জেনে নিন আপনার অধিকার ; ব্যাংক ঋণ ও বিনিয়োগ নিরাপদ করতে প্রয়োজনীয় সতর্কতা প্রসঙ্গে

FB_IMG_1527486226517.jpg

জিয়া হাবীব আহ্‌সান, এডভোকেট

————————-
বর্তমানে ভূয়া বন্ধক সৃজন পূর্বক ঋণের অর্থ লোপাট সংক্রান্ত বহু অভিযোগ শুনা যায় । ব্যাংক ঋণ বা বিনিয়োগকে নিরাপদ করতে ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে অত্যন্ত সর্তক পদক্ষেপ নিতে হয় । কেননা আমাদের দেশে ভূমি রেজিস্ট্রেশন বিভাগে ডিজিটাল সিস্টেম না থাকাতে প্রকৃত তথ্য জানা অত্যন্ত দুরূহ । ফলে দেখা যায় অনেকে একই জমি বার বার বিক্রি ও বন্ধক প্রদান করছে । মালিকানা যাচাই না করে জমি বন্ধক নিলে বা কিনলে বিনিয়োগকৃত অর্থ বা ঋণের টাকা উদ্ধার দুরূহ এবং ভবিষ্যতে মামলা-মোকদ্দমায়ও জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। জমির বিভিন্ন ধরনের দলিল থাকতে পারে। বিক্রয় দলিল থেকে শুরু করে ভূমি উন্নয়ন কর, খতিয়ান সবই হচ্ছে দলিল। বন্ধক গ্রহীতা বা ক্রেতাকে প্রথমেই দেখতে হবে সবশেষে যে দলিল করা হয়েছে, তার সঙ্গে আগের দলিলগুলোর মিলামিল আছে কি না। একে বলে চেইন অব ওনারশীপ । বিশেষ করে, বায়া দলিলের সঙ্গে সামঞ্জস্য আছে কি না, তা দেখতে হবে। বায়া দলিল হচ্ছে মূল উৎস বা দলিল, যা থেকে পরের ধারাবাহিক দলিল সৃষ্টি হয়। হস্তান্তর করা দলিলে দাতা এবং গ্রহীতার নাম, ঠিকানা, খতিয়ান নম্বর, জোত নম্বর, মহল, দাগ নম্বর, মোট জমির পরিমাণ ভালো করে পর্যবেক্ষণ করতে হয় । আরেকটি বিষয় খেয়াল করতে হবে, যে বায়া দলিল থেকে পরবর্তী দলিল করা হয়েছে, তাতে প্রতি দাগের হস্তান্তরিত জমির পরিমাণ ঠিক আছে কিনা। অনেক সময় আগের দলিলের চেয়ে পরের দলিলে বেশি জমি দেখানো হয়। এক্ষেত্রে হাল সন খাজনার দাখিলায় দেখতে হবে কতটুকু জমি রেকর্ড হয়েছে । খতিয়ানের ক্ষেত্রে আগের খতিয়ানগুলোর সঙ্গে দাগাদির সর্বশেষ মিলামিল আছে কি না, তা মিলিয়ে দেখতে হবে । মিউটেশন বা নামজারির মাধ্যমে যে খতিয়ান তৈরি করা হয়েছে, সে মতে খতিয়ানে দাগের মোট জমির পরিমাণ এবং দাগের অবশিষ্ট পরিমাণ যোগ করতে হবে। এই যোগফল কোনো দাগে মোট যে পরিমাণ জমি আছে, তার চেয়ে কম না বেশি, তা দেখা