যশোরের চৌগাছার একটি গ্রামের প্রায় সবাই আর্সেনিক আক্রান্ত!

qewret-3-300x282.jpg

আব্দুর রহিম রানা, যশোর :
যশোর জেলার চৌগাছা উপজেলার জগদিশপুর ইউনিয়নের একটি গ্রামের নাম মাড়ুয়া দক্ষিন সাগর। এই গ্রামটির বেশির ভাগ মানুষই মরণ ব্যাধি আর্সেনিক আক্রান্ত। এখানে চার হাজার জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় তিন হাজারেরও বেশি মানুষ আর্সেনিকে ভুগছেন। উপজেলার এই জনপদটি এখন আর্সেনিক গ্রাম বলেই সর্বজন পরিচিত।
ভয়াল বিষ আর্সেনিক আক্রান্ত মাড়ৃয়া গ্রামে সরেজমিনে গেলে প্রথমেই দেখা হয় কয়েকজন যুবকের সাথে। তারা বলেন, সালমা বেগম নামের এক আর্সেনিক রোগীর কথা। সেখানে যেয়ে চোখে পড়ে আধাপাকা একটি বাড়ি। চারপাশের ইটের প্রাচীর, লোহার গেট। বাড়ি দেখলেই বোঝা যায়, পরিবারটি স্বচ্ছল। কিন্তু গেটে তালা দেখে চিন্তায় পড়তে হয়। কারণ গ্রামের এই বাড়িতে এখন কেউ থাকে না।
গ্রামের লোকজন জানায়, বাড়ির মালিক কাশেম আলী (৬০) ২০০৭ সালে মারা গেছেন। তাঁর স্ত্রী পদ্মা খাতুন (৫৩) ২০১৩ এবং ছেলে আয়ুব হোসেন (৩৮) ২০১৬ সালে মারা গেছেন। তাঁরা তিনজন আর্সেনিকে আক্রান্ত ছিলেন। বেঁচে আছেন আয়ুবের স্ত্রী জাহানারা বেগম (৩৬)। আর্সেনিকের ভয়ে তিনি মহেশপুরে বাবার বাড়িতে থাকেন। জমি বর্গা দেয়া। বছরে দুবার এসে তিনি টাকা নিয়ে চলে যান।
এ গ্রামের জনসংখ্যা চার হাজার। এরমধ্যে প্রায় ৩ হাজার এই রোগে আক্রান্ত। এর দুই হাজার অতি ও মধ্যম মাত্রায় আক্রান্ত।
গ্রামের মানুষের কাছ থেকে জানা গেছে আর্সেনিক আক্রান্ত হয়ে গত ২৮ বছরে এই গ্রামের মোট ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। গ্রামের বাসিন্দা রোকেয়া বেগম (৫২) বলেন, ‘আমার ডান হাতের দুটি আঙুল কেটে ফেলতে হয়েছে। আর্সেনিকের কারণে আমাদের পরিবারে সাতজন মারা গেছে।’ স্বজন হারিয়ে শোকে কাতর রোকেয়া বেগম ভাঙ্গা ভাঙ্গা স্বরে বলতে থাকেন, ১৯৯০ সালে প্রথম মারা যান তাঁর দেবর আনিছুর রহমান (২০)। এরপর ১৯৯১ সালে শ্বশুর ইয়াকুব আলী (৭০), স্বামী মুক্তিযোদ্ধা আলতাফ হোসেন (৫৫) ২০০৪ সালে, ২০০৬ সালে শাশুড়ি নূরজাহান (৬৫), ২০০৮ সালে স্বামীর ভাই আব্দুল আজিজ (৫২), ২০০৯ সালে ইউছুফ আলী (৩৫), ২০১৩ সালে ইউছুফের স্ত্রী সালমা খাতুন (৩০), মারা গেছেন।
এই গ্রামে আর্সেনিকে আক্রান্ত হয়ে আরো মারা গেছেন ২০১৭ সালে আকরাম হোসেন (৪০), ২০১৫ সালে নূর ইসলাম (৫৫), ২০০৬ সালে হোসেন আলী (৫০), ২০০৫ সালে ময়না বিবি (৪০), ২০০২ সালে মুকতার আলী (৪৫), ২০১২ সালে আতিয়ার রহমান (৪৮), ২০০৩ সালে আক্কাচ আলী (৪৪), ২০০২ সালে মনসের আলী (৪২), ১৯৯৮ সালে ইলাহুড়ি (৬৭) এবং ২০১৩ সালে ইউনুচ আলী (৫৫)।

উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী অফিস ও এশিয়া আর্সেনিক নেটওয়ার্ক বেশ কিছু গ্রামকে আর্সেনিকযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এগুলো হলো মাড়ুয়া, বেড়গোবিন্দপুর, কুষ্টিয়া, রামভদ্রপুর, ফুলসারা, জগদীশপুর, পাতিবিলা, সিংহঝুলী, জগন্নাথপুর, হাকিমপুর, কয়ারপাড়া, মাজালী, বলিদাপাড়া, সুখপুকুরিয়া, তেঘোরি, গরীবপুর, জাহাঙ্গীরপুর ও চৌগাছা।
জগদীশপুর ইউনিয়ন পরিষদের মাড়ুয়া গ্রামের সদস্য ইমতিয়াজ আলী বলেন, ‘আর্সেনিকের গ্রাম বললে সবাই মাড়ুয়াকেই বোঝে। এ গ্রামের অল্পসংখ্যক লোক বাদে সবাই আর্সেনিকের রোগী। আমিও এ রোগে আক্রান্ত।’
এ গ্রামের বাসিন্দা ও এশিয়া আর্সেনিক নেটওয়ার্কের সংগঠক লুৎফর রহমান বলেন, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে প্রতি লিটার পানিতে আর্সেনিকের সর্বোচ্চ সহনীয় মাত্রা ০.০১ মিলিগ্রাম। কিন্তু দেশে ০.৫ মিলিগ্রাম সহনীয় মাত্রা ধরা হয়। সেখানে এই গ্রামে গড়ে আর্সেনিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে ৮৫ মিলিগ্রাম এবং গ্রামের দক্ষিণপাড়ায় ১০০ মিলিগ্রাম উপস্থিতি পাওয়া গেছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘এ গ্রামে দুই হাজার ৫০০ থেকে তিন হাজার রোগী রয়েছে। যা প্রমাণিত। আমি নিজেও আক্রান্ত। আর্সেনিকের কারণে আমার ফুসফুসে ক্যান্সার হয়েছে।’
তিনি জানান, বেশ কয়েকটি সংস্থা এখানে আর্সেনিক নিয়ে কাজ করেছেন তার মধ্যে ২০০১ সালে এশিয়া আর্সেনিক নেটওয়ার্ক এই গ্রামে বিশেষ গবেষণা শুরু করে। মাটি, পানি, মানুষের রক্ত, মলমূত্রসহ নানা বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালায়। তারা আর্সেনিকযুক্ত পানির উৎস বন্ধ করার পরিকল্পনা করে। পরবর্তী সময়ে নিরাপদ পানির জন্য পরিশোধক স্থাপন করে। ২০০৮ সালে তাদের প্রকল্প শেষ হয়। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার কারণে পরিশোধক থেকে মানুষ পানি সংগ্রহ করতে পারছে না। এ ছাড়া পুরো গ্রামে নিরাপদ পানি সরবরাহের জন্য একটি বড় প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। যার ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৫ কোটি টাকা। কিন্তু ২০১৫ সালে রংপুরে জাপানি নাগরিক কুনিও হোশি হত্যার পর ওই প্রকল্প আর আলোর মুখ দেখেনি।
গত শনিবার ওই গ্রামে গেলে অন্তত ২০ জন আক্রান্তের সঙ্গে কথা হয়। এর মধ্যে মাড়ুয়া বাজার মসজিদের মুয়াজ্জিন আনছার আলী (৬৫) বলেন, ‘২০ বছর ধরে এ রোগে ভুগছি। এখন শ্বাসকষ্ট আর হৃদযন্ত্রে সমস্যা দেখা দিয়েছে। ১০ কাঠা জমি বেচে চিকিৎসা করিয়েও সুস্থ হইনি।’
এ বিষয়ে চৌগাছা উপজেলা জনস্বাস্থ্য অফিসের সহকারী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘২০০৩ সালে এ উপজেলার ৩৬ হাজার নলকূপ পরীক্ষা করে ১৬ হাজার নলকূপে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিকের উপস্থিতি ধরা পড়ে। এরপর আর জরিপ হয়নি। জনগণ পানি নিয়ে অফিসে এলে সেটা পরীক্ষা করা হয়।’ তিনি জানান, চলতি অর্থবছরে সরকারিভাবে ৭৯টি পাতকুয়ার বরাদ্দ এসেছে। প্রতিটি পাতকুয়া নির্মাণ করতে সরকারের ব্যয় হবে প্রায় ৬০ হাজার টাকা। যাদেও নামে বরাদ্ধ দেওয়া হবে তাদেরকে মাত্র দুই হাজার ৫০০ টাকা ব্যাংক ড্রাফটের মাধ্যমে জমা দিতে হবে।
উপজেলা ৫০ শয্যা হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা আওরঙ্গজেব বলেন, ‘হাতেপায়ে ক্ষত বা ক্ষত বৃদ্ধির উপশমের জন্য কিছু ওষুধ দেওয়া হয়। তবে সরকারিভাবে সরবরাহ নেই। এ কারণে হাসপাতালে আর্সেনিক রাগীর সংখ্যা কম।’
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সেলিনা বেগম বলেন, ‘আক্রান্তদের তালিকা তৈরি করে চিকিৎসা দিচ্ছি। প্রাথমিকভাবে চিকিৎসার পাশাপাশি আর্সেনিকমুক্ত পানি পান করলে রোগ ভালো হয়।’

চৌগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মারুফুল আলম বলেন, ‘আর্সেনিকযুক্ত এলাকায় সরকার দৃষ্টি দিয়েছে। ভুক্তভোগীদের মধ্যে পাতকুয়া দেওয়া হচ্ছে। নিরাপদ স্তারে নলকূপ স্থাপন করে আর্সেনিক থেকে মুক্ত থাকা যায় তাছাড়া জনগণ সচেতন হলে, নিরাপদ খাবার পানির জন্য টিউবওয়েলের ওপর ভরসা করার দরকার নেই। বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করে পান করা যেতে পারে। এ ছাড়া অনেক পুকুর আছে। সেখান থেকে পানি সংগ্রহ করে ফুটিয়ে ব্যবহার করা যায়।’

Top