পীরে কামেল,ছৈয়দুল আযম আল্লামা হাফেজ শাহ মুহাম্মদ বজলুর রহমান (রহ.) স্মরণে–জিয়া হাবীব আহসান

FB_IMG_1536048967313.jpg

১৪ই অক্টোবর ৭২তম ওফাত দিবস

সৃষ্টির শুরু থেকে বিশ্ব ইতিহাসের প্রতি নজর বুলালে প্রতীয়মান হয় যে পৃথিবীর দেশে দেশে যুগে যুগে যত আম্বিয়ায়ে কিরাম,সংস্কারক,নবী,রাসুল,পীর,সূফী,ফকির,সাধক,আউলিয়াগণ এসেছেন তাদের সবাই এক মহান আল্লাহ্‌ তাআলার অস্তিত্বে বিশ্বাসী ছিলেন এবং সকলেই তাদের অনুসারীদেরকে আল্লাহ্‌ তাআলার অস্তিত্বে বিশ্বাসী করে তুলার প্রয়াস পেয়েছেন।পীর আউলিয়ার দেশ চট্রগ্রামের রাঙ্গুনিয়া থানাধীন বেতাগী দরবার শরীফের বেতাগী পীর হাফে্জ ছাহেব সকল পীর আউলিয়ার মধ্যে অন্যতম।এই মহান সাধকের ৭২তম ওফাত দিবসে তাঁর সম্পর্কে সামান্য আলোচনা অবতারণ করেছি।
পরিচয়ঃ
ছৈয়দুল আযম আল্লামা হাফেজ ক্বারী হযরত শাহ মুহাম্মদ বজলুর রহমান (রহ.) ১৮৯২ হতে ১৯৪৮ মাত্র ৫৬ বছর বয়সে যিনি হয়েছিলেন যুগের গৌরব,ছৈয়্যদুল আযম,গাউছে জামান ৤ তারই ব্যপারে এই লেখনি। ক্ষণজন্মা এই মহান পুরুষ বেতাগির হাফেজ সাহেব কেবলা নামে সুপরিচিত ও সুপ্রসিদ্ধ ছিলেন। উনাকে শুধু বুজুর্গ বললে খাটো করা হবে,বাড়িয়ে বললে জাহির করা হবে এবং উপড়িয়ে বললে উলঙ্গ করা হবে,তাই উনার জীবনীর যা কিছু সত্য রয়েছেন তা পাঠকদের নিকট তুলে ধরতে চাই। তাঁর বংশগত নছবনামা হচ্ছে হযরত মোজাদ্দেদ আলফেসানি(রহ.),হযরত পীর মাছুম শাহ্‌ (রহ.) হতে হযরত শেখ লাল আশরাফ আলী,শেখ গোলাম আলী,শেখ রাহাত আলী,হযরত শাহ মুহাম্মদ বজলুর রহমান (রহ.) পরিসমাপ্তি। হযরত পীর মাছুম (রহ.) চাঁদ ও সূর্য নিয়ে যিনি খেলা করতেন। এই কথাটি আধ্যাত্নিক মানুষ ছাড়া বুঝা বড় দায়।
জন্মঃ
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভুমি আমদের এই চট্রগ্রাম। যাকে এক নামে ১২ আওউলিয়ার দেশ বলা হয়। যেখানে হাজারও আওউলিয়া,গাউস,কুতুব,আবদাল,সুফি,দরবেশের সমারোহ। চট্রগ্রামের পূর্ব প্রান্তে রাঙ্গুনিয়া থানার বেতাগী গ্রাম বাংলাদেশের আনাচে কানাচে আজ বেশ পরিচিত শুধুমাত্র আমাদের সেই মহান ব্যক্তি ছৈয়দুল আযম আল্লামা হাফেজ হযরত শাহ মুহাম্মদ বজলুর রহমান (রহ.) এর কারণে। ১৮৯২ সালের কোন এক মাসের বৃহস্পতিবার ছোবহে ছাদেকের সময় বেতাগি গ্রামেরই এক সম্ভ্রান্ত এবং বুজুর্গ পরিবারের সর্ব কনিষ্ঠ সন্তান হয়ে উনি ধরারা বুকে তশরীফ আনেন।
নামের উপাধিসমুহ/উপনামঃ
