কাপাডোকিয়া আন্ডারগ্রাউন্ড সিটি দেখে এসে–আশ্‌ফা খানম (হেলেন)

IMAG5445.jpg

——————————
কাপাডোকিয়ায় ৪ তারকা হোটেল দিনলার (DINLER)-এ আমরা অবস্থান করি । প্রাকৃতিক মনোরম পরিবেশে হোটেলটি যে কোন পর্যটকের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে । আজ যথারীতি সকাল ৯টা বাজে ইনজি গাড়ী নিয়ে হাজির। আমরাও সবাই রাজকীয় ব্রেকফাস্ট সেরে তৈরী। আজ প্রথমেই আকাংখিত আন্ডার গ্রাউন্ড সিটি ট্যুরে যাবো। উল্লেখ্য কাপাডোকিয়ায় স্থানীয়দের জন্য সরকারীভাবে বাসভবন তৈরী করতে গিয়ে সেখানে মাটির নীচে গুহার সন্ধান মেলে। সাথে সাথে নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেয়া হয়। সেখানে মাটির নিচে মানুষের বসবাসের উপযোগী ২তলা ও ৩ তলা এবং সর্বশেষ অনুসন্ধানে মাটির নিচে ১০ তলা বিশিষ্ট গুহার সন্ধান মেলে। শুধু তাই নয় দেখা গেছে গুহাগুলো সরু টানেল-এর মাধ্যমে একটি আরেকটির সাথে সংযুক্ত। আর এভাবে গুহাগুলো মাকাড়সার জালের মতো একটি আরেকটির সাথে নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মাটির নীচে একটি শহর গড়ে তুলেছে। পূর্বেই এসব গুহা তৈরীর ইতিহাস বলেছি। এক একটি এই রকম গুহার নগরীতে ১০,০০০ মানুষ বাস করতে পারতো। সরকারীভাবে আরো অনুসন্ধানের কাজ চলছে । ধারণা করা হচ্ছে পুরো কাপডোকিয়া শহরের মাটির নীচে এই ধরণের গুহার শহর ছড়িয়ে আছে। আমরা এই রকমই মাটির নীচে চার তলা বিশিষ্ট একটি গুহা পরিদর্শনে যায়। উল্লেখ্য মাটির নীচের গুহাগুলোর যথাযথ সংরক্ষনের জন্য সেখানে দৈনিক ৮০ জনের বেশী ট্যুরিস্ট ভিজিট নিষিদ্ধ । তাই প্রথম ৮০ জন ট্যুরিস্টই অনুমতি পাবে। যাক আমরা তাদের অন্তর্ভুক্ত হলাম। ইনজি আমাদেরকে নিয়ে সেখানে ঢুকে পড়ল। তবে যাবার পূর্বে আমাদের কারো হার্টের অসুখ বা এ্যাজমা থাকলে যেতে বারণ করে । আমরা সবাই যাত্রা শুরু করি। মাটির নিচে সরু পথ দিয়ে, কখনো মাথা নীচু করে আবার কখনো হামাগুড়ি দিয়ে নীচে নেমে পড়ি। কিন্তু কিছু সময়ের মধ্যে আমাদের দলের এডভোকেট রফিক ভাই তাকে দ্রুত বের করার জন্য অনুরোধ করেন। উনার সাথে তার স্ত্রীও গুহা থেকে বের হয়ে যেতে চাইলে ইনজি দ্রুত তাদেরকে বের হবার পথ দেখিয়ে গুহা থেকে বের করে দিয়ে আসেন। সেখানে আমরা গুহাবাসীদের প্রার্থনা ঘর, রান্না ঘর, তাদের মিটিং রুম, খাবার সংগ্রহের ঘর, আঙ্গুরের মদ তৈরী স্থান, থাকবার ঘর দেখলাম। গুহায় সবার উপরে পশু রাখার স্থান এবং তাদের খাবার ঘর দেখলাম। শত্রু যাতে আক্রমন করলে তারা দ্রুত পশুগুলোকে স্থানান্তর করতে পারে সে জন্য পশুদের ঘর সবার উপরে। এছাড়া একতলা থেকে আরেক তলায় চলাচলের পথ এত সরু যে এতে একজনের বেশী চলাচল করতে পারে না। কারণ শত্রুদের এক সাথে আক্রমণ প্রতিহত