ইমাম-মুয়াজ্জিনের সংগ্রামী জীবন

41626164_744821995857682_4623597783805329408_n.jpg

মো: তানভীর অাহম্মেদ রনি :
ফজর থেকে এশা পাঁচ ওয়াক্ত সঠিক সময়ের মধ্যে নামাজ পড়ানোর দায়িত্ব পালন করেন মসজিদের ইমাম। আর এ প্রতিটি নামাজের আগেই সময় মেনে আযান ও ইক্বামত দেন মুয়াজ্জিন। খুব বেশি শারিরীক অসুস্থতা না থাকলে ঝড়-বৃষ্টি ও প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেই এ দুই পদে নিয়োজিত ব্যক্তিরা দায়িত্ব পালন করে চলেন নিয়মিত। ধর্মপ্রাণ মানসিকতার পাশাপাশি পেশা হিসেবেও এই দায়িত্ব পালন করেন তারা। তবে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পেশা হিসেবে বেছে নিলেও মসজিদ কমিটি থেকে পাওয়া অর্থে সংসার চলে না, অভাব-অনটন লেগেই থাকে। ইমাম-মুয়াজ্জিনদের এ অভাবের চিত্র শহরের তুলনায় গ্রামে আরও প্রকট। এক্ষেত্রে ২০০৬ সালে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় ‘মসজিদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা’ প্রণয়ন করলেও বাধ্যবাধকতা না থাকায় কমিটিগুলো এসব নিয়ম মানে না।

ঢাকা ও ঢাকার বাইরের কয়েক জন ইমাম-মুয়াজ্জিন ও খতিবের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজধানীতে গড়ে ইমামদের সম্মানি ৬ থেকে ১৫ হাজার টাকার মধ্যে। আর মুয়াজ্জিনের বেতন সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা। তবে এ সর্বোচ্চ সম্মানি দেওয়া হয় খুব কমসংখ্যক মসজিদেই। দীর্ঘদিন ধরে অধিকাংশ মসজিদে মুয়াজ্জিনের সম্মানি ৫/৬ হাজার। কোনও কোনও গ্রামের মসজিদে মৌসুমভিত্তিক ধান তুলে তাদের দেওয়া হয়।

ঢাকা ও ঢাকার বাইরে কয়েকটি গ্রামের মসজিদের ইমাম ও খতিবরা জানান, মসজিদগুলোর আয় কম হওয়ায় কমিটির তহবিলও কম। কোনও কোনও গ্রামের মসজিদে মাসে দু’শ থেকে আড়াইশ টাকা বা বছরে ৪/৫ হাজার টাকা দেওয়া সম্মানি দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম শহরের খতিবরা। প্রতি মাসে চার বার জুমার নামাজ পড়িয়ে গড়ে ৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত সম্মানি পান তারা।

গত ০৫ সেপ্টেম্বর মাগরিবের নামাজের পর মসজিদে বসে কথা হয় গাজীপুরের খাইলকুর গ্রামের একজন ইমামের সাথে । তিনি জানান, তার গ্রামের বাড়ি বরিশাল, ব্যক্তিগত জীবনে বিবাহিত এ ইমামের ১৮ মাসের একটি ছেলে সন্তান সহ অারো দুই ছেলে ৫ম ও ৮ম শ্রেণীতে পড়ে ।

কিভাবে সংসার চলে? এমন প্রশ্নের উত্তরে ইমাম সাহেব বলেন, ‘বলার কিছু নেই। বলতে গেলে অনেক কথাই…। তবে প্রতি মাসের প্রথম দিকেই সম্মানি পেয়ে যাই।’

একই মসজিদের মুয়াজ্জিনের সাথে কথা বললে জানা যায়, তার দুই ছেলে এক মেয়ে নিয়ে চলা সংগ্রামী জীবনের কাথা।

কেমন চলছে জীবন? প্রশ্নের উত্তরে মুয়াজ্জিন বলেন, ‘চলছে,আল্লায় চালায় নেন।

ঐ মসজিদের একজন মুসল্লি বলেন, বেশিরভাগ ইমাম ও মুয়াজ্জিনরা সম্মানি দিয়ে সংসার চালাতে পারেন না। এরপরও আলেমরা ইমামতি করেন। কারণ দুনিয়ার চেয়ে আখেরাতের মর্যাদায় বিশ্বাসী।’

ইমাম ও মুয়াজ্জিনরা বলছেন, তারা পাঠ্য-জীবনের শুরু থেকেই মাদ্রাসা ও মসজিদ সংশ্লিষ্ট কাজে সম্পৃক্ত থাকার পরিকল্পনা করেন। এক্ষেত্রে কম বা বেশি বেতন হলেও ‘পরকালীন সাফল্যের’ প্রত্যাশায় সম্মানি নিয়ে উচ্চবাচ্য বা দাবি-দাওয়া থেকে বিরত থাকেন।

এ বিষয়ে রাজধানীর একটি জামে মসজিদের খতিব বলেন, ‘ইমামরা আল্লাহর রাসূলের সুন্নাত পালন করতেই মাদ্রাসা ও মসজিদের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। ফলে, স্বাভাবিক জীবনে কষ্ট হলেও বেতন বা সম্মানি নিয়ে কেউ খুব একটা তৎপর হন না।’

তিনি অারো বলেন ‘অনেকে চক্ষুলজ্জার জন্যও নিরব থাকেন। তবে ইমামদের অন্তত স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে যে ব্যয় হয়, সেটা মসজিদ কমিটি দিলে খুব ভালো হবে।’

