইসলামের ‘পথে ফুটা তাজা ফুল’ বুঝি এমনই হয়।
বর্ষাকাল। আকাশে কালো মেঘ জমেছে। থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। সুমনদের ক্লাস শেষ হয়েছে। বৃষ্টির মধ্যেই সবাই সবার মতো চলে গেছে। ক্লাসের কাজ শেষ করে কলাভবনের গেইটে এসে দেখে কেউ নেই। সে একা একা দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছে। বৃষ্টি থামছে আবার শুরু হচ্ছে। যেন একজন মানুষের জীবন সঙ্গীত বাজছে। এই কান্না, এই সুখ। আজ সকাল থেকে সে অসুস্থতা অনুভব করছে। ঢাবির নিজস্ব মেডিকেল সেন্টারে একবার গেলে মন্দ হয়না। মাস শেষ। তাই পকেটেও খরা চলছে।তাই রিক্সার কথা ভাবাও পাপ। এই বৃষ্টিতে একা একা ভিজে যাবে কিনা মনস্থির করতে পারছেনা।এসব ভাবতে ভাবতে সুমন লক্ষ্য করলো মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। সে আস্তে আস্তে বৃষ্টির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা তার হালকা শরীরটাকে স্পর্শ করছে। সুমনের মন আনন্দে নেচে উঠলো। বৃষ্টির ফোটাগুলো যেন তাকে ভালোবাসার স্পর্শ দিচ্ছে, গালে চুমো এঁকে দিচ্ছে। বৃষ্টির ফোটাগুলোকে তার পরম বন্ধু মনে হচ্ছে। তার মনে হচ্ছে এদের সাথে ওর যুগ যুগ ধরে পরিচয়, আত্মার বন্ধন এদের সাথে। বৃষ্টিও যেন তার গোত্রের কাউকে পেয়েছে। সে চুম্বনের মাত্রা আরো বৃদ্ধি করলো।সুমন হঠাৎ নিজেকে চার্লি চ্যাপলিন হিসেবে আবিষ্কার করলো।। বৃষ্টির দু’টো উৎস আজ হেটে চলেছে আলিঙ্গন করে। যেন বহুকাল পর দেখা হয়েছে। বৃষ্টির মধ্যে সুমনের হাসি-মাখা মুখটি আর দেখা যাচ্ছেনা। কেউ দেখার চেষ্টাও করছে না। কারণ সবাই সুমন না।

লেখক ঃ

কাজী ই সাকিব,শিক্ষার্থী,দর্শন বিভাগ,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Top