করতে এই ব্যবস্থা। সে সুযোগে তারা যেন পালাতে পারে। শত্রুদের ঠেকাতে বড় বড় রোলিং করা যায় এমন পাথরের টুকরো দিয়ে সুড়ঙ্গের মুখ বন্ধ করার ব্যবস্থা আছে। একটি কুয়ার মতো ব্যবস্থার মাধ্যমে ভেনটিলেশানের ব্যবস্থা আছে। তাছাড়াও দেওয়ালের গায়ে ছোট ছোট ছিদ্র দিয়ে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রয়েছে। জানা যায় শত্রুর আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য এভাবে তারা অনেক সময় মাসের পর মাস মাটির নীচের এই শহরে লুকিয়ে থাকতো। সামগ্রিক অবস্থা দেখে সে সময়ে তাদের কঠিন জীবন ব্যবস্থার চিত্র আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠে। হঠাৎ আমার ছোট ছেলে তার নিঃশ্বাস ভারী হবার কথা বললে আমিও ঠান্ডা অনুভব করতে থাকি এবং নিঃশ্বাস ভারী হতে অনুভব করি। আমি ইনজিকে আমাদেরকে দ্রুত গুহা হতে বের করার পথ দেখাতে বলি। আমার নিঃশ্বাস ক্রমে ভারী হয়ে আসতে থাকে। আমি আর আমার ছেলে ইনজির পেছনে ছুটছি। দম বন্ধ হবার মতো অবস্থা। অবশেষে গুহার বাইরে আসতে সক্ষম হই। গুহার শহর থেকে বের হয়ে আমি সেখানে রাখা বেঞ্চে লম্বা লম্বা শ্বাস নিতে থাকি। আর গুহাতে কিভাবে তারা দিনের পর দিন অতিবাহিত করতো তা’ ভাবছিলাল। না জানি আমার মতো কতজনের দমবন্ধ হয়ে হয়তোবা সেখানে মৃত্যু হয়েছিল। পরমকরুনাময়ের অশেষ রহমতের কথা স্মরন করে তার প্রতি শুকরিয়া জানাতে থাকি। সেখানে কিছুক্ষন ঘোরাঘুরি করে আমরা হাইকিং- এর জন্য Ihlar Village-এর দিকে ছুটে চল্লাম। কাপাডোকিয়ার পর্বতগুলো হাইকিং করা সেখানকার ট্যুরিস্ট এবং স্থানীয় লোকদের কাছে খুবই জনপ্রিয়। তাই সেখানে পর্যটকদের জন্য সরকার পাহাড়ের সরু উঁচু নিচু পথ ধরে হাইকিং করার জন্য ব্যবস্থাও রেখেছেন। আমরা স্পটে পৌঁছে, সেখানেও পাকা টসটসে আলুবোখরা বিক্রির জন্য দেখতে পাই। কিছু আলুবোখরা কিনে এবং ১লিরার বিনিময়ে ফ্রেস রুমে ফ্রেশ হয়ে হাইকিং এর জন্য পথ ধরি। প্রায় ৩৬০ টি সিঁড়ি ভেঙ্গে আমরা পাহাড়ের নীচে (প্রায় ১০০ মিটার) নেমে আসি। ইলহারা ভ্যালীকে তুর্কীর অসম্ভব সুন্দর ভূ-সৌন্দর্যের শিরোমণি মনে করা হয়। এটি কাপডোকিয়ায় অবস্থিত এবং হাজার বছর পূর্বে সৃষ্টি হয়। এতে প্রায় ১৪ কিলোমিটার সরু পথ আছে যার দু’ধারে উঁচু পাথরের খাড়া পাহাড় বিদ্যমান । ইতিহাসবিদরা এখানে বিভিন্ন মনুষ্য বসতির চিহ্ন ও প্রার্থনার জন্য চার্চ খুজেঁ পায়। ফলে তারা বিশ্বাস করে এক সময় এখানে শত শত বছর পূর্বে কোন জনপদ বাস করত এবং এতে আশ্চর্য হবারও কারণ নেই। কারণ এইখানে আছে মেলিন্দিজ নদী। যা আজো পর্বতের ধার ঘেষে বহমান এবং প্রবাহিত। আর একে কেন্দ্র করে এখানে মনুষ্যবসতি গড়ে উঠা অমূলক নয়। এখানে পানি সরবরাহ আর পাহাড়ে লুকানোর