সভ্যতার সংঘাত: ইসলাম সম্পর্কে পশ্চিমাদের মিথ?–জাহিদুল ইসলাম

31381305_2040055709585707_2840754265458038787_n.jpg

————————————
বর্তমানে অনেক পশ্চিমা রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন ইসলাম এবং পশ্চিমা বিশ্ব সংঘাতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই সংঘাতকে অনেক সময় পশ্চিমা বিশ্লেষকরা সভ্যতার সংঘাত হিসাবে তুলে ধরেছেন।এদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন বার্নার্ড লুইস ও স্যামুয়েল পি হান্টিংটন। বার্নার্ড লুইসের “দ্য রুডস অব মুসলিম রেইজ” এবং স্যামুয়েল পি হান্টিংটনের “দ্য ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশনস” দুটো রচনাই কূটনৈতিক, নীতিনির্ধারক, একাডেমিক বিশ্লেষক, সাংবাদিকদের মোহগ্রস্ত ও বিতর্কের সৃষ্টি করে। বার্নার্ড লুইস আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পণ্ডিত এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক বিশ্লেষক হওয়ায় তার “দ্য রুটস অব মুসলিম রেইজ ” আন্তর্জাতিকভাবে বিপুল সাড়া লাভ করে। “দ্য রুটস অব মুসলিম রেইজ” এ বার্নার্ড লুইস ইসলামিক হুমকি এবং মুসলিম ক্রোধ নিয়ে আলোচনা করেছেন।

পেত্রার্ক প্রশ্ন করেছিলেন রোমের প্রশংসার চেয়ে আর বেশ কিছু কি ইতিহাসে নেই? আর আমাদের প্রশ্ন ইসলাম ও পাশ্চাত্যের দ্বন্দ্ব ছাড়া ইতিহাসে কি কিছু নেই?যেখানে অবশ্যই, ইসলাম এবং মুসলমানরা পাশ্চাত্যের উপর ক্রুদ্ধ এবং আগ্রাসী।বার্নার্ড লুইস তার বিভিন্ন লেখায় অটোমানদের সাথে পাশ্চাত্যর দ্বন্দ্বকে খ্রিস্টান বনাম মুসলমানদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব হিসাবে অভিহিত করেছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো,এসব যুদ্ধ ছিল ভূখণ্ডের ওপর রাজাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লড়াই।যদিও অটোমান সেনাবাহিনীতে অনেক ইহুদি খ্রিস্টান ও চাকরি করত।তাছাড়া এসময় অটোমানরা পারস্যের সাফাভিদের (যারা ছিল শিয়া মুসলিম)সাথেও দ্বন্দ্বে লিপ্ত ছিল।”দ্য রুটস অব মুসলিম রেইজ” প্রসঙ্গে জর্জটাউন ইউনিভার্সটির ধর্ম ও আন্তর্জাতিক বিষয়ের প্রফেসর জন এল . এসপোসিতো তার “দ্য ইসলামিক থ্রেট মিথ অর রিয়ালিটি? ” বইতে লিখেছেন বার্নার্ড লুইস এ লেখায় পর্যাপ্ত তথ্যের ঘাটতি ও ইসলামি পুনর্জাগরণের প্রকৃতি ও বৈচিত্র সম্পর্কে বিশ্লেষণ অসম্পূর্ণ।

