প্রশ্ন ফাঁস রোধে প্রয়োজন সরকারের সহায়তা –রাজু আহমেদ

IMG_20181019_194503.jpg

————————————–
তবে কি বাংলাদেশ তার মেরুদণ্ড হারাতে বসেছে?
হ্যাঁ, মেরুদণ্ড হারানোর কথাই বলছি। আমরা সেই ছোটবেলা থেকেই পড়ে আসছি “শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড”। প্রশ্ন চলে আসে কেমন শিক্ষা পুরো জাতির মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করে। অবশ্যই সুশিক্ষা! আপনার কি মনে হয়?বাংলাদেশে এখন সুশিক্ষার পরিবেশ বিরাজ করছে? যদি হ্যাঁ, বলেন। তবে ধরে নেব আপনি এখনও বর্তমান থেকে কয়েক হাজার মাইল দূরে আছেন। আপনি অন্ধকারে এখনও নিমজ্জিত। আমি বলবো পুরোপুরি এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। আর তার কারন হচ্ছে পরিক্ষার আগেই প্রশ্নপত্র ফাঁস, ভর্তি জালিয়াতি, দুর্নীতি, শিক্ষা বানিজ্য ইত্যাদি। দিনদিন বাংলাদেশের শিক্ষার পরিবেশ ক্রমেই ঘোলাটে হয়ে যাচ্ছে। সংঘটিত হচ্ছে প্রশ্ন ফাঁস, ভর্তি জালিয়াতির মতো কুৎসিত কিছু ঘটনা।

শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। যে জাতির মেরুদণ্ডের ভিত যত বেশি মজবুত, সে জাতি তত বেশি উন্নত। শিক্ষা মানুষের নৈতিক ও আত্মিক শক্তি জোগায়। শিক্ষা মানুষকে নৈতিক, মানবিক ও অসাম্প্রদায়িক হওয়ার শিক্ষা দেয়। আপনি উন্নত বিশ্বে যান দেখবেন শিক্ষিত মানুষই তাদের দেশগুলোতে নেতৃত্ব দিচ্ছে। সেদেশের নাগরিকরা সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দেশ ও জাতিকে উন্নতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা এক্ষেত্রে তাদের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারছি না। আমরা তাদের থেকে অনেকটা পিছিয়ে। আমাদের ভীত বা মেরুদণ্ড তাদের মতো ততোটা মজবুত না। কারন, বাংলাদেশে শিক্ষার মতো একটি মৌলিক বিষয় আজকে বিপর্যস্ত। প্রশ্ন ফাঁস, ভর্তি বানিজ্য, দুর্নীতিসহ নানা সমস্যায় জর্জড়িত আমাদের তথা বাংলাদেশ নামক ছোট্ট ভূখন্ডটির জাতির উন্নতির পরিমাপক হিসেবে পরিচিত শিক্ষাব্যবস্থা।

আজকাল আকাশ-সংস্কৃতি বা প্রযুক্তির কল্যাণে জেএসসি,এসএসসি,এইচএসসি এমনকি যেকোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরিক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়ে যাচ্ছে যা বাংলাদেশের জন্য অশনি সংকেত বলে মনে হয়। বাংলাদেশে বিভিন্ন পরিক্ষাগুলোতে প্রশ্ন ফাঁস নতুন কিছু নয়। সরকারী তথ্যমতে বাংলাদেশে প্রশ্ন ফাঁসের প্রথম ঘটনা ঘটে ১৯৭৯ সালে এসএসসি পরিক্ষায়। আজকালের মতো এতো তীব্ররুপ তখন ছিলোনা। প্রশ্ন ফাসের ঘটনা তীব্রতা লাভ করে এই কয়েক বছর ধরে। বিশেষ করে ২০১৪ সাল থেকে বাংলাদেশের পরিক্ষাব্যবস্থাায় প্রশ্ন ফাঁস বা ভর্তি জালিয়াতির মতো ঘটনা তীব্রতা লাভ করে। বাংলাদেশে ২০১৪ সাল থেকে পিএসসি,জেএসসি,মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরিক্ষার মতো বাংলাদেশের অন্যান্য সরকারি পরিক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস শুরু হয়।