২০০৬ সালের ১৫ নভেম্বর মসজিদ পরিচালনা নীতি, কমিটি ও মসজিদের পদবিসহ বেতন কাঠামো নির্ধারণ করে একটি প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করে ধর্ম মন্ত্রণালয়। তাতে আটটি পদ এবং সেগুলোর বিপরীতে সম্মানী ধরা হয় এমন : ১. খতিব, সম্মানী চুক্তিভিত্তিক। ২. সিনিয়র পেশ ইমাম, বেতন স্কেল ১৩৭৫০-৫৫০-১৯২৫০ টাকা (তৎকালীন স্কেলে পঞ্চম গ্রেড)। ৩. পেশ ইমাম, ১১০০০-৪৭৫-১৭৬৫০ টাকা (ষষ্ঠ গ্রেড)। ৪. ইমাম, ৬৮০০-৩২৫-৯০৭৫-ইবি-৩৬৫-১৩০৯০ টাকা (নবম গ্রেড)। ৫. প্রধান মুয়াজ্জিন, ৫১০০-২৮০-ইবি-৩০০-১০৩৬০ টাকা (দশম গ্রেড)। ৬. জুনিয়র মুয়াজ্জিন, ৪১০০-২৫০-৫৮৫০-ইবি-২৭০-৮৮২০ টাকা (১১তম)। ৭. প্রধান খাদেম, ৩১০০-১৭০-৪২৯০-ইবি-১৯০-৬৩৮০ টাকা (১৫তম গ্রেড)। ৮. খাদেম, ৩০০০-১৫০-৪০৫০-ইবি-১৭০-৫৯২০ টাকা (১৬তম গ্রেড)। (যুগান্তর : ৩ অক্টোবর, ২০১৭)। বর্তমান স্কেল (২০১৫) হিসেবে সিনিয়র পেশ ইমামের মূল বেতন ৪৩ হাজার টাকা, পেশ ইমামের ৩৫ হাজার ৫০০ টাকা, ইমামের ২২ হাজার টাকা, প্রধান মুয়াজ্জিনের ১৬ হাজার টাকা, জুনিয়র মুয়াজ্জিনের ১২ হাজার ৫০০ টাকা, প্রধান খাদেমের ৯ হাজার ৭০০ টাকা এবং খাদেমের ৯ হাজার ৩০০ টাকা হওয়ার কথা। এর সঙ্গে যুক্ত হবে বাড়ি ভাড়া ও অন্যান্য সুবিধা। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো প্রজ্ঞাপন প্রকাশের এক যুগ অতিবাহিত হতে চললেও তা বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ লক্ষ করা যাচ্ছে না। গেল বছর সরকারের উদ্যোগে এবং সৌদি সরকারের অর্থায়নে প্রতি উপজেলায় একটি করে মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। (ইত্তেফাক : ২৮-০৯-২০১৬)।

নবীজি (সা.) এর পরে হজরত আবু বকর (রা.) ছিলেন মদিনার মসজিদের ইমাম। তার পরবর্তী খলিফারাও ছিলেন ইমাম। তাদের বেতন দেওয়া হতো সরকারি কোষাগার থেকে। আজও পৃথিবীর বিভিন্ন মুসলিম দেশে ইমামদের সম্মানজনক বেতন রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকেই দেওয়া হয়। বাংলাদেশে বেসরকারি মসজিদগুলোয় বছরে কোটি কোটি টাকা আয় হয়; কিন্তু সে টাকা এসি, দামি দামি কার্পেটসহ বিভিন্ন আয়েশি খাতে খরচ করা হলেও ইমামদের পরিবার নিয়ে খেয়েপরে বেঁচে থাকার মতো সম্মানী প্রদানের ক্ষেত্রেই অবহেলার প্রতিযোগিতা লক্ষ করা যায়। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের (অধিকাংশ) মসজিদগুলোর করুণ অবস্থার চেয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার মসজিদগুলোয় কর্মরত ইমাম-খতিবদের অবস্থাও অত্যন্ত শোচনীয়। রাষ্ট্রের কর্তারা একটু আন্তরিক হলেই ইমামদের ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রস্তাবিত স্কেলে বেতন দিতে পারত।

শিক্ষা যেমন মানুষের মৌলিক অধিকার, তেমনি ধর্ম পালনও মানুষের অধিকার। মানুষের শিক্ষার ব্যবস্থা করে দেওয়া যদি রাষ্ট্রের কর্তব্য হয়ে থাকে, তাহলে রাষ্ট্রের নাগরিকদের ধর্মীয় সুবিধা দিতে ইমামদের যথাযথ সম্মানী প্রদান কি রাষ্ট্রের কর্তব্যে পড়ে না? একটি সরকরি কলেজ, মাদরাসা কিংবা মাদরাসা শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে শত শত কর্ম
কর্মচারীর বেতন প্রদানের সাধ্য রাষ্ট্রের থাকে, এমনকি লাইব্রেরি ব্যবস্থাপনা, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের জন্য কর্মচারীদের বেতন দেওয়ার সাধ্য রাষ্ট্রের থাকলে দুই-তিনজন ইমাম-মুয়াজ্জিনের বেতন দেওয়ার সাধ্য কি রাষ্ট্রের নেই?

নীতিমালার ১৯ ধারা এর দুই উপধারায় বলা হয়েছে, সরকার পরিচালিত মসজিদে এই বেতনকাঠামো অনুসরণ করা যেতে পারে। অন্যান্য মসজিদের ক্ষেত্রে মসজিদ পরিচালনা কমিটির আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী আলোচনার মাধ্যমে বেতন-ভাতা নির্ধারণ করা যেতে পারে।

Top