চিংড়ি না থাকায় বিয়ে ভেঙ্গে যায়, এমন সমাজ চাইনাঃ

unnamed.png

মোহাম্মদ মনজুরুল আলম চৌধুরী।
সমাজের সর্বক্ষেত্রেই বিরাজ করছে অস্থিরতা। অশুভ, অনাকাঙ্ক্ষিত, অনভিপ্রেত, অসুস্থ প্রতিযোগিতা দিনদিন মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। পাশাপাশি লোপ পাচ্ছে নৈতিকতা, মানবিকতা, সামাজিকতা, ধর্মীয় অনুশাসন ও অনুভূতি, বিচার, বুদ্ধি, বিবেক, বিবেচনা। ফলে ঘটছে মানবিক ও সামাজিক অবক্ষয়। ধনীরা তাঁদের বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে যে প্রীতিভোজের আয়োজন করে তাতে তাঁদের নিজেদের মধ্যেই চলে নীরব আর লোক দেখানো অশুভ প্রতিযোগিতা। পাশাপাশি যা গরীব অসহায় নিম্ন মধ্যবিত্তদের কঠিন অসহনীয় আর্থিক সমস্যায় ফেলছে। ধনী আর গরীবের বৈষম্যে দিশেহারা হয়ে অনেকেই মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছে। আর এসব অনুষ্ঠান আয়োজন করতে গিয়ে বর পক্ষের অনৈতিক চাওয়া পাওয়া বা যৌতুকের বলি হচ্ছে দেশগ্রামের গরীব ঘরের মেয়েরা।

বেশ কিছুকাল থেকে চলে আসা বাগদান বা আকদের পর ধনী কনে পক্ষরা যে প্রীতিভোজের আয়োজন করে তাতে খাবারের ম্যানুতে হরেক রকম উপাদেয় মুখরোচক পদের সমাহার ঘটে। অনেকের পক্ষে সব পদের খাওয় সম্ভব না হলেও একটু টেস্ট করতে গিয়ে প্রচুর খাদ্যের অপচয় হয়। আমাদের মন মানসিকতা হচ্ছে সবাই খেতে পারুক বা নাইবা পারুক টেবিল ভর্তি খাবার দেখে নয়ন জুড়িয়ে যেতে হবে। লোক মুখে চর্চা হতে হবে যে জনাব ‘ক’ দেখেছেন মেয়ের আকদ/ বাগদান/ বিয়েতে কি দারুণ আয়োজন করেছেন। কিছুই যে বাদ যায়নি দেখছি। যার কুপ্রভাব বা বিরূপ প্রভাব পড়ছে সমাজের সর্বক্ষেত্রে তথা গ্রামে গঞ্জে শহরে বন্দরে সব জায়গায়। এমন কি প্রীতিভোজে নানান পদের ম্যানু রাখতে অসামর্থ্য হওয়া সত্ত্বেও বাধ্য হচ্ছে তা করতে। ফলে ঘটছে অনভিপ্রেত এবং অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা, কলহ, সংঘর্ষ। ভেঙ্গে যাচ্ছে কত নারীর বিয়ে। যেমন গত ৩০ সেপ্টেম্ব্র’১৮ চট্টগ্রামের আনোয়ারায় বিয়ের প্রীতিভোজে চিংড়ি না থাকায় ঘটে গেছে এক তুলকালাম কান্ড। কনে পক্ষ প্রীতিভোজে বিভিন্ন পদের খাবারের আয়োজন করলেও প্রবাসী বর আলমগীর প্রীতিভোজে চিংড়ি না থাকায় কনে পক্ষের সাথে তর্কাতর্কিতে এবং পরবর্তীতে হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েন। উভয় পক্ষ মারমুখী অবস্থানে চলে যায়। অবশ্য পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং তিন দিন পর একটি সালিসি বৈঠকের আয়োজন করেন। উক্ত বৈঠকে কনের নিরাপত্তার জন্য দেন মোহরের ৭ লাখ টাকার মধ্যে কনের নামে ৩ লাখ টাকার এফ ডি করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। কিন্তু পরবর্তীকালে বর পক্ষ তা না মানায় অদ্যাবধি এর আর কোন সুরাহা হয়নি। কনের পিতা বর পক্ষের কথা দিয়ে কথা না রাখার জন্য হতবিহবল ও মুষড়ে পড়েছেন। কনের পিতা মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব উদ্বিগ্ন, উৎকণ্ঠিত, হতাশ ও দুশ্চিন্তাগ্রস্থতার মধ্যে দিনানিপাত করছেন। এই কন্যা দায়গ্রস্ত পিতা এই সমস্যা থেকে কবে উদ্ধার হবেন তা ভবিতব্যের হাতেই তোলা রয়েছে। এই খবরটি পত্রিকায় এবং সামাজিক যোগাযোগ মধ্যমে এসেছে বলে দেশবাসী জানতে পারছে। এরকম কত শত শত ঘটনা সমাজে ঘটছে যা লোকচক্ষুর আড়ালেই থেকে যাচ্ছে।

