ধৈর্য্যই সাফল্যের মূলমন্ত্র—–মোঃ জাকারিয়া

IMG_20181110_004713.jpg

—————–
সাম্প্রতিক সময়ে পত্রিকার পাতা খুললেই আত্মহত্যার ঘটনা চোখের সামনে ভেসে উঠে। এর অধিকাংশ ঘটনাই ঘটে হতাশা থেকে। এই হতাশার জন্ম কোন কিছু না পাওয়া থেকে। কারো ক্ষেত্রে সাফল্য আসে অনেক দ্রুত আবার কারো কারো অনেক ধীরে। কেউ তরুণ বয়সেই সফলতার উচ্চ শিকরে আহরণ করে আবার কেউ কেউ বার্ধক্যে উপনীত হয়ে সাফলতার মুখ দেখে। এইটাই শাশ্বত। এটাই প্রকৃতির নিয়ম। কিন্তু আমারা এই চিরন্তন বাস্তবতাটা মেনে নিতে পারি না। ফলে সহজেই আমরা হতাশার অতলে হারিয়ে যাই।
যদি প্রশ্ন করা হয় একটা রেস্টুরেণ্টের নাম বলেন ? সবার প্রথমেই মাথায় আসবে কেএফসির নাম। কিন্তু এর পিছনের ইতিহাস কী আমরা জানি? কেএফসির প্রতিষ্ঠাতা কর্নেল হারল্যান্ড ডেভিড স্যান্ডার্সের জন্ম ৯ সেপ্টেম্বর ১৮৯০ সালে। বাবা উইলবার ডেভিড ও মা মার্গারেট অ্যান। তিনি ছিলেন বাবা – মায়ের বড় সন্তান। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে স্যান্ডার্স তার পিতাকে হারান। বার বছর বয়সে তার মা আরেকটি বিবাহ করেন। তার সৎ বাবার সাথে তার সম্পর্ক ছিল দা – কুমড়া।
তেরকে বলা হয়ে থাকে দুর্ভাগ্য। স্যান্ডার্সের ক্ষেত্রেও সেইটাই ঘটছে। সে মাত্র তের বছর বয়সে বাড়ী ছেড়ে চলে যান সাথে স্কুলও ত্যাগ করেন। তখন থেকেই তার জীবিকার সংগ্রাম শুরু হয়। এমন কোন পেশা ছিলো না যেটা তিনি গ্রহণ করেন নি। তিনি খেতে কাজ দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা শুরু করেন তারপর ট্রেনের ফায়ারম্যান, আইনজীবী, বিমা কোম্পানির সেলসম্যান, ডিঙি নৌকার উদ্যোক্তা হয়ে কিছুদিন ব্যাবসা করেন, গাড়ির টায়ারবিক্রেতা ও ফিলিং স্টেশনের কর্মচারী হয়ে চাকরী করেন কিছু কাল। সেখান থেকে একটি মোটেল খুলেন।
কিন্তু তাতেও তার ভাগ্যের চাকা খোলে নি। মোটেলটি আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। তারপর সেটাকে কোন ভাবে সংস্কার করে রেস্টুরেন্ট করেন। কিন্তু কিছু দিন পরেই শুরু হয় ২য় বিশ্ব যুদ্ধ। ফলে সেটাও বন্ধ হয়ে যায়। এতে তিনি প্রচন্ড হতাশ হয়ে যান এবং ভাবতে থাকলেন এই ষাট বছরে তিনি কী করতে পারলেন? যেখানেই হাত দিয়েছেন শুধু ব্যর্থতা আর ব্যর্থতা। তিনি নিজের জন্য, পরিবারের জন্য, সন্তানদের জন্য কিছুই করতে পারেনি। তখন তিনি একাকী একটি জঙ্গলে গেলেন এবং আত্মহত্যা করার মনস্থির করলেন। আত্মহত্যা করার পূর্ব মুহূর্তে তার মনে পড়লো তিনি একটি সিক্রেট রেসিপি জানেন। সেটা হলো মুরগী পোড়ানোর রেসিপি। তখন তিনি আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত ত্যাগ করে কেন্টাকিতে ফিরে আসেন এবং সেখানেই কেন্টাকি ফ্রাইড চিকেন (KFC) নামে একটি রেস্টুরেন্ট খোলেন। যার শাখা- প্রশাখা ছড়িয়ে আছে সারা বিশ্বে।
১৯৮০ সালে নব্বই বছর বয়সে স্যান্ডার্সের সংগ্রামী জীবনের অবসান হয়। সে জীবন হার মানতে শেখেনি। স্যান্ডার্স জীবনে ভেঙে পড়েছে বার বার। কিন্তু সে পিছপা হয়নি কখনো। সে জীবনে সফলতার জন্যে ছুটেছে বছরের পর বছর। স্যান্ডার্সও অন্য সবার মত আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলো। কিন্তু তার চিন্তা শক্তি, যোগ্যতা, দক্ষতাই তাকে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে ও আমাদের মাঝে বাঁচিয়ে রাখবে চিরকাল।
কর্নেল হারল্যান্ড ডেভিড স্যান্ডার্সের জীবনী থেকে এই শিক্ষাই পাই যে, জীবনে যত বড ঝড় আসুক না কেনো কখনই কর্ম থেকে বিরত থাকা যাবে না।
আমরা খুব শহজেই কোন কিছুতে হতাশ হয়ে পড়ি। আমাদের সামনে সাফল্যের হাজারো উদাহরণ রয়েছে। কিন্তু আমরা সেইগুলো জানি না। ফলে আমাদের হতাশা অনেক বেশী কাজ করে। ইতিহাসের বড় শিক্ষা এই যে, কেউ ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেন না। এই বিখ্যাত উক্তিটাকে মিথ্যা প্রমাণিত করে এগিয়ে যেতে হবে। ধৈয্য ধরে সমস্যার মোকাবেলা করতে হবে। জগতের সমস্যাগুলো একই। আমাদের খোঁজা উচিত কেউ আগে এমন সমস্যায় পড়েছিলো কিনা এবং সে কীভাবে এর সমাধান করেছে। তাহলেই আমরা একটা ভালো ও মঙ্গলজনক সমাধান পাবো। আমাদের স্যান্ডার্সের মত করে ধৈর্য্য ধরে কর্ম করে যেতে হবে। তাহলে জীবনের কোন না কোন সময়ে সাফল্যের দেখা মিলবেই।

মোঃ জাকারিয়া
দর্শন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Top