আজকাল প্রশ্ন ফাঁস নিয়মিত ঘটনায় পরিনত হয়েছে। কোনোভাবেই রোধ করা যাচ্ছে না। এর ফলস্বরুপ প্রতারণা করা হচ্ছে দেশের গরীব মেধাবী শিক্ষার্থীদের সাথে। তাদের স্বপ্নের সমাপ্তি ঘটছে প্রশ্ন ফাঁসের করাল গ্রাসে। টিকে থাকতে পারছে না তারা প্রশ্ন পাওয়া ধনীর দুলাল-দুলালিদের সাথে প্রতিযোগিতায়। অন্ধকারে নিমজ্জিত হয় তাদের স্বপ্নগুলো। আমার মনে হয় বাংলাদেশের অধিকাংশ শিক্ষার্থীদেরই প্রথম স্বপ্ন থাকে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড নামে খ্যাত, বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার। স্বপ্ন ঠিকই থাকে। কিন্তু সেই স্বপ্নের সুন্দর সমাপ্তি অনেকেরই হয় না। তার কারণ এখানেও প্রশ্ন ফাঁস বা ভর্তি জালিয়াতি রয়েছে। পরিক্ষার আগের রাতেই কোটি টাকায় বিক্রি হয় প্রশ্ন যা নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে কখনোই সম্ভব হয় না। ফলে মেধা থাকা সত্তেও চান্স হয় না স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ে।

গত কয়েক বছর ধরেই দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরিক্ষায়ও প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ উঠতেছে। বরাবরের মতো এবার সবকিছুকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৮-১৯ সেশনের ঘ ইউনিটের প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ ওঠেছে। গত কয়েক বছর একই ইউনিটের প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনার পর এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘ ইউনিটের ভর্তি পরিক্ষায় পাশের হার বিগত বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ এবং প্রশ্নের মানও বিগত বছরের তুলনায় নিম্নমানের হয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন। এমনও দেখা গেছে যে ঘ ইউনিটে অংশগ্রহণকারী অনেক শিক্ষার্থী নিজেদের স্ব স্ব ইউনিটে পাশই করতে পারেনি অথচ ঘ ইউনিটের ভর্তি পরিক্ষায় পেয়েছে রেকর্ড সংখক নম্বর যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে বিরল। যেসব শিক্ষার্থী ক,খ এবং গ ইউনিটে সর্বনিম্ন নম্বর নিয়েই পাশ করতে পারে না তারা কিভাবে ঘ ইউনিটের পরিক্ষায় রেকর্ড সংখ্যক নাম্বার পায়। মাত্র কয়েকদিনের প্রস্তুতিতে কিভাবে সম্ভব হয় রেকর্ড সংখ্যক নম্বর পাওয়া। ভাবতেই অবাক লাগে। কি মনে হয় আপনার?কোন পথে যাচ্ছে বাংলাদেশ?কেমন হবে আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম? নানা প্রশ্নের জন্ম নিচ্ছে সচেতন মহলের মাঝে। এর শেষ কোথায়?এই প্রতারণার সমাপ্তি কোথায়? এভাবে আর কতদিন চলবে? এই প্রহসনের শেষ হবে কি? নাকি নিম্ন বা মধ্যবিত্তের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে।