আগে দেখেছি শিশু কন্যা সন্তানদের কর্ণ ছেদন বা শিশু ছেলদের খৎনা, বর বা কনের মেহেদী লাগানোর জন্য গ্রামে পানতলের আয়োজন করা হতো। অর্থাৎ শিশু বা বড়দের হাতে মেহেদী লাগানো হতো আর আমন্ত্রিত অতিথিদের নানান ধরণের পিঠা পুলির সাথে পান দিয়ে আপ্যায়ন করা হতো। সবাই পান খাওয়ার পাশাপাশি গীতের সাথে সাথে নাচতো, বিভিন্ন ধরণের রংগ তামাশা করতো। এটি হল গ্রামে দেখা আমার নির্মল হাসি আনন্দের দারুণ উপভোগ্যের ছবি যা এখনো মানস পটে আঁকা আছে। ৭০/৮০ দশকে জন্মদিন, মেহেদী অনুষ্ঠানগুলো হতো বিকেলের দিকে সবাইকে বিভিন্ন ধরণের নাস্তা বা স্ন্যাক্স জাতীয় খাবার দিয়ে আপ্যায়ন কর হতো। এসব অনুষ্ঠান গুলো ঘরে, ঘরের ছাদে বা বাড়ীর আংগিনায় অনুষ্ঠিত হতো খুবই ঘরোয়া পরিবেশে উভয় পক্ষ মিলে ৬০ থেকে শ’খানেক লোকোর সমাগম হতো। পরবর্তীতে যোগ হল একটু ভারী খবার গোস্ত পরটা বা আখনি। এখন আর সেই পুরানো যুগ নেই এখন কমপক্ষে ৩০০ শত বা ততোধিক মানুষের জন্যে আয়োজন করা হয় আগেকার যুগের বিয়ের প্রীতিভোজের মতো যা দিয়ে গরীব দুঃখী মানুষের ৩/৪টি বিয়ে সম্পন্ন হতে পারে। এসব অনুষ্ঠানের জন্য ক্লাব বা কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া করতে হয়। বিয়ের, আকদের, বাগদানের, ওয়ালিমার জন্যে আয়োজনের বাজেটের কথা নাইবা বললাম। একটি বার্থডে পার্টিতে যদি ক্লাব ভাড়া করে ৩০০/ ৪০০ মানুষের জন্য ১২ লাখ টাকা খরচ করা হয় তবে অন্য কিছুর কথা বলার আদৌ কোন প্রয়োজন আছে বলে মনে হয়না।