উনার নামের অর্থ(বজলুর রহমান) করুণাময়ের অপার দান। যা সত্যিকারভাবে উনি লাভ করেছিলেন।উনার পিতার নাম হযরত রাহাত আলী শাহ্‌ (যার মাজার চম্পাতলি কবরস্থানে) এবং মাতার নাম মুহতারিমা কমলজান বিবি।উনার নামের আগে ছৈয়দুনা, শেখুনা, মুরশিদুনা, মাওয়ানা, মালযানা, ছৈয়দুল আযম, গউছুল আযম, গৌছে জামান,আল্লামা হাফেজ,ক্বারী উপাধিসমুহ ব্যবহার করা হয় এবং তা উনি সত্যিকারভাবে অর্জন করেছিলেন।
শিক্ষাঃ
উনার বাল্য শিক্ষা জীবন শুরু হয় কোরআন পাঠের মধ্য দিয়ে গ্রামের মক্তবে।পরবর্তীতে চট্রগ্রামেরই মোহসেনিয়া মাদ্রাসায় জামাতে আউয়াল পর্যন্ত পড়াশুনা করেন। দাওরায়ে হাদিস ও ফিকাহ শাস্ত্রের উপর ভুৎপত্তি জ্ঞান অর্জন করেন ভারতের রামপুরা আলিয়া থেকে। তিনি শরীয়তের এত বড় আলেম ছিলেন যে উনার সাথে বাতিলরা কোন অবস্থাতেই দাড়াতে সাহস করতেন না। হুজুর কেবলা তৎকালীন সারা ভারতবর্ষের প্রখ্যাত হেকিম আজমল খাঁর তত্ত্বাবধানে তিব্বিয়া কলেজে হেকেমি শাস্ত্র শেষ করেন এবং বুৎপত্তি অর্জন করেন হেকেমী শাস্ত্রে।

ফয়েজ প্রাপ্তী,অলি পর্যায়ে মর্যাদা লাভ ও খেলাফত অর্জনঃ
কামালিয়াত অর্জনের শুরুতেই সর্বপ্রথম উনি ফয়েজ প্রাপ্ত হন পড়াকালীন সময়ে মাইজভান্ডারের হযরত শাহ্‌ আহমদ উল্লাহ্‌ মাইজভান্ডারী নিকট হতে যা খুব ছোট বেলায়।কথিত আছে হাফেজ ছাহেব হুজুরকে দেখে শাহ্‌ ছাহেব কেবলা আনন্দে উচ্ছ্বাসিত হয়ে যান। হযরত কেবলা বাবা বলেছিলেন হাফেজ ছাহেব হুজুর আলেম হবেন,ক্বারী হবেন,হাকিম হবেন,সাহিত্যিক হবেন এইভাবে বলতে বলতে বিভিন্ন পদে ভূষিত করেন,যা হুজুরের ভবিষ্যৎ জীবনের আলোকচিত্র তুলে ধরেন।হাফেজে কুরআন দ্বিনী এলম শেষে হুজুর কেবলা তাকে অলি পর্যায়ে মর্যাদাশীল ও সম্মানিত করেন। তাছাড়া উনি হযরত পেঠান শাহ্‌ (রা.) সান্নিধ্য লাভ করে অর্জন করেছে ফয়েজ আর বরকত যা কল্পনাতীত। তিনি মুশুরি খোলার শাহ্‌ ছাহেব ফানাফিল্লাহ বাকাবিল্লাহ রুহানি জগতের মোজাদ্দেদ হযরত শাহ্‌ আহসানউল্লাহ (রহ) নিকট হতে বাইয়াত গ্রহণ করলেন।তিনি গাউছে পাক (রহ) হতে সরাসরি খেলাফত লাভ করেছেন।বাইয়াতের অল্পদিনের মধ্যে হাফেয ছাহেব কেবলায়ে আলমকে কাদেরিয়া, চিশতিয়া, নক্সবন্দিয়া, মোজেদ্দিয়া চার তরিকার ইমামদের উপস্থিতিতে হযরত কেবলায়ে আলম খেলাফত প্রদান করেন।পীরে মুরশিদ হযরত শাহ্‌ আহসানউল্লাহ (ক) তাকে শরীয়ত তরিকত হাকীকত্ব মারফতের সর্ব বিষয়ে পূর্ণ করে আকা মাওলা হযরত মুহাম্মাদ (সা) রাসুলুল্লাহ আয়াত্বে তাঁর অনুসারী করে দিয়েছেন।হযরত কালিম শাহ্‌ বোগদাদি (রহ) হযরত কেবলাকে বাইয়াত করেছেন এবং খেলাফত দিয়েছেন।খাজায়ে গরীবে নেওয়াজ (রহ) ওনাকে একটি সোনালি তাজ(টুপি) পড়াইয়া দেন।