আফ্রিকার সবচেয়ে নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়টির নাম ইউনির্ভাসিটি অব সাউথ আফ্রিকা। যার প্রবেশদ্বারে লেখা রয়েছে –
“কোন জাতিকে ধ্বংস করার জন্য পারমাণবিক হামলা কিংবা ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের দরকার নেই। বরং সেই জাতির শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় প্রতারণার সুযোগ দিলেই হবে। কারণ এভাবে পরীক্ষা দিয়ে তৈরি হওয়া ডাক্তারদের হাতে রোগীর মৃত্যু হবে,ইঞ্জিনিয়ারদের দ্বারা নির্মিত দালান-কোঠা, ইমারত ধ্বংস হবে এবং অর্থনীতিবিদের দ্বারা দেশের আর্থিক খাত দেউলিয়া হবে। এ ছাড়া বিচারকদের হাতে বিচারব্যবস্থার কবর রচনা হবে। সুতরাং শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়ার মানে হলো একটি জাতির অবলুপ্তি।” হ্যাঁ, বাংলাদেশের জন্যেও প্রশ্ন ফাঁস সে রকম অশনি সংকেত হয়ে উঠতে পারে। যে হারে প্রশ্ন ফাঁস, ডিজিটাল ভর্তিজালিয়াতি, দুর্নীতি ইত্যাদি দিন দিন ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা আজ হুমকির মুখে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় অরাজকতার ফলে অনেক মেধাবী মুখ ঝরে যাচ্ছে আমাদের মাঝ থেকে। অনেক দিনের বোনা রঙিন স্বপ্ন ধূসর হয়ে যাচ্ছে, অনেকের ভবিষ্যতের আলো ছড়ানোর সুর্যটা শুরুতেই অস্তমিত হচ্ছে।
সারকথা কি দাড়াঁয়? প্রশ্ন ফাঁস বা ভর্তি জালিয়াতিতে কারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে?আপনি বলবেন হয়তো মধ্যবিত্ত শ্রেণি। হ্যাঁ, ঠিক তাই। কিন্তু মুদ্রার অন্য পিঠেও তাকাতে হবে আপনাদের। পরোক্ষভাবে গোটা দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান, দেশের শাসন ব্যবস্থা, দেশের নীতিনির্ধারণকারী সংস্থা। মোটকথা দেশের প্রতিটি ব্যক্তিই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পক্ষান্তরে কতিপয় লোক টাকার জোড়ে যোগ্যতা না থাকা সত্তেও ভালো প্রতিষ্ঠান এ ভর্তি হতে পারছে, বাংলাদেশের শিক্ষিত যুবকদের জাতীয় স্বপ্ন নামে পরিচিত বিসিএস পরিক্ষাতেও প্রশ্ন ফাঁসের ফলে টাকাওয়ালা ধনীর দুলালেরা সারা দিনরাত পরিশ্রম করা মেধাবী ছেলেটিকে হটিয়ে সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে সেই পরিক্ষায় কৃতকার্য হওয়ার। ফলাফল কি হচ্ছে?অযোগ্যরা যোগ্যদের স্থানে যাচ্ছে। দেশে বৃদ্ধি পাচ্ছে দুর্নীতি, ঘুস, স্বজনপ্রীতি এবং ভদ্রবেশী অপরাধ। আর এদিকে যোগ্য প্রার্থীরা নিজের যোগ্যতা থাকা সর্ত্তেও কাঙ্ক্ষিত ফলাফল না পেয়ে নিরবে নিভৃতে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে। এভাবে আর কতদিন চলবে দেশ? এখনই সময় ঘুরে দাড়াঁনোর… এখনই সময় প্রশ্ন ফাঁস বা ডিজিটাল জালিয়াতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলার। সাধারন জনগনের বা সাধারন শিক্ষার্থীদের একার পক্ষে এর বিরুদ্ধে দাড়ানো সম্ভব না। আর হলেও বিশেষ ফলপ্রসু হবে না সেটা। প্রয়োজন সরকারে হস্তক্ষেপ, প্রয়োজন আইনের সহায়তা।