বিয়ে শাদী সহ বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে বিভিন্ন পদের বিভিন্ন ধরণের খাবারের প্রদর্শন আজ এমন এক পর্যায়ে গেছে যা সব মানুষের পক্ষে সামাজিক ও আর্থিকভাবে আয়োজন করা সম্ভবপর নয়। ইসলামে নারীদেরকে অনেক মর্যাদা দেয়া হয়েছে। দেন মোহর আদায় করে বরের পিতা গিয়ে কনে নিয়ে আসা এবং গরীব মিসকিন ও স্বজনদের তাওফিক অনুযায়ী ওয়ালিমা খাওয়ানোর আয়োজন করার কথা বলা হয়েছে। কনে পক্ষকে অযথা বা অহেতুক চাপ দেয়ার ব্যাপারে নিষেধ করা হয়েছে। মহানবী (সঃ) যেখানে কন্যা পক্ষকে অযথা বা অহেতুক কোন চাপ সৃষ্টি না করার কথা বলেছেন সেখানে বাস্তবে আমরা করছি ঠিক তার উল্টো। বরং আমরা কন্যা পক্ষকে দিচ্ছি বিভিন্ন অযৌক্তিক চাপ তা যৌতুক এবং হাজার হাজার মানুষ খাওয়ানোর জন্য। বিয়ে হচ্ছে দু’জন আলাদা সত্ত্বার মধ্যে পবিত্র শুভ সুন্দর ভালোবাসার দাম্পত্য বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে ভবিষ্যতের পথচলার মধুর ক্ষণ। দু’টি মানুষের বন্ধনে বিভিন্ন পরিবারের সাথে আত্মার বন্ধনে গড়ে উঠে আত্মীয়তার, ভ্রাতৃত্বের, সৌহার্দ্যের সুদৃঢ় বন্ধন। তাই নতুন সম্পর্ক সূচনা দর কষাকষির মাধ্যমে গড়ে উঠা বঞ্চনীয় নয়। বাঞ্ছনীয় নয় অনৈতিক চাপ প্রয়োগ বা সৃষ্টি করা। যা সুন্দর সম্পর্ক গড়ে উঠার ভিতকে নড়বড়ে করে দিতে পারে।

আমরা বর্তমানে দেখছি ব্যক্তি পরিবার সমাজের মধ্যে সুদৃঢ় সৌহার্দ্য ভ্রাতৃত্বের বন্ধনের বদলে লৌকিকতা, ধনী/ প্রভাবশালী মানুষের সাথে আত্মীয়তা জাহির করার আপ্রাণ হীন প্রচেষ্টা। দান সদাকা করতে বা অসহায় দুঃখীদের লোক দেখানো ৩/৪শ টাকার জাকাতের কাপড় দিতে ডাকঢোল পিটিয়ে পদদলিত করে মানুষ মারতেও এই সমাজে কারো বুক কাপেনা। গরুর গলায় ঘণ্টা বেঁধে, শিশু-কিশোরদের দিয়ে মিছিল করে জানান দিতে হয় কার কোরবানির গরু দাম কত ? সবাই যেন বলে অভাই গরু, দাম কত ? মসজিদে কিছু দান করলেন সেখানেও লেখা থাকবে কার সৌজন্যে তা দেয়া হয়েছে। হয়তবা একদিন দেখা যাবে কাফনের কাপড়েও লেখা থাকবে সৌজন্যে জনাব ……। আসুন আমরা সমাজকে মানবিক নৈতিক সামাজিক ধর্মীয় অবক্ষয় থেকে টেনে তুলি। সমাজে লৌকিকতা, লোক দেখানো সকল ধরণের প্রদর্শনী বাদ দিয়ে মানুষের বিবেক ও মনুষ্যত্ববোধকে জাগ্রত করি। মানুষের মনে এই বোধটুকু অন্তত জাগ্রত করি মানুষ মানুষের জন্য। প্রীতিভোজে চিংড়ি না থাকায় বিয়ে ভেংগে যায় এমন সমাজ আমরা চাইনা। অমানুষের অস্তিত্ব, দাপট থাকবেনা এমন সমাজ চাই আমরা।

Top