মানসিক অসুস্থতা ও তরুণ প্রজন্ম

IMG_20181113_152645.jpg

অরিনা খাতুন জিনিয়া ঃ
———————-

প্রতি বছর ১০ অক্টোবর বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস পালিত হয়ে আসছে। তারই ধারাবাহিকতায় এ বছরও ১০ই অক্টোবর পালিত হলো বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস ,যার প্রতিপাদ্য বিষয় ছিলো “Young people and mental health in a changing world.” ১৯৯২ সালে সর্বপ্রথম বিশ্বের ১৫০টির বেশি রাষ্ট্রে এই দিবসটি উদযাপন করা হয়।

সাধারণত প্রতিটি মানষের স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট দুটি দিক থাকে। একটি তার দৈহিক দিক এবং অপরটি মানসিক দিক। দৈহিক সুস্থতা ও সাজসজ্জার এবং যত্নের প্রতি আমরা সচেতন থাকলেও মানসিক সুস্থতা ও মানসিক যত্নের ব্যাপারে আমরা অনেকাংশে উদাসীন। এমনকি আমরা এ ব্যাপারে এতটাই অসচেতন যে মানসিকভাবে আমরা অসুস্থ থাকলেও আমরা বুঝি না যে আমরা মানসিকভাবে অসুস্থ। সাধারণত আচরণ সম্পর্কিত বিজ্ঞান হিসেবে মানুষ ও প্রাণীর আচরণ নিয়ে মনোবিজ্ঞান আলোচনা করে থাকে। আর মনোবিজ্ঞানের যে প্রায়োগিক শাখাটি মানসিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা করে থাকে তা চিকিৎসা মনোবিজ্ঞান বা Clinical Psychology নামে পরিচিত। মানসিক সমস্যা সংক্রান্ত বিষয় গুলো চিকিৎসা মনোবিজ্ঞান মূলত দুটি উপায়ে করে থাকে।
প্রথমত, উন্নত মানসিক স্বাস্থের চর্চা করে যাতে করে মানসিক স্বাস্থ্যের স্তর উন্নীত হয়।

দ্বিতীয়ত, পুনর্বিন্যাসের পদ্ধতিতে অবদান রেখে ব্যক্তিত্বে উত্তেজনাসষ্টিকারী সমস্যা গুলোকে সমাধানের মাধ্যমে পুনঃস্থাপন করা।

সাধারণত শারীরিক অসুস্থতার ক্ষেত্রে আমরা অস্বাভাবিক কিছু পরিবর্তন (যেমন: আঘাতে ক্ষত, প্রদাহ, রক্ত সঞ্চালনে বিঘ্নতা ইত্যাদি) দেখলে ও মানসিক রোগে শরীরের অস্বাভাবিক কোনো পরিবর্তন অথবা মানসিক রোগের নিদিষ্ট কারণ হিসেবে কোনো জীবাণুর অস্তিত্ব বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পাওয়া যায় না। তবে সাধারণত দৈহিকভাবে, সামাজিকভাবে এবং মানসিকভাবে মানসিক অসুস্থতার লক্ষণ গুলো প্রকাশ পেয়ে থাকে। দৈনন্দিন জীবনে আমরা প্রায়শই নানারকম মানসিক যন্ত্রণা বা মানসিক অস্থিরতার সম্মূখীন হয়ে থাকি তবে এইসব অবস্থা সাধারণত আমাদের কাজকর্মের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে না এবং জীবনযাত্রায় তেমন বিঘ্নতা ঘটায় না। তবে কোনো ব্যক্তি বা বিষয়ের প্রতি রাগ, আক্রোশ, ঘৃণা এবং অস্বস্তিকর অনূভূতি যখন দীর্ঘমেয়াদে আমাদের কাজকর্মের ওপর প্রভাব ফেলে ও জীবনযাত্রায় বিঘ্ন ঘটায় তখন সেই অবস্থাকে মানসিক অসুস্থতা হিসেবে চিহ্নিত করা যায় |মানসিক অসুস্থতা মূলত বংশগত কারন মস্তিষ্ক এবং মানসিক রোগ, শৈশবে শিশুর লালন-পালনে ত্রুটি, ক্ষতিকর সামাজিক পরিবেশ সহ বিভিন্ন কারণে হয়ে থাকে।