যে বা যারা প্রশ্ন ফাঁস বা ডিজিটাল জালিয়াতির সাথে সম্পৃক্ত তাদের সাথে অবশ্যই উপর মহলের কারো না কারো সাথে সংযোগ রয়েছে। তাদের সাহায্য নিয়েই তারা প্রশ্ন ফাঁস, ভর্তি জালিয়াতির মতো নিকৃষ্ট কাজগুলো চালিয়ে যাচ্ছে। পুরো চক্রটিকে খুজে বের করতে হবে। আর তা সরকার বা আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার পক্ষেই কেবল সম্ভব। সরকার জঙ্গি দমনে সক্ষমতা দেখিয়েছেন, বিশ্ব ব্যাংকের কোনোরকম সহায়তা ছাড়াই পদ্মা সেতুর মতো বৃহৎ প্রকল্পের কাজ শুরু করার সক্ষমতা দেখিয়েছেন, যুদ্ধাপরাধীদের মতো কিটদের থেকে দেশকে মুক্ত করতে পেরেছেন। তবে প্রশ্ন ফাঁসকারীদের কেন নির্মূল করছেন না। প্রশ্ন ফাঁসকারীরাও যুদ্ধাপরাধীদের থেকে কম ভয়ঙ্কর নয়। তারাও দেশকে ধ্বংসের নেশায় মত্ত। তারা আমাদের লাল-সবুজের দেশের মেরুদণ্ডকে বিলীন করে দেশকে পঙ্গু করে দিতে চাচ্ছে। অবশ্যই এটা ঘৃণ্য অপরাধ যা পুরো জাতিকে ধ্বংস করার নীলনকশা। আমরা চাইনা কোনো কুচক্রী মহল আমাদের দেশকে আমাদের চোখের সামনে ধ্বংস করে ফেলুক। আমরা চাইনা কোনো অশুভ শক্তির কারনে কোনো বাবা-মায়ের চোখে অশ্রু ঝরুক। আমরা চাই যোগ্যতমরাই টিকে থাকুক, দেশের প্রতিনিধিত্ব করে লাল- সবুজের পতাকাটিকে সারা বিশ্বের মাঝে ছড়িয়ে দিক। আমরাও বলতে চাই, আমরা কারো মুখাপেক্ষী নই। আমরাও বলতে চাই আমাদের দক্ষ ডাক্তার আছে, ইঞ্জিনিয়ার আছে, শিক্ষাবিদ আছে, আছে দক্ষ রাজনীতিবিদ। আমরা মেরুদণ্ডহীন হতে চাই না। আমরা সগৌরবে বাচঁতে চাই। আমরা বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা চাই। আমরা প্রশ্ন ফাঁস চাই না, আমরা দুর্নীতি চাই না। আমরা চাই যোগ্যরাই টিকে থাকুক।

পরিশেষে, বাংলাদেশ অযুত সম্ভাবনার এক সোনালি দেশ। স্বাধীনতার ৪৭ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনও উন্নতির স্বর্ণশিখরে উঠতে পারিনি আমরা। এর মূল কারণ আমাদের অপরিকল্পিত শিক্ষা কাঠামো ও শিক্ষাব্যবস্থা। এভাবে লাগামহীনভাবে প্রশ্নপত্র ফাঁস হলে আরও কয়েক শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি কাঙ্ক্ষিত মানে উন্নীত হতে পারবে না। সমৃদ্ধ দেশ গঠনে প্রয়োজন দক্ষ, যোগ্য, দেশপ্রেমিক ও সুশিক্ষিত জনসমষ্টি। এভাবে প্রশ্ন ফাঁস হতে থাকলে সেই জনসমষ্টি আমরা কোথায় পাব? সুতরাং, এখনই সময় জেগে ওঠার। এখনই নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার প্রস্তুতি নেওয়ার। প্রয়োজন প্রশ্ন ফাঁস, দুর্নীতি, ঘুসের মতো অপরাধকে “না” বলার। আমরা চাই বাংলাদেশ সরকার যুদ্ধাপরাধী, জঙ্গিবাদ নির্মূলের মতো প্রশ্ন ফাঁসকারী চক্রকে স্বহস্তে নির্মূল করে দেশকে রক্ষা করুক। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়কে ত্বরান্বিত করুক।।
লেখকঃ রাজু আহমেদ; শিক্ষার্থীঃ সমাজকলাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Top