অপরদিকে হান্টিংটনের মতে ইসলামি মৌলবাদ নয় খোদ ইসলামই হচ্ছে পশ্চিমাদের জন্য বিপদজনক। তিনি তার “দ্য ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশনস অ্যান্ড দ্য রিমেকিং অব দ্য ওয়ার্ল্ড অর্ডার” গ্রন্থে লেখেন – পশ্চিমাদের জন্য ইসলামি মৌলবাদ সুপ্ত সমস্যা নয়। সমস্যা হচ্ছে ইসলাম। এটা এক ভিন্ন সভ্যতা যার অনুসারিরা তাদের সংস্কৃতির প্রাধান্য সম্পর্কে বিশ্বাসী এবং তাদের শক্তিহীনতার ব্যাপারে বিকারগ্রস্ত। হান্টিংটনের এ সভ্যতার সংঘাতের তত্ত্ব পাশ্চাত্যের অনেক বুদ্ধিজীবীরা অস্বীকার ও সমালোচনা করেছেন।এডওয়ার্ড ডব্লিউ সাঈদ তার “রিপ্রেজেন্টেশনস অব দ্য ইন্টেলেকচুয়াল” গ্রন্থে লেখেন -আজকাল আমেরিকান বা ব্রিটিশ একাডেমিক বুদ্ধিজীবীরা মুসলিম বিশ্ব নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ইসলাম সম্পর্কে দায়িত্বজ্ঞানহীন উক্তি করেন।যেখানে এক বিলিয়ন মানুষ ডজনখানেক সমাজ এবং আরবি, তুর্কি, পার্সি সহ ছয়টি ভাষা বিশ্বের এক- তৃতীয়াংশ জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সেখানে ‘ইসলাম’ একটি মাত্র শব্দ ব্যবহার করে মনে হয় তারা এটিকে একটি সহজ সরল জিনিস বলে প্রতিপন্ন করতে চান।
হান্টিংটন তার ‘সভ্যতার সংঘাতে’ পাশ্চাত্য সভ্যতাকে সার্বজনীন সভ্যতাতে হিসাবে অভিহিত করেছেন।অনেকক্ষেত্রে এটি প্রতিটি সভ্যতার লোকেরাই দাবি করে।কিন্তু তিনি মনে করেন অন্যান্য সভ্যতা বিশেষত ইসলাম পশ্চিমাদের জন্য হুমকিস্বরূপ। মূলত এর মাধ্যমে তিনি পাশ্চাত্যকে অন্যান্য সভ্যতার প্রতি আক্রমনাত্মক হতে প্ররোচিত করেছেন। ব্রিটিশ লেখক ক্যারেন আর্মস্ট্রং ‘দ্য ব্যাটল ফর গড ‘ গ্রন্থে মৌলবাদের ইতিহাস আলোচনা করতে গিয়ে জামালুদ্দিন আফগানি ও ডক্টর আলি শরিয়তির মতো ইসলামিক দার্শনিকদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। যারা বিশ্বাস করতেন ইসলাম সার্বজনীন সভ্যতা ,আধুনিক হওয়ার জন্য ইউরোপীয়দের অনুসরণ করার প্রয়োজন নেই, মুসলমানরা নিজেরাই সেটা পারবে। তারা চাইতেন পাচ্য থেকে পাশ্চাত্যের হস্তক্ষেপ ও প্রভাব দূর হোক।এসব ইসলামিক চিন্তাবিদদের মন্তব্য ছিল অনেক ক্ষেত্রে আত্মরক্ষামূলক।অথচ ক্যারেন আর্মস্ট্রং এর আলোচিত মৌলবাদিদের তুলনায় হান্টিংটনের থিওরি ছিক আক্রমণাত্মক।হান্টিংটন লিখেছেন, স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তি সময়ে আমেরিকা মনে করে যে, তাদের সভ্যতা ও মূল্যবোধ সার্বজনীন সভ্যতা এবং সমগ্র বিশ্বের জন্য তা সর্বতোভাবে প্রযোজ্য। এজন্য তারা যেকোন দেশে হস্তক্ষেপ করার অধিকার রাখে।এখানে ক্যারেন আর্মস্ট্রং সহ পশ্চিমা অনেক বুদ্ধিজীবীদের নিকট জামাল উদ্দিন আফগানি বা আলী শরিয়তির তত্ত্ব বিচারে যে মানদণ্ড হান্টিংটনের সার্বজনীন সভ্যতা বিচার করতে গিয়ে সেই মানদণ্ড নেই।

ইসলাম সম্পর্কে পাশ্চাত্যর অধিকাংশ বুদ্ধিজীবীদের নেতিবাচক ধারণার বিভিন্ন কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে জন এল. এসপোসিতো বলেন -বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞ সেক্যুলার শিক্ষাগত পক্ষপাত ও সেই সাথে ইসলাম এবং মুসলিম সমাজসমূহের ইসলামিক মাত্রা সম্পর্কে সীমিত জ্ঞান নিয়ে তাদের গবেষণার উপসংহার টানেন।এজন্যই পশ্চিমারা ইসলাম সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করেন।
প্রশ্ন হচ্ছে পাশ্চাত্যের জন্য ইসলামি হুমকির অস্তিত্ব কি আদৌ আছে?এটা এই অর্থে আছে, যদি পাশ্চাত্য হুমকি বা জুডো-ক্রিশ্চান হুমকির অস্তিত্ব থেকে থাকে।
লেখক: সদস্য বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক সংঘ

Top