সাপাহারে মনোসেক্স তেলাপিয়ার চাষে স্বাবলম্বী সাবিত্রী রানী

photo-sapahar-04.08.2018.jpg

সারোয়ার হোসেন, সাপাহার (নওগাঁ) প্রতিনিধি:
গ্রাম্য মেয়েরাও পারে কোমর বেঁধে শক্ত হাতে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাকে আলোকিত করতে।পারে ‘স্বয়ংসম্পূর্ণ মাছের দেশ-বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ’ ও মাছে ভাতে বাঙ্গালী,এই স্লোগাণ কে বাস্তবায়ন করতে, পারে দারিদ্র বিমোচন করে সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে। নওগাঁ জেলায় এই প্রথম সাপাহারে এর দৃষ্ঠান্ত মুলক উদারন দিলেন উপজেলার মানিকুড়া গ্রামের সাবিত্রী রানী,অস্বচ্ছল সংসার,১০ ও ১২ বছর বয়সী দু”সন্তানের জননী এবং দু-চোখ অন্ধ প্রতিবন্ধি স্বামী,সংসার জিবনে নেমে এসেছিল করুন পরিনতি অভাব অনটন ছিল নিত্য সঙ্গি,বড় ছেলের লেখা পড়া বন্ধ হয়ে যায়,এই প্রতিকুলটা পাড়ি দেয়ার লক্ষে সাবিত্রী রানী যোগাযোগ করে তার বড় ভাইয়ের ছেলে (ভাতিজা) সাপাহার মৎস্য অফিসের ক্ষেত্র সহকারী মিথুন চন্দ্র দেবনাথ এর কাছে,এবং তারই সহযোগীতায় গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ইউনিয়ন পর্যায়ে মৎস্যচাষ প্রচুক্তিসেবা সম্প্রসারন প্রকল্প মৎস্য অধিদপ্তরের মনোসেক্স তেলাপিয়া চাষ আরডি প্রদর্শনী ১৮,প্রকল্প বরাদ্দ ৫০ হাজার টাকা পেয়ে একই গ্রামের মাজেদ আলী সাবেক ইউপি সদস্য এর নিকট হতে ৪৮ শতক জলাশয়ের পুকুর লিজ নিয়ে ৫৭,৬০০ টাকার টার্গেটে মনোসেক্স তেলাপিয়ার চাষ শুরু করেন,অল্পদিনেই ঐ পুকুর হতে লাভ্যংশ পেতে শুরু করে সাবিত্রী রানী তাছাড়ার মৎস্য চাষের পাশাপাশি উপজেলার সদরে অবস্থিত শাওন ডায়াগনষ্টিক নামক বেসরকারী ক্লিনিকে আয়ার কাজ করেন।ফলে তার জিবন থেকে দুর হতে শুরু করেছে অভাব অনটন স্বদচ্ছন্দে জিবন কাঁটাতে পারছেন, ২ বছর লজে পুনরায় বড় ছেলেকে লেখা পড়ায় ভর্তি করেছে বর্তমানে দু’ছেলেই সাপাহার ডাঙ্গাপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে ৭ম শ্রেনীতে অধ্যায়নরত রয়েছে। সে এত ভালো মনোসেক্স তেলাপিয়া চাষ করতে সক্ষম হয়েছে যে নওগাঁর সাপাহারে জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ উৎযাপনের শেষে ২৮ জুলাই শনিবার সকাল ১১ টার সময় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অফিস কক্ষে, উপজেলা প্রশাসন ও মৎস্য অধিদপ্তরের উদ্যোগে পুরস্কার বিতরন ও সমাপনী অনুষ্ঠানে তাকে মৎস্য চাষে বিশেষ ভুমিকা অর্জন করায় পুরস্কৃত করা হয় মৎস্য অনুষ্ঠানে মৎস্য অফিসার মনিরুজ্জামান এর সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসাবে সাপাহার উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও)-ভারপ্রাপ্ত, ভূমি কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিষ্টেট জনাব সবুর আলী,অন্যান্যর মধ্যে বদলীজনিত বিদায়ী সমাজ সেবা কর্মকর্তা রেজওয়ানুল হক,প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সাজ্জাত হোসেন,প্রেসক্লাব সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম,সাপাহার রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি সাংবাদিক হাফিজুল হক,মৎস্য অফিসের ক্ষেত্র সহকারী মিথুন চন্দ্র দেবনাথ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন । পরবর্তীতে সাবিত্রী রানীর পুকুর পাড়ে সাংবাদিকদের এক বিশেষ সাক্ষাত কালে অনেক মুল্যবান বিষয় তুলে ধরেন তিনি,তেলাপিয়া বর্তমানে বাংলাদেশের মৎস্য চাষে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। স্থানীয় বাজারে চাহিদা ও এর উচ্চ বাজার মূল্যের জন্য খামারীরা বর্তমানে অধিক হারে এ মাছ চাষ করছে। প্রাকৃতিক খাবার গ্রহণের দক্ষতা, সম্পূরক খাবারের প্রতি আগ্রহ, বিরূপ প্রাকৃতিক পরিবেশে টিকে থাকা ও অধিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার কারণে চাষিদের কাছে এর জনপ্রিয়তা ও দিন দিন বাড়ছে। তাছাড়া বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে ও এর চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তেলাপিয়া মাছ ১২-৪০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় টিকে থাকে এবং ১৬-৩৫ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়। বাংলাদেশের জলবায়ুতে একই পুকুরে কমপক্ষে ২ বার মনোসেক্স তেলাপিয়ার চাষ করা যায়। ভবিষ্যতে আমাদের চাষ পদ্ধতি ও উৎপাদন ব্যবস্থার উন্নয়ন করা গেলে তেলাপিয়া মাছের বিশাল আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশ স্থান করে নিতে পারবে। তাই আমাদের দেশে মনোসেক্স তেলাপিয়া চাষের বেশ উজ্জল সম্ভাবনা রয়েছে ।
তেলাপিয়া চাষের বড় সমস্যা হলো এর অনিয়ন্ত্রিত বংশ বিস্তার। এই ধরণের অনিয়ন্ত্রিত বংশবিস্তারের কারণে পুকুরে বিভিন্ন আকারের তেলাপিয়া মাছ দেখা যায়। এতে করে আশানুরূপ ফলন পাওয়া যায় না। প্রকৃতিগতভাবেই পুরুষ তেলাপিয়া মাছের দৈহিক বৃদ্ধির হার বেশি। এই ধারণাকেই কাজে লাগিয়ে শুধুমাত্র পুরুষ তেলাপিয়া চাষকেই মনোসেক্স তেলাপিয়া চাষ বলা হয়। এই প্রজাতি সম্পূক খাদ্য গ্রহণে অভ্যস্থ্য, প্রতিকূল পরিবেশেও টিকে থাকে, অধিক ঘনত্বে চাষ করা যায় এবং প্রজননের জন্য পুকুরের পাড়ে গর্ত করে না বিধায় বর্তমানে শুধুমাত্র পুরুষ তেলাপিয়া বা মনোসেক্স তেলাপিয়া চাষে খামারীদের আগ্রহ বাড়ছে। এ মাছ দ্রুত বেড়ে ওঠে, উচ্চ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন এবং প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে পারে,এ মাছের চাষাবাদ ব্যবস্থাপনা সহজতর। মনোসেক্স তেলাপিয়া শুধুমাত্র পুরুষ তেলাপিয়া হওয়ায় স্ত্রী তেলাপিয়ার অভাবে প্রজনন সম্পন্ন করতে পারে না। ফলে পুকুরে বাচ্চা হয় না এবং চাষে কোন বিঘœ ঘটে না।সম্পূরক খাবার দিয়ে অধিক ঘনত্বে চাষ করা যায়। মনোসেক্স তেলাপিয়া দুই ধাপে অর্থাৎ নার্সারি ও মজুদ পুকুরে চাষ করা হয়। এতে করে কম সময়ে একই পুকুর হতে অনেক বেশি উৎপাদন পাওয়া সম্ভব,