লেখক ও সাহিত্যিকঃ
তিনি সুসাহিত্যিক ও কবি ছিলেন এবং বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা সাময়িকীতে লেখালেখি করতেন।উনার কবিতা গল্পের পাণ্ডুলিপি এখনো রয়ে গেছে।সাহিত্যেও ছিল উনার অসম্ভব প্রতিভা।তবে তিনি নিজেকে আল্লাহ্‌র ইবাদাতে বন্দেগী করতে সাহিত্য চর্চা বন্ধ করে দেন।তাঁর রচিত খোদার দান কবিতাটি বান্দার শুকরিয়া আদায়ের এক উৎকৃষ্টতম নজির এবং তা আজও মাশুর হয়ে আছেন।
রাজনীতিবিদ ও সুবক্তাঃ
রাজনীতিতে তিনি ছিলেন অত্যন্ত অনলবর্ষী বক্তা। ব্রিটিশ বিরোধী খেলাফত আন্দোলনের সক্রিয় ভূমিকা পালন করায় উনি ১৯২০ সালে গ্রেফতার হন।মাওলানা মুনিরুজ্জামান ইসলামবাদী,ফাররুখ আহমেদ নিযামপুরী,আব্দুর রশিদ চৌধুরী,মাওলানা তামিযুদ্দিন খান,আল্লামা মাশরেখী খেলাফত আন্দোলনে জড়িত তৎকালীন রাজনীতিবিদগণ হুজুরের সঙ্গী ছিলেন।জেলে থাকাকালীন পাকিস্তানের গণ পরিষদ সদস্য জনাব তমীজুদ্দিন খানকে হুজুর কেবলা ছহিহভাবে কোরআন শিক্ষা দেন এক বছর।
উনার অনলবর্ষী বক্তৃতায় লক্ষ লক্ষ মানুষ লক্ষ লক্ষ টাকা খেলাফত কমিটিতে দান করত।বিলেতি কাপড় পুড়ে ফেলে মানুষ স্বদেশী কাপড় পড়তো,স্বর্ণ ছাদি রৌপ্য মুদ্রা স্তূপে স্তূপে খেলাফতকে প্রদান করতো,শুধুমাত্র উনার পূর্ব বগ্মীতার জন্য।তখন হুজুরের বক্তৃতার ঝংকার ছিল সব বক্তার বক্তৃতার উপরে।উনার বক্তৃতার জোরে ব্রিটিশের পুলিশ বাহিনীও অস্ত্র ফেলে খেলাফত আন্দোলনে যোগ দিতো যা মশহুর হয়ে আছে।
ধর্ম সংস্কারক :
হুজুর নামাযকে নামাযের মত কায়েম করতে বলতেন।নামায কিভাবে কায়েম করতে হয় সবাইকে সে শিক্ষা দিতেন।নামাযের আরকান আহকাম গভীরভাবে আমল করতেন।জিকির আজকার থেকে নামাযের প্রাধান্য বেশি দিতেন।হুজুর পীর মুর্শিদ বা কবরে সিজদাহ করাকে হারাম জানাতেন।আল্লাহ ব্যতীত কাউকে সিযদাহ করাকে কঠোরভাবে সম্পূর্ণভাবে হারাম জানিয়েছেন।যা এখনও তাঁর দরবার শরীফে কঠোরভাবে মানা হয়।তিনি শিরক বিদ্আত মুক্ত সুণ্ণাহ আকিদার অনুসারী ছিলেন কিন্তু ওহাবীর আক্বিদার ঘোর বিরুধী ছিলেন। উনার তরিকার টুপি ছিল গোল।ওহাবী সুন্নীরা এই দ্বিমতের জন্য উনি লম্বা টুপি ব্যবহার করে গিয়েছেন শেষ বয়সে।তিনি ওহাবীদের ব্যাপারে কঠোর ছিলেন।
বৈবাহিক জীবনঃ