সুযোগ থাকায় রোমান সৈন্যদের থেকে পলাতকরা দীর্ঘদিন পালিয়ে থাকতে এই স্থানকে বেছে নিতো। আমরা নীচে নামলে সেখানে বসার এবং ছবি তোলার জন্য ব্যবস্থা দেখে কিছুক্ষন পর্বত আর শান্ত বহমান নদীর দৃশ্য উপভোগ করি। নানা রকম পাখির কলতান, নদীর কুল কুলু ধ্বনি আমাদেরকে বিমোহতি করে। অতঃপর বিশাল বিশাল দুই পর্বতের মাঝে সরু উচুঁ নিচু পথ ধরে চলতে থাকি। সাইনবোর্ডে Arrow mark (তীর চিহ্ন) দিয়ে সেখানে দিক নির্দেশনা দেয়া আছে এবং মাঝে মাঝে ময়লা ফেলবার জন্য ডাস্টবিন দেয়া আছে। প্রায় দেড় থেকে দুই ঘন্টার পথ অতিক্রম করেছি । কোথাও কোন ময়লা পড়ে থাকতে দেখিনি। চারিদিক পরিস্কার পরিছন্ন। শুধু নির্মল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যমন্ডিত। আমরা মাঝপথে এক চমৎকার জায়গায় বিশ্রাম নিতে বিরতি নিই । সেখানে নদীর মাঝখানে বড় বড় কাঠের রেলিং দেয়া ভেলার মতো ভাসছে। যেখানে মোটা বড় কার্পেট ও গদি এবং টেবিল বিছানো আছে। নদীর বুকে বসে চা-কফি বা অন্য কোন হালকা নাস্তার অর্ডার দিয়ে সেখানে তা উপভোগ করা যায়। ভেলাগুলোর চারটি পা নদীর বুকে গাঁথা। যদি স্রোতের সাথে ভেসে আসা পাতা-ঘাস সেই পা গুলোতে জমে ও স্রোতের গতি বাধাগ্রস্থ করে, তাই কিছুক্ষন পর পর সেখানে নিয়োজিত ব্যক্তিরা তা পরিস্কার করছিল । চমৎকার দৃশ্যের সাথে তূর্কী টি আমরা উপভোগ করছিলাম । প্রায় ১৫-২০ মিনিট বিরতির পর অবশেষে আমরা হাঁটতে হাঁটতে আমাদের লাঞ্চের স্থানে পৌঁছালাম। তখন জোহরের আযান শোনা যাচ্ছিল। সেখানেও নদীর ধারে চমৎকার ব্যবস্থা ছিল। আমরা সবাই ফ্রেস হয়ে এলে আমাদেরকে যথারীতি Appetizer Serve করা হয় এবং মেইন ডিস -এর অর্ডার নিয়ে অল্প সময়ের মধ্যে তা সার্ভ করে। আমরা প্রকৃতির মাঝে গল্প করতে করতে, খুব মজা করে লাঞ্চ উপভোগ করি। সেখানে অনেক বিড়াল যত্র তত্র ঘোরাফেরা করতে দেখেছি । লাঞ্চ শেষ করে সেখানে যোহরের নামাজ সেরে নিই । সেখানে অনেক পুরানো চার্চও দেখতে পাই । অতঃপর আমাদেরকে প্রথমে জুয়েলারী এবং পরে তাদের pottery শিল্প, সামগ্রী দেখতে নিয়ে যাওয়া হয়। মাঝপথে আমাদেরকে আরো একটি স্পটে নেওয়া হয় যেখানে ফেইরী চিমনীর (fairy chimney) মতো অনেক ছোটখাট পর্বত-গুহা রয়েছে। দুই জোড়া নব দম্পতিকে রাজা রানীর বেশে আমরা সেখানে ছবি তুলতে দেখি। স্পটে অনেক দোকানও আছে আর সেখানে গিয়ে আলুবোখরা ভর্তি গাছ দেখেছি। পটারী শপে আমাদেরকে তারা কিভাবে প্রথমে মাটি তৈরী করে তা থেকে (আমাদের মৃৎশিল্পের মতো)বিভিন্ন সামগ্রী তৈরী করা হয় তা দেখায় । এর পর তুর্কী টি দিয়ে অভ্যর্থনা জানিয়ে তাদের শিল্পকর্ম প্রদর্শন ও ক্রয় করার জন্য ঘুরে দেখায় । সেখানে একটি ঘরে তারা বিশেষ ক্যামিকেল মিশ্রনে তৈরী মৃৎ সামগ্রী দেখান যেগুলো আলো বন্ধ করার পরও জ্বল জ্বল করছিল ।