দেড় ফুট থেকে চার ফুট গভীরতার পুকুর তেলাপিয়া নার্সারির জন্য অত্যন্ত উপযোগী। পুকরে নির্বাচনের সময় খেয়াল রাখতে হবে-পুকুরের পাড়সমূহ যেন মজবুত ও বন্যামুক্ত থাকে, পুকুরে পর্যাপ্ত সূর্র্যের আলো পড়ে, পুকুরটি যেন জলজ আগাছামুক্ত থাকে। প্রথমেই সম্পূর্ণ পুকুর শুকিয়ে অথবা রোটেনন ওষুধ প্রয়োগ করে রাক্ষুসে ও অবাঞ্ছিত মাছ দূর করতে হবে,এরপর প্রতি শতকে ১ কেজি চুন, ৫-৭ কেজি গোবর, ১০০-১৫০ গ্রাম ইউরিয়া, ৫০-৭৫ গ্রাম টিএসপি ও ২০ গ্রাম এমওপি সার প্রয়োগ করতে হবে,পুকুরের চারিদিকে জাল দিয়ে এমনভাবে ঘিরে দিতে হবে যেন ব্যাঙ বা সাপের উপদ্রব না হয়, সার প্রয়োগের ৫-৭ দিন পর প্রতি শতকের জন্য ২১-২৮ দিন বয়সের ১০০০-২০০০ টি মনোসেক্স তেলাপিয়ার পোনা মজুদ করতে হবে, মজুদকৃত পোনার মোট ওজনের ১০-১৫% হারে ৩৫% আমিষ সমৃদ্ধ খাবার দিনে ৩-৪ বার দিতে হবে। এভাবে নার্সারি পুকুরে ৪০-৬০ দিন পোনা পালন করে পোনার ওজন ২০-৩০ গ্রাম হলে মজুদ পুকুরে ছাড়তে হবে।
মজুদ পুকুরের গভীরতা কোন সমস্যা নয়। ফলে বেশি গভীরতার পুকুরকেও তেলাপিয়া মাছ চাষে ব্যবহার করা যায়।পুকুরে প্রাকৃতিক খাবারের যাতে অভাব না হয় সেজন্য প্রতি ৭ দিন পরপর প্রতি শতকে ৪-৫ কেজি গোবর, ২-৩ কেজি মুরগীর বিষ্ঠা, ৩৫ গ্রাম ইউরিয়া ও ২০ গ্রাম টিএসপি সার দিতে হবে। তবে পরবর্তীতে খাবার প্রয়োগের পরিমান বেড়ে গেলে সার প্রয়োগ বন্ধ করে দিতে হবে। মাছের গড় ওজন যখন ১০০ গ্রামের বেশি হয় তখন থেকেই দৈনিক ৫% হারে পুকুরের পানি পরিবর্তন করে দিলে ভাল ফল পাওয়া যায়।
মজুদের ১০০-১২০ দিন পর থেকে মাছের গড় ওজন ২০০-২৫০ গ্রাম হয়ে যায়। তখন থেকেই মাছ বিক্রি করা যেতে পারে। যখন মাছের গড় ওজন ৩০০-৫০০ গ্রাম হয় তখন বাজারের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে সব মাছ ধরে ফেলতে হয়।
বর্তমানে পৃথিবীব্যাপী মনোসেক্স তেলাপিয়া মাছের বাজার সম্প্রসারিত হচ্ছে। আমাদের দেশের প্রকৃতি ও আবহাওয়া মনোসেক্স তেলাপিয়া চাষের জন্য খুবই উপযোগী। তাছাড়া চাষে কম সময়, সম্পূরক খাদ্য গ্রহণে অভ্যস্থতা, দ্রুত বেড়ে ওঠার ক্ষমতা, সর্বোপরি বাজার মূল্য বেশি থাকায় বর্তমানে অধিকাংশ মৎস্য চাষি মনোসেক্স তেলাপিয়া চাষে এগিয়ে আসছেন। আমিষের চাহিদা পূরণ করে অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বি হতে মনোসেক্স তেলাপিয়া চাষ উন্মোচন করতে পারে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার।
পরিশেষে সাবিত্রী রানী মধ্য আয়ের দেশ বঙ্গ বন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ,বঙ্গ কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশে সাপাহার বাসিকে দেখিয়ে দিতে চায় মৎস্য চাষে আয় করে দেশের উন্নয়ন নিজের উজ্জল নকত্র গড়ে তুলতে,মৎস্য চাষে সামনে অগ্রসর সংসারের পাশাপাশি সাপাহার বাসির ভাগ্য উম্মেচনে সাবিত্রী রানী গন প্রজাতন্ত্রি বাংলাদেশ সরকারের,বঙ্গ কন্যা শেখ হাসিনার সার্বিক সহযোগিতা কামনা করেছে।তাছাড়া ঐ এলাকার জন সাধারন মনে করেন স্থানীয় ব্যাংক,এনজিও গুলো তাকে সার্বিক সহযোগিতা করলে সে ভালো আয় করতে সক্ষম হবে।

Top