হুজুর প্রথম বিবাহ করেন পটিয়া থানার মনশা গ্রামের মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস সাহেবের কন্যা।আর তিনি আগেই ভবিষ্যৎ বাণী করেছিলেন যে এই বিয়ে ঠিকবেন না এবং সেদিনেই উনি খেলাফত আন্দোলনের জন্য জেলে যান। হুজুর দ্বিতীয় বিয়ে করেন ব্রাহ্মণবাডিয়ার মাওলানা ছৈয়দ আব্দুর রব মক্কির বড় মেয়ে এবং অনেকদিন সংসার করার পর তাঁর ২য় স্ত্রী মারা যান।এ ঘরে তিন মেয়ে এক ছেলে জন্ম নেয়।তিনি ৩য় বিয়ে করেন বাশখালি নিবাসী মরহুম আনায়েত আলী চৌধুরীর ১ম কন্যা।হুজুর তাওয়াজ্জু সহ্য করতে গিয়ে হুজুর কেবলা হঠাৎ চরম অসুস্থ হয়ে পড়েন।
এতে উনার মোহতারেমা ৩য় বিবি হুজুরের মরণ মুখ অসুখে নিজ হায়াত হুজুরের উদ্দেশ্যে দান করে ইন্তেকাল করেন।হুজুর সবশেষে বিয়ে করেন হাটাজারির গুমান মর্দন(বর্তমানে নাঙ্গন মোড়া লেখকের নিজ গ্রামের বাড়ি) সুলতান বাড়ির হযরত আবুল হায়াত ওবাইদুল মুক্তাদের ও প্রফেসর এ.টি.এম আবু তাহেরের ভগ্নি হযরত হাসমত আলী গৌরমর্দ্দনী (রহ.) এর কন্যা।
হজ্ব যাত্রায় আখেরি মুনাজাতঃ
১৯৪৮ সালে হুজুর চট্রগ্রাম বন্দর হতে হজ্বের উদ্দেশ্যে জাহাজ যাত্রার প্রাক্কালে উনি যে আখেরি মুনাজাত করেছিলেন এবং সে মুনাজাতে মানুষ অঝরে কেঁদেছিল।
পর্দা প্রাক্কালেঃ
১০ই জিলহজ্ব বৃহস্পতিবার ১৯৪৮ সালের ১৪ই অক্টোবর মক্কা মোয়াজ্জেমায় বাদে জোহর উনি অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন,ভক্ত-মুরিদ ও অনুসারীদের কাঁদিয়ে এ-দুনিয়া হতে পর্দা নেন।উনার মাজার শরীফ মিনাতে অবস্থিত। তিনি ইহকাল থেকে পর্দা নিলেও তাঁর মহৎকর্ম ও আদর্শ এখনও সকলের জন্য অনুকরণীয় হয়ে আছে।
শেষ কথাঃ
আগামী ১৪ অক্টোবর ২০১৮ইং,৪ই মুহররম-সফর ১৪৪০ হিজরিতে পালিত হবে ফাতেহা-ই-ইয়াজদহম। চট্রগ্রামের রাঙ্গুনিয়া বেতাগী আস্তানা দরবার শরীফে যথাযোগ্য মর্যাদা ও ভাবগাম্বির্য্যরে মাধ্যমে ছৈয়দুল আযাম আল্লামা হাফেজ হযরত শাহ মুহাম্মদ বজলুর রহমান (রহ.)এর ওফাত দিবস উপলক্ষে ফাতেহা-ঈ-ঈয়াজদহম পালিত হবে। ছৈয়দুল আযম আল্লামা হাফেজ হযরত শাহ মুহাম্মদ বজলুর রহমান (রহ.)এর আদর্শিক জীবনের সামান্য অংশ যদি আমরা পালন করতে সক্ষম হই।তাহলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল মুহাম্মদ (সা) এর সন্তুষ্টি অর্জন সম্ভব।আমাদের ব্যক্তিগত জীবনে এ মহান সুফি সাধকের আদর্শিক জীবনধারা থেকে শিক্ষা নেয়ার মতো অনেক কিছু রয়েছে।মহান আল্লাহ সুবহান রাব্বূল আলামীণ তায়ালা আমাদের ব্যক্তিগত জীবনে মহান তাপস অলি ছৈয়দুল আযম আল্লামা হাফেয ক্বারী হযরত শাহ মুহাম্মদ বজলুর রহমান (রহ.)এর আদর্শ বাস্তবায়ন করার তৌফিক দান করুন।আমীন।

লেখকঃ আইনজীবি,কলামিস্ট,মানবাধিকার ও সুশাসন কর্মী।

Top