দরকার। যদি বেশি হয়, তবে অতিরিক্ত জমির মালিকানা কোনোভাবেই দাবি করা যাবে না। দেখতে হবে মিউটেশন বা নামজারি করা হয়েছে কি না এবং নামজারি যদি না হয় তাহলে কী কারণে হলো না তা জানতে হবে। মিউটেশন না করা থাকলে জমি কিনতে বা বন্ধক নিতে সমস্যা হবে। এজমালি সম্পত্তির ক্ষেত্রে শুধু নামজারী হলে হবে না, ওয়ারিশদের মধ্যে রেজিষ্টার্ড বন্টননামা ও চৌহদ্দি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে । তবে মূল বিএস খতিয়ানে একক মালিকের ক্ষেত্রে নামজারির খতিয়ানের প্রয়োজন নেই । মনে রাখতে হবে, দাগ নম্বরে সর্বমোট যে পরিমাণ জমি আছে, তার সঙ্গে আগের দলিলগুলোর মিল আছে কি না। জমি যার কাছ থেকে বন্ধক নিবেন বা কিনবেন তিনি কীভাবে জমির মালিক হয়েছেন, তা দেখতে হবে। ক্রয়সূত্রে, ওয়ারিশমূলে, লীজ, দান বা হেবামূলে যেকোনো উপায়েই হোক না কেন, প্রতিটি ক্ষেত্রেই উপযুক্ত দলিল যাচাই-বাছাই করে নিতে হবে। পাওয়ার অব অ্যাটর্নি মূলে যদি কেউ কোনো জমি বিক্রি করতে চান তাহলেও মূল মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা এবং তাঁর কাছ থেকে প্রকৃত তথ্য জেনে নেওয়া উচিত। অনেক সময় ভুয়া পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দলিল তৈরি করে জমি বিক্রির ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। জমি বন্ধক নেওয়ার ক্ষেত্রে সেটা সরকারি মালিকানা বা অর্পিত, অনাবাসিক, পরিত্যক্ত সম্পত্তির তালিকাভুক্ত কি না, অথবা অধিগ্রহণকৃত, খাস জমি ও ওয়াকফ ভূমি কিনা তা যাচাই করে নিতে হবে। যেকোনোভাবেই হোক না কেন, জমির মালিকানা যাচাই না করে তাড়াহুড়া করে জমি কেনা ও বন্ধক নেওয়া বোকামি। অনেক সময় জমিজমা নিয়ে মামলা-মোকদ্দমা চলাকালে প্রকৃত তথ্য গোপন করেও অনেকে জমি বন্ধক বিক্রি সৃজন কিংবা করে দেন । তাই মালিকানা-সংক্রান্ত বিরোধের বিষয়টি জেনে নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে আশপাশের লোকজনদের কাছ থেকেও জমি নিয়ে প্রকৃত তথ্য জানার চেষ্টা করতে হবে । অনেক সময় জমি নিয়ে অগ্রক্রয়ের মামলাও থাকতে পারে। তাই পার্শ্ববর্তী জমির মালিক অগ্রক্রয়ের দাবিদার কি না, তা খুঁজে বের করতে হবে।