২০১৮ সালে উদযাপিত মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের মূল প্রতিপাদ্য ছিলো “পরিবর্তনশীল বিশ্বে তরুণ প্রজন্ম এবং মানসিক স্বাস্থ্য | ” মানসিক সুস্থতার ঠিক বিপরীত অবস্থা হলো মানসিক অসুস্থতা। বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার প্রেক্ষিতে সবচেয়ে বেশি মানসিক সমস্যার সম্মূখীন হচ্ছে তরুণ প্রজন্ম যা হতাশা, বিষন্নতা সহ বিভিন্ন মানসিক রোগের রূপে প্রকাশ পাচ্ছে। এমনকি এই মানসিক সমস্যার কথা স্থান পেয়েছে সাহিত্য ̈কর্মেও। দৃষ্টান্ত ̄স্বরূপ বলা যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “ছুটি” নামক গল্পটির কথা। এ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র ফটিককে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে: “বিশেষত, তেরো-চৌদ্দ বছরের ছেলের মতো পৃথিবীতে এমন বালাই আর নাই। শোভাও নাই, কোনো কাজেও লাগে না। স্নেহও উদ্রেক করে না, তাহার সঙ্গসুখও বিশেষ প্রার্থনীয় নহে। তাহার মুখে আধো আধো কথাও ন্যাকামি, পাকা কথাও জ্যাঠামি এবং কথামাত্রই প্রগল্ভতা।” অর্থাৎ এই গল্পটিতে লেখক মূলত কিশোর বয়সের পরিবর্তন গুলো তার লেখনীর মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। মানসিক সমস্যার উদ্ভব ঘটে থাকে মূলত শৈশব থেকে কৈশোরে পদার্পণের সময় অর্থাৎ বয়ঃসন্ধিকালে। এই মানসিক সমস্যা গুলো মূলত আচরণগত সমস্যা হিসেবে প্রকাশ পায়। মানসিক অসুস্থতা এবং এর কারণ সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষা মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জনাব সায়রা হোসেনের মত উপস্থাপন করা হলো: ‘‘অন্য যেকোনো অসুস্থতার মতো মানসিক অসুস্ততাও এক ধরনের অসুস্থতা। মানসিক অসুস্থতার নানান ধরনের কারণ থাকতে পারে। কখনো কখনো এটা শারীরিক অসুস্থতার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে যা কিনা মানসিক পর্যায়ে চলে যেতে পারে। কিছু কিছু মানসিক অসুস্থতা হরমোন গত অসামঞ্জস্যতার কারণে হতে পারে আবার কিছু কিছু মানসিক অসুস্থতা দীর্ঘমেয়াদি চাপ, হতাশা এবং জীবনে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মাঝখানের ব্যবধানের কারণে হতে পারে। মানসিক অসুস্থতার জন্য কোনো একটি একক কারণকে দায়ী না করে বলা যেতে পারে এখানে একসাথে অনেক গুলো কারণ কাজ করে এবং যখন এই নানাবিধ কারণ মিলে জটিল আকার ধারণ করে তখনই সেটা ব্যক্তির মধ্যে মানসিক অসুস্থতার লক্ষণ আকারে প্রকাশ পায়। এ কারণ গুলো হতে পারে বংশগত (সিজোফ্রেনিয়া), সামাজিক পরিবেশগত কারণ, মনস্তাত্ত্বিক পরিবেশগত কারণ,- সহ প্রভৃতি নানাবিধ কারণ যখন জটিল আকার ধারণ করে তখনই তা মানসিক অসুস্থতার পর্যায়ে চলে যায়। মূলত তরুণ প্রজন্মের জন্য যেকোনো মানসিক সমস্যাকে অসুস্থতার পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটা বড় বিষয় যেটা কাজ করে সেটা হলো রূপান্তর।”

আমাদের দেশের সমাজ ব্যবস্থার ও শিক্ষা ব্যবস্থায় সবচেয়ে উপেক্ষিত দিকটি হচ্ছে মানসিক সুস্থতার দিকটি। শিক্ষার্থীদের মানসিক সুস্থতার দিকটি উন্নত দেশ গুলোতে যতটা গুরুত্বের সাথে বিবেচিত হয়, আমাদের দেশে ঠিক ততটাই তা দষ্টিগোচর হয় না। তবে সাম্প্রতিক সমাজ ব্যবস্থার প্রেক্ষিতে আমাদের তরুণ সমাজের মানসিক অসুস্থতার পেছনে সবচেয়ে বড় যে কারণটিকে আমি দায়ী বলে মনে করি তা হলো মাত্রাতিরিক্ত বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আসক্তি। যা মূলত তাদের অজান্তেই তাদের ঠেলে দিচ্ছে এক অসুস্থ প্রতিযোগিতার মধ্যে এবং এর ফলশ্রুতিতে তারা সম্মূখীন হচ্ছে বিভিন্ন রকমের চাপের এবং অপ্রাপ্তির। পরবর্তীতে এটি হতাশা ও বিষন্নতায় রূপ লাভ করছে।

বস্তুত মানসিক অসুস্থতা আমাদের দৈহিক সুস্থতার ওপর স্বল্পমেয়াদী অথবা দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলে এবং এর ফলে আমাদের কাজকর্ম ক্ষতিগ্রস্থ হয়। তাই মানসিক সুস্থতার প্রতি আমাদের নজর দিতে হবে এবং সেই সাথে আমাদের শিক্ষা ̈ব্যবস্থার কাঠামো এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে করে আমাদের শিক্ষার্থীদের মানসিক দিকও সেখানে যথেষ্ট গুরুত্ব পায়। সেজন্য স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় গুলো এবং প্রয়োজনবোধে কর্মক্ষেত্রেও কাউন্সিলিং সেন্টারের ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ মানসিক অসুস্থতার অন্যতম একটি কারণ হলো চুপ করে থাকা বা নিজের অস্বস্তি গুলো বা সমস্যা ̧গুলো কারো সাথে ভাগ না করা।
লেখিকা : অরিনা খাতুন জিনিয়া
প্রভাষক,দর্শন বিভাগ,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Top