অসম্ভব দাম দেখে নিদর্শন রাখবার জন্য ছোট একটি শো-পিস কিনে আমরা বেড়িয়ে পড়লাম । এবার আমাদেরকে (UC H ISAR) উহিসার ক্যাসেল দেখাতে নিয়ে চলল । এটি কাপাডোকিয়ার সবচেয়ে উচুঁতম স্থানে উহিসারে নির্মিত । এখান থেকে মনোরম নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক ও নৈসর্গিক দৃশ্য অবলোকন করা যায় । জানা যায় প্রাসাদটির উত্তর দিকের রুমগুলো বর্তমানে কবুতরের আবাস স্থল । সেখানকার কৃষকেরা সেখান থেকে কবুতরের বিষ্ঠা সংগ্রহ করে । তা তাদের ফলের বাগান, আঙ্গুরবাগানের জন্য অতি উত্তম সার হিসেবে ব্যবহার করে । আমরা প্রাসাদের নিকটে অবস্থিত পর্বতের ধারে একটি রেস্টুরেন্টে বসে কাপাডোকিয়ার পর্বতগুলোর দৃশ্য তুকী টি পান করতে করতে উপভোগ করছিলাম । উহিসারের উত্তর পূর্ব ও পশ্চিমে অবস্থিত ফেইরী চিমনীগুলো রোমান সাম্রাজ্যের সময়কালে তাদের কবর স্থান হিসাবে ব্যবহার হতো । পাথরের এই মাজারগুলোর প্রবেশের মুখ পশ্চিমে হয় এবং এর ভিতরে পাথরের স্ল্যাব বা টুকরার উপর মৃতদেহ রাখা হতো । এখানে পাথর দিয়ে খোদাই করে বানানো অনেক গীর্জা আবিস্কৃত হয়েছে । অতঃপর সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে ।আমরা Dinler হোটেলের দিকে ছুটে চললাম ।আজ কাপাডোকিয়ায় শেষ রাত । আগামীকাল সকালে কোনিয়ায় গাড়ীতে যাবো । সকাল ১০ টায় । আমরা রুমে ডিনার সেরে পরের দিন কোনিয়ায় যাবার জন্য ব্যাগ গুছালাম । আবার ভোরে বেলুন ট্যুরের জন্যও সাথীদের সকালে উঠতে হবে ।তাই তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লাম । আজকেও ফজরের নামাজ সেরে আমাদের দলের ৪জন বেলুন ট্যুরের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো । আজ আবহাওয়া ভালো । অবশেষে তাদেরকে ফোন করে জানানো হয় যে গতকালের ট্যুরিস্টরা সহ আজকে ভীষন চাপ থাকায় আমাদের দলের লোকদের কথা তারা ভুলে গেছে । অতএব বুকিং মানি ফেরত দেয়া হবে । ইনজিকে জানানো হয় । সবাই ভীষন ক্ষুদ্ধ । ইনজি আসবার সাথে সাথে সবাই তার উপর ক্ষোভ ও রাগ ঝাড়লো । সেও খুব দুঃখ প্রকাশ করে সহানুভুতি জানালো । আমরা ব্রেকফাষ্ট সেরে কোনিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দেই । প্রায় ২-৩ ঘন্টার পথ । শেষবারের মতো সৃষ্টিকর্তার অপূর্ব ও বিস্ময়কর সৃষ্টি কাপাডোকিয়ায়ার দৃশ্য উপভোগ করতে করতে কোনিয়ার দিকে গাড়ি ছুটলো তীব্র গতিতে । পরবর্তী সংখ্যায় শান্তির শহর কোনিয়া ও বিশ্ব বরেণ্য সুফী সাধক আল্লামা রুমি (রহঃ) মাজার জিয়ারত সম্পর্কে লিখার প্রত্যাশা রাখি ।

লেখকঃ প্রিন্সিপ্যাল, চট্টগ্রাম ভিক্টোরী ন্যাশনাল স্কুল-সিভিএনএস এবং কলামিস্ট ও নারী উন্নয়নকর্মী।

Top