ফাস্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড, আঞ্চলিক ট্রনিং সেন্টারের উদ্যোগে Perfection of Securitiesঃ Chain of Documents & Chain of Ownership, Scrutiny of related Papers Identification of Land, Owner & Ownership of Collateral etc বিষয়ে একটি কর্মশালার আয়োজন করেন । উক্ত কর্মশালায় বিজ্ঞ আইনজীবী এ এম জিয়া হাবীব আহ্‌সান ৤

কোনোভাবে জমিজমা-সংক্রান্ত বিষয়ে তৃতীয় পক্ষ বা ব্রোকার কিংবা মধ্যস্থতাকারীকে শতভাগ বিশ্বাস করা ঠিক হবে না। ক্রেতা বা বন্ধকগ্রহীতাকে ভূমির মালিকানা-সংক্রান্ত বিষয়ে ভালোভাবে খোঁজ খবর নিয়ে কিংবা যাচাই-বাছাই করে জমি কিনতে/ বন্ধক নিতে হবে। কমিশনে রেজিস্ট্রিতে False personification হওয়ার সম্ভাবনা বেশী থাকে । ভূয়া লোক দিয়ে রেজিস্ট্রি দেয়া হচ্ছে কিনা সতর্ক থাকতে হবে । দেওয়ানি বা সিভিল কোর্টের রায় বা ডিক্রিমূলে মালিকানা লাভ করলে সে রায়ের সার্টিফাকেট কপি, উচ্চ আদালতে আপীল/রিভিউ/রিভিশন দায়ের আছে কিনা সংবাদের দরখাস্ত দিয়ে জানতে হবে । পার্বত্য জেলার সম্পত্তি বা আদিবাসির জমি-জমা ক্রয় বিক্রয় ও বন্ধকের ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকের দপ্তর থেকে বিক্রয়ের অনুমতি পত্র, বন্ধকের অনুমতি আছে কিনা দেখতে হবে । পার্বত্য জেলায় জমি রেজিস্ট্রির দায়িত্বে থাকেন জেলা প্রশাসক বা তাঁর প্রতিনিধি ইউ.এন.ও । ভূমি মালিকের স্বত্ব দখলীয় জমির চতুঃসীমানায় স্থায়ী আইল/ পিলার দ্বারা চিহ্নিত আছে কিনা এবং এমনকি দাগের মধ্যে জমি ভাগ হলেও সেটেলমেন্ট নশকায় সীমানা চিহ্নিত করা হয়েছে কিনা যাচাই করতে হবে । সাব রেজিস্ট্রি অফিসের রেকর্ড রুম থেকে প্রাপ্ত এন.ই.সি তে মাত্র ১২ বছরের তল্লাসী রিপোর্ট পাওয়া যায় । এতে নিশ্চিত হওয়া যায় না সম্পত্তি বিক্রি বা হস্তান্তর হয়েছে কিনা । এজন্যে বিকল্প পদ্ধতি হিসাবে সংবাদপত্রে সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি প্রচার করতে হবে । ফ্ল্যাট/ ভূমি/ বন্ধকী সম্পত্তি ইত্যাদির স্বত্ব পরীক্ষার জন্য যেসব দলিলপত্র সমূহ অবশ্যই আইনজীবীকে সরবরাহ করা প্রয়োজন তাহলো ০১। স্বত্বের দলিল – লীজ ডীড, হেবা,কবলা, দানপত্র, অংশনামা বা পার্টিশন ডীড ইত্যাদি যে কোন হস্তান্তর দলিল, ০২।বায়া দলিল (পুর্ববর্তী মালিকানার ধারাবাহিক (রেফারেন্স) দলিল সমূহ, ০৩। সি.এস, এস.এ, আর.এস, পি.এস, বি.এস খতিয়ান সমূহ ; (ঢাকার জন্য সিটি জরিপ বা মহানগর জরিপ), কক্সবাজারের জন্য এম.আর.আর বা দিয়ারা খতিয়ান, ৪। মিউটেশন খতিয়ান (বর্তমান মালিকের নামে নামজারী খতিয়ান), ০৫। (D.C.R) ডুব্লিকেট কার্বন রিসিট, ৬। হালসন খাজনার দাখিলা (সর্বশেষ বাংলা সনের), ০৭। N.E.C (দায়মুক্ত সনদপত্র) (১২ বছর পর্যন্ত সদর রেকর্ড রুম হতে ইস্যু হয়), ০৮। মৌজা ম্যাপ (সি.এস, এস.এ ও আর.এস), ০৯। ওয়ারিশন সার্টিফিকেট (অংশনামা বা পাটিশন ডীড এর ক্ষেত্রে বা উত্তরাধিকার সম্পত্তির ক্ষেত্রে), ১০। আদালতের মাধ্যমে স্বত্ব দখল বা মালিকানা প্রাপ্ত হলে সংশ্লিষ্ট মামলা মোকদ্দমার রায় ডিক্রী, বয়নামা ১১। সিটি কর্পোরেশন বা পৌর এলাকায় হলে হোল্ডিং ট্যাক্সের রসিদ, ১২। নাবালকের সম্পত্তি হলে আদালতের অনুমতি (গার্ডিয়ানশীপ ও বিক্রয়ের অনুমতিপত্র), ১৪। বন্ধকী সম্পত্তির ক্ষেত্রে বন্ধক মুক্তির দলিল (রিডেমশান দলিল), ১৫। ওয়াকফ সম্পত্তির ক্ষেত্রে ওয়াকফ প্রশাসকের অনুমতিপত্র, সি.ডি.এ, এবং হাউজিং সোসাইটির প্লট এর ক্ষেত্রে N.O.C অবশ্যই লাগবে, ১৯। খাস/পরিত্যক্ত/ওয়াকফ, এনিমি প্রোপার্টি/অনাবাসিক/অর্পিত সম্পত্তি একোয়ার সম্পর্কিত তথ্য জানতে সংবাদের দরখাস্ত, ১৮। সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি প্রচার – (কেননা মালিকানা সংক্রান্ত এবং বন্ধক সংক্রান্ত তথ্য ডিজিটাল না হওয়ার কারণে তথ্য জানা সম্ভব নয়) । আরো জানতে হবে জমিটি কোন মামলার বিরোধীয় সম্পত্তি কিনা, ১৭। মূল দলিলের টোকেন সংগ্রহ ও জমা গ্রহণ করতে হবে, ১৮। দলিলপত্র/ এনআইডি/ওয়ারিশন সনদ ইত্যাদির সত্যতা যাচাই করতে হবে, ১৯। পাওয়ার অব এটর্ণি যাচাই করা, পাওয়ারে শুধু বন্ধক প্রদানের ক্ষমতা থাকলে হবে না। ব্যংকের বরাবরে মামলা ছাড়া পাওনা টাকার বিপরীতে সরাসরি সম্পত্তি বিক্রয়ের ক্ষমতা উল্লেখ থাকতে হবে (থার্ড পার্টি বন্ধকের ক্ষেত্রে), ২০। ফ্ল্যাট বাড়ি বন্ধক সংক্রান্তে যে সব অতিরিক্ত দলিল ও তথ্য সমূহ প্রয়োজনঃ ক। ভূমি মালিকের স্বত্বের দলিল (টাইটেল ডীড) খ। ডেভলাপারের কাছ থেকে রেজিস্ট্রি নেওয়ার ক্ষেত্রে কোম্পানির বরাবর রেজিঃ চুক্তিপত্র ও আমমোক্তারনামা নিতে হবে, গ। ডেভলাপার কোম্পানি হলে উক্ত কোম্পানির মেমোরেন্ডাম, আর্টিকেল অব এ্যাসোসিয়েশন, রেজুলেশান ইত্যাদি, ঘ। সংশ্লিষ্ট বায়া দলিল সমূহ, খাতিয়ান সমূহ যাচাই করতে হবে, ঙ। ভূমি মালিক ও ডেভলাপারের মধ্যে ফ্ল্যাট বন্টন চুক্তিপত্র, চ। সি.ডি.এ কর্তৃক প্ল্যান অনুমোদন পত্র, ছ। ফ্ল্যাটের আনুপাতিক ভূমির পরিমাণ কতটুকু ? যেমন ০০.৪৮ শতাংশ, (অচিহ্নিত ও অবিভক্ত ভূমি) ফ্ল্যাটের টাইপ, যেমন (এ-১), কোন ফ্লোরে অবস্থিত-? যেমন-২য় তলা, কার পার্কিং আছে কিনা ? যেমন ৮০/১০০ বর্গফুট, এখানে আরেকটি বিষয়ে সর্তক থাকতে হয় যে, ফ্ল্যাটটি ইতিপূর্বে ডেভলাপার বা ভূমি মালিক বন্ধক প্রদান করেছে কিনা, রেজিস্ট্রির জন্য ক্রেতার ই.টি.আই.এন, এন.আই.ডি, ছবি ইত্যাদি আবশ্যক । উল্লেখিত আলোচনা থেকে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ ও বিনিয়োগের বিপরীতে অতিরিক্ত সহায়ক জামানত হিসেবে সম্পত্তি বন্ধক গ্রহণে জালিয়াতি ও প্রতারণা প্রতিরোধে কি কি সতর্কতা অবলম্বন করা যায় তৎ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা জনস্বার্থে উপস্থাপন করা হলে । আশা রাখি ব্যাংকিং সেক্টরে দুর্নীতি ও প্রতারণা বন্ধে এ আলোচনা কার্যকর ভূমিকা রাখবে ।

লেখকঃ আইনজীবী, কলামিস্ট, মানবাধিকার ও সুশাসন কর